Back

ছোট্ট পাখি মারইয়াম

রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্সের ২২তম ব্যাচের পার্টিসিপেন্ট ফারজানা আক্তার আপুর দৌলা হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। আপুর সাথে আমার প্রথম কথা হয় সেপ্টেম্বরের ২৭ তারিখ, ওনার ৩৬ সপ্তাহের শুরুতেই। সেকেন্ড প্রেগন্যান্সি। VBAC ট্রায়াল দেবেন। পহেলা নভেম্বর EDD। ডক্টর ম্যাম খুবই সাপোর্টিভ ছিলেন। জানতেন প্রিনেটাল কোর্স সম্পর্কেও।
এক্সারসাইজ করার অভ্যাস ছিল আগে থেকেই, সাথে প্রিনেটাল কোর্স বেশ যত্ন সহকারে করেছিলেন। সব মিলে তার প্রস্তুতি মাশাল্লাহ অনেক গোছানো ছিল।
ওয়াকিং, বাটারফ্লাই, কেগেল, পেলভিক রক, ডাক ওয়াক, ডিপ ব্রীদিং, স্কোয়াট ছাড়াও বাসার স্বাভাবিক কাজকর্ম করছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই অনেক সময় পেলভিক জয়েন্টে পেইন হচ্ছিল, ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিলেন। এক্সারসাইজ করলে কষ্ট হচ্ছে এটা হয়ত আপুর মানতে একটু কষ্ট হচ্ছিল। যদিও নিজেই বুঝতে পারছিলেন এই পরিবর্তনগুলো খুবই স্বাভাবিক।
কমফোর্টেবল থেকে এক্সারসাইজ করার পরামর্শ দিলাম। বললাম কোন এক্সারসাইজে বেশি পেইন হলে যেন স্কিপ করেন। VBAC ট্রায়াল হিসেবে ম্যাম কোনো রেসট্রিশন দিলে সেটাও ফলো করার কথা বললাম।
এর সাথেই জানালেন অনেক ফলস পেইন হচ্ছে। চিন্তা করলাম প্রি টার্ম লেবার কিনা। ম্যামের সাথে দেখা করার বিষয়ে পরামর্শ চাইলেন। আমারও মনে হলো দেখা করে আসলেই ভাল হবে। ১২ অক্টোবর রুটিন ভিজিট ছিল, ১ তারিখে যাওয়ার দিন ঠিক হলো।
প্রোপার নিউট্রিশন, ওয়েট, হরমোনাল ব্যালেন্স মেইনটেইনের জন্য আপু প্রেগন্যান্সির শুরু থেকেই একজন নিউট্রিশনিস্টের আন্ডারে ছিলেন। বলা যায় বেশ স্ট্রিক্টলি সবকিছু মেইনটেইন করছিলেন। তাঁকে অনুরোধ করলাম শেষ পর্যন্ত যেনো চেষ্টা ধরে রাখেন।
আপুর ব্যাপারে আমার ভাল লাগা যেন শেষই হচ্ছিল না। কয়েকদিন পর বার্থ প্ল্যান পাঠালেন। স্পষ্টভাবে তাঁর চাওয়াগুলো তুলে ধরেছিলেন। ইমারজেন্সি সিচুয়েশনের জন্য কিছু পয়েন্ট যোগ করতে বললাম।
এদিকে ৫ তারিখে ম্যামের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সব রিপোর্ট আলহামদুলিল্লাহ ভালো আসে। কোনো কমপ্লিকেশন ছিল না। ৩৮ সপ্তাহের দিকে বার বার প্রস্রাবের চাপ আসা, কোমরে ব্যথার মত সাধারণ কিছু সমস্যা হচ্ছিল। একটু সমস্যা হলেও ঠিকমত পানি পান করতে বললাম। ডায়েটে দুটো করে খেজুর, আনারস রেখেছিলেন। সাথে লেবার ইনডাকশনের জন্য ছিল মাইলস সার্কিট।
আপু বেশ ভয় পাচ্ছিলেন, মনে হচ্ছিল বাবু নিচে নেমে গেছে, লেবার প্রগ্রেস করছে কিনা জানতে চাইলেন। বললাম পেলভিস বেশ প্রশস্ত হলে অনেক সময় খুব দ্রুত ডেলিভারি হয়ে যায় কিন্তু ওনার ক্ষেত্রে এমন সম্ভবনা তেমন নেই। কন্ট্রাকশনের দিকে খেয়াল রাখতে বললাম।
১৪ অক্টোবর ২০২৫। বিকাল সোয়া পাঁচটার দিকে আপুকে নক দিলাম কন্ট্রাকশন কেমন আসছে জানতে। জানালেন দুপুরের পর থেকে অনবরত কন্ট্রাকশন আসছে, রেস্ট নেওয়ার সুযোগ পাননি। গত রাত থেকে পেলভিক এরিয়ায় খুব ব্যথা হচ্ছিল তবে সহ্য করার মত।নিচের দিকেও বেশ চাপ লাগছিল। স্কোয়াট করলে একটু আরাম পাচ্ছিলেন। সেদিন রাতটা দেখে পরদিন ম্যামের কাছে যাবেন বলে ঠিক করলেন। বললেন, প্রয়োজন হলে জানাবেন।
জার্নির পুরোটা সময় তিনি যথেষ্ট ধৈর্য্য আর আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ২১ তারিখ বিকালে নক দিয়ে জানালেন ডক্টর দেখিয়েছেন। রিপোর্ট সব ভালো তবে সার্ভিক্স ওপেন হয়নি। সামনের রবিবার পর্যন্ত দেখবেন, পরে ইনডাকশনে যাবেন। বিকাল ৫ টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে সিজারিয়ান। বেবির ওয়েট ছিল ৩.৫ কেজির মত। ম্যামের মতে VBAC হিসেবে ওজন কম হলে আরো অপেক্ষা করা যেত তবে এই ওজনে বেশি ওয়েট করা রিস্কি।
এ পর্যায়ে আপু একটু কষ্ট পেলেন ঠিকই তবে পরিস্থিতি বুঝে সামলে নিলেন খুব দ্রুতই। একরকম অনুরোধ করলাম শেষ পর্যন্ত যাই হোক, তাঁর এতদিনের সাধনা আর আগ্রহ যেন ধরে রাখেন।
আপু চাইছিলেন আমি যেন অফলাইনে তাঁর লেবার অ্যাটেন্ড করি। এতদিনে আমি নিজেও বেশ খানিকটা মোটিভেটেড হয়েছি তাঁকে দেখে। মনে মনে এমন কিছুই চাচ্ছিলাম। দৌলা সার্ভিস নিয়ে পেইজের প্রসিডিউর শেষ করা হলো। ২৬ তারিখ রবিবার হসপিটালে যাব বলে ঠিক করলাম।
আপুকে লেবার টাইমে করার মত কিছু এক্সারসাইজ সাজেস্ট করলাম। জানালেন যতটা পারছেন করছেন। ডিপ ব্রীদিং করলে বেশ ভাল বোধ করছিলেন।
২৫ তারিখ ভোরে জানালেন রাত সাড়ে বারোটা থেকে ফজর পর্যন্ত কন্ট্রাকশন ছিল, এরপর আর হয়নি। তবে নিচের দিকে প্রেশার লাগছে। প্রস্রাবের চাপ আসছে ঠিকই তবে সে অনুযায়ী প্রস্রাব হচ্ছে না। টেনশন করতে একদম নিষেধ করলাম। তাঁর পেইন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে আমার তখনো বেশি ভাবতে হয়নি, বেশ ভাল ভাবে ম্যানেজ করে নিচ্ছিলেন সব। শুধু এটুকু বললাম, পেলভিসের অ্যালাইনমেন্ট যেন যথাসম্ভব গ্রাভিটি সাপোর্টিভ হয়।
২৬ তারিখ সকালের দিকে হসপিটালে এডমিট হলেন। সাতটার কিছু পরেই জানালেন তিন মিনিট পর পর পেইন আসছে। খাওয়া দাওয়া আর ব্রীদিং এক্সারসাইজের কথা মনে করিয়ে দিলাম। আমার বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল একদম অপারগ না হওয়া পর্যন্ত আপু সবই করবেন যা যা করার তবু দৌলা হিসেবে দায়িত্ব বলে কথা। কিছু দুয়া আর জিকির সাজেস্ট করলাম।
ইনডাকশনের কথা জিজ্ঞেস করতে জানালেন ভালো কন্ট্রাকশন আসছে তাই আজকে আর ইনডিউস করা হবেনা। সার্ভিক্স ক্লোজ আর মিউকাস প্লাগ তখনো ইনট্যাক্ট। আমার যাওয়া একদিন পিছিয়ে গেল। তাও বলে রাখলাম কোনো প্রয়োজনে যেন কল দেন।
রাত দুইটার পর থেকে থেকে ভালই পেইন আসছিল, থাকছিলও বেশি সময়। হাঁটলে ব্যথা একটু কম পাচ্ছিলেন। না ঘুমিয়ে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন তার ওপর ইনডাকশন দিয়ে দেওয়ায় ঠিকমত হাঁটাচলাও করতে পারছিলেন না। তবে পেলভিক রক করে একটু আরাম পাচ্ছিলেন। রিল্যাক্সেশন ম্যাসেজ নিচ্ছিলেন আগে থেকেই সাথে বললাম রেস্ট নিতে যেন যতটা পারেন সিম’স পজিশনে থেকে নেন।
সকালে জানালেন খুব টায়ার্ড লাগছে, ঘুমাতে চান। অনেকক্ষণ পর একটু নিশ্চিন্ত লাগল। ১০ টার দিকে টেক্সট পেলাম আপুর। ঘুম ভাল হয়েছে, একটু ভাল লাগছে। কন্ট্রাকশনের গ্যাপে গ্যাপে এক্সারসাইজ করছেন। পিটোসিন আপাতত অফ। সার্ভিক্স ওপেন না হওয়ায় মিউকাস প্লাগ রাপচার করে দেওয়া হয়েছে।
কলেজ থেকে বাসায় এসে ২টা ৭ মিনিটে বের হলাম হসপিটালের উদ্দেশ্যে। সাড়ে তিনটার দিকে পৌঁছালাম। ডক্টররা যারা ছিলেন বেশ আশাবাদী ছিলেন। ভাল পেইন আসছিল। আপু অ্যাসিস্টেড স্কোয়াট আর বার্থ বলেই বেশি কমফোর্টেবল ছিলেন। কনট্রাকশন আসলে কুরআন তিলওয়াত করছিলেন আর আমি ম্যাসেজ করে দিচ্ছিলাম তাঁর সুবিধামত। পিভি চেক করে একজন ডক্টর বললেন ডায়ালেটেশন ৩ সে.মি এর মত। রাত আটটা পর্যন্ত থেকে বাসায় ব্যাক করলাম। বললাম সকালে যাব আবার।
পরদিন সকাল সাতটার দিকে নক করলাম আপুকে আপডেট জানার জন্য। রাত দেড়টায় প্রায় ৬ সে. মি. ছিল বললেন, তারপর আর প্রগ্রেস করেনি। আবার পিটোসিন দেওয়া হচ্ছে। আপু বললেন এখনই যেন যাই একবার। ৯ টার খানিক পরে পৌঁছালাম। লেবারের ল্যাটেন্ট ফেজ যেন শেষই হচ্ছিল না। এত কষ্টের মাঝেও আপু বলছিলেন ম্যাসেজ করে দিলে ভাল লাগছে একটু।
তারপর প্রায় চার ঘণ্টা। এর মাঝে প্রয়োজন মত ওয়াশরুমে যাচ্ছিলেন, সকালের হালকা নাশতা করলেন, বার বার একটু ঘুমাতে চাইছিলেন কিন্তু ব্যথার জন্য চোখ বন্ধ করাও কঠিন ছিল। পিটোসিনের ডোজ কমানো হলো আর বমির জন্য দেওয়া হল ইমিস্টেট ট্যাবলেট। কন্ট্রাকশনের ফ্রিকুয়েন্সি কমে যাওয়ায় পিটোসিনের ডোজ বাড়ানো হলো। এবার ব্যথা এত বেশি ছিল যে আপু এপিডুরালের জন্য একরকম অস্থির হয়ে পড়লেন।
দুপুরে ম্যাম এসে মেমব্রেন সুইপ করে একটু গাঢ় রঙের ফ্লুইড দেখালেন। বেবির মেকোনিয়াম পাস করে দেওয়ার লক্ষণ। যদিও এতক্ষণ বার বার ফিটাল হার্ট রেট ভাল পাওয়া যাচ্ছিল, আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। তাও ম্যাম বললেন তিনটা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত দেখবেন। মজার বিষয় হলো, আমরা এতক্ষণ জানতাম সার্ভিকাল ডায়ালেটেশন ৬ সে.মি.। ম্যাম জানালেন ডায়ালেটেশন কোনোভাবেই ৪ সে.মি. এর বেশি না।
আমি দুইটার দিকে বের হলাম হসপিটাল থেকে। সত্যি বেশ খারাপ লাগছিল আপুর জন্য। বিকালের দিকে তাঁকে ওটিতে নেওয়া হলো।
রাত আটটায় বাবুর ছবি পাঠালেন। মেয়ে বাবু, আলহামদুলিল্লাহ। শেষ মুহূর্তে কর্ড পেঁচিয়ে যাওয়ায় বেচারি নামতে পারেনি।
সিজার নিয়ে আপুর কোনো অভিযোগ ছিল না বরং বলেছিলেন জেন্টল সিজারিয়ানের সমস্ত সুবিধা তিনি পেয়েছেন। ডিলেইড কর্ড ক্ল্যাম্পিং থেকে শুরু করে বাবুকে প্রায় পুরোটা সময় স্কিন টু স্কিন কেয়ার
দিতে পেরেছেন, ব্রেস্টফিড করাতে পেরেছেন।
মারইয়াম বাবুর বয়স এখন প্রায় দুই মাস। আলহামদুলিল্লাহ সুস্থ আছে। আপুও সেরে উঠছেন বেশ দ্রুত। অ্যাকটিভ থাকার চেষ্টা করেন টুকটাক। নিজের পড়াশোনা, অভিজ্ঞতা দিয়ে হবু মায়েদের গাইড করছেন, মাশাল্লাহ।
 
ইল্লিন সাইয়্যারা
দৌলা, রৌদ্রময়ী স্কুল
মেডিকেল স্টুডেন্ট

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *