শর্ট সার্ভিক্স নিয়ে আমার নরমাল ডেলিভারির গল্প
- Posted by MNCC Moderator
- Date June 12, 2026
- Categories Birth Story, Uncategorized

১১-০১-২০২৬—আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনেই নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে আমি আমার কন্যা সন্তানের মা হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করি। আমার এই বার্থ স্টোরি কেবল একটি অভিজ্ঞতা নয়; এটি দোয়া কবুলের এক জীবন্ত, অনুভূতিময় যাত্রা—যেখানে প্রতিটি ধাপে ছিল ভরসা, ধৈর্য এবং আল্লাহর অশেষ রহমত।
সবকিছুর শুরুটা ছিল এক গভীর বিস্ময় আর আনন্দের মাধ্যমে—টেস্ট করে জানতে পারি আমি কনসিভ করেছি। ১১ সপ্তাহে জানা গেল, আমার সার্ভিক্যাল লেন্থ মাত্র ২.২ সেন্টিমিটার। তখন থেকেই এক অদৃশ্য আশঙ্কা মনকে ঘিরে ধরে। তবুও মনটা ছিল দৃঢ়—আমি নরমাল ডেলিভারিই চাই। বাবুর আব্বুও সি-সেকশনের কথা কল্পনাই করতে পারতেন না।
এর পরপরই “আমানি বার্থ” বইটি সংগ্রহ করি। বইটি পড়তে পড়তেই মনে হচ্ছিল—ইশ! যদি এমন কোনো প্রিনেটাল কোর্স পেতাম, যেখানে সবকিছু গাইডলাইনসহ শেখানো হয়। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যেন আমার মনের অপ্রকাশিত সেই আকাঙ্ক্ষাটুকুও শুনে নিলেন।
একটি গ্রুপে এক আপুর মাধ্যমে “রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স”-এর সন্ধান পেলাম—আর সেদিনই দেরি না করে এনরোল করে ফেলি।বাবুর আব্বুও কোর্সটির কথা শুনে অনেকটাই স্বস্তি পেলেন মনে হলো।
নিঃসন্দেহে, এটি আমার জীবনের অন্যতম বড় নেয়ামত ছিল। কোর্সটি শুরু হওয়ার পর থেকেই নিজের শরীরের পরিবর্তন, দুর্বলতা এবং প্রতিটি নতুন অভিজ্ঞতার সাথে মানিয়ে নেওয়া আমার জন্য অনেক সহজ হয়ে যায়। তখন মনে হতো—আমি আর অজানা ভয়ের মধ্যে নেই; বরং আমি সচেতন, প্রস্তুত এবং আত্মবিশ্বাসী।
শ্বশুর ফ্যামিলি দেশের বাইরে থাকায় আমি বাবার বাড়িতে থাকি। সেখানে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল একটু বেশি শুয়ে-বসে। হাই রিস্ক প্রেগন্যান্সি হওয়ায় আমি খুব হালকা কিছু এক্সারসাইজই করতাম—বিশেষ করে কেগেল এক্সারসাইজ, টেইলর সিটিং পজিশনে বসা, স্ট্রেচিং, ডিপ ব্রিদিং এবং রিলাক্সেশন প্র্যাকটিসের মাধ্যমে নিজেকে এক্টিভ রাখার চেষ্টা করতাম।
আমার লাস্ট পিরিয়ড অনুযায়ী ইডিডি ছিল ৬ জানুয়ারি ২০২৬। দিন যত এগোচ্ছিল, শর্ট সার্ভিক্সের কারণে প্রি-ম্যাচিউর ডেলিভারির ভয় ততই বাড়ছিল। প্রতিটি দোয়া কবুলের মুহূর্তগুলোই যেন আমার সম্বল। মনে হতো—৩৭ সপ্তাহ পার হলেই যেন এক বিশাল স্বস্তি মিলবে।
অবশেষে ৩৭, ৩৮ সপ্তাহ পেরিয়ে ৩৯ সপ্তাহ ১ দিন। তবুও দিন কাটছিল আগের মতোই। এরই মাঝে বাবুর আব্বু দেশে আসেন।আমার কিছুটা অলসতা দেখে তিনি উদ্বিগ্ন হন এবং উনার মাধ্যমেই শুরু হয় নতুন প্রস্তুতি–সিঁড়ি ভাঙা (নিচতলা থেকে ৬ তলা পর্যন্ত), ডিপ স্কোয়াট, বাটারফ্লাই এক্সারসাইজ, ইন্টিমেসি প্র্যাকটিস, হিপ ওপেনিং এক্সারসাইজগুলো, খেজুর ও কাঁচা পেঁপে খাওয়া–সবই চলতে থাকল। এভাবেই কেটে গেল আরও একটি সপ্তাহ।
