Back

বাংলাদেশে হোম বার্থ

হোম বার্থ আমাদের সমাজে কোনো নতুন কোন ধারণা নয়। একটা সময় ছিল, যখন আমাদের দাদী–নানীদের প্রায় সকল সন্তানই জন্ম নিয়েছে তাদের নিজ বাড়িতে। তখন ডেলিভারির দায়িত্বে থাকতেন ধাত্রীরা—যারা প্রাতিষ্ঠানিক মেডিকেল শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও হাতে–কলমে শেখার মাধ্যমে এই কাজ করে আসতেন।
স্বাভাবিক ও ঝুঁকিমুক্ত গর্ভধারণের ক্ষেত্রে বেশীরভাগ সময় দেখা যেত, বাড়িতে শান্ত ও স্বাভাবিকভাবে ডেলিভারি সম্পন্ন হচ্ছে এবং মা ও নবজাতক দুজনই সুস্থ আছেন। তবে সেই সময়ের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল—লেবার চলাকালীন কোন জটিলতা দেখা দিলে তা মোকাবেলার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা।
উদাহরণস্বরূপ—
লেবার যথাযথভাবে প্রগ্রেস না করা,
বাচ্চার পজিশনজনিত সমস্যা বা পেলভিসে বাচ্চার কাঁধ আটকে যাওয়া
একলেম্পশিয়া, ডেলিভারির পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ,
এই ধরনের পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সহায়তা পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিত এবং মা ও শিশুর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ত। সেই কারণেই তখন মা ও শিশু মৃত্যুর হার ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
পরবর্তীতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়ন, হাসপাতালভিত্তিক সেবার বিস্তার এবং প্রশিক্ষিত ডাক্তার, নার্সের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ডেলিভারির জন্য হাসপাতালকে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য স্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। মা ও শিশু মৃত্যুর হার কমানোর লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে হাসপাতাল ডেলিভারিকে বিশেষ ভাবে উৎসাহিত করা হতে থাকে।
বর্তমানে আমরা এমন এক সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে শহর তো বটেই—গ্রামাঞ্চলেও অধিকাংশ ডেলিভারি এখন হাসপাতালে সম্পন্ন হচ্ছে। এর ফলে আগের তুলনায় মা ও শিশু মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে, যা নিঃসন্দেহে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও পজেটিভ অর্জন।
এই পরিবর্তনের ফলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সামনে এসেছে। আগে মেয়েরা লেবারের বিভিন্ন ধাপ, শরীরের পরিবর্তন এবং ডেলিভারি কীভাবে স্বাভাবিকভাবে এগোয়—এই বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা রাখত। পরিবার ও সমাজে গল্প, অভিজ্ঞতা আর বাস্তব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তারা বিষয়টিকে খুব সহজভাবে গ্রহণ করত।
কিন্তু বর্তমানে প্রায় সব ডেলিভারি হাসপাতালকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ায় মেয়েরা এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। অনেক মায়ের জন্য নিজের লেবারই হয়ে উঠছে জীবনের প্রথম বাস্তব অভিজ্ঞতা। লেবার সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও মানসিক প্রস্তুতি না থাকার কারণে কী হবে, কতক্ষণ লাগবে, কীভাবে ব্যথা ম্যানেজ করতে হবে—এসব বিষয়ে তাদের ধারণা থাকেনা। ফলে ধৈর্য ধরে লেবারকে সময় দেওয়াটা অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে অনেক মা সি-সেকশনকে লেবারের কষ্ট থেকে বাঁচার একটি সহজ ও নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখতে শুরু করেন। আবার দেখা যায়, কেউ প্রিপারেশন নিলেও হাসপাতালের পরিবেশ—অপরিচিত জায়গা, নিয়মকানুন, চাপ—নিজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না। এর ফলে লেবার প্রগ্রেস ব্যাহত হয় এবং শেষ পর্যন্ত সি-সেকশনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এভাবেই ধীরে ধীরে সি-সেকশনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে।
হাসপাতালে অনেক জায়গায় রুটিনমাফিক এপিসিওটমি দেওয়া হয়, কিংবা সি-সেকশনের মাধ্যমে ডেলিভারি হলে মায়ের স্বাভাবিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় লাগে। অনেক মা ডেলিভারির পরপরই বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন না, নিজের মতো করে বিশ্রাম বা যত্ন নেওয়ার সুযোগও পান না।
এর সঙ্গে যদি সেলাইয়ের ইনফেকশন, দীর্ঘদিন ব্যথা বা সুস্থ হতে দেরি হওয়ার মতো সমস্যা যুক্ত হয়, তাহলে মায়েদের মধ্যে ডিপ্রেশনে যাওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
প্রিনেটাল কেয়ার ও বার্থ সংক্রান্ত পড়াশোনার মাধ্যমে আমরা সবাই এখন জানি—ঝুঁকিমুক্ত গর্ভাবস্থায় ন্যাচরাল বা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রসবই মা ও শিশুর জন্য সবচেয়ে উপকারী। এতে মা দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন, শিশুর সঙ্গে গভীর বন্ধন তৈরি হয়, যা ব্রেস্টফিডিংয়ের হার বাড়াতে সাহায্য করে এবং ভালো একটি জন্ম-অভিজ্ঞতা মায়েদের পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন থেকেও অনেকটা সুরক্ষা দেয়।
এই জায়গা থেকেই অনেকের মনে হোম বার্থের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। বিশেষ করে প্রবাসী মায়েদের কাছ থেকে বা বিভিন্ন বার্থ ভ্লগে ট্রেইনড মিডওয়াইফের সঙ্গে সুন্দর ও শান্ত হোম বার্থের অভিজ্ঞতা দেখে বিষয়টি খুব আকর্ষণীয় মনে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
এই বিষয়ে আমাদের একটি আলোচনা সেশন হয়েছিল মিডওয়াইফ কানেতা আপুর সঙ্গে। তিনি বাংলাদেশের একজন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার তুলনায় প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফের সংখ্যা খুবই কম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে মিডওয়াইফারি শিক্ষা শুরু হওয়ায় তাদের অনেকেরই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এখনো গড়ে ওঠেনি।
আপু আরও বলেন, লেবার ট্রায়ালের সময় যদি দেখা যায় বাচ্চার মাথা মায়ের পেলভিসের সঙ্গে ঠিকভাবে এলাইন করছে না, কিংবা হঠাৎ কোনো ইমার্জেন্সি তৈরি হয়—যেমন সাডেন ফিটাল ডিস্ট্রেস—তাহলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য যাতায়াত ব্যবস্থা আমাদের দেশে সব জায়গায় সহজলভ্য নয়।
ট্রেইনড মিডওয়াইফরা তাদের প্র্যাকটিসে এভিডেন্স-বেইজড, ন্যাচরাল ও সাপোর্টিভ প্রোটোকল অনুসরণ করেন, তবে তাদের কাছেও ইমার্জেন্সি সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ইকুইপমেন্ট থাকে না।
বাংলাদেশে হোম বার্থের কথা ভাবলে বাস্তবে অনেক সময় লেবার রুমে নার্স, আয়া বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন ধাত্রীদেরই পাওয়া যায়। দুঃখজনকভাবে, অনেক ক্ষেত্রে তাদের দ্বারা নানা ধরনের ম্যালপ্র্যাকটিস দেখা যায়—যেমন অপ্রয়োজনীয় ইনডাকশন বা এপিসিওটমি—যা হোম বার্থের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই বাস্তবতায় বলা যায়, বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হোম বার্থকে সার্বিকভাবে নিরাপদ ও সমর্থনযোগ্যভাবে পরিচালনা করার মতো কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। তবে আমরা আশাবাদী হতে পারি—ভবিষ্যতে মিডওয়াইফের সংখ্যা বাড়বে, সরকারি হাসপাতাল ও বার্থ সেন্টারগুলোতে আমরা মিডওয়াইফদের উপস্থিতি ও সার্ভিস পাবো। এর ফলে দেশে ন্যাচরাল বার্থের হারও বাড়বে ইনশাআল্লাহ।
সচেতনতা বৃদ্ধি, সঠিক প্রিপারেশন এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে হয়তো একদিন বাংলাদেশেও প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফের তত্ত্বাবধানে নিরাপদ হোম বার্থ বাস্তবসম্মতভাবে সম্ভব হবে।
 
ফারইয়াব হাসান
দৌলা, রৌদ্রময়ী স্কুল