Back

উরওয়াহর আম্মু হওয়ার গল্প

Mother of urwah
আমি ১৮জুলাই, ২০২২ তারিখে প্রথম মা হয়েছি। আপনাদের সাথে সেই গল্পটা শেয়ার করবো ইন শা আল্লাহ।
বিয়ের ৮ মাস পরে পিরিয়ড মিস হয়। আমার পিরিয়ড প্রথম থেকেই রেগুলারই ছিল এজন্য মিস যাওয়ার পরেই প্রেগনেন্সি কিট দিয়ে বাসায় টেস্ট করতে শুরু করি। আলহদুলিল্লাহ এটা ছিল আমাদের জন্য খুবই সারপ্রাইজ।খুশি হয় সবাই।

আমি তখন প্রেগনেন্সি সম্পর্কে কিছুই জানতাম না কোনো ধারণাই ছিল না আমার। বোন বললো পজেটিভ আসলেই সাথে সাথে একটা আল্ট্রা করে নিতে হয়, আম্মু বলেছিল পেঁপে,গাজর এসব খাওয়া যাবে না। প্রথম আল্ট্রা রিপোর্টে (২৪নভেম্বর) ৫+- সপ্তাহ আসে। আল্লাহ আমার জন্য পুরো প্রেগনেন্সি জার্নিটা সহজ করে দিয়েছেন।এর পরে ১১ সপ্তাহের দিকে ডাক্তার দেখাই। আল্ট্রা, RBS, CBC, Hb এসব টেস্ট দেয় মোট ৬ টা। আলহামদুলিল্লাহ সব রিপোর্ট ঠিক ছিল।

তখন জানুয়ারির ৯,২০২২ তারিখ। হাসবেন্ডের বেস্টফ্রেন্ডের মাধ্যমে প্রিনেটাল কোর্সের ব্যাপারে জানলাম। আমি কোর্সের অনেক উপকারিতা শুনে আগ্রহী হই। এমনিতেও আমি শুরু থেকেই চাইতাম আমার নরমালে হোক। যাইহোক এভাবে আমি প্রিনেটাল কোর্সটাতে জয়েন করেছিলাম।

অরিয়েন্টেশনে আমি হাসবেন্ড সহ জয়েন করি।আমি পুরোটা সময় অনেক এক্সাইটেড ছিলাম।আর যখন ১০ম ক্লাস শেষ হলো প্রচুর মন খারাপ হয়ে গিয়েছিলো।

কোর্স থেকে পাওয়া জ্ঞান অনুযায়ী আমি চলতে শুরু করলাম। যখন যেটা জানতে পেরেছি,সেটা ভাল ভাবে মেনে চলার চেষ্টা করেছি। কোনটা স্বাভাবিক,কোনটা অস্বাভাবিক, কখন ডাক্তারের কাছে ছুঁটতে হবে? কখন ঘাবড়ানো বা ভয় পাওয়া যাবে না সব আমি জানতে পেরেছি।পুষ্টি মেইনটেইন করতে চেষ্টা করেছি। এক্সারসাইজ গুলো লাইভ ক্লাসে প্র্যাক্টিস করে ভালভাবে শিখে গিয়েছি, করতাম, শেষের দিকে একটু ঘন ঘন করার চেষ্টা করতাম। লেবার সম্পর্কে পুরোটা জানতে পেরে এত্ত ভাল লেগেছিল আমি বলে বুঝাতে পারব না!আসলে প্রিনেটাল কোর্সটা আমার জন্য কি ছিল সেটা বুঝানোর ভাষা-ই নেই আমার!

১৭-১৮ সপ্তাহের দিকে ৭-৮ ঘন্টা জার্নি করে আমার আম্মুর বাসায় চলে আসি।এখানে এসে আমার প্রথম চিন্তা ছিল একটা নরমাল সাপোর্টিভ ভাল ডাক্তার আর হসপিটাল খুজে বের করা।

এরপরে রমজান চলে আসে। আলহামদুলিল্লাহ আমি এবার সব কটা রোজা-ই করতে পেরেছি।হিমোগ্লোবিন একটু কম ছিল ১০.৩ ছিল। পরে খাবারের দ্বারাই সেটা কন্ট্রোলে এসেছিল।

৩২ সপ্তাহের দিকে গেলাম কুষ্টিয়া হসপিটালে ডাক্তারের কাছে। নরমাল আমি নিজেই চাই শুনে বেশ খুশি হয়েছিলেন ডাক্তার।বল্লেন রোগীর নিজেরই এমন আগ্রহ দেখে খুব ভাল লাগলো। আপু বলেছিল, ও তো অনেক পেইন নিয়ে হসপিটালে আসতে চায়, বাসায় বেশি সময় কাটিয়ে। এটা শুনে ডাক্তার আরও খুশি হয়েছে। এগুলো শুনে আমার আগের খুঁত খুঁত চলে গেল এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম ভরসা করে আমি এই ডাক্তারের কাছেই থেকে যাবো এবং চেঞ্জ করার কোন চিন্তা আর করবো না 

সারাক্ষন লেবার টাইম কেমন হবে, কি হবে তখন, আমি যদি ক্লাসের সব ভুলে যাই! কিছু যদি মনে না থাকে সে সময় কে আমাকে মনে করিয়ে দেবে? এরকম একজন সাপোর্ট পার্সনের খুব প্রয়োজন বোধ করছিলাম। মানে আমার দৌলার খুব প্রয়োজন বুঝলাম। রাবেয়া আপুকে দৌলা হিসেবে চাচ্ছিলাম খুব কিন্তু জুলাই মাসেই আপু দৌলা সার্ভিস বন্ধ রেখেছে। তারপর রাবেয়া আপু আমাকে অন্য দৌলা আপুর কথা বলেছিলেন। আমি দৌলা আপুকে নক করে রেজিস্ট্রেশন করে ফেলি। রাবেয়া আপু যেহেতু বলেছেন, আমি দৌলা আপুকে পেয়ে অনেকটা টেনশন ফ্রি হয়ে গেলাম।

তখন ৩২-৩৩ সপ্তাহ ছিল। আমার কোনো প্রশ্ন থাকলে দৌলা আপুকে নক করতাম। মাতৃত্বের ওয়েবসাইটে, মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার গ্রুপে আমি বার্থ স্টোরি পড়তে শুরু করলাম।মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার গ্রুপে লাইভে আপুদের বার্থস্টোরিও শুনেছিলাম। LMP হিসেবে আমার ইডিডি ১০ জুলাই। প্রথম আল্ট্রাতে হার্টবিট আসেনি। এনোমালি স্ক্যানে ২২ জুলাই এসেছিল আমি এটাকে ধরে সপ্তাহ হিসাব করতাম।

ডাক্তারের চেকাপে গিয়েছিলাম আবার তখন একেবারে পেইন উঠলে বা পানি ভেঙে গেলে বা মুভমেন্ট কম পেলে ( দিনে ৫-৬ বার কিক করলে পর পর ২ দিন এমন হলে যেতে বলেছিলেন।আর যদি টানা ৫-৬ ঘন্টা একবারও না নড়ে তাহলে যেতে বলেছিলেন)ইমার্জেন্সি বা কোনো প্রয়োজনে নার্সকে কল করুতে বলেছিলেন।আমি শুনে নিয়েছিলাম কোথায় ডেলিভারি হবে।

যাই হোক তেমন কোনো সমস্যা আমার হয় নাই।আমার বেবি কম নড়তো, আস্তে আস্তে নড়তো।কিন্তু অবশ্যই কাউন্ট করতে হবে সব সময় বুঝার চেষ্টা করতে হবে বেবি ঠিক আছে কিনা?

এবার চলে আসি আমি লেবারের গল্পে। কারণ পুরো প্রেগনেন্সি জার্নিটা স্মুথলি চলে আসলেও লেবারে এসে ৮ দিন মত লেগেছে। আমার অনেক ফলস পেইন হতো। আমি ব্যায়ামের মাধ্যমে বডিকে ফ্লেক্সিবল এক্টিভ রাখার চেষ্টা করতাম আগে থেকেই।

এবার ৯ জুলাই, ২০২২ তারিখে জ্বর এসেছিলো পুরো শরীর প্রচন্ড ব্যথা, আর যেহেতু প্রেগনেন্সির কারণে বডি ব্যাথা ভি এরিয়া ব্যথা আগে থেকেই ছিল জ্বর এসে সব মিলিয়ে ভয়ঙ্কর বানিয়ে দিলো। লেবারই শুরু হয় কিনা এমন ভাবতে লাগলাম। দৌলা আপুর সাথে কথা বললাম একটু পর পর আপু আপডেট নিচ্ছিলেন, আমিও টেক্স বা কলে কথা বলছিলাম।

ঈদের দিন দুপুরে দুইটাই মিউকাস প্লাগ দেখলাম। বিকালের মধ্যে ৩-৪ বারে বেশি বেশি করে মিউকাস প্লাগ বেরিয়ে গেল, সাথে কোনো ব্লাড ছিল না। আমি তো খুব এক্সাইটেড হয়ে গেলাম তাহলে আমার লেবার শুরু হবে এই ভেবে।
এবার অপেক্ষা শুরু হলো কখন পেইন উঠবে।খেয়াল করতে শুরু করলাম একটু চিন চিন করলেই বা একটু কোথাও ব্যথা হলেই ভাবতে লাগলাম আসছেতে। আর একটিভ থাকার চেষ্টা করলাম বেশি বেশি। মাঝে মাঝে ফলস কন্ট্রাকশন আসছিল apps এ কাউন্ট করছিলাম।

আমি রেডি হতে শুরু করলাম।বাবুর ব্যাগ ২ মাস আগেই পুরো গুছিয়ে রেখেছি। কনট্রাকশনের মত হচ্ছিলো তারপর রাতে ঘুমালাম, ভালো হয়ে গেলো। সকালে উঠে আবার চিন্তায় পরে গেলাম ব্যথা কই, উঠছেনা কেন। দৌলা আপুর পরামর্শে বেশি বেশি হাফ স্কোয়াট, ফুল স্কোয়াট, করছিলাম, কনট্রাকশনের সময় পেলভিক রক করছিলাম, আর বার্থ বলে হিপ রোটেট করছিলাম। এভাবে সারাদিন পার হয়ে গেল, ব্যথা আসে ঘুমালে বা গোসল করলে ব্যথা চলে যায়। দৌলা আপু বলেছিলেন যে সর্বোচ্চ ৭ দিন লাগতে মিউকাসের পরে পেইন উঠতে। পরদিন সকালে (১২ জুলাই) একটু অস্থির হয়ে যাচ্ছিলাম, আর ভাল লাগছিলা না।

আমি নার্সকে কল করে জানালাম, সে বললো ” ম্যাডাম আজ নেই ১৪ তারিখে আসবে, এর মধ্যে ইমার্জেন্সি কিছু হলে ম্যাডাম আসতে পারবে, আপনি চলে আসেন পিভি করে দেখি আমি।” আগে কোনোদিন পিভি করিনি লজ্জা,ভয়,টেনশন হচ্ছিল।নার্সকে আবার কল করে শুনলাম সে পারবে কিনা। তারপর বড় বোনের সাথে গেলাম। দৌলা আপুর থেকে শুনে নিয়েছিলাম যাব কিনা?আপুও বলেছে গিয়ে দেখে আসতে।

আমার বাসা থেকে ৫ মিনিট লাগে এজন্য হসপিটালে যাওয়া আসা নিয়ে কোনো টেনশন ছিল না। পিভি করে বললো সার্ভিক্স নরমাল ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত না।আমি ধরেই রেখেছি ২২ এ ডেট বা ২৭ এ। নার্স ডাক্তারকে কল করে বললো ডেট পার হওয়ার কথা। ১৪ তারিখের জন্য ৪০২ কেবিন বুক করে দিয়ে চলে আসলাম।তারপর সন্ধ্যায় কনট্রাকশন আসলো। রিল্যাক্স ও একটিভ থাকার ট্রাই করলাম। সকালে আবার কোনো ব্যথা নেই। দিনে এমন লম্বা লম্বা ফলস পেইন এসেছিল।

ডাক্তারের কাছে গেলাম।যেদিন কনট্রাকশন আসছিলো আমি ৪,৫ ক্লাসের নোট পুরোটা ভাল করে পরে নিয়েছি, আর কনট্রাকশন এপ্সে কাউন্ট করছি আর নোট ৫ দেখে মিলাচ্ছি। আর দৌলা আপু আপডেট শুনছে, একটিভ থাকার কথা বলছে, কখন কি করতে হবে, আমি পরামর্শ নিচ্ছিলাম, আপুর কথা মত ব্যায়াম হাঁটাহাঁটি চলছিলো। এর মাঝে একবার কখন যেন মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার গ্রুপে পোস্টও করে ছিলাম মিউকাস বের হওয়ার পর কখন পেইন উঠবে এমন। রাবেয়া আপু কমেন্ট করেছিলেন, “Few hours to weeks.”

আমি বড় বোনের সাথে হসপিটালে গেলাম। ডাক্তার বললেন, “পিভি করে একটু সুইপ করে দেব তোমার একটু আনইজি লাগতে পারে, কিন্তু এটা করবো ন্যাচারালি পেইনটা উঠানোর জন্য। তারপরে একটা আল্ট্রা করে পানির পরিমাণ কেমন আছে দেখবো৮ এ চলে আসলে এখনই ভর্তি করে স্যালাইন দেব পেইন উঠানোর জন্য। আর ৮ এর বেশি থাকলে বাসায় গিয়ে পেইনের জন্য অপেক্ষা করতে পারবা।” সুইপ করে বললেন জরায়ু মুখ সফট হয়নাই। আল্ট্রা করলেন। বাবুর ওজন ৩৫০০+, বিপিডি ৯.৬ সেমি, fluid ৯ আসলো। সব ফাইল দেখে ম্যাডাম বললেন কয়দিন পর পর fluid পরিমাণ দেখে ২৭ তারিখ পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করবো।

আবার খুব খুশি লাগলো যে ব্লাডি শো হয়েছে। বিকাল থেকে কনট্রাকশন হচ্ছিল, নির্দিষ্ট সময় পর পর। ১০ মিনিট মত পর পর এক দেড় মিনিটের। সন্ধার পরে একটু দ্রুত আসতে শুরু করলো।একটিভ আর রিল্যাক্স থাকছিলাম। রাতে খেয়ে নিলাম, ৪-৫ মিনিট পর পর দেড় দুই মিনিটের কনট্রাকশন হচ্ছিলো।আমার ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম পুরোপুরি, সব ব্যাগ রেডি। প্রচুর টায়ার্ড থাকায় ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে (১৫ তারিখ) উঠে একদম সুস্থ!কোনো ব্যথা নেই।

১৫ জুলাই, ২০২২
কন্ট্রাকশন আসে দুপুরে আবার গোসল করলে ভালো হয়ে যায়। বিকালে হাসবেন্ডের ফ্রেন্ডের ওয়াইফ আমার সব অবস্থা শুনে, উনার লেবার এর পুরো গল্পটা শোনায়, হাটাহাটি করতে বলে বাইরে গিয়ে অনেক্ষন হাটতে বলে। কিছু গল্প বলেন যা আমাকে অনেক মোটিভেটেড করে।

সন্ধ্যার পরে ছাদে আধা ঘন্টা জোরে জোরে হেটেছি। রাতে প্রিনেটালের ব্যায়াম, দৌলা আপুর বলা কিছু ব্যায়াম, ভাবি ও রাবেয়া আপু যা যা বলেছিলেন বলেছে সব গুলো করি। রাবেয়া আপুর একটা কথা আমার হতাশা অনেক ভাল করে দিয়েছিল “ফলস পেইন যখন হচ্ছে আসল পেইনও উঠবে”।আর দৌলা আপু আদা দারচিনির হালকা গরম চা খেতেও বলেছিলেন।মাঝে মাঝেই খেয়েছি।অনেক ব্যথা হচ্ছিলো।

১৬ জুলাই, ২০২২
সকালে উঠে ব্যথা নেই!হতাশ লাগছিল।হাটতে গেলাম। বাইরে ১ ঘন্টা ৫ মিনিট হেটেছি।পরে বাসায় এসে এত্ত ব্যাথা যে নড়তেও পারি না।শুয়েই থেকেছি এই দিনে। দুপুরের পর থেকে আবার একটিভ থাকার চেষ্টা করেছি বাসায় ব্যায়াম করে। কনট্রাকশনের মত হয় ব্যথা আসে যায় কাউন্ট করি।রাতে হাসবেন্ডের হেল্পে দৌলা আপু ও রাবেয়া আপুদের বলা ব্যায়াম করি।রাতে কয়েকবার ঘুম ভেঙ্গে গেলো কনট্রাকশন হচ্ছিলো। মৃদু ব্যথা কিন্তু ঘুমে ডিস্টার্ব হচ্ছিলো।

