Back

ঠিক যেন একটি গল্প

গল্প হোক চাইনি। কিন্তু জীবনটা আসলেই গল্পের মত, বরং গল্পের থেকেও আরো একটু বেশি।

আলহামদুলিল্লাহ!!
রমাদানে জানতে পারলাম আমি মা হতে যাচ্ছি। আলাদা কোন অনুভূতির থেকে তখন দায়িত্ববোধটা আমাকে বেশি নাড়া দিচ্ছিলো। আমি পারবো তো আমার কাছে আল্লাহ তা’য়ালার এই আমানতের যাথাযথ মূল্যায়ন করতে? ঠিকভাবে এই নিয়ামতের কদর করতে?

প্রেগনেন্সি জার্নিটা আল্লাহ তায়ালা আমার জন্য অনেক অনেক সহজ করেছেন। সবকিছু নরমাল। পুরো প্রেগন্যান্সিতে ব্যায়াম, খাওয়া ভালোভাবেই মেইনটেইন করতে পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ। হাঁটতে একটু কষ্ট হত, দম বন্ধ হয়ে আসতো। তবুও হাঁটতাম হালকা পাতলা।
নরমাল ডেলিভারির চিন্তা করতাম বিয়ের পর থেকেই, ভুলেও সিজারের কথা মাথায় আনতাম না। কন্সিভ করার পর নরমাল ডেলিভারি নিয়ে এতো বেশি কনফিডেন্ট ছিলাম যে প্রিন্যাটাল কোর্সে ফাতেমা ইয়াসমিন ম্যামের সিজারের ক্লাসটাও মন দিয়ে করি নাই।
এই মানসিকতাটাই আমার জন্য পরীক্ষা হয়ে যাবে বুঝতে পারি নাই।

ওহ হ্যা! ফাতেমা ইয়াসমিন ম্যামই আমার ডাক্তার ছিলেন 😊। পুরো প্রেগন্যান্সিতে আমি উনাকেই অনলাইনে দেখিয়েছি। ম্যামও আমার নরমাল ডেলিভারি নিয়ে আশাবাদী ছিলেন। ( ম্যামের সম্পর্কে একটু বলি। ম্যাম একটা ভালোবাসা ❤। )

দুআ করতাম প্রচুর নরমাল ডেলিভারির জন্য। সময়ে , অসময়ে , দুআ কবুলের সময়গুলা, কিচ্ছু বাদ দিতাম না। আমি সিজার খুবই ভয় পেতাম। তবে প্রি – ন্যাটাল কোর্সের কল্যাণে সিজারের প্রতি নেতিবাচক মানসিকতা অনেকটাই দূর হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আমি কখনই সিজার চাইতাম না, ভুলেও না।

যাই হোক, ম্যামের পরামর্শে আমাদের শহরেও একটা গাইনি ডাক্তারের কনসালটেশন এ থাকি। উনাকে ২ বার দেখিয়েছি, কিন্তু আমার কাছে কেন জানি নরমাল ডেলিভারি সাপোর্টিভ মনে হয়নি তাকে। হতে পারে এটা আমার মনের ভয়। আমি আসলে ফাতেমা ম্যাম ছাড়া কারো উপরেই আস্থা রাখতে পারছিলাম না। বিশ্বাস ছিলো, ম্যাম যদি সিজার ও করেন, সেটার পেছনে অবশ্যই কারণ থাকবে। বিনা কারণে ম্যাম কখনই সিজার করবেন না। এই আস্থা থেকেই ৩৭ সপ্তাহে আম্মু কে ছেড়ে গাজীপুর বাসায় চলে যাই।

আমার কেন জানি খুব করে মনে হত ৩৮ থেকে ৩৯ সপ্তাহের মধ্যেই আমার ব্যাথা উঠবে। কিন্তু ব্যাথা আর ওঠে না। ৩৯ সপ্তাহে ম্যামের কাছে সরাসরি এপয়েন্টমেন্ট নেই। ম্যাম দেখে বললেন যেহেতু সব কিছু নরমাল আছে আমরা আরো ১ সপ্তাহ অপেক্ষা করি।

কিন্তু এর মধ্যে বাদ সাধে আমার CBC রিপোর্ট। রিপোর্টে আমার প্লাটিলেট কাউন্ট আসে মাত্র ৫১ হাজার। তাই এর জন্য আলাদা করে মেডিসিন নিতে হয় আমাকে।

৪০ সপ্তাহে ম্যামের কাছে গেলাম। আল্ট্রা করে ফ্লুইড আসে ৬.৪, যেটা এত কম কখনই ছিলো না। ম্যাম পিভি করলেন। জরায়ু মুখ খোলা তো দূর সেটা এত উপরে যে ম্যাম খুঁজেই পেলেন না। তাই ম্যাম সেদিনই আমাকে হসপিটালে ভর্তি হয়ে যেতে বলেন সিজারের জন্য 🙂। যেহেতু ফ্লুইড কম, দেরি করলে বেবির ক্ষতি হতে পারে।
আল্লাহ তা’য়ালা এর পরিকল্পনা অবশ্যই অতি উত্তম এবং আমাদের জন্য কল্যানকর, সেটা আমরা অনুধাবন করতে না পারলেও।

এটা বিশ্বাস করলেও সিজারের ব্যাপারটা মানতে খুব কষ্ট হচ্ছিল, অন্যদিকে অনবরত নিজেকে বুঝিয়ে যাচ্ছিলাম। আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। হাজবেন্ড ও সমানে আমাকে বুঝিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু তবুও আমি কান্নাই আটকাতে পারছিলাম না।

৯ তারিখ সিজারের কথা থাকলেও ১ সপ্তাহ পরেও আমার প্লাটিলেট কাউন্ট সেই ৫১ হাজার ই আসে। হসপিটাল থেকে বলা হলো প্লাটিলেটের জন্য ৮ জন ডোনার ম্যানেজ করতে। পরে অবশ্য ৮ জন লাগে নি, আল্লাহর রহমতে ৩ জন ডোনার থেকেই বিশেষভাবে প্লাটিলেট ম্যানেজ করা হয় হসপিটাল এ । আর অপারেশন এর ডেইট ঠিক হয় পরের দিন, মানে ১০ তারিখে।

১০ তারিখে বিকেলে আমাকে ওটি তে নেয়া হয়। তার আগে প্লাটিলেট দেয়া হলে পরে প্লাটিলেট কাউন্ট আসে ৯১ হাজার।

আমার বাচ্চাটা যখন দুনিয়ায় আসলো, ম্যাম বললেন, ” ফাওজিয়া, তোমার ছেলে একদম তোমার মত হয়েছে ।” একই সাথে শুনতে পেলাম আমার ছেলের কান্না। সেই মূহুর্তটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত ছিলো। আমি কোনভাবেই কান্না আটকে রাখতে পারছিলাম না। জীবনের প্রথম আনন্দের কান্নার স্বাদ পেলাম আমি।

আমি নরমাল ডেলিভারির জন্য প্রচুর দুআ করেছিলাম। কিন্তু নরমাল ডেলিভারি আমার তকদির এ ছিলো না। আমি কখনই বলবো না আল্লাহ তা’য়ালা আমার দুআ কবুল করেননি। বরং তিনি অন্যভাবে আমাকে পুরস্কৃত করেছেন, সেটা এখানে বললাম না। আমার আর আমার রবের মধ্যেই থাক সেটা। তাওয়াক্কুলের সেই পুরস্কারটা সত্যিই আমার জন্য সর্বোত্তম এবং কল্যানকর ছিলো। আমি আবারও আল্লাহর পরিকল্পনার মাহাত্ম্য অনুধাবন করতে পারলাম।

তাই আপুদের কে বলবো, অযথা বা শখ করে সিজারের চিন্তা কখনই মাথায় আনবেন না। কিন্তু আল্লাহ তা’য়ালা যদি তকদির এ রাখেন নিশ্চিন্তে মেনে নিন। আল্লাহ তায়ালা কখনই আপনার অকল্যান চান না।

ফাওজিয়া
রৌদ্রময়ী প্রি – ন্যাটাল কোর্স পার্টিসিপেন্ট , ব্যাচ ১৩

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *