আমি প্রথমবার মা হয়েছিলাম ২০২১ সালে। যখন প্রেগ্ন্যাসিতে বমি হয়। মাথা ঘুরে এইসব ছাড়া তেমন কিছু জানতাম না আর বুঝতামও না। যে যা করতে বলেছে সেটাই নিজের অবস্থা বুঝে করার চেষ্টা করেছি।
তাকদীরের ফয়সালা এবং নিজের অজ্ঞতা, সবমিলিয়ে প্রথম সন্তান সিজারিয়ান হয়। যেটার ট্রমা আমাকে দীর্ঘদিন ভুগিয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ আলা কুল্লি হাল।
প্রিনাটাল কোর্স এবং ভিব্যাক সম্পর্কে জানার পর থেকেই নিয়ত করেছিলাম যা-ই হোক না কেন আরেকবার আল্লাহ সুযোগ দিলে আবার একটা চেষ্টা করবো। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর রহমতে আমি সেই সুযোগটা আল্লাহর পক্ষ থেকে পেয়েছি।
চারবছরের গ্যাপে দ্বিতীয় প্রেগ্ন্যাসিতে প্রিনাটাল কোর্স শুরু করি। নরমাল ডেলিভারি ও ভিব্যাকের জন্য সুপরিচিত এজন ডাক্তারের আন্ডারে থাকার সিদ্ধান্ত নেই। কোর্সের মাঝামাঝি সময়ে ফাতিমা ইয়াসমিন ম্যাম আমাদের ক্লাস নেন।
তবে ম্যামের ইউনিকো হসপিটালে তখনও তেমন কোন সার্ভিস চালু হয়নি বলে জানতে পারি। যখনই মানসিকভাবে নরমাল ডেলিভারির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তখন কিছু নেগেটিভ রিভিউ আমার মনে ভয় ঢুকিয়ে দেয়।
অনেক নেগেটিভ চিন্তা সারাক্ষণ মাথায় ঘুরতে থাকে। এমনকি কী করবো, কোথায় যাবো সেটা নিয়েও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকি। এরইমধ্যে আল্লাহর রহমতে পেইজে আমাদের একজন আপুর ইউনিকো হসপিটালে ভিব্যাক সাকসেস হয়েছে বলে রিভিউ দেখি। আর সেখানে একবার গিয়ে দেখানোর চিন্তা করি।
অবশেষে ৩২ সপ্তাহে ফাতিমা ইয়াসমিন ম্যামের সাথে কন্সাল্ট করি। হসপিটালের পরিস্থিতি দেখে ভালো লাগলেও কস্টিং জেনে একটু দমে গিয়েছিলাম।
পরবর্তীতে আল্লাহ একটা ব্যবস্থা করে দেওয়ায় মনে মনে একটু আশার আলো জাগে যে হয়তো আল্লাহ চান এখানে আসি এবং এখানেই হয়তো আমার তাকদীরের কিছু অংশ আছে।
এরমধ্যে কোর্সও শেষ হয়ে গিয়েছিল। আর আমি বারবার লেবারের প্রস্তুতি এবং এক্সারসাইজ এর ক্লাসগুলোই রিভিউ করছিলাম। খাবার খুব মেইনটেইন করার চেষ্টা করতাম।
আর যে ব্যায়ামটা করতে সহজ মনে হতো সেটা বারবার করার চেষ্টা করতাম। হাঁটা হতো খুব কম এজন্য ঘরের কাজগুলোই শরীরের অবস্থা বুঝে করার চেষ্টা করতাম।
৩২ সপ্তাহে আল্ট্রায় বেবির পজিশন ব্রীচ আসলো যেটা আগের আল্ট্রাগুলোতে সেফালিক পজিশনেই ছিলো।ফাতিমা ম্যাম আমাকে কোর্সে শিখানো ব্রীচ বেবি সেফালিক হওয়ার এক্সারসাইজ গুলো করতে বললেন।
৩৬ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতিদিন অন্তত একবার করে হলেও সেগুলো করতে চেষ্টা করতাম। আর সাথে বার্থবল এক্সারসাইজ। ৩৬ সপ্তাহে ম্যামের কাছে গেলে ম্যাম হাত দিয়ে পেটের উপর থেকেই বুঝতে পারলেন বেবি সেফালিক হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।
