মা হওয়া এবং কিছু আপেক্ষিক বিষয়

প্রেগন্যান্সি গ্রুপগুলোতে প্রায়ই পোস্ট দেখা যায় যেখানে জিজ্ঞেস করা হয় কোন ডাক্তার প্রিনাটাল ভিজিটে সময় দিয়ে কথা শোনেন বা কার নরমালের প্রতি আন্তরিকতা বা ব্যবস্থা কেমন। সেখানে কেউ হয়ত এসে একজন ডাক্তারের নাম সাজেস্ট করল যার কাছে উনি হয়ত খুব ভালো সার্ভিস পেয়েছেন, ঠিক তার পরের কমেন্টেই দেখা যায় আরেকজন এসে বলছে যে উনি তেমন সময় দেন না, অনেক ব্যস্ত ইত্যাদি। আবার কখনো প্রশ্ন দেখা যায় সিজারের পর নরমালের চেষ্টা করেন এমন ডাক্তার কে আছেন।
সেখানে কেউ একজন ডাক্তারের নাম বলার পরের কমেন্টেই অন্য কেউ হয়ত এসে বলছে যে উনি তেমন চেষ্টা করেন না, আমি গিয়েছিলাম কিন্তু উৎসাহিত করেননি।
অদ্ভূত না? আসলে বিষয়টা কী?
আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে প্রশ্নের উত্তরগুলো দেই। যার ভালো অভিজ্ঞতা সে অন্যকে সেভাবেই সাজেস্ট করবে আবার যার খারাপ অভিজ্ঞতা সে অন্যকে ওই পথ মাড়াতেও না করবে।
আমাদের প্রত্যেকের শারীরিক, মানসিক গঠন আলাদা। আমাদের মা হওয়ার প্রক্রিয়াটা কেমন হবে তার অনেকটাই নির্ভর করে এসবের ওপর। ডাক্তার একজনকে নরমালের জন্য উৎসাহ দিয়েছে আরেকজনকে দেননি এর পেছনেও এই কারণগুলো অনেকটাই জড়িত থাকে।
একই কথা বলা যায় নরমাল ডেলিভারিকে উৎসাহিত করা আর সিজারকে নিরুৎসাহিত করার ক্ষেত্রে। কারো শরীর হয়ত নরমাল ডেলিভারির জন্য উপযোগী। তার জন্য নরমাল ডেলিভারি সম্ভব হয়েছে। কিন্তু কারো হয়ত কম্পলিকেশন আছে। তার জন্য শত চেষ্টাতেও নরমাল ডেলিভারি সম্ভব হয়নি। যার সহজেই নরমাল ডেলিভারি হয়েছে সে হয়ত এ ব্যাপারে অন্যকে প্রবল উৎসাহিত করবে। তার কথায় অনেকসময় অন্য পক্ষের কমপ্লিকেশন বিবেচনার দিকটা উঠে আসে না।
অন্যদিকে কেউ হয়ত প্রেগন্যান্সি ও ডেলিভারি নিয়ে অনেক নেগেটিভ ঘটনা শুনেছে। তাই নিজের পক্ষে সম্ভব কি না এটা না ভেবেই সরাসরি সিজার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছে। অথবা লেবার পেইনটাকেই হয়ত তার অনেক ভয় লাগে।
আমরা যখন মানুষকে নরমাল ডেলিভারিতে উৎসাহিত করতে চেষ্টা করব তখন সব পক্ষের কথা মাথায় রেখেই করতে চেষ্টা করব। আমাদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত যারা নরমাল ডেলিভারিকে ভয় পেয়ে সিজার করাতে চায় তাদের মনের অকারণ ভীতি দূর করতে চেষ্টা করা। এরপর হচ্ছে, যারা নরমাল ডেলিভারি করাতে আগ্রহী তাদের এ ব্যপারে তৈরি হতে সাহায্য করা। এক্ষেত্রে জ্ঞান অর্জন করা ও সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেয়ার বিকল্প নেই। সুষম পুষ্টি ও শারীরিকভাবে একটিভ থাকা একজন মাকে সুস্থ ও কম ঝুঁকির মাঝে রাখবে। মা যত সুস্থ ও কম ঝুঁকির মাঝে থাকবেন উনার ভালো অভিজ্ঞতা হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি হবে।
