আজকে একটা দু:খজনক ঘটনা শেয়ার করছি আপনাদের সাথে। রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্সের ১৮তম ব্যাচের পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়া আপুটা, আমার দৌলা সার্ভিস নিয়েছিলেন। ঢাকার শনির আখড়ার দিকে থাকেন।
নরমাল ডেলিভারি চাচ্ছিলেন। সেই অনুযায়ী ব্যায়াম ও সাপোর্টিভ ডাক্তারের খোঁজ করে তার চেক আপে ছিলেন। ডেট পার হয়ে অল্প কিছুদিন হয়েছে, লেবার পেইনের সাইন ছিল না। বাচ্চা উপরে ছিল। পেলভিসের ইনলেট (বাচ্চা প্রবেশের পথ) আরো প্রশস্ত হওয়ার জন্য কিছু এক্সারসাইজ দিয়েছিলাম। এর মাঝে বাচ্চা কিছুটা নিচে নামে আর ব্যায়ামের প্রভাবে লেবার শুরু হয় আলহামদুলিল্লাহ।
একজন পারিবারিকভাবে পরিচিত অভিজ্ঞ ধাত্রী হাতের কাছে ছিল কয়েকদিন ধরেই৷ বাচ্চার নিচে নামার গতি খুব ধীর ছিল, একসময় ধাত্রী হাত গুটিয়ে নেয়।
আপুর পরিবারের পক্ষ থেকে ভাবা হয়, কোন মেডিকেল প্রসিডিওর প্রয়োজন হলে, যেমন পিটোসিন বা এপিশিওটমি, তাহলে তো ধাত্রী পারবেন না। তাই উনারা আগে থেকে যোগাযোগ করে ঠিক করে রাখা ছাড়াই কাছাকাছি একটা ছোটখাট হাসপাতাল থেকে কয়েকজন নার্স নিয়ে আসে।
এখানেই সমস্যা হয়ে যায়! নার্সরা পেশেন্ট ধরে রাখার জন্য ম্যালপ্র্যাকটিস শুরু করে, না জানিয়ে পিটোসিন দেয়া, পানি ভেঙে দেয়া ইত্যাদি কাজ করে এবং বার বার আশা দিতে থাকে যে আর অল্প সময়ের মাঝেই বাবু হয়ে যাবে!
এদিকে আপু শুয়ে থাকতে পারছিলেন না, জোর করে শুইয়ে রাখে। প্রচন্ড ব্যাথার মাঝে দৌলা হিসেবে আমার সাথেও আর কোন যোগাযোগ করেননি।
আপুর চিৎকার চেঁচামেচিতে ফজরের পর উনার ডাক্তারের হাসপাতালে নিতে চাইলে তখনো নার্সরা জোর দিয়ে নিজেদের হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে আরো কিছুক্ষণ ম্যালপ্রাকটিস ও সময়ক্ষেপনের পর একরকম জোর করেই উনারা বের হয়ে আপুর নিয়মিত চেক আপের ডাক্তারের হাসপাতালে যান। বলে রাখি, এই ডাক্তার বেশ ভালো, উনাদেরও চেক আপে ভালো লেগেছিল। সেদিন ইমার্জেন্সি অবস্থায় দ্রুত সিজারের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বাচ্চা কিছুটা মেকোনিয়াম খেয়ে ফেলে এবং এনআইসিইউতে থাকে।
আমাদের দেশে এখনো হোম বার্থ এর জন্য পেশাদার মিডওয়াইফ বা নার্স হাতের কাছেই পাওয়া যায় না। এসব কারণে হোম বার্থ ট্রায়াল দেয়া যথেষ্ট রিস্কি। এতে মা ও বাচ্চা দু’জনের কষ্টের মাত্রাই বাড়তে পারে। পূর্ব পরিচিত না থাকা নার্সদের লেবারের সময় হঠাৎই নিয়োগ দেয়াটা বড় ভুল ছিল। তাদের ডেলিভারি বিষয়ে যথেষ্ট পেশাদারিত্ব ছিল না।
আপুর পরে মনে হয়েছে হাসপাতালে গিয়ে কেবিন নিলে হয়ত ধীরে ধীরে ব্যায়ামের মাধ্যমে বাচ্চা নিচে নামানোর জন্য চেষ্টা করতে পারতেন, যেভাবে আল্লাহর রহমতে ব্যায়ামের মাধ্যমে ইনলেট প্রশস্ত হতে ও লেবার শুরু হতে হেল্প হয়েছিল৷
অপরিকল্পিতভাবে নেয়া একটা সিদ্ধান্তের জন্য প্রসব অভিজ্ঞতা ভীতিকর হয়ে গেল আপুর কাছে!
হাসপাতাল ডেলিভারিও সুন্দর হতে পারে যদি জ্ঞানের পাশাপাশি সুপরিকল্পনা নেয়া হয়। হোম বার্থের ট্রায়ালও ভীতিকর হতে পারে অপরিকল্পিত হওয়ার কারণে।
প্রেগন্যান্সি, লেবার-ডেলিভারির সময় দক্ষ সেবাপ্রদানকারীর পরামর্শে থাকা অত্যন্ত জরুরী। দক্ষ সেবাপ্রদানকারী না পেলে হোম ডেলিভারি ট্রায়াল দেয়ার সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হতে পারে। এছাড়াও রাস্তাঘাটের যানজট ইত্যাদি কারণে আমাদের দেশে ইমার্জেন্সি অবস্থায় দ্রুত সেবা পাওয়া নিশ্চিত করা যায় না।
আল্লাহ এই আপুর জন্য উত্তম কিছু দিক যার বিনিময়ে তিনি এই কষ্টটা ভুলে যেতে পারেন।
রাবেয়া রওশীন
প্রিনেটাল ইন্সট্রাক্টর ও দৌলা, রৌদ্রময়ী স্কুল