১৭ জুলাই, ২০২২
সকালে এটা দৌলা আপুকে বললাম। আপুও বললো এটা আসল পেইন হতে পারে। আমারও তাই মনে হচ্ছিলো কারণ এতদিনের পেইন ঘুমে ডিস্টার্ব করেনি একটুও আর ঘুমালে ভালো হয়ে যেত। আজকের পেইন যতবার এসেছে ততবার ঘুম ভেঙেছে আর আমি কাতরাচ্ছিলাম।

হাসবেন্ডকে নিয়ে হসপিটালে চলে গেলাম ভর্তি হতে। ডাক্তার চেম্বারে দেখলেন পিভি করতে চাইলেন।আল্ট্রা করে fluid দেখা গেল ৮ সেমি। ডাক্তার বললেন এখন বাসায় চলে যাও বিকালে এসে ভর্তি হয়ে যেও। বাসায় গিয়ে শুয়ে থাকলাম।দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে রেস্ট নিয়ে উঠে একটিভ থাকার চেষ্টা করছিলাম। পেইন আসতেছিলো।নির্দিষ্ট গ্যাপে আসতে শুরু করলো এক দেড় মিনিটের কনট্রাকশন।গ্যাপ আস্তে আস্তে কমতে থাকলো,ব্যথার তীব্রতা বাড়তে থাকলো। স্কোয়াট, হাফ স্কোয়াট, হিপ রোটেট বার্থ বলে এগুলো ঘন ঘন করছিলাম আর কনট্রাকিশনে পেলভিক রক এবং হিপ রোটেট।আর ঘন ঘন প্রস্রাব করছিলাম,৪-৫ মিনিট পর পরই।প্রতি কনট্রাকশনে অনেক কষ্ট হচ্ছিলো তবে সহ্য করার চেষ্টা করছিলাম।
৬.৩০ মিনিটে হসপিটালে চলে গেলাম।কেবিন নেওয়ার পরে কর্তব্যরত ডাক্তার আর নার্স এসে বাবুর হার্টবিট দেখলো।একটু পরে আম্মুকে আর হাসবেন্ডকে ডেকে রুমের বাইরে নিয়ে কিছু বললো।হাসবেন্ডকে জিজ্ঞাসা করলাম।বললো বাবুর হার্টবিট অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছে।এখন আমাকে অক্সিজেন দেবে এক ঘন্টা। হার্টবিট স্বাভাবিক না হলে সিজার করতে হতে পারে সিজারের প্রিপারেশন নিয়ে রাখতে বললো।দৌলা আপুকে কল দিলাম,জানালাম এখানে আসার পরে এমন এমন হয়েছে।নার্স অক্সিজেন দিয়ে গেলো, হার্টরেট ছিল বললো ১৮০-১৮২ এমন। শুয়ে ছিলাম অক্সিজেন চলছে, কনট্রাকশন আসলেই কোমর মাসাজ করে দিচ্ছিলো হাসবেন্ড, আমার হাত পা গরম হয়ে যাচ্ছিলো তাই আম্মুও গামছা ভিজিয়ে মুছে দিচ্ছিলো৷ রাত ৯ টা পার হয়ে গিয়েছে তখন, নার্স বললো আমরা চাইলে এখন একটু রিস্ক নিয়ে নরমালের জন্য ট্রাই করতে পারি,আর নাহলে সিজার করতে চাইলে জানাতে তাহলে ম্যাডাম আসবে।ব্যথা আসলেই উঠে বসার চেষ্টা করছিলাম বা বাথরুমে যেত চাচ্ছিলাম ফরওয়ার্ড লিনিং পজিশনে একটু ভালো লাগছিল এভাবে থাকছিলাম।হাতে ক্যানোলা লাগিয়ে ইঞ্জেকশন দিল,কন্ট্রাকশন হচ্ছিলো ঘন ঘন একটু পর পর রুমে ছুটাছুটি করছি,টয়লেটে যেতে চাচ্ছি। ওয়াশরুমে পানি ইউজ করলে একটু ভালো লাগছিলো ফরওয়ার্ড লিনিং পজিশনে একটু ভাল লাগছিলো।আর হাসবেন্ড কোমড় ম্যাসাজ করছিলো, কোর্স থেকে সে শিখেছে এটা৷

