সিজারিয়ান ডেলিভারিও হতে পারে ইবাদাহ
- Posted by MNCC Moderator
- Date October 15, 2023
- Categories Birth Story, Others

প্রিনেটাল কোর্স কেন করবেন? নরমাল হওয়ার জন্য? নরমাল অবশ্যই কাম্য তবে এটাই একমাত্র কথা নয় কিন্তু। ডেলিভারির আগে পরে অনেক বিষয় আছে। কোর্সটা করবেন যাতে আপনার বাচ্চার এবং সাথে আপনারও যেন আপনার অজান্তে কোনো ক্ষতি করে না ফেলেন।
আমার মেয়েটার হওয়ার সময় ওজন ছিল ২.২৫ কেজি। তাছাড়াও লাস্ট আল্ট্রাসাউন্ডে দেখা যায় ও হাইপক্সিয়ার (অক্সিজেন কম) প্রাথমিক স্টেজ শুরু হয়ে যাচ্ছে। ওর গলায় কর্ড পেঁচানো ছিল, এবং সাথে এমনিওটিক ফ্লুইড, অর্থাৎ পানি ছিল মারাত্মকভাবে কম – যে দুটি বিষয় কিনা একটা প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করে। রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বলেছিলেন, ইমার্জেন্সী সি সেকশন তো করতেই হবে, ধরে নাও তোমার বেবির NICU লাগবেই।
এত কিছু কিভাবে এবং কেনো হল? এবার আসুন এই অবস্থার ব্যবচ্ছেদ করি।
১. Flu হওয়ার আগে পানি কিছুটা কম ছিল। সেই রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তার দেখানোর আগের দিন আমার অনেক জ্বর উঠে যায়। তাও হয়তো নরমাল সম্ভব হতো যদি না পানি আরো কমে যেত। কিন্তু অনেক চেষ্টা করার পরও পানি বাড়ছিল না। এর কারণ:
২. বেবির গলায় কর্ড ছিল। সেটা সমস্যা হতো না যদি পানি পর্যাপ্ত থাকতো। তাতে কর্ডে চাপ পড়ে না। পানি কম থাকলেই কর্ডে চাপ পড়তে পারে, খুব সম্ভব যেটা আমার ক্ষেত্রে হয়েছিল। এতে পুষ্টি, পানি, অক্সিজেন সবকিছুর সাপ্লাই বাধাগ্রস্ত হয় এবং যেহেতু এম্নিওটিক fluid-এ বেবির প্রস্রাব বড় একটা অংশ হয়ে থাকে, তাই এসব কারণে বেবির প্রস্রাব কমে গেলে সেটা বাড়ানো খুব কঠিন হয়ে যায়। একটা দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে যাবেন। এতে শুধু যে অক্সিজেনই কম পাচ্ছিল তা না, বাচ্চার যে শেষের দিকে ওজনটা বাড়ে, সেটাও তার আর হয়ে ওঠে নি।
৩. লাস্ট আল্ট্রা করানোর ১৫ দিন আগে ভয়াবহ flu হয়েছিল। খুব সম্ভব করোনা। অক্সিমিটার থাকার পরও কেনো চেক করিনি জানি না, তবে হসপিটালে গিয়ে ধরা পড়লো আমার নিজের হাইপোক্সিয়া। অক্সিজেন দেওয়ার পরেও ৯৮ হচ্ছিল না। খুব খারাপ রকমের একটা কাশি ছিল। এবং এটা সিজারের ১ মাস পর পর্যন্ত থেকেছে। এই ফ্লুয়ের জন্য পানি আরো কমে গেছে বলে ডাক্তার ধারণা করছেন, যেহেতু ইনফেকশন/inflammation থেকে রিকভার করতে শরীরের প্রচুর রিসোর্স খরচ হয়। তাছাড়াও জ্বরে আমার রুচি চলে গিয়েছিল।
কিন্তু আমার বেবির কিন্তু NICU লাগেনি। হওয়ার সময়ই সে কেঁদে তার সুস্থতার জানান দেয়। এমনকি ডাক্তার নার্সরা অবাক হয়ে গিয়েছিলেন যে ও ওটিতে নেওয়ার পরও পেটের ভেতর এত কম পানিতেও নড়ছিল।
এখনো ম্যাম দেখা হলে ওকে ফাইটার বলেন মাশাআল্লাহ।