আমার নিজের দুইটি প্রাকৃতিক প্রসবের অভিজ্ঞতা আছে, আলহামদুলিল্লাহ। আমি নিজে প্রাকৃতিক প্রসবের একজন আন্তরিক সমর্থক। কিন্তু একই সাথে আমার চাইল্ডবার্থ এডুকেশনের ট্রেনিং-এ আমি এটাও শিখেছি যে সব মেডিকেল হস্তক্ষেপেরই নিজ নিজ জায়গা আছে। আমরা যেমন মায়েদের শেখাতে চেষ্টা করি প্রাকৃতিক উপায়ে কিভাবে লেবার পেইনের সাথে কোপ করা যায়, তেমনি এটাও তাদের জানাতে চেষ্টা করি যে প্রয়োজন হলে তাদের মেডিকেল হেল্প নিতে হবে। কখন মা মেডিকেল সহায়তা নেবেন আর কখন না নিয়েও লেবার ও ডেলিভারি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যেতে পারবেন এ ব্যপারে জ্ঞান রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রৌদ্রময়ী স্কুলের সাথে প্রিনাটাল কোর্স নেয়ার বিগত চারটি ব্যাচের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, নরমাল ডেলিভারি সকলের জন্য সম্ভব হয় না। এবং প্রিনাটাল কোর্স করার উদ্দেশ্যও সকলের এটা হয় না। নিশ্চিত সিজার লাগবে জেনেও অনেকে এই কোর্স করতে আসেন গর্ভকালীন সময়, নিউট্রশন, নবজাতকের যত্ন, খাওয়ানো ইত্যাদি বিষয়ে জানতে। আমাদের একজন স্টুডেন্ট মা ছিলেন যিনি বলেছিলেন অনেককিছু জানার সুযোগ পাওয়ার পরও প্রেগন্যান্সিতে কাজে লাগাতে পারেননি নিজের শারীরিক অসুস্থতার কারণে। কিন্তু বাচ্চাকে খাওয়ানোর ক্লাসগুলো থেকে অনেক উপকৃত হয়েছেন মাশাল্লাহ। একজন মা ছিলেন যিনি ডিপ্রেশনে ভোগার কারণে প্রেগন্যান্সিতে নিজের যত্নটাই ঠিক মতো নিতে পারতেন না। এক জোড়া ডাক্তার দম্পতি ছিলেন যারা খুব উৎসাহী ছিলেন মাশাল্লাহ। আপুটার শেষ দিকে পানি কমে যায়, নরমালের জন্য আরো এক সপ্তাহ অপেক্ষা করার পর সিজারের সিদ্ধান্ত নেন। একজন আপু প্রিনাটাল কোর্সে জয়েন করেন পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশনের ক্লাস করার জন্য। পরবর্তীতে কোর্স করে VBAC-র জন্য অনুপ্রানিত হন এবং উনার সফল VBAC হয় আলহামদুলিল্লাহ। চতুর্থ ব্যাচের একজন আপু বলেছেন উনার সবচেয়ে ভালো লেগেছে সি-সেকশনের ক্লাস, উনি এই ক্লাস করে বুঝতে পেরেছেন কেন উনার আগে সিজার হয়েছিল।
অজ্ঞতা আমাদের মাঝে ভয় আর হতাশা তৈরি করে। নরমাল ডেলিভারির প্রতি অকারণ ভীতি দূর করার জন্য ও মায়েদের গাইড করার জন্য যেমন আমাদের নরমাল ডেলিভারি প্রমোট করা প্রয়োজন, তেমনি জেনে-বুঝে নেয়া সিজারের সিদ্ধান্তও আমাদের জন্য কল্যাণ আর আত্মবিশ্বাসের কারণ হতে পারে এই জ্ঞান তাদের মাঝে দেয়াটাও প্রয়োজন। সেই সাথে, নরমালের জন্য আন্তরিক ডাক্তার খোঁজ করা যেমন জরুরী, তেমনি চিকিৎসা পেশার সাথে জড়িতদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখাও একান্তই প্রয়োজন। সব ধরনের পরিস্থিতি মাথায় রেখে ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে মায়েদের জানার সুযোগ করে দেয়া উচিত।
রাবেয়া রওশীন
প্রিনাটাল ইন্সট্রাক্টর ও দৌলা
রৌদ্রময়ী স্কুল