৬ জানুয়ারি—ডিউ ডেট। তবুও কোনো পেইন নেই। আল্ট্রাসনোতে সবকিছু ঠিক পাওয়া গেল, বেবীর ওজনও স্বাভাবিক। পরিচিত একজন নার্স পিভি চেক করে জানালেন সার্ভিক্সের ইফেসমেন্ট ৫০%, কিন্তু বেবী তখনো নিচে নামেনি। আত্মীয় স্বজনদের উদ্বেগ বাড়তে থাকলো। আমার আম্মুও চিন্তিত হয়ে পড়ছিলেন। কারণ আমার কাছাকাছি ইডিডি থাকা আত্মীয়দের সবারই বেবী হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি আম্মুকে আশ্বস্ত করতাম। আমার দৃঢ়তা দেখে তিনিও মনোবল ফিরে পেতেন।
৭ জানুয়ারি থেকে মাইলস সার্কিট শুরু করি। প্রথম দিকে প্রথম স্টেপটা ১০ মিনিটও কষ্ট হতো। প্রথম দিনই বিকেলে মিউকাস প্লাগ চলে যায় এবং ব্র্যাক্সটন হিক্স শুরু হয়।
১০ জানুয়ারি– খুব ভোরেই আবার মাইলস সার্কিট করি, এবার প্রায় আধঘণ্টা ধরে করি, কষ্ট হচ্ছিল তবুও। এরপর থেকেই অনিয়মিত কনট্রাকশন শুরু হয়। বিকেলে সেই নার্স জানান—১ সেমি ডাইলেশন এবং বেবীর হেড এনগেজড হয়েছে।
রাত বাড়ার সাথে সাথে ব্যথার ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ছিল। কনট্রাকশন ট্র্যাকার দিয়ে ট্র্যাক করছিলাম, আর লেবার ক্লাসের নোট পড়ছিলাম। রাত প্রায় ২টা ছুঁই ছুঁই—৫০-৬০ সেকেন্ড ডিউরেশনে ৫-৭ মিনিট পর পর ব্যথা আসতেই থাকলো ৫-১-১ প্যাটার্নে। একটু ব্লাডি শো-ও দেখা যাচ্ছিল।
আমার অবস্থা দেখে মমতাময়ী মা আর ঘরে অপেক্ষা করতে চাইছিলেন না তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটি মেটারনিটি কেয়ারে যাই। ঠিক সেই সময় এক গর্ভবতী মাকে ওটি রুমে নেওয়া হচ্ছিল—দৃশ্যটা দেখে বাবুর আব্বু ভড়কে যান।
সেখান থেকে বের হয়ে আমরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাই। সেখানে চেক করে জানা যায় ১ সেমি ডায়ালেটেড আরও সময় লাগবে। আবার বাসায় ফিরে এলাম।
কনট্রাকশনের ফাঁকে ফাঁকে চোখে ঘুম নেমে আসছিল, তবুও ব্যথার তীব্রতা এমন ছিল যে বসে থাকাও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছিল। পুরো রাতটা কেটে গেল এক অবিরাম চলাফেরার ভেতর দিয়ে—কখনো হাঁটা, কখনো থেমে গভীর শ্বাস নেওয়া, খেজুর-পানি আর সামান্য শক্তিদায়ী খাবার গ্রহণ করে শরীরটাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা, আর প্রতিটি কনট্রাকশনের ঢেউ সামলাতে ডিপ ব্রিদিংয়ের আশ্রয়।
আমার আম্মু আর শাশুড়ি মা—দুজনেই যেন কবে ফজরের আজান ধ্বনিত হবে—এই অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন। সময় যেন থমকে থাকা এক দীর্ঘশ্বাস। রাতটি তাদের জন্য রূপ নিয়েছিল উদ্বেগ আর নীরব দোয়ার এক দীর্ঘ অধ্যায়ে।
ফজরের নামাজ শেষ হতেই, সেই ভোরের নিস্তব্ধ আলোয় আমরা আবার রওনা দিলাম—কাছের আরেকটি ক্লিনিকের উদ্দেশ্যে।
ক্লিনিকে পৌঁছাতেই শরীরজুড়ে চলমান ব্যথার ঢেউ আরও তীব্র হয়ে উঠল, আর মনের গভীরে অজানা এক আশঙ্কা ধীরে ধীরে ছায়া ফেলতে শুরু করল। তখন ভেতরে ভেতরে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—“আমি পারব তো?”
মনে হচ্ছিল, এতদিন ধরে গড়ে ওঠা সাহসটুকুও যেন এক মুহূর্তে টলে উঠেছে।
ডাক্তার পিভি করে জানালেন—১.৫ সেমি ডায়ালেশন হয়েছে। এরপর আমাকে কেবিনে নেওয়া হলো এবং নরমাল স্যালাইন দেওয়া হলো। ব্যথা তখনো একই প্যাটার্নে আসছিল।
সকাল ৭টায় আরেকজন অ্যাটেন্ডিং ডাক্তার এসে আবার পিভি চেক করলেন। বেবীর হার্টবিট মনিটর করা হচ্ছিল—সবকিছু তখনো একই অবস্থায় ছিল। এদিকে আমি ক্লান্তিতে যেন ধীরে ধীরে নুয়ে পড়ছিলাম, ঘুমে চোখ ভারী হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল সিমস পজিশনে শোয়া গেলে বোধ হয় একটু ঘুমাতে পারবো। কিন্তু হায়! শোয়ার চেষ্টা করলেই ব্যথার তীব্রতায় আবার উঠে দাঁড়াতে হচ্ছিল। তাই বাবুর আব্বুর সহায়তায় শুধু হাঁটতেই থাকলাম। তিনি আমাকে বারবার অভয় দিয়েই যাচ্ছিলেন। আমাকে ব্যথার ফাঁকে ফাঁকে জমজমের পানি আর খেজুর খাওয়ানো হচ্ছিল।
এভাবেই ধীরে ধীরে কেটে গেল বেলা ১১টা পর্যন্ত। ব্যথার ইনটেনসিটি, ফ্রিকোয়েন্সি আর ডিউরেশন দেখে আমার মনে হচ্ছিল আমি হয়তো এক্টিভ লেবার স্টেজেই আছি।
ক্লাসে শেখা বিষয়গুলোর সাথে নিজের অবস্থার মিল খুঁজতে গিয়ে আমি তখন আরও বেশি মনোযোগী হয়ে পড়লাম, প্রতিটা কনট্রাকশন, প্রতিটা পরিবর্তন বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম।
এরই মধ্যে আরো বেশ কয়েকবার পিভি চেকের কারণে শরীর আর মন—দুটোই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল। দুপুর ১২টায় জানানো হলো—লেবার প্রগ্রেস হচ্ছে না, আরও এক ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করা হবে; না হলে সিজারের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এই কথাটা শুনেই যেন ভেতরটা থমকে গেল। প্রায় ২০ ঘণ্টার ব্যথার পরেও মাত্র ১.৫ সেমি ডায়ালেশনে হার মানতে হচ্ছে!!মনে হচ্ছিল, শরীর আর মন—দুটোই যেন একসাথে হার মেনে নিচ্ছে। এত দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও বুঝি সব আশা থেমে যাচ্ছে।
সিজারের কথা শুনে আমার মমতাময়ী মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। আমিও হার মেনে নিয়ে —“আমি আর পারবো না” বলে বাবুর আব্বুকে বলতেই তিনি শুধু আমার হাত শক্ত করে ধরে বললেন—“তুমি পারবে ইনশাআল্লাহ। আমি জানি তুমি পারবে।”
এরপর বাবুর আব্বু আমার অস্বস্তি আর আনকমফোর্টেবল অবস্থাটা বুঝে সিদ্ধান্ত নিলেন অন্যত্র যাওয়ার। পরে বন্ড সাইন করে আমাদের রিলিজ দেওয়া হলো।
সেখান থেকে আমরা রওনা দিলাম “মানাহিল”-এর উদ্দেশ্যে—এক বুক অনিশ্চয়তা আর হতাশা নিয়ে, যেখানে শুরু থেকেই নিকট আত্মীয়ের কয়েকজন যেতে বলেছিলেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টার পথ, তবুও তখন আর কিছুই ভাবার মতো অবস্থা ছিল না।
সেখানে পৌঁছে আবার পিভি চেক করে জানা গেল—২ সেমি ডায়ালেশন। তারাও ৩–৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখবেন বললেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বললাম: “رَبِّ إِنِّي مَغْلُوبٌ فَانْتَصِر”
(সূরা আল-কামার ৫৪:১০)
এর অর্থ—“হে আমার পালনকর্তা, আমি অসহায় অতএব আপনি আমাকে সাহায্য করুন।”
আরও একটি দোয়া মনে মনে উচ্চারণ করছিলাম:
“رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ”
(সূরা আল-কাসাস ২৮:২৪)
অর্থ—“হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণই নাজিল করবেন, আমি তারই মুখাপেক্ষী।”
তারপর আমি অজু করে ব্যথার ফাঁকে ফাঁকে যোহরের নামাজ আদায় করলাম এবং দীর্ঘ দোয়া করলাম—চোখ ভিজে যাচ্ছিল, কিন্তু ভেতরটা অদ্ভুতভাবে হালকা হয়ে আসছিল। আর ধীরে ধীরে চারপাশের পরিবেশও যেন বদলে যেতে লাগল—মনের ভেতর এক ধরনের গভীর শান্তি ফিরে আসছিল। মনে হচ্ছিল, এখন আর চিন্তার কিছু নেই—উপরওয়ালা যা ফয়সালা করবেন, আমি তা মাথা পেতে নিব।
ডিপ স্কোয়াট করছিলাম, হালকা লাঞ্চের পর আবার হাঁটা শুরু করলাম।
আসরের পর প্রায় সাড়ে চারটার দিকে আমাকে ডাকা হলো। পিভি চেকের পর মেমব্রেন সুইপ করে পিটোসিন দেওয়া হলো—আর আশ্চর্যজনকভাবে ডায়ালেশন বেড়ে ৪–৫ সেমি! যেন মুহূর্তেই সবকিছু গতি পেয়ে গেল।
বাবুর আব্বুর সহযোগিতায় হাঁটা, ডিপ স্কোয়াট—সব চলতে থাকল। একটু পর ডাক্তার পানি ভেঙে দিলেন জানা গেল, বেবী মেকোনিয়াম পাস করেছে। মুহূর্তেই ব্যথার তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে গেল—সময়, ক্লান্তি, ভয়—সবকিছু মিলিয়ে এক অন্যরকম জার্নি শুরু হলো। সময়ের হিসাব হারিয়ে গেল।তখনই বুঝতে পারলাম এটাই হয়তো এক্টিভ ফেজ।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ডায়ালেশন ৮ সেমি। আমাকে লেবার রুমে নেওয়া হলো। নার্সদের সহায়তায় আবার ডিপ স্কোয়াট, তারপর লেবার বেডে তোলা হলো। অক্সিজেন দেওয়া হলো।
আমাকে বলা হলো—“পুশিং আর্জ এলে নিজের মতো করে পুশ করো।”
রেস্টিং পিরিয়ডে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় আমি শুধু দোয়া ইউনুস আর “রব্বি ইয়াস্সির” পড়ছিলাম—ব্যথার ভেতরেও যেন দোয়াই ছিল আমার একমাত্র ভরসা।
বেশ কয়েকবার পুশ করার পর মনে হচ্ছিল আর পারছি না… শরীর যেন সম্পূর্ণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ঠিক তখনই এক নার্স বুকের নিচে কয়েকটা জোরে চাপ দিতেই—
এক মুহূর্ত… সব থেমে গেল।
তারপর—একটা ছোট্ট কান্না।
আর আমার পুরো পৃথিবী বদলে গেল।
সমস্ত যন্ত্রণার গোঙানি ভেদ করে ভেসে এলো এক নবজীবনের প্রাণস্পর্শী কন্ঠস্বর!!
অবশেষে—৪০ সপ্তাহ ৫ দিন পূর্ণ করে, ১১ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে আমার কোল আলোকিত করে এলো আমার সারা।
“সারা”—যার নামের অর্থই রাজকন্যা ও খুশির কারণ। নামের মতোই সে যেন সত্যিকারের এক রাজকন্যা—যার আগমনে আমার পুরো পৃথিবীটাই বদলে গেল, রঙে, আলোয় আর অপার আনন্দে ভরে উঠল।প্রতিটি অপেক্ষার প্রহর, প্রতিটি ব্যথা, প্রতিটি দোয়া এক অনন্য অর্থ পেল। প্রতিটি কষ্ট যেন ধীরে ধীরে সাজিয়ে দিল এমন এক মুহূর্তের জন্য, যাকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তার প্রথম কান্নার শব্দেই আমার ভেতরের সব যন্ত্রণা, ক্লান্তি, ভয়—সব মুহূর্তে মুছে গেল। মনে হলো, এই প্রথম আমি সত্যিই শান্ত হলাম। মনে হলো, আমিও যেন নতুন করে জন্ম নিলাম।
প্লাসেন্টা আউট হওয়া, এপিসিওটমি আর তিনটি সেলাই—কিছুই যেন তখন আর কষ্ট মনে হয়নি। সব ব্যথা, সব ক্লান্তি এক নিমিষেই মুছে গিয়েছিল।
ডিলেইড কর্ড ক্ল্যাম্পিং আর স্কিন-টু-স্কিন করার প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও, বেবী মেকোনিয়াম খেয়ে ফেলায় তাকে দ্রুত সাকশনের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো।
এরপর আমার গল্পে এলো এক অবাক করা টুইস্ট—আমার বেবীর ওজন ছিল ৩৯০০ গ্রাম, আর তার গলায় পেঁচানো ছিল তিনটি কর্ড!!
আল্লাহু আকবার!!
প্রিম্যাচিউর ডেলিভারির ভয় থেকে শুরু করে ৪০ সপ্তাহ ৫ দিনের পূর্ণতা, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ওজন, আর তিনটি কর্ড পেঁচানো—সবকিছু আড়াল রেখেই তিনি কত নিখুঁতভাবে সব সম্পন্ন করেছেন।
সুবহানাল্লাহ!!
এই পুরো যাত্রায় “রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স” এর বিশেষ অবদান ছিল। চারপাশে যখন অজানা ভয়, ভুল ধারণা আর দুশ্চিন্তার চাপ—তখন এই কোর্স আমাকে শিখিয়েছে নিজের শরীরকে বুঝতে, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে আর নিজের সিদ্ধান্তের উপর আস্থা রাখতে। অন্যদিকে তিনি আমাকে দিয়েছেন মানসিক স্থিরতা ও সাহস—যেখানে ক্লান্তি, ব্যথা আর অনিশ্চয়তার মাঝেও আমি একা হয়ে যাইনি।
আজ মনে হয়—এই জ্ঞান আর এই সহযাত্রা না থাকলে হয়তো এই দীর্ঘ পথটা এতটা সচেতন আর এতটা দৃঢ়ভাবে পার হওয়া সম্ভব হতো না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে দোয়া করি—তিনি যেন এই কোর্সের সাথে জড়িত প্রত্যেককে উত্তম প্রতিদান দেন।
আর প্রতিটি মা’কে একটি সুন্দর, নিরাপদ এবং বিশ্বাসে ভরা মাতৃত্বের জার্নি দান করেন… আমীন ![]()
![]()
উম্মু সারা
রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স পার্টিসিপ্যান্ট, ব্যাচ ২৩
Other post
You may also like
বারাকাহ হওয়ার গল্প
“সন্তান প্রসবের বেদনা তাকে এক খেজুর বৃক্ষতলের দিকে তাড়িত করলো।” (সুরাহ মরিয়ম:আয়াত-২৩) কত মর্যাদাপূর্ণ সেই মুহূর্ত! কত মহিমান্বিত সেই বেদনা!বযা আল্লাহ সুবহানাওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন।বারাকাহ্’র অস্তিত্ব যখন জানতে পারলাম, যারপরনাই আনন্দিত ছিলাম। শুরু হলো ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা। …
এপিশিওটমি ছাড়া আমার সাড়ে ৩কেজি বাবুর তিব্যাকের গল্প
আলহামদুলিল্লাহ গত ২১-০২-২৬ তারিখ রাত ১০:২২ মিনিটে ভিব্যাকের মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা আমার আয়িশাহকে আমার কোলে দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ ছুম্মা আলহামদুলিল্লাহ। সর্বোপরি আল্লাহ তায়ালার প্রতি হাজার হাজার শুকরিয়া তিনি আমাকে ভিব্যাকের জন্য কবুল করেছেন। অতঃপর রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল টিমের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা, …
নরমাল ডেলিভারি নিয়ে পড়াশোনায় স্বামীর সহযোগিতা পেয়েছি
আমার বার্থ স্টোরি পুরোটাই দুয়া কবুলের একটা জার্নি। খুবই প্রশান্তিদায়ক আর স্নিগ্ধ একটা জার্নি ছিলো আমার জন্য। আমার জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া সবচেয়ে সুন্দরতম ৯ মাস আলহামদুলিল্লাহ!মাশা আল্লাহ! আমার যেই তারিখে পিরিয়ড মিস যায় সেদিন আমার পায়ে একটা লাইপোমা …