ব্যাপারটা হল ওর অর্গানসহ বাকি সব কিছুর ডেভলপমেন্ট ভালো ছিল আলহামদুলিল্লাহ্। শেষের দিকে পানি কমে যাওয়ায় আর জ্বরে কেবল ওজনটা বাড়ে নি। অন্যদিকে আমার অপারেশনের পরেই আরেকটা বেবি হয়, ৩.৫ কেজির বেশি ওজন কিন্তু বাচ্চাটাকে NICU তে নেয়া লাগে, ওর শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছিল। মেয়েটার জন্য দুআ করবেন, ওর ওজনটা এখন কিছুটা ঠিক হলেও আরো বাড়াতে হবে।
আলহামদুলিল্লাহ্ আমার সিজারের পর রিকভারিও ভালো ছিল। খুব দ্রুত সেলাই শুকিয়ে গিয়েছিল। ডাক্তার যেই ডেটে সেলাই কাটার জন্য আসতে বলেন সেদিন গেলে দেখা যায় আমার সেলাই অলরেডি এত শুকিয়ে গেছে যে সুতা আর বের করা যাচ্ছে না।
বেবি হওয়ার আগে সবাই আমাকে দেখলে বলতো আমার নাকি নরমাল হবে। ন্যাচারাল বার্থ আমিও চেয়েছিলাম। কারণ আমি বিশ্বাস করতাম আমাদের শরীর আল্লাহ নরমাল ডেলিভারির জন্যই প্রস্তুত করেছেন। এটা আল্লাহ্ প্রদত্ত, আল্লাহর বাছাই করা পদ্ধতি মা হবার। এটা এমনই এক প্রক্রিয়া যাতে মারা গেলে মা শহীদ হন। নিশ্চয়ই এতে বিশেষ কিছু আছে – এই কারণে আমি এটা এক্সপেরিয়েন্স করতে চাইতাম। আশেপাশের মানুষের কথা শুনে সি সেকশনের প্রতি একটা ভীতি না হলেও একটা বিতৃষ্ণা চলে আসছিল।
কিন্তু দেখেন, আল্লাহ্ কিন্তু আমার জন্য সি সেকশনই নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ্ আমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন সেটার জন্য নিশ্চয়ই আমাকে প্রস্তুতও করেছেন। এতে সবর করলে ইবাদত কেন হবে না? আর সত্যি কথা বলতে, সবর করাটা আমার জন্য কঠিন কিছু ছিল না। আমার ডেলিভারির পরে যে কাশিটা ছিল, সেটার জন্য সেলাইয়ে জ্বলতো। তাও আমি বলবো আমার আলহামদুলিল্লাহ কোনো কষ্ট হয়নি। সিজারের প্রতি এই ভীতির কারণ নিশ্চয়ই আছে, অনেক কম্প্লিকেশনও থাকে, কিন্তু আল্লাহর রহমতে প্রেগন্যান্সি আর সি সেকশনসহ এই পুরো অভিজ্ঞতাটুকুতে আমার এতই কম কষ্ট হয়েছে, যে আমার এখনই ইচ্ছা করে আবার বেবি নেই। আমার একটাদিনের জন্য আফসোসও হয়নি আলহামদুলিল্লাহ্।
আমার রিকভারি আর বেবির সার্ভাইভ করার পেছনে প্রিন্যাটাল কোর্সের একটা বড় রকমের কৃতিত্ব রয়েছে। প্রমা আপুর বলে দেওয়া ডায়েট রিকোয়ারমেন্ট ডেইলি ফলো করেছি শুরু থেকেই, শেষ ৩-৪ মাস হাটাহাটি, কেগেল এক্সারসাইজ এবং স্কোয়াটিং করেছি (মাঝে মধ্যে বাদ দিয়েছি
) আলহামদুলিল্লাহ্, যাতে বেবি পুষ্টি কম না পায়, এবং এটা আমাকেও সাহায্য করেছে। দেখেন সিজারের পর আপনি সারাজীবন পঙ্গু হয়ে যাবেন এটা ভুয়া কথা। সিজারের পর কোমরে ব্যাথা করে – এটাও কিন্তু ঠিক না। ফাতেমা আপু বলেছিলেন, ব্যথাটা করে মার যদি ক্যালসিয়াম ঘাটতি হয়। সিজারের পর দ্রুত উঠে বসতে পারা বা হাঁটাচলা করতে পারাটাও একটা ভালো লক্ষণ।
আলহামদুলিল্লাহ, অনেক অনেক জানতে পেরেছি এই কোর্সটা করে। ডেলিভারির বিষয়ে আমি একেবারে ব-কলম ছিলাম বলতে পারেন। আজকে আমি অন্যরা যারা জানেন না তাদেরকে এডভাইস দিতে পারি আলহামদুলিল্লাহ্
।