৩৮ সপ্তাহে আল্ট্রা করে ম্যামের কাছে গেলে দেখলেন বেবির হেড এখনো অনেক ওপরে আছে। ওজন ৩.৩ কেজি আর স্কার থিকনেস ২.৯ এমএম আছে।
আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করতে বলে ম্যাম হেড এঙ্গেজড হওয়ার কিছু এক্সারসাইজ এবং মাইলস সার্কিট করার কথা বলেন। এবং পেইন না ওঠলে ৩০ নভেম্বরে ভর্তি হতে বললেন।
হাতে বেশি সময়ও ছিলো না। প্রতিদিন সবগুলো এক্সারসাইজ করার চেষ্টা করতাম। আর আধাঘন্টা করে হাঁটতে লাগলাম। যত দোয়া আছে পড়তে লাগলাম। বিশেষ করে সূরা ইয়াসিন এবং দোয়া ইউনূস।
শেষ রাতে তাহাজ্জুদে দোয়া করতে লাগলাম আল্লাহ যেন সহজ করেন। আর ন্যাচারাল পেইন ওঠে। প্রতিদিনই মনে হতো এই বুঝি কন্ট্রাকশন হলো। পেইন ওঠলো কিন্তু আসলে তেমন কিছুই হতো না।
দেখতে দেখতে ৩০ তারিখ চলে আসলো, পেইন ওঠলো না। ম্যামকে জানিয়ে বিকেলে বের হয়ে গেলাম আল্লাহর সাহায্য চাইতে চাইতে। যেহেতু হসপিটালে একজনের বেশি এটেন্ড্যান্ট এলাও না।
তাই আমার হাসব্যান্ড আর আমিই গেলাম।ছেলেকে বাসায় দাদা-দাদীর কাছে রেখে গেলাম। তখনও সার্ভিক্স ওপেন হয়নি। এবং হেড ওপরেই ছিলো। রাতে বেলুন ক্যাথেটার করা হলো।
সারা রাতই কিছুক্ষণ পরপর রেস্ট নিয়ে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করলাম ইনলেট ওপেন হওয়ার জন্য। আর দোয়া অব্যহত ছিলো। ভোর ৬টায় ওয়াশরুমে যাওয়ার পর ক্যাথাটার নিজ থেকেই খুলে গেলো।
পিভি চেক করে দেখা গেলো ৩ সেমি ওপেন এবং হেড একদম এঙ্গেজড হয়ে যাবে এমন অবস্থায় আছে।আমাকে পেট ভরে খেয়ে নিতে বলা হলো। এবং এক্সারসাইজ চালিয়ে যেতে বললো।
৯ টায় ম্যাম এসে সবকিছু দেখে পজেটিভ ফিডব্যাক দিলেন আর অল্প মাত্রায় অক্সিটোসিন চালু করতে বলে গেলেন। প্রতি ১০ মিনিটে কয়টা কন্ট্রাকশন আসে খেয়াল রাখতে বললেন।
সারাদিন অক্সিটোসিন চলার পরও দশ মিনিটে ৩ টা মৃদু কন্ট্রাকশন আসতো। আর ৩০-৪০ সেকেন্ড পর্যন্ত স্থায়ী হতো। সারাদিনে তেমন কোন উন্নতিও ছিলো না।
রাতে ম্যাম অক্সিটোসিন অফ করে দিতে বললেন। আর আমাকে প্যাথেডিন নিয়ে ভালো করে ঘুমাতে বললেন। পরদিন সকাল থেকে আবার অক্সিটোসিন শুরু করা হবে।
রাতে একজন আপু এডমিট হলেন পেইন নিয়ে। সবাই ওনাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। আমার আফসোস হতে লাগলো। আল্লাহর কাছে বলছিলাম আমাকে কেন পেইন দিলেন না।
আর দোয়া করছিলাম,”আল্লাহ একটা মিরাকল ঘটান যেন ফজরের সাথে সাথে আমার সন্তান আমার কাছে চলে আসে।” সকালে ঘুম থেকে ওঠেই শুনতে পেলাম ঐ আপুর বেবি হয়েছে।
তখনও আমার কোন কন্ট্রাকশন নেই। আল্লাহকে বলতে লাগলাম, “আমিও তো আপনার বান্দী, আমাকেও তার মতো সাহায্য করুন।” দোয়ার মধ্যে বেশির ভাগ সময়ই মারিয়াম আঃ এর মতো করে আমাকে সাহায্য করার আকুতি জানাতাম।
সকাল ৭টায় ম্যাম পিভি চেক করে দেখলেন। সবকিছু আগের মতোই আছে, কোন উন্নতি নেই। এদিকে আমার কন্ট্রাকশন আসছে প্রতি ৭ মিনিটে ১ বার আর ১ মিনিট করে স্থায়ী হচ্ছে।
ম্যাম অক্সিটোসিন লাগাতে বললেন আর যাওয়ার সময় বলে গেলেন যদি তেমন কোন উন্নতি না হয় তাহলে ১২ টার পর আমাদের সিজারের ডিসিশন নেওয়া লাগতে পারে। ম্যাম চলে যাওয়ার পর এতো কান্না এলো, মনে হচ্ছিল আমার সব আশা শেষ।
আল্লাহকে বারবার বলছিলাম, “আপনি কুন বললেই তো সব হয়ে যায়। আমার জন্য একটা কুন বলুন, ইয়া ফাত্তাহ!”
এরমধ্যে একবার ইউরিন পাস করে আসার চিন্তা করলাম। ওয়াসরুমে বসার পরে আমার একটা কন্ট্রাকশন হলো। খুবই স্ট্রং মনে হলো এবং অনেকক্ষণ স্থায়ী হলো। আস্তে আস্তে বেডে এসে বসলাম।
এবং খুবই হতাশার সাথে সিস্টারকে বললাম অক্সিটোসিন চালু করতে। আমি বাম কাত হয়ে শুয়ে পরলাম। সিস্টার সবকিছু রেডি করছিলেন। এরমধ্যেই এমন একটা কন্ট্রাকশন শুরু হলো যে, জোরে দোয়া ইউনুস পড়ে ওঠলাম।
এরমধ্যেই আমার ওয়াটার ব্রেক হয়ে গেলো। আমি আতঙ্কিত হয়ে গেলাম। কারণ আমার প্রথম বেবির সময় ওয়াটার ব্রেক নিয়ে বাজে অভিজ্ঞতা ছিলো। পানির কালার দেখার চেষ্টা করলাম।
কিন্তু খুব অল্প ব্যবধানে কন্ট্রাকশন আসতে লাগলো। ম্যামকে আসতে বলতে বললাম। তখন ৭ টা ১৫ বাজে। ডিউটি ডাক্তার এসে পানির কালার দেখে নিশ্চিত করলেন মেকোনিয়াম পাস হয়নি। আর এটাও বললেন ৪ ঘন্টা হওয়ার আগে আর পিভি চেক করা যাবে না।
এতো বেশি কন্ট্রাকশন আসতে লাগলো যে, অল্প সময় পরেই ম্যাম অক্সিটোসিন বন্ধ করে দিতে বললেন। আমার হাসবেন্ডকে সারাক্ষণ ধরে রাখলাম, খুবই কষ্ট করে আমার ভেজা ড্রেস চেঞ্জ করা হলো।
আমি শুধু ঘড়ি দেখছিলাম কখন চার ঘন্টা শেষ হবে। একেকটা মুহুর্ত মনে হচ্ছিল একেকটা বছরের সমান। আমার অবস্থার সাথে কোর্সের পড়াগুলো মিলানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কোন দিশা করতে পারছিলাম না।
রিলাক্স থাকা, তলপেট থেকে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করা কিছুই করতে পারছিলাম না। শুধু বাম কাত হয়ে শুয়ে ছিলাম দুই পায়ের মাঝে প্রথমে বালিশ পরে পিনাট বল দিয়ে।
এরমধ্যে শিফট চেঞ্জ করার সময় হয়ে যাওয়ায় সবাই ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। আমার খুব একা লাগছিলো। বারবার বলছিলাম, “আমি পারবো ইন শা আল্লাহ।” আবার নেগেটিভ চিন্তাও আসছিলো।
এতো ব্যথা আসছিলো আমার হাসবেন্ডকে বলে রাখলাম ম্যাম আসলে যেন পেইনলেস করার ব্যবস্থা করে। অবস্থা এমন হয়ে গেলো যে সোজাই হতে পারছিলাম না।
ফলে আমার বেবির হার্টবিট চেক করা যাচ্ছিলো না। সিটিজিও হচ্ছিল না। অল্প সময় পরেই পুশিং আর্জ আসা শুরু হলো। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। এতো তাড়াতাড়ি কেন পুশিং আর্জ আসছে আমার তো সার্ভিক্স পুরোটা ডায়লেট হয়নি।
এরমধ্যে সাড়ে ৯টায় ম্যাম আসলে আমাকে কোনরকম একটু সোজা করে পিভি চেক করতে গিয়ে দেখলেন মাথা একদম কাছে চলে এসেছে। সবকিছু রেডি করতে বলে গেলেন সবাইকে আর আমাকে বললেন একটু অপেক্ষা করতে।
অল্প একটু ডায়লেশন বাকী আছে। ১০ টায় ম্যাম চলে আসলেন। ততোক্ষণে সবাই সবকিছু রেডি করে অপেক্ষা করছে। আমার প্রচন্ড পুশিং আর্জ আসতে থাকলো। ম্যাম আমাকে বললেন আমি যেভাবে পছন্দ করি সেভাবেই যেন পজিশন নিই।
এরমধ্যে সূরা ইয়াসিনের অডিও তিলাওয়াত চলছিল আর মুখে দোয়া ইউনুস পড়ছিলাম। গলা শুকিয়ে আসলে অল্প করে পানি খাচ্ছিলাম। আর এরমধ্যে দুইবার করে স্যুপও খাওয়ানো হলো।
“রিং অফ ফায়ার” অনুভব করলাম। ম্যাম বলে দিলেন, পরবর্তী পুশ আসলে বিসমিল্লাহ বলে নিশ্বাস ধরে রেখে আস্তে আস্তে পুশ করতে। দুই হাঁটু মিলিয়ে আধশোয়া অবস্থায় পায়ের পাতা ছড়িয়ে দিয়ে পুশ করলাম।
কতক্ষণ সময় লাগলো জানি না গরম পানির সাথে বেবির হেড বের হয়ে আসার অনুভূতি পেলাম। আর জোরে জোরে আলহামদুলিল্লাহ পড়তে লাগলাম। ঘড়িতে দেখলাম ১০:২৫ বাজে।
বেবিকে আমার ওপর এক মিনিট রাখা হলো। এরপর কর্ড কাটা হলো। জানলাম আমার বহুল কাঙ্ক্ষিত মেয়ে সন্তান হয়েছে। আরো কয়েকবার আলহামদুলিল্লাহ বললাম।
আল্লাহ আমার জন্য এতো সহজ করেছেন ভাবতে ভাবতে কান্না চলে আসলো। আমি এপিসিওটমি থেকে টিয়ার হওয়াটা প্রেফার করছিলাম কিন্তু ম্যামকে বলার সুযোগও পাইনি, জিজ্ঞেস করে জানলাম আমার সেকেন্ড ডিগ্রি টিয়ার হয়েছে।
কিছুক্ষণ পরেই প্লাসেন্টা ডেলিভারি হয়ে যায়। ব্লিডিং একটু বেশি হওয়ায় একব্যাগ ব্লাড নিতে হয়। এই পুরো সময়ে আমার আগের সেলাইয়ের জায়গায় কোন ব্যথা বা অস্বস্তিও অনুভব করিনি।
আল্লাহ তায়া’লার সাহায্য ছাড়া এটা একেবারেই অসম্ভব ছিলো। আমার রব এভাবেই আমার জন্য সহজ করলেন, আর আমাদের মিরাকল বেবি “নাফিসাতুল ইলম” কে দুনিয়ায় পাঠালেন।
হসপিটাল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ। পুরো সময়ে আমার হাসবেন্ডকে আমার পাশে থাকতে দেওয়ায়। আর প্রিনেটাল কোর্স সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ আমাদেরকে এতো সুন্দর করে সবকিছু সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য।
তামান্না
রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স পার্টিসিপ্যান্ট, ব্যাচ ২২