বদ নজর কি সত্য?
- Posted by Sumaiya Snigdha
- Date August 15, 2026
- Categories Blog

আমার বেবি হওয়ার আগেই আমি নিজের সাথে নিজে একটা চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম “আমি আমার বাচ্চাকে কোনোদিনও বদনজর থেকে বাঁচানোর জন্য কালো কাজলের টিপ আর গলায় গিট দেয়া কালো সুতা পড়াবো না। দেখবো কি হয়।”
এগুলো ছাড়াও যে বাচ্চা বড় করা যায় এটাই দেখার ইচ্ছা ছিল আমার। গ্রামে থাকি, এখানে এগুলো ছাড়া কোনো বাচ্চা বড় হয়েছে বলে আমি তো অন্তত দেখিনি। অনেক আগে থেকেই এগুলো আমার ভালো লাগতো না। কেন যেন আমার ইনটিউশন কখনোই এগুলোতে সায় দেয় নি।
বিশ্বাসটা পোক্ত হয় শায়েখ আহমাদুল্লাহ এর একটা বক্তব্য দেখে। যেখানে তিনি বলেছিলেন, “যেখানে আল্লাহ আমাদের সূরা ফালাক্বে সেইসব মানুষদের থেকে হেফাজতের দোয়া শেখাচ্ছেন যারা গিঁটে ফু দেয়, সেখানে আমরা ফুঁ দেয়া গিঁটকেই হেফাজতের মাধ্যম বানিয়ে নিয়েছি, সুবহানাল্লাহ।”
এখানে খুব সরল একটা যুক্তি থাকে যে “আল্লাহর কালাম পড়েই তো ফুঁ দেয়া হচ্ছে”।
প্রশ্ন হচ্ছে –
“সাহাবিরা তাহলে কেন আল্লাহর কালামের ব্যবহার এমনভাবে করেন নি?”,
“রাসূল সাঃ কেন এমনটা করতে বলেন নি?”,
“বদনজর থেকে হেফাজতের জন্য যেখানে শরিয়তসম্মত উপায় আছে সেখানে কেন আমাকে এসব মানতে হবে?”
“শরিয়তসম্মত উপায়গুলোই কি যথেষ্ট নয় বদনজর থেকে হেফাজতের জন্য?”
বাচ্চার বালিশের নিচে লোহা রাখা, রসুন রাখা, ম্যাচ বক্স রাখা, গলায় সূতার সাথে বোতাম, হাড়, বিভিন্ন মেটাল পড়ানো – এমন হাজারো অদ্ভুত রীতি প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে। একটা কালো টিপের কি ক্ষমতা আছে বদনজর থেকে হেফাজতের! যেখানে এর পেছনের কোনো সলিড ভিত্তি পর্যন্ত নেই।
উল্টো সেই টিপ দেয়ার জন্য যে কাজলগুলো ব্যবহার করা হয় সেগুলো কতটুকু বেবি স্কিন ফ্রেন্ডলি সেটি নিয়ে প্রশ্ন করা দরকার। সাধারণত বাজার থেকে কেনা ক্যামিকেল দেয়া, নয়তো হাতে বানিয়ে নেয়া কাজল ব্যবহার করা হয়। হাতে বানানো কাজলগুলো বেশ স্টিকি হয়। স্কিনে আঁঠার মতে লেগে থাকে। তারওপর দেয়া হয় পাউডার। মরার উপর খড়ার ঘা। আর বাজারের কাজলে থাকে ক্যামিকেল।
বাচ্চাদের স্কিন এমনিতেই সেনসিটিভ হয়। তিন মাসের আগে সোপ, অয়েল, ক্রিম কিচ্ছু দিতে নিষেধ করা হয়। সেখানে সারাক্ষণ এগুলো লাগিয়ে রাখা কতটুকু নিরাপদ? অনেকে তো বাচ্চাকে সাজানোর জন্য আইভ্রু ও চোখেও কাজল লাগিয়ে দেয়। অতোটুকু বাচ্চার আই এরিয়ার মত সেনসিটিভ জায়গায় এগুলো লাগানো পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়।
কেউ কেউ বেবিকে শুধু সাজানোর জন্য এগুলো দেয়, আবার কেউ কেউ এটা বিশ্বাস করে দেয় যে ‘এই কালো টিপ তার বাচ্চাকে বদনজর থেকে হেফাজত করবে’। এমন বিশ্বাসে যদি কেউ টিপ লাগায় সেটা কি তাকে শিরকের দিকে নিয়ে যায় না?
আমার তো মনে হয় এসব উল্টো খারাপ জ্বিন শয়তানকে বাচ্চার দিকে আকৃষ্ট করে। কিভাবে করে?
– বলছি,
একটা সহিহ হাদিসে এসেছে –
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এবং তাঁর স্ত্রী যায়নাব (রা.)-এর ঘটনা।
যায়নাব (রা.) চোখের ব্যথার কারণে এক ইহুদি নারী দ্বারা ঝাড়ফুঁক করাতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বাড়িতে এসে যখন এটি জানতে পারেন, তখন তিনি রাগান্বিত হয়ে স্ত্রীর গলা থেকে ওই সুতো বা তাবিজ কেটে ফেলে দেন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন।
সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) সেদিন তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন:
”এটা তো শয়তানের কাজ! শয়তান নিজের হাত দিয়ে তোমার চোখে খোঁচা দেয়, ফলে তোমার চোখ দিয়ে পানি পড়ে ও ফুলে যায়। আর যখনই ইহুদি নারীটি এসে ঝাড়ফুঁক করে, শয়তান তখন খোঁচা দেওয়া বন্ধ করে দেয় (যাতে তোমরা মনে করো এই শিরকি ঝাড়ফুঁকেই রোগ ভালো হয়েছে)। অথচ তোমার জন্য রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর শেখানো এই দোয়াটি পড়াই যথেষ্ট ছিল—
’আযহিবিল বা’সা রব্বান নাসি, ইশফি আন্তাশ শাফী, লা শিফায়া ইল্লা শিফাউকা, শিফায়ান লা ইয়ুগাদিরু সাক্বামা।’
অর্থ: হে মানুষের প্রতিপালক! কষ্ট দূর করে দিন। আর আরোগ্য দান করুন, আপনিই তো আরোগ্য দানকারী। আপনার আরোগ্য ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই, এমন আরোগ্য যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখে না।”
সূত্র : সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নম্বর: ৩৫৩০
আমরা যখন বিশ্বাস করা শুরু করবো এই কালো কাজলের টিপ আমাদের বাচ্চাদের হেফাজত করবে সেখানে কিন্তু শয়তানের জন্য আমাদের ইমানকে হুমকির মুখে ফেলার জন্য দারুন একটা সুযোগ তৈরি হয়। টিপ না দেয়া থাকলেই আমাদের বিরক্ত করা শুরু করবে যেন আমাদের মধ্যে এই ধারণা পোক্ত হয় যে এই টিপ দিলেই আমর বাচ্চাটা নিরাপদ থাকে।
তাহলে আমরা কি করবো?
বদনজর তো সত্য, সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত৷ তাই আমরা এর থেকে বাঁচার সেসব উপায়ই অবলম্বন করবো যেগুলো আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল সাঃ আমাদের শিখিয়েছেন।
সকাল-সন্ধ্যা তিন কুল, আয়তুল কুরছি, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়ে বাচ্চাকে ফুঁ দেয়া। যদি হায়াজ বা নিফাসের কারণে নিজে পড়া সম্ভব না হয় তাহলে পরিবারের অন্য কাউকে দিয়ে পড়িয়ে ফুঁ দিতে বলা।
ঘরে সূরা বাকারা চালিয়ে রাখা যেতে পারে।
ঘরে কোনো প্রাণীর ছবি না রাখা।
ঘরে নাপাকি না রাখা।
কখনো যদি মনে হয় বাচ্চার বদনজর লেগে গিয়েছে সেক্ষেত্রে বদনজরের শরীয়তসম্মত রুকাইয়া করা। রুকাইয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে তবে আমার কাছে ওযুর পানি দিয়ে গোসল করানোর পদ্ধতিটা সবচেয়ে সহজ লাগে।
হ্যাঁ, আমার বাচ্চা কালো কাজলের টিপ আর গলার সূতা ছাড়াই আল্লাহ নিরাপদ রেখেছেন। ও আল্লাহর রহমতে এগুলো ছাড়াই বড় হচ্ছে। একবার ক্লাস্টার ফিডিং এর সময় যখন আমার বেবি কলিক আচরণ করছিন তখন আমার মা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। বলা শুরু করেছিলেন “কই থেকে কি হল, একটা সূতা পড়িয়ে আনলে হত না?”
আমি জানতাম এটা স্বাভাবিক, কারণ প্রিনেটাল থেকে জেনেছিলাম। কতভাবে যে এই কোর্সটা থেকে আমি উপকৃত বলে বুঝাতে পারবো না। আম্মুকে জাস্ট বললাম একটা ভিডিও দেখ তারপর এসব বলো। নাইমা আপুর ফিডিং ম্যারাথন বা ক্লাস্টার ফিডিং এর ভিডিও দেখার পর আম্মু একটা কথাই বলেছিল “হায়রে, এই কারণে তোরে নিয়ে কি কি করছি আমি। আগে জানা থাকলে কত্ত সহজ হত।”
হ্যাঁ, একারণেই মায়েদের জানতে হয়। কারণ জ্ঞানই আলো, জ্ঞানই শক্তি।
আল্লাহ আমাদের প্রতিটা বাচ্চাকে হেফাজত করুক, আজীবনের সুস্থতা দান করুক। আমিন।
রেজওয়ানা রাজ্জাক
সার্টিফাইড চাইল্ডবার্থ এডুকেটর এন্ড দৌলা
এডভান্সড ভিব্যাক দৌলা
Other post
You may also like
আমার ব্রেস্ট ফিডিং জার্নি
আমার বাবু হওয়ার পর প্রথম দুই দিন আমার মিল্ক ফ্লো আসেনি। ফ্যামিলি থেকে ফর্মুলা ফিডিং করাবো কিনা জিজ্ঞেস করা হচ্ছিল। আমি কনফিডেন্টলি বলেছিলাম ‘ফ্লো আসবে, ফর্মুলা দেবো না’।আমার বাবু হওয়ার পর প্রথম দুই দিন আমার মিল্ক ফ্লো আসেনি। ফ্যামিলি থেকে …
কম সময়ে সহজে আমার নরমাল ডেলিভারির গল্প
#বার্থ স্টোরি আলহামদুলিল্লাহ!গত ০৪/০৬/২৬ তারিখ দুপুর ০২:১৫ মিনিটে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমার ছেলে ‘আহমাদ’-কে আমার কোলে দিয়েছেন।আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ!আল্লাহ তায়ালার কাছে কোটি কোটি শুকরিয়া যে, তিনি আমাকে নরমাল ডেলিভারির জন্য কবুল করেছেন। রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল টিমের প্রতি অশেষ …
সিজারিয়ান ডেলিভারির আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি
বাংলাদেশে সিজারিয়ান ডেলিভারির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।যেখানে WHO বলছে আদর্শ হার ১০–১৫%, সেখানে আমাদের দেশে অনেক জায়গায় এখন অর্ধেকের বেশি বাচ্চা সিজারের মাধ্যমে জন্ম নিচ্ছে। মায়েদের সাথে কথা বললে দেখা যায়—কেউ জেনে–বুঝে সি–সেকশনের সিদ্ধান্ত নেন,আবার কেউ পরিবার বা চিকিৎসকের কথার ওপর …