এখন সবচেয়ে বেশি কাজে দিচ্ছে নাইমা আপুর নিউবর্নের কেয়ার রিলেটেড ক্লাসগুলো। বাচ্চার যত্ন নিয়ে এত্ত এত্ত ভুল ধারণা প্রচলিত আছে! যেই বাচ্চা দেখে, একটা দুইটা এডভাইস না দিয়ে যাবে না। এই ক্লাসগুলো না করলে আমি বুঝতামও না কোনটা বাচ্চার জন্য ঠিক আর কোনটা ক্ষতিকর। মানুষ কথাও শুনায় অনেক, এবং সেইগুলোর মোকাবেলা করতে আমি যেই কনফিডেন্স বুস্ট পেয়েছি, তার কারণে অনেক মুরুব্বির ভুল কথাগুলোও আমি তাদেরকে বুঝিয়ে বলতে পারি, যেই সাহস আমার আগে ছিল না। আমি বলতে পারি আমি প্রিন্যাটাল কোর্স করেছি, আমাদেরকে অমুক জিনিস পড়িয়েছে, তমুক জিনিস কিভাবে করতে হয়ে দেখিয়েছে। আমি জানি। আমি পারি। যেখানে আমার মা খালারা নিজেদের বাচ্চাদেরকে ভয়ে গোসল দেন নি, সেখানে আমি নিজে একাই ওকে গোসল করাতে পারি আলহামদুলিল্লাহ্।
আরেকটা মানুষের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। রাবেয়া আপু। উনি আমাকে এত্ত সাপোর্ট দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ্। উনি জুলাইয়ে দৌলা সাপোর্ট দিবেন না বিধায় নিতে পারিনি। তবে উনি তাও আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। আমি যখন যা জানতে চেয়েছি সাথে সাথে বলছেন, আমার আপডেট জানালে সাথে সাথেই করণীয় কি তা বলেছেন। আমি ৩৯ সপ্তাহে গিয়েও যখন ডাক্তার ফিক্স করতে পারছিলাম না, উনি তখন ডাক্তার রিকমেন্ড করেছেন এবং উনার দেখানো ডাক্তারের কাছেই শেষে আমার সিজারিয়ান ডেলিভারি হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ্। এমনকি আমাকে উনি আরেকজন দৌলা আপুর খোঁজ ও দেন। আমি অবশ্য উনার সাপোর্ট নেওয়ার আগেই আমার ইমার্জেন্সী সি সেকশন হয়ে যায়।
আল্লাহ্ উনাদের সবার কাজে বারকাহ দিক।
দেশের প্রত্যেকটা মেয়েকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রিন্যাটাল করানো উচিত বলে আমি মনে করি।
সালসাবিল কাওসার নওশিন
প্রিনাটাল কোর্স, ব্যাচ ৭
Other post
You may also like
লেবারের লক্ষণ নেই ভাবছিলেন যে মা, তার ন্যাচারাল ভিব্যাক হয়েছে — দৌলা ডায়েরী সিরিজ (পর্ব ৪১)
September 3, 2026
ভিব্যাক তা-ও ন্যাচারাল! আলহামদুলিল্লাহ!! অথচ এই মা ৩৮ সপ্তাহেও ভাবছিলেন, উনার লেবারের কোন লক্ষ্মণ নেই কেন! আসলে, নরমাল ডেলিভারি এমনই। সবাই পূর্ব লক্ষ্মণ দেখে না। তবে বডি রেডি থাকলে ফুল টার্মের কাছাকাছি গিয়ে হঠাৎই পেইন শুরু হয়ে যেতে পারে। এই …
আমি পেরেছি আপু! — মারুফা আপুর বার্থ স্টোরি (দৌলা ডায়েরী সিরিজ: পর্ব ৪০)
September 3, 2026
মারুফা আপু ৩৭ সপ্তাহ থেকে আমার দৌলা সার্ভিস নিচ্ছিলেন। প্রেগন্যান্সিতে আপু খাবার ও এক্সারসাইজ মোটামুটি মেইনটেইন করেছেন। শেষের দিকে হাঁটতে গেলে পায়ে কোথাও যেন কিছু একটা বাধে, এমন অনুভূতির কথা বলেছিলেন। বাবুর পজিশন নিয়ে আমার একটু সন্দেহ হয়। কিছু প্রশ্ন …
ইডিডি পার হয়ে নরমাল ডেলিভারি — দৌলা ডায়েরী সিরিজ (পর্ব ৪২)
September 3, 2026
আপু খুবই শান্ত মানুষ। এতই শান্ত যে হ্যালো হ্যালো বলে বুঝতে হতো লাইনে আছেন কিনা। এই শান্ত সভাবই হয়তো আপুর স্টোরির স্পটলাইট। ৩৬ সপ্তাহ থেকে দৌলা সার্ভিস নেন। আলহামদুলিল্লাহ উনার পুরো প্রেগন্যান্সি একদম স্মুথ ছিল। নিউট্রিশন ও এক্সারসাইজও ভালোভাবে মেইনটেইন …
