আমার ব্রেস্ট ফিডিং জার্নি
- Posted by Sumaiya Snigdha
- Date August 15, 2026
- Categories Blog

আমার বাবু হওয়ার পর প্রথম দুই দিন আমার মিল্ক ফ্লো আসেনি। ফ্যামিলি থেকে ফর্মুলা ফিডিং করাবো কিনা জিজ্ঞেস করা হচ্ছিল। আমি কনফিডেন্টলি বলেছিলাম ‘ফ্লো আসবে, ফর্মুলা দেবো না’।
আমার বাবু হওয়ার পর প্রথম দুই দিন আমার মিল্ক ফ্লো আসেনি। ফ্যামিলি থেকে ফর্মুলা ফিডিং করাবো কিনা জিজ্ঞেস করা হচ্ছিল। আমি কনফিডেন্টলি বলেছিলাম ‘ফ্লো আসবে, ফর্মুলা দেবো না’।
আমার আনমেডিকেটেড নরমাল ডেলিভারি ছিল। আমি জানতাম যে শরীর তার স্বাভাবিক নিয়মেই সঠিক সময়ে সাড়া দেবে। খুব দ্রুততম সময়ে ফ্লো না আসাটা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। তাছাড়া একটি ফুলটার্ম বাচ্চা তার মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেই প্রথম ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি, তরল ও পুষ্টি রিজার্ভ বা জমা করে নিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়।
তাই এর আগে মিল্ক ফ্লো নিয়ে এতো দুশ্চিন্তার কিছু নেই। তাছাড়া একটি নবজাতকের পাকস্থলীর সাইজ থাকে একটা মটরশুঁটি দানার সমপরিমাণ। এত ছোট্ট একটা পাকস্থলী ভরতে খুব বেশি একটা দুধের প্রয়োজনও পড়ে না। যতটুকু কোলাস্ট্রাম বাচ্চা পায় অতটুকুই ওই কয়দিনের জন্য তার জন্য যথেষ্ট।।
আমার জন্য সবথেকে স্ট্রেসফুল ছিল দ্বিতীয় রাতটা। যখন আমার বাবু ‘সেকেন্ড নাইট সিন্ড্রোম’ (Second Night Syndrome) এর জন্য কান্না করছিল তখন কেউ একজন আমাকে বারবার বলছিল, “বাচ্চা তো দুধ পাচ্ছে না, এই জন্যই তো কান্নাকাটি করছে! একটু চিনির পানি খাইয়ে দাও তাহলেই আর কান্না করবে না।”
মাত্র একদিনের একটা নবজাতককে চিনির পানি খাওয়ানো যে কতটা মারাত্মক ক্ষতিকর আমি জানি, এটা তাকে বললেও সে বুঝবে না তাই আমি কোন কথাই বাড়াইনি। আমি শুধু বলেছিলাম, “ইনশাল্লাহ মিল্ক ফ্লো আসবে”।
এবং আসলোও! কিন্তু আসার পর আরেক স্ট্রাগল। মিল্ক ফ্লো এত বেশি ছিল যে জামাকাপড় ভিজে যেত, আমাকে নিয়মিত মিল্ক প্যাড ব্যবহার করতে হতো। রাতের পর রাত জেগে ফিডিং করানো, একটু পর পর ঘুম ভেঙে যাওয়া, তার ওপর নিপল ক্র্যাকের মারাত্মক যন্ত্রণা, সব মিলিয়ে শরীর আর টেনে নেওয়া যাচ্ছিল না। মনে হতো যেন সারারাত বাচ্চার সাথেই আধো-ঘুমে জেগে আছি, আর সকালে ঘুম থেকে উঠে চরম ক্লান্তিতে শরীর নিস্তেজ হয়ে আসত।
এই জায়গাটিতে আমি আমার মায়ের কথা গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি। আমার পোস্টপার্টম বা প্রথম ৪০ দিনের কঠিন সময়টায় মা আমার পাশে দুইজন হেল্পিং হ্যান্ড রেখে দিয়েছিলেন। সকালবেলা উনাদের একজন এসে বাবুকে কোলে নিয়ে বসে থাকতেন। কারণ ওই সময় ওর কোলে ঘুমানোর অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল।
আমি তখন পাম্প করে রাখা মিল্ক ফিডারে দিয়ে বাবুকে উনার কাছে দিয়ে টানা দুই-তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিতাম। সত্যি বলতে, ওই দুই-তিন ঘণ্টার ঘুমটাই ছিল সারা দিন একা হাতে সব সামলানোর একমাত্র ‘রিচার্জ’! কারণ ১০ টার পর উনারা দুজনেই চলে যেত আর আমার মা চাকরিজীবী। তো সারাদিন আমার একাই বাবুকে সামলাতে হবে।
সারাদিন একা হাতে বাবুকে সামলাতে গিয়ে কখনো কখনো ঠিকমতো খাওয়ার সময় হতো না। এসময়টা আমার চাচা, চাচী আর চাচাতো বোনও আমাকে অনেক হেল্প করেছে। আমার ভাইয়ের প্রতিও আমি অনেক কৃতজ্ঞ।
এত এত শারীরিক কষ্টের পরও আমি ব্রেস্টফিডিং জার্নি থামাইনি। কারণ, এটি শুধু বাচ্চার জন্যই নয়, একজন মায়ের নিজের শারীরিক রিকভারির জন্যও এক জাদুকরী প্রক্রিয়া।
মায়ের দ্রুত রিকভারি:
ব্রেস্টফিডিং করানোর সময় মায়ের শরীরে ‘অক্সিটোসিন’ (Oxytocin) হরমোন নিঃসৃত হয়, যা প্রসব-পরবর্তী রক্তপাত কমায় এবং জরায়ুকে দ্রুত তার পূর্বের আকৃতিতে ফিরে যেতে সাহায্য করে।



মাতৃদুগ্ধে থাকা অ্যান্টিবডি (বিশেষ করে কোলস্ট্রাম ও পরবর্তী বুকের দুধ) বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি তৈরি করে। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রেস্টফিডিং করা শিশুদের আইকিউ (IQ) এবং ব্রেইন ডেভেলপমেন্ট অনেক উন্নত হয়।



মা ও শিশুর মাঝে যে অদৃশ্য সুদৃঢ় বন্ধন (Bonding) তৈরি হয়, তা অতুলনীয়।
আমি টানা দুই বছর আমার বাবুকে ব্রেস্টফিডিং করিয়েছি। তবে সবচেয়ে কঠিন পার্টটা এসেছিল ১৫ থেকে ১৮ মাসের পর। এ সময় ওর চোষার ও কাছে থাকার প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে গেল। সবসময় আমার সাথে লেগে থাকতে চাইতো।
২২-২৩ মাসের দিকে গিয়ে আমার নিপল ক্র্যাকের যন্ত্রণা এত ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছায় যে একপাশে কেটে রক্ত-মাংস বের হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল! বাধ্য হয়ে একপাশের ফিডিং ৭ থেকে ১০ দিনের জন্য পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছিল। আর ফিডিং অফ করার ১ মাস অব্দি শুধু নিপলের স্কিন চেঞ্জ হতো। টান দিলে ১ ইঞ্চি মতো মরা চামড়া লম্বা হয়ে উঠে আসতো। এই পেইনগুলো আসলে বলে কাউকে বুঝানো সম্ভব নয়।
এরপর ২৩ মাসের মাথায় আমি সিদ্ধান্ত নিই এবার জার্নিটা ইতি টানার। প্রসেসটা আমি খুব ধীরে ধীরে করেছি— 














রাতের ফিডিং বন্ধ করার প্রথম ৭ থেকে ১০ দিন ছিল এক ভীষণ কষ্টের পরীক্ষা। রাতে ঘুম ভেঙে ও দুধের জন্য কান্না করতো, আমি তাকে কোলে নিয়ে পুরো ঘর হেঁটে হেঁটে ঘুম পাড়াতাম। কখনো কান্নাকাটি করতে করতে ও নিজেই আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ত। এক সপ্তাহের কঠোর ধৈর্যের পর আলহামদুলিল্লাহ ও অভ্যস্ত হয়ে যায়।
আমাদের সমাজে ব্রেস্টফিডিং করানো একজন মায়ের এই নীরব ত্যাগকে প্রায়ই ছোট করা হয়। গবেষণায় প্রমাণিত যে, প্রতিদিন শুধুমাত্র বুকের দুধ উৎপাদন করতে একজন মায়ের শরীর থেকে ৪০০ থেকে ৫০০ ক্যালোরি বার্ন হয়! যা একটা বড়সড় ওয়ার্কআউটের সমান। কিন্তু এত ক্লান্তির পর মা যখন একটু পরিশ্রান্ত অনুভব করে, তখন সমাজ বা চারপাশ থেকে কথা আসে—”মা নাটক করছে”, “ভান করছে”।
পবিত্র কোরআনে প্রসব ও দুধ খাওয়ানোর এই সময়টাকে বলা হয়েছে “কষ্টের ওপর কষ্ট”। অথচ এই মহান কাজটিকে যখন ছোট করে দেখা হয়, তখন একজন মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। যা তার শরীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। সে চরম আত্মগ্লানি বা ‘মাদার্স গিল্ট’ (Mother’s guilt)-এ ভুগতে শুরু করে মনে করতে থাকে সে হয়তো বেশি ওভার-রিঅ্যাক্ট করছে! এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো ভীষণ জরুরি।
আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, মনে হয় এটিই আমার জীবনের অন্যতম সেরা এবং সুন্দর একটি জার্নি ছিল। যখন এই স্ট্রাগলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন প্রতিটা মুহূর্ত ক্লান্তিকর ও কঠিন মনে হতো। কিন্তু আজ সেই দিনগুলো পার করে এসে আমি আমার ওই স্মৃতিগুলোকে বড্ড মিস করি!




আপনাদের ব্রেস্টফিডিং জার্নিটা যতটা কঠিনই মনে হোক না কেন, এটাকে উপভোগ করার চেষ্টা করুন। আপনার সন্তানের সাথে তৈরি হওয়া এই অনন্য বন্ধনটাকে অনুভব করুন। বিশ্বাস করুন, জীবনের একটা পর্যায়ে গিয়ে আপনি এই ক্লান্তিময় কিন্তু ভালোবাসায় ভরা দিনগুলোকে ভীষণ মিস করবেন। মাতৃত্বের এই নীরব লড়াইয়ে আপনি একা নন, আপনি যা করছেন তা এক অতুলনীয় সৃষ্টিশীল কাজ!
প্রতি বছর ১ই আগস্ট থেকে ৭ই আগস্ট পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ (World Breastfeeding Week) পালিত হয়। আমি আমার ব্রেস্টফিডিং জার্নি শেয়ার করলাম। কমেন্টে আপনারাও ছোট করে আপনার ব্রেস্ট ফিডিং জার্নির কোনো একটা ঘটনা শেয়ার করতে পারেন।

সার্টিফাইড চাইল্ডবার্থ এডুকেটর এন্ড দৌলা
এডভান্সড ভিব্যাক দৌলা
Other post
You may also like
কম সময়ে সহজে আমার নরমাল ডেলিভারির গল্প
#বার্থ স্টোরি আলহামদুলিল্লাহ!গত ০৪/০৬/২৬ তারিখ দুপুর ০২:১৫ মিনিটে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমার ছেলে ‘আহমাদ’-কে আমার কোলে দিয়েছেন।আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ!আল্লাহ তায়ালার কাছে কোটি কোটি শুকরিয়া যে, তিনি আমাকে নরমাল ডেলিভারির জন্য কবুল করেছেন। রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল টিমের প্রতি অশেষ …
বদ নজর কি সত্য?
আমার বেবি হওয়ার আগেই আমি নিজের সাথে নিজে একটা চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম “আমি আমার বাচ্চাকে কোনোদিনও বদনজর থেকে বাঁচানোর জন্য কালো কাজলের টিপ আর গলায় গিট দেয়া কালো সুতা পড়াবো না। দেখবো কি হয়।” এগুলো ছাড়াও যে বাচ্চা বড় করা যায় …
সিজারিয়ান ডেলিভারির আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি
বাংলাদেশে সিজারিয়ান ডেলিভারির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।যেখানে WHO বলছে আদর্শ হার ১০–১৫%, সেখানে আমাদের দেশে অনেক জায়গায় এখন অর্ধেকের বেশি বাচ্চা সিজারের মাধ্যমে জন্ম নিচ্ছে। মায়েদের সাথে কথা বললে দেখা যায়—কেউ জেনে–বুঝে সি–সেকশনের সিদ্ধান্ত নেন,আবার কেউ পরিবার বা চিকিৎসকের কথার ওপর …
