Back

মায়ের নিঃশব্দ কান্না, আমরা কি শুনি?

‘খুব কাঁদত, রাতে ঘুম হত না! যমজ সন্তানকে ফাঁস দিয়ে মারল মা।

সন্তানদের কান্না থামানোর জন্য একটি লেপ দিয়ে মুখ ঢেকে দেয়। তাতে আরও জোরে চিৎকার শুরু করলে ওড়না দিয়ে তাদের শ্বাসরোধ করে মারে মা।’

কিছুদিন পরপরই এমন ঘটনা ঘটে আজকাল। তবুও কেন যেন আমরা মাদের প্রতি একটু মায়া দেখাতে পারি না। প্রেগ্ন্যাসির অবর্ননীয় কষ্ট, প্রসব ও প্রসব পরবর্তী কষ্ট। কোনো কিছুইতেই কিছু মানুষের মন গলে না। শারীরিক কষ্ট যুদিওবা কিছুটা বুঝলেও মানসিক কষ্ট যেন কিছুই না।

না। আমি অপরাধকে ছোট করে দেখছি না। যেটা অপরাধ সেটা অপরাধই। তবুও বলছি পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশন!কতোটা ভয়ংকর তা আমাদের কল্পনারও বাইরে। পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বাচ্চা জন্মের পর থেকে ২বছরের মাঝে যে কোনো সময় হতে পারে। শুধু যে নিউবর্ন বেবি থাকলেই হয় তা না কিন্তু। ভুক্তভোগী নিজেও হয়তো বুঝে না। আর আশেপাশের মানুষ তো দূরের কথা। মানুষ শুধু ভুল ধরতে ব্যস্ত। কেন হাঁসে না! কে কথা বলে না। কেন সারাদিন মুখটা প্যাঁচার মত বানিয়ে রাখে। এসবও দোষ হিসেবে গণ্য হয়। কেউ কখনই এই না হাসা মানুষটার হাসির কারণ হয় না। কে সে হাসে না তাও খোঁজ নিতে যায় না। সাহায্য করার বদলে উলটা খোঁটা দিয়ে নিজের বড়ত্বের প্রমাণ দেয়।

নতুন মা হওয়ার পর, একজন মেয়েকে শুধু শারীরিক না, মানসিক বিভিন্ন দিক থেকেও স্ট্রাগল করতে হয়। নানাজনের নানারকম কথা, হরমোনার ইমব্যালেন্স, না ঘুমানো, ক্লান্তি, ঘন ঘন কাঁদতে আর শরীরের সাথে লেপ্টে থাকা আরেকটা প্রাণী, সারাদিনের উল্টাপাল্টা রুটিন, সব মিলিয়ে বিধ্বস্ত জীবন। আর সাথে সংসারের সমস্ত কাজ। নিজের স্বপ্ন শখের কবর দিতে হয় প্রতিনিয়ত।

আরেকটা কথা কি জানেন, একজন বাবা ঘর থেকে বেরুলেই তার আগের জীবনে ফিরে যেতে পারে, কিন্তু মায়েদের জন্য আর কখনোই সেই আগের জীবনটা ফিরে পাওয়া সম্ভব না। জীবন ফিরে পাওয়া তো দূরের কথা, দুই মিনিট নিরবে চিন্তা করার স্বাধীনতাও হারিয়ে যায় মাটার জীবন থেকে।

এই যে নতুন জীবন, নতুন দায়িত্ব, নতুন রুটিন, খাপ খাইয়ে নেয়া কী খুব সহজ? না। এই কঠিন কাজটা সবাই যে পারে তাও না। কেউ কেউ এতোটাই মুষড়ে যায় যে এমন ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। আবারো বলছি, অপরাধ অপরাধই। আমি অপরাধের পক্ষে সাফাই গাচ্ছি না। বলছি যেন বুঝতে পারেন। যেন আপনার আশেপাশে যে নতুন মাটা নিজেকে দুমড়ে মুচড়ে নিয়েছে তাকে খোঁটা না দিয়ে একটু মায়া ভরে জড়িয়ে নিতে পারেন।

আর আপনি নিজেই যদি নতুন মা হয়ে থাকেন তবে শুনুন, এই সময় শেষ হয়ে যাবে। আমাদের রব অনেক দয়ালু। একটা কথা জানেন, আমাদের রব আমাদের সাধ্যের বাইরে কিচ্ছু চাপিয়ে দেন না। তার মানে এই সন্তানের দায়িত্বও আপনার সাধ্যের বাইরে না। আপনি কীভাবে বুঝবেন আপনি পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে পড়েছেন কিনাঃ

★Low mood কিংবা সবসময় মন খারাপ থাকা

★নরমাল সময়ে যা ভালো লাগে তাতে উৎসাহ না পাওয়া

★খাবারের রুচি না পাওয়া কিংবা অনেক সময় নরমালের চেয়ে অতিরিক্ত খাওয়া

★অস্বাভাবিক বেশি কান্না করা

★ঘুম না হওয়া (Insomnia) বা অনেক বেশি ঘুম পাওয়া

★অল্পতেই বিক্ষুব্ধ বা বিচলিত হওয়া

★কোন কাজে এনার্জি না পাওয়া

★Feeling failure, guilty, ashamed, worthless, hopeless, empty or sad.

★মনোযোগ কমে যাওয়া, ভুলে যাওয়া

★নিজেকে কিংবা বাচ্চাকে আঘাত করার চিন্তা করা (➡️নিচে আরো কিছু লিখছি এই ব্যাপারে।)

★কারো সাথে সোশ্যাল কন্ট্যাক্ট করতে ইচ্ছা না হওয়া

সব যদি মিলে যায় তাহলে প্লিজ ডক্টরের বা কাউন্সিলরে পরামর্শ নিন। আর পরামর্শ নেয়ার পাশাপাশি কিছু নিজে কিছু পদক্ষেপ নিন যেন দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারেন।

১। প্রেগন্যন্সিতে যেমন হেলদি ডায়েট মেইন্টেইন করতেন সেরকম পুরো ব্রেস্ট ফিডিং টাইমে মেনে চলবেন।

২। মানুষের কটু কথাকে পাত্তা দিবেন না।

৩। আপনার যা সাহায্য লাগবে স্পষ্ট তা পরিবারের মানুষের বলবেন। কোনো দ্বিধা করবেন না।

৪। একদম অল্পকরে হলেও নিজেকে সময় দিন।

➡️ নিজেকে কিংবা বাচ্চাকে আঘাত করার চিন্তা করাঃ সাধারণত পোস্ট পার্টটাইম ডিপ্রেশনের শুরুতেই এমন চিন্তা হয় না। তাই শুরুতেই যদি আপনি বুঝেন ও সবরকম ব্যবস্থা নেন তাহলে এমন চিন্তা আপনার নাও আসতে পারে। কিন্তু যদি এমন চিন্তা আসেই তবে মনে রাখবেন

১। এটা শুধু মাত্র একটি চিন্তা। ওয়াসওয়াসা। এই চিন্তায় আপনি নিজে act করবেন কিনা সেটা আপনার নিজের ডিসিশন। অবশ্যই আল্লাহ আমাদের সেই ক্ষমতা দিয়েছেন। তাই তো মনের চিন্তার কোনো জবাবদিহিতা নেই। কিন্তু আমি যদি সেই চিন্তা অনুযায়ী act করি তার জন্য আমাকে জবাবদিহি করতে হবে, শাস্তি পেতে হবে।

২। এমন চিন্তা আসলে বেশি বেশি আউজুবিল্লাহ পড়তে থাকবেন। আয়াতুল কুরসি। মানে প্রটেকশনের যত দু’আ আপনি জানেন সব।

৩। সম্ভব হলে কিছুক্ষণের জন্য বাচ্চাকে অন্যকারো কাছে দিয়ে নিজে নিজের মত অন্য কিছু করবেন। যদি তা সম্ভব না হয় তবে বাচ্চাকে নিয়েই হাঁটতে বের হয়ে যাবেন। সেটাও যদি সম্ভব না হয় তবে অন্তত গোসল করে নিবেন।

৪। যে আপনাকে বুঝবে সাপোর্ট করবে আমন কাউকে সব খুলে বলবেন আপনি কেমন অনুভব করছে আপনার কি ধরণের চিন্তা আসছে সব।

৫। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করুন। সব আল্লাহ বলুন। বারবার বলুন। কেঁদেকেটে বলুন। কুরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহর স্মরণই হচ্ছে এমন জিনিস যার সাহায্যে চিত্ত প্রশান্তি লাভ করে” [১৩:২৮]

তাই আল্লাহর সাথে সম্পর্কের প্রতি যত্নবান হওয়া খুব দরকারি। বেশী বেশী কুরআন পড়ুন আর পড়তে না পারলে তিলাওয়াত শুনুন। বেশী বেশী যিকির করুন। নামাজ ও সবরের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করুন।

আবার বলছি, অপরাধ অপরাধই। আপনার পোস্ট ডিপ্রেশন বলে অপরাধকে হাল্কা করে দেখার উপায় নেই। এমন চিন্তা আসলে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতাকে ভয় করুণ।

নুসরাত জাহান মুন(আমাতুল্লাহ)
দৌলা, রৌদ্রময়ী স্কুল
সার্টিফাইড চাইল্ড বার্থ এডুকেটর অ্যান্ড দৌলা ট্রেইনি, আমানি বার্থ