রৌদ্রময়ীর সাথে প্রথম পরিচয় এক ফ্রেন্ডের সেলাই শেখার কোর্সের পোস্ট থেকে। তখন পেজটা দেখতে গিয়েই এই কোর্সের ব্যাপারে জানা। আমার তখন প্রেগ্ন্যাসির ৫ মাস চলে। আমার আগে থেকেই ইচ্ছা ছিল নরমাল ডেলিভারির।
কোর্স ডিটেইলস, আগের ব্যাচের আপুদের রিভিউ, তারপর এখানকার ক্লাসগুলো নরমাল ডেলিভারিতে পেইন ম্যানেজমেন্টের জন্য হেল্পফুল এই সবকিছু দেখে আমি সিদ্ধান্ত নেই যে কোর্স করব। হাজবেন্ডকে জিজ্ঞেস করার পর হাজবেন্ড বলেন যে আর কাউকে তো কখনো শুনি নাই এই ব্যাপারে ক্লাসও হয় এমন বলতে, কিন্তু তোমার প্রয়োজন মনে হলে তুমি করো।
আরেকটা ফ্রেন্ড যার কয়েকমাস আগে বেবি হয়, ওকে তখন কোর্সের লিংকটা দিয়ে জিজ্ঞেস করি যে এই কোর্সটা কি হেল্পফুল হবে কিনা তোর অভিজ্ঞতা থেকে বল। ও বলে যে যা জানাবে কোর্সে এসব মা খালারাই তোকে বলে দিবেন,এর জন্য ক্লাস করা লাগে না।
কিন্তু তবুও একান্তই নিজের ইচ্ছায় ক্লাসে এনরোল করি।
ওরিয়েন্টেশন ক্লাসেই যখন প্রমা আপু বললেন যে প্রেগ্ন্যাসির জার্নিটা শুধু কনসিভ করার পরই শুরু হয় না, প্রেগ্ন্যাসির জন্যও প্রিপারেশন প্রয়োজন, তখন আমার মনে হয় যে আমি ঠিক জায়গাতেই এনরোল করেছি। কারণ প্রেগ্ন্যাসির আগে আমি ডাক্তারের সাথে কনসাল্ট করে আল্লাহর ইচ্ছাতে প্রিপেয়ার্ড প্রেগ্ন্যাসিতে গিয়েছি,কারণ আমি মনে করতাম যে একজন সুস্থ বাচ্চা জন্ম দেওয়ার জন্য মাকে সুস্থ থাকতে হবে,প্রিপেয়ার্ড থাকতে হবে। কিন্তু আত্নীয়রা, এমনকি আম্মুও বলছিল যে আর কাউকে তো দেখি নাই বাচ্চা নেওয়ার আগে এত টেস্ট, এত ওষুধ(ফলিক এসিড,ভিটামিন) খেতে। কিন্তু এই ওরিয়েন্টেশন ক্লাসের পর মনে হয়েছে যে আমি ঠিক ছিলাম।
প্রিনাটাল কোর্সটা আমাকে এতটা কনফিডেন্স দিয়েছে আমার বাকি জার্নিতে আলহামদুলিল্লাহ যা বলার বাইরে৷ প্রেগ্ন্যাসির ক্ষেত্রে পা ব্যাথা, কোমর ব্যাথা, ব্রেস্ট থেকে সাদা কসের মত বের হওয়া এগুলো নরমাল, এটা ক্লাসে জেনেছিলাম বলেই ওই সময়ে প্যানিকড হইনি। অলস আমিও ক্লাসের লেকচার শোনার পর থেকে হাঁটা, স্কোয়াট করা, এক্সারসাইজ করা শুরু করি, ঠিকঠাক মত মাছ খাওয়া শুরু করি( মাছ আমার খুবই অপছন্দ ছিল)। লেবারের ক্লাসে লেবারের প্রতিটি স্টেপ জানা থাকায় আমি লেবারের আগের দিন পর্যন্ত কনফিডেন্স এর সাথে বাইরে খাওয়ার জন্য যেতে পেরেছিলাম
আমার ইডিডি ছিল ১৭/১০/২১ এ। ১২/১০/২১ দুপুরে ১২ টার দিকেআমি স্কোয়াট পজিশনে বসে জগে পানি ভরছিলাম। তখনই লিকুইড ডিসচার্জ খেয়াল করি। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বুঝতে পারি যে এটা নরমাল ভ্যাজাইনাল ডিসচার্জ না, তখন আম্মুকে জানাই,বলি যে রেডি হও হসপিটালে যাওয়া লাগবে,আমার সম্ভবত পানি ভাংছে। আম্মু তো শুনে আতংকিত হয়ে গেছে যে এখনি ব্যাথা শুরু হয় কিনা, কিভাবে সামাল দিবে এসব ভেবে। আমি আম্মুকে সাহস দেই যে এখনি এমন ব্যাথা উঠবে না যে হসপিটালে যেতে পারব না, সময় আছে। তারপর গোসল করে, আগে থেকে গুছিয়ে রাখা ব্যাগ আবার ভালভাবে চেক করে, খেজুর ধুয়ে বক্সে নিয়ে উবার কল করে হসপিটালে যাই। দুপুর ৩.৩০ টার দিকে ব্যাথা উঠে হালকাভাবে। পিভি চেক করে তারা বলে যে এখনো ওয়াটার ব্রেক হয়নি, হাঁটতে থাকেন।
ব্যাথা আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে, সন্ধ্যা ৬.৩০টার দিকে চেক করে বলে যে ডাইলেশন মাত্র ২ সেমি, তখন ক্যানোলা করে ইনজেকশন দেয় ব্যাথা আরও বাড়ানোর জন্য। আমি বলেছিলাম মেডিসিন দিয়ে ব্যাথা না বাড়ানোর জন্য, ব্যাথা ন্যাচারালি যেভাবে বাড়বে, যেভাবে আগাবে, আমি সেভাবেই চেষ্টা করতে চাই।
কিন্তু তারা আমার কথা শোনেনি, ইনজেকশন দেওয়ার পর থেকে ব্যাথা আস্তে আস্তে অসহনীয় হয়ে যায়। আমি তারপরও পেইন কোপিং টেকনিকগুলো এপ্লাই করে হিপ রোটেশন, স্কোয়াট করছিলাম, লেবারের ক্লাস নোটস পড়ছিলাম। রাত ১০.৩০ টায় আবারও মেডিসিন ইঞ্জেক্ট করে, এরপর থেকে ব্যাথা এতটাই অসহ্য হয়ে যাচ্ছিল যে, আমি চিৎকার শুরু করি। বুঝতে পারছিলাম যে এক্টিভ লেবারের দিকে যাচ্ছি, এই সময় আর বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না, কিন্তু ব্যাথায় এত বেশি অস্থির হয়ে যাই যে আমিই বলছিলাম যে সিজার করিয়ে ফেলুক, আমার পক্ষে আর সম্ভব না। রাত ২ টায় লেবার রুমে নিয়ে যায়, পিভি চেক করে দেখে ৮ সেমি ওপেন হয়েছে। স্কোয়াট করতে, হাঁটতে বলে, আর কিছুক্ষণ পর পর পুশ করতে বলে। স্কোয়াট পজিশনে পুশ করতে পেরেছি, হিপ রোটেশন করতে পেরেছি।কিন্তু ডিপ ব্রিদিং করতে তারা আমাকে এলাও করেনি, যখন ডিপ ব্রিদিং করছিলাম ব্যাথায় তখন তারা আমাকে বলে যে ডিপ ব্রিদিংয়ের জন্য নাকি বেবি নিচ থেকে আবার উপরে চলে যাচ্ছে।
ভোর ৫ টার দিকে ফুল ডাইলেশন হয়, কিন্তু পুশ করার পর বেবির মাথা দেখা গেলেও এর বেশি আর আগাচ্ছিল না। অনেক চেষ্টার পর এপিসিওটোমি করে ভোর সাড়ে ৬ টায় আল্লাহর রহমতে আমার ছেলে দুনিয়াতে আসে৷ ডিলেয়ড কর্ড ক্ল্যাম্পিংয়ের কথা বলার আগেই তারা কর্ড কেটে বেবিকে সরিয়ে নিয়ে যায়। বেবিকে স্কিন টু স্কিন কন্ট্যাক্টের জন্য বুকের উপর দিতে বললে তারা শুধু ওকে দেখিয়ে বাইরে আমার আম্মুর কাছে দিয়ে দেয়।
লেবার পেইনের টাইমে আমি যতটুকু সাহস রাখতে পেরেছিলাম আলহামদুলিল্লাহ, প্রিনাটাল কোর্স না করলে আমি পারতাম না।
এছাড়াও ৩৬ সপ্তাহের পর এম্নিওটিক fluid কমে যাওয়ায় ডাক্তার তখনই সিজার করতে বলেছিলেন। কিন্তু গ্রুপে পরামর্শ চাওয়ার পর প্রমা আপুর পরামর্শে লিকুইড ইনটেক বাড়িয়ে এক সপ্তাহ পরের আল্ট্রাসনোগ্রামে fluid পরিমাণ বাড়ে আলহামদুলিল্লাহ, কিন্তু আমি যেই ডাক্তারকে দেখাচ্ছিলাম তিনি তখনও বলেন যে সিজার লাগবেই। তখনি ভর্তি হয়ে যেতে, না হলে রিস্ক নিজের নিতে হবে। তখনও গ্রুপে আপুদের পরামর্শে আমি অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেই এবং ডাক্তার পরিবর্তন করি, নরমাল ডেলিভারিতেই ছেলেকে পৃথিবীতে আনতে পারি আল্লাহর ইচ্ছায়।
এছাড়াও baby blue, পোস্ট নাটাল ডিপ্রেশনের ব্যাপারে আমি এবং আমার হাজবেন্ড দুজনেই এই কোর্সের মাধ্যমে জেনেছিলাম বলেই আলহামদুলিল্লাহ সুন্দরভাবে সেই সময় পার করতে পেরেছি।
ব্রেস্টমিল্ক যে পাম্প করে স্টোর করে বাচ্চাকে খাওয়ানো যায়, কখনো শুনিনি। টেনশনে ছিলাম প্রেগ্ন্যাসির শুরুতে যে ক্লাস শুরু হলে আমি কিভাবে বাচ্চাকে খাওয়াব, ফর্মুলা দিলে কোন সমস্যা হবে কিনা এসব নিয়ে। কিন্তু কোর্স থেকে এটা জানা থাকায় আলহামদুলিল্লাহ গত দেড় মাস থেকে আমি বাচ্চাকে বাসায় রেখে স্টোরড ব্রেস্টমিল্ক খাইয়েও রেগুলার ক্লাস করতে পারছি।
আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে প্রত্যেক প্রেগ্ন্যান্ট মা এবং যারা বাচ্চা নেওয়ার কথা ভাবছেন, তাদের সবার উচিত এই কোর্সে এনরোল করা। আল্লাহর ইচ্ছায় এই কোর্সের জ্ঞান একজন মায়ের প্রেগ্ন্যাসিকে অনেকটাই সহজ করে দিবে ইনশাআল্লাহ। ইন্সট্রাক্টর আপুদের এবং রৌদ্রময়ী স্কুলের জন্য অনেক অনেক দোয়া ও শুভকামনা থাকল।
১১-০১-২০২৬—আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনেই নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে আমি আমার কন্যা সন্তানের মা হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করি। আমার এই বার্থ স্টোরি কেবল একটি অভিজ্ঞতা নয়; এটি দোয়া কবুলের এক জীবন্ত, অনুভূতিময় যাত্রা—যেখানে প্রতিটি ধাপে ছিল ভরসা, ধৈর্য এবং …
“সন্তান প্রসবের বেদনা তাকে এক খেজুর বৃক্ষতলের দিকে তাড়িত করলো।” (সুরাহ মরিয়ম:আয়াত-২৩) কত মর্যাদাপূর্ণ সেই মুহূর্ত! কত মহিমান্বিত সেই বেদনা!বযা আল্লাহ সুবহানাওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন।বারাকাহ্’র অস্তিত্ব যখন জানতে পারলাম, যারপরনাই আনন্দিত ছিলাম। শুরু হলো ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা। …
আলহামদুলিল্লাহ গত ২১-০২-২৬ তারিখ রাত ১০:২২ মিনিটে ভিব্যাকের মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা আমার আয়িশাহকে আমার কোলে দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ ছুম্মা আলহামদুলিল্লাহ। সর্বোপরি আল্লাহ তায়ালার প্রতি হাজার হাজার শুকরিয়া তিনি আমাকে ভিব্যাকের জন্য কবুল করেছেন। অতঃপর রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল টিমের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা, …