১৮জুলাই, ২০২২
৮ টার পর পিভি করে এক আঙুল খুলেছে বললো। এটা শুনে আমি হতাশ হয়ে গেছিলাম। হাসবেন্ড জোর করে বার্থবলে বসিয়ে রেখে আমাকে ধরে ধরে রোটেট করতেছে, আম্মু খাওয়ায়ে দিচ্ছে, তখন ডাক্তার আন্টি চেম্বারে আসছে আমাকে কেবিনে এসে দেখে গেলেন। ৯ টার দিকে বার্থ বলে বসে ছিলাম মনে হলো,আমার তলায় ঠাঁশ করে একটা বেলুন ফেটে গেল। অনেক গুলো পানি বেরিয়ে গেল। আম্মু নার্সকে কল দিলো সাথে সাথে এসে দেখে বললো সমস্যা নেই পানি একদম ক্লিয়ার।পরে প্রচুর কনট্রাকশন হয় ২-৩ মিনিটের গ্যাপে ৫-৭ মিনিটের ব্যথা হচ্ছিলো।কিছু খেতে পারছিলাম না একটু পর পর বমি হচ্ছিলো। পানি, ডাবের পানি এগুলো ঘন ঘন খাচ্ছিলাম। কিছুক্ষন পর পর বমি করছিলাম।

তারপর মনে হচ্ছিল একটা অনেক বড় পায়খানা আটকে আছে সব ছিড়ে ফেটে যাচ্ছে বের হচ্ছে না বের করার চেষ্টা করছি বেড ধরে ডীপ স্কোয়াট করে বসে থাকতেছিলাম। রক্ত পানি বের হলো একবার। পরে কনট্রাকশনে জান বেরিয়ে যাচ্ছে এমন অবস্থা ফ্লোরে গড়াগড়ি টাইপ করছিলাম ফরওয়ার্ড লিনিং থাকছিলাম আম্মুকে ধরে থাকছিলাম। হাসবেন্ড সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সুরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করছে জোরে জোরে, আর সেই গতরাত থেকেই কোমর ম্যাসাজ করছে।অনেকক্ষন পরে আবার খুব কষ্ট হচ্ছিলো। নার্স আসলো পিভি করে বললো চার আঙুলই খুলে গেছে বাবুর মাথা দেখা যাচ্ছে।

তারপর বেডে শুয়ে গেলাম, স্যালাইন দিলো শুয়ে থাকলাম।পৌঁনে দুইটায় মনে হয় ডাক্তার আসলো।বাবুর মাথা দেখা যাচ্ছে এজন্য ডাক্তার আন্টি চেম্বার থেকে চলে এসেছে।একটু পর পর ডপলার দিয়ে হার্টবিট দেখতেছিলো।সবাই মাথা দেখতেছিলো বাবুর।

আমাকে একটু পর পর পানি খাওয়াচ্ছিলো। ডাক্তার glucose খেতে বললো।আমাকে ডাক্তার আন্টি নার্স বার বার বলছিলেন যখন কনট্রাকশন আসবে শুধু তখন পুশ করতে। বেশি তারাহুরা না করতে। আর একটু পর পর ডাক্তার নারিকেল তেল দিয়ে ভ্যাজানার চামড়া টেনে টেনে কিভাবে যেন ম্যাসাজ করে দিচ্ছিলো।শেষের দিকে বাবুর হার্টবিট কমে যাচ্ছিলো।আমার অনেক টায়ার্ড লাগছিল। চুপচাপ চোখ বন্ধ করে একটু পর পর পুশ করতেছিলাম। দুই হাত দিয়ে দুই পায়ের গোড়ালির উপরে চেপে ধরে পুশ করতে বলেছিল তাহলে শক্তি পাওয়া যাবে। আমি সেভাবেই করছিলাম। লাস্টে চোখ মুখ অফ করে জোরে অনেক লম্বা একটা পুশ করলাম। ভকাত করে অনেক বড় কিছু পানি টানি সহ বেড়িয়ে গেলো।আল্লাহু আকবার! সমস্ত ব্যথা হঠাৎ গায়েব আমার কাছে তখন স্বপ্নের মত লাগছিল। এটাই প্রথমে মাথায় আসলো যