দৌলা ডায়েরী সিরিজ — পর্ব ৩৯
- Posted by Sumaiya Snigdha
- Date August 15, 2026
- Categories Doulas

সাদিয়া আপু আমাকে দৌলা সার্ভিস এর জন্য নক করেন উনার ২য় প্রেগন্যান্সির ৩৬ সপ্তাহে। আপুর ফর্ম থেকে জানতে পারি উনার প্রায় ৩ বছরের একটি বাবু আছে এবং ১ম প্রেগন্যান্সিতে উনার লেবার ট্রায়াল দেয়ার সময় ৭সেমি ডায়লেশনের (জরায়ু মুখ খোলার) পর জানা যায় যে উনার বেবি অবলিক (oblique) বা বাঁকা অবস্থায় আছে।
এরপর সি-সেকশন হয়।
সাদিয়া আপু রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স করেছেন ২৫তম লাইভ ব্যাচে। আপুর সাথে ১ম বার যখন ফোনে কথা বলি, উনাকে ভিব্যাক নিয়ে মোটামুটি ডিটারমাইন্ড মনে হলেও ডাক্তার/হাসপাতাল ফাইনাল করা এবং ভিব্যাকের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে কিছুটা কনফিউজড ও অপ্রস্তুত মনে হয়েছিল।
সাদিয়া আপু যে হাসপাতালে ছিলেন সেখানে খুব বেশি রিস্ক নেয়া হয় না, উনাকে বলে দেখা হয়েছিল ৯০% চান্স রিপিট সিজার হবে।
আমি আপুকে বললাম, হাসপাতাল থেকে যদি এমনটা বলেই থাকে তাহলে এখানে ভিব্যাকের আশায় যাওয়া আসলে অর্থহীন। ভিব্যাক লেবার ট্রায়াল দেন এমন ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিলাম। রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্সের ইন্সট্রাক্টর ডা. ফাতেমা ইয়াসমিনের কথা জানালাম এবং আপু উনার কাছে ভিসিটে যান।
৩৬+ সপ্তাহে ডাক্তার ভিসিটে পিভি করে জানা যায় এবার প্রেগন্যান্সি থেকেই আপুর বেবি অবলিক পজিশনে আছে। বেবির মাথা আপুর তলপেটের একদম বাম দিকে ছিল।
সাদিয়া আপু প্রেগন্যান্সিতে খুব বেশি ব্যায়াম আগে থেকে করেননি। তাই ৩৬ সপ্তাহে সার্ভিস শুরু করার পরও আমি আপুকে একসাথে অনেক ধরনের ব্যায়ামের জন্য জোর দেইনি। উনার ক্যাপাসিটি অনুযায়ী কিছু কিছু ব্যায়াম দিচ্ছিলাম ও আস্তে আস্তে বাড়ানোর জন্য বলছিলাম।
এবার বেবি পজিশন অবলিক আসায় আপু ব্যায়ামের প্রতি আরেকটু সিনসিয়ার হলেন। যেহেতু আপু ব্যায়ামে খুব এক্টিভ ছিলেন না, আমি বেশি জোর দেই আপুর বডি ব্যাল্যান্সিং এর প্রতি।
Psoas muscle release ও hip hinge এই দুটোর প্রতি বেশি জোর দেই শরীরের সামনে-পেছনে ব্যালান্স করার জন্য। সেই সাথে নিয়মিত 3D ডিপ ব্রিদিং ও upper body stretching করতে বলি শরীরের ভেতর স্পেস ক্রিয়েট হওয়ার জন্য।
আপু যথাসম্ভব চেষ্টা করতে থাকেন এবং আমি লক্ষ্য করি আপু ধীরে ধীরে ব্যায়ামের পরিমাণ বাড়াচ্ছিলেন।
সাদিয়া আপুর আরেকটা ভালো ব্যাপার ছিল যে, উনি আমাকে নিয়মিত ডায়েট চার্ট দিতেন। আর আমাকে চার্ট শেয়ার করার কারণে ব্যাল্যান্সড ডায়েটের প্রতিও উনার সচেতনতা বাড়ে।
আপু ব্যায়ামে আরেকটু রেগুলার ও অভ্যস্ত হলে বেবি পজিশন ভালো আসার জন্যও কিছু ব্যায়াম সাজেস্ট করি। উনি সব করতে পারতেন না, তবে যেগুলো পেরেছেন নিয়মিত করতেন।
আলহামদুলিল্লাহ, পরবর্তী ডাক্তার ভিসিটে আপু জানতে পারেন যে বেবি প্রায় মিডলাইনে চলে এসেছে। ডাক্তার উনাকে লেবারের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেন।
আপু স্বস্তি পেলেও চিন্তিত ছিলেন যে বেবি আবারও মিডলাইন থেকে সরে যায় কি না, তাই শেষ পর্যন্তও সাজেস্টেড ব্যায়ামগুলো করে যান।
৩৮ সপ্তাহ রানিং এমন সময় থেকে আপু হালকা পিংক/ব্রাউন ডিসচার্জ দেখতে পান ও ঘন ঘন ব্র্যাক্সটন হিক্স (প্র্যাক্টিস কন্ট্র্যাকশন) অনুভব করেন। এ সময় আপু আল্ট্রা করান, স্কার থিকনেস আলহামদুলিল্লাহ ৩.৭ মিমি আসে, সিটিজি-ও ভালো ছিল।
এভাবে ২য় দিন কন্ট্রাকশনগুলো আরো ঘন ঘন আসতে থাকে এবং চলতেই থাকে। আপুর থেকে শুনে আমার মনে হলো যে উনি ল্যাটেন্ট ফেইজ (লেবারের শুরুর ধাপে) আছেন।
আপু মোটামুটি ডিপ ব্রিদিং, আর একটু নাড়াচাড়ার মধ্যে থেকে পেইন ম্যানেজ করছিলেন। ডাক্তারের সাথেও উনার যোগাযোগ ছিল।
সেই রাতটাও বাসায় কাটিয়ে পরদিন সকালে হাসপাতালে ভর্তি হন। পিভি করে দেখলেন যে স্টেশন ০ (জিরো), Effacement মোটামুটি ৫০%, আর ৪ সেন্টিমিটার ডাইলেটেড, আলহামদুলিল্লাহ।
এরপর ৪ ঘন্টা পর দুপুর দুইটার সময় আবার পিভি চেক করা হলো। তখন দেখা গেল আপু ৬ সেন্টিমিটার ডাইলেটেড, কিন্তু স্টেশন তখনও জিরোতেই ছিল। আর Effacement অনেকটা হয়ে গেছে—মনে হয় ৬০% বা ৭০%।
এর মধ্যে আপু আমার সাথেও যোগাযোগ রাখেন, একটু হাঁটাহাঁটি, মুভমেন্টের মধ্যে ছিলেন।
যেহেতু বাচ্চা মিড পেলভিসে ছিল, কয়েকটা asymmetrical pelvis পজিশনের টিপস দিয়েছিলাম, যাতে বেবি নিচে নামে। যেগুলো আপুর শারীরিক অবস্থায় সম্ভব হচ্ছিল,asymmetric position নিয়ে সাথে একটু ম্যাসাজ নেওয়া, আর thigh shaking—এসবও করছিলেন।
এরপর সন্ধ্যা ছয়টায় আবার পিভি করার পর দেখা গেল, স্টেশন এখনও জিরো। তবে ডাইলেশন একটু বেড়েছে। আর Effacement মনে হয় ৬০% বা ৭০% এর মতো ছিল।
তো যাই হোক, স্টেশনটা চেঞ্জ হচ্ছিল না। এটা নিয়ে আপু খুব টেনশনে ছিলেন।
তারপর সন্ধ্যা সাতটার দিকে ডা. ফাতেমা ইয়াসমিন এসে চেক করলেন। বললেন, যেহেতু আপুর কন্ট্রাকশন কমে যাচ্ছিল, তাই পিটোসিন দেওয়া হবে। পিটোসিন লো ডোজে শুরু হলো। প্রথমে ৫ ড্রপ দিয়েছিলো।
তখন কন্ট্রাকশন আবার রেগুলার হতে লাগল, কিন্তু আপুর মনে হচ্ছিল একটু কমিয়ে দিলে ভালো হয়। পরে ৩ ড্রপ করে দেওয়া হলো। তখনও কন্ট্রাকশন ঠিকঠাক ছিল। কিছুক্ষণ পর আবার আপু বললাম ড্রপ কমিয়ে দিতে। তখন মোটামুটি কন্ট্রাকশন ঠিক ছিল।
রাত ১০টা–সাড়ে ১০টার দিকে, বা পিটোসিনের ডোজটা শেষ হওয়ার পর, চেক করে দেখা গেল ৮ সেন্টিমিটার ডায়লেটেড, ৭০% Effaced, আর স্টেশন মোটামুটি, জিরো থেকে +১ হতে পারে।
মাঝেমধ্যে CTG আর Doppler করা হচ্ছিল বাচ্চার হার্ট রেট দেখার জন্য।
আপু বারবার সোফায় পা ৯০ ডিগ্রি রেখে সাইড লাঞ্জেস করছিলেন, হাঁটাহাঁটি করার চেষ্টা করছিলেন, অসমানভাবে (uneven) পা রেখে স্কোয়াট করার চেষ্টা করছিলেন। এ ধরনের কিছু এক্সারসাইজও আপুকে বলেছিলাম।
ওয়াশরুমে একটু বসে থাকতে বলেছিলাম, এড়া পেলভিক ফ্লোর মাসেল রিল্যাক্স করতে হেল্প করে যার ফলে বেবি নিচে নামতে পারে। ওটাতেও মোটামুটি আরাম লাগছিল আপু জানিয়েছেন।
কিন্তু আস্তে আস্তে দেখলেন যে আপুর কন্ট্রাকশনগুলো কমে যাচ্ছিল।
আপুর হাসব্যান্ডও বারবার এসে বলছিল, “তুমি এত টেনশনে বডি শক্ত করে রেখেছ, রিল্যাক্স করো।” কিন্তু আপুর মাথায় বারবারই আসছিল—স্টেশন কেন নামছে না?
তো যাই হোক, তারপর ডাক্তাররা যখন CTG দেখলেন, তখন ওনারা বললেন যে পানি ভেঙে দেখতে চান, বেবি পটি করেছে কি না।
প্রথমে আপু যদিও চাচ্ছিলেন না। পরে শেষ মুহূর্তে কোনো রিস্ক নিতে চাননিনা।
তো পানি ভাঙার পর আলহামদুলিল্লাহ দেখা গেল যে পানি একদম ক্লিয়ার, কোনো সমস্যা নেই।
আর এরপরই দেখলেন যে পানি ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে বেবি অনেকটা নেমে এসেছে। স্টেশন মোটামুটি +১ এর দিকে চলে এসেছে। ডাইলেশনও অলমোস্ট সম্পূর্ণ হয়ে গেছে।
তো তখন ওটা শুনে আপু আলহামদুলিল্লাহ খুব খুশি হলেন।
আপুর কন্ট্রাকশন মোটামুটি পানি ভাঙার পরও কন্টিনিউ হয়েছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে আবার কমে যাচ্ছিল।
তো দ্বিতীয়বার আবার আপু ড্রিপ নিতে বলেছিলেন।
আপু ওয়াশরুমেও গিয়ে অনেকক্ষণ বসেছিলেন, যাতে স্টেশনটা আরও নিচে নামে আর আপু একটু আরাম পান।
তখন ডা. ফাতেমা ইয়াসমিনের সঙ্গে কথা বলে লেবার টিম ড্রিপ শুরু করে। দেওয়ার জন্য রাজি হলেন।
প্রথমে ৫ ড্রপ, তারপর হয়তো ১০ ড্রপ—একটু একটু করে বাড়ানো হয়েছিল, একদম শেষ মুহূর্তে, যখন বেবি একদম বের হওয়ার দিকে।
রাত দুইটার দিকে প্রায় ৩ পুশেই আপুর বেবি বের হয়ে আসে, আলহামদুলিল্লাহ।
যদিও ৩৬ সপ্তাহ থেকে সার্ভিস নেয়ায় আপুর সাথে অল্প সময় ছিলাম, কিন্তু এ সময়টা বেশ ঘটনাবহুল ছিল।
আপুর হাজব্যান্ডের প্রতিও কৃতজ্ঞতা ব্যায়াম, লেবারের সময় আপুকে খেজুর-পানি খাওয়ানো, রিল্যাক্সেশনে সাপোর্ট দেয়া এসব কিছুর জন্য।
রাবেয়া রওশীন
প্রিনেটাল ইন্সট্রাক্টর ও দৌলা, রৌদ্রময়ী স্কুল
Other post
You may also like
এপিডুরাল শুধু একটি পেইন কিলার নয়
আব্দুল্লাহর জন্মের সময় এপিডুরাল নেওয়ার আগে আমি ভেবেছিলাম এটি শুধু একটি পেইন কিলার। ব্যথা একটু কমবে, কিছুটা বিশ্রাম পাব, আর এর মধ্যেই বেবি হয়ে যাবে।কিন্তু আমি যা বুঝিনি তা হলো— এটি লেবরের স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়াকে বদলে দেয়।লেবর মানে শুধু জরায়ুর Contractions …
লেবারের সময়ে কুইক লিস্ট
লেবারের সময়টা একজন মায়ের সবচেয়ে ভালনারেবল সময়। অনেক কিছু আগে থেকে পড়া থাকলেও জানা থাকলেও ব্যথার তীব্রতায় হয়তো মাথায় নাও থাকতে পারে। তাই লেবারের সময়টা একটু সহজ করার জন্য এটি একটি কুইক লিস্ট।১. লেবরের প্রাথমিক পর্যায়ে হাঁটাহাঁটি করুন এবং যতক্ষণ …
জিলহজের ১০ দিনঃ গর্ভবতী মায়ের দুয়া
ইসলামের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সময়গুলোর একটি হলো জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “এমন কোনো দিন নেই, যেদিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে এই ১০ দিনের আমলের চেয়ে বেশি প্রিয়।” (সহীহ বুখারী)এই দিনগুলো কুরবানির প্রস্তুতি নেয়ার পাশাপাশি দোয়া, ইবাদত, আর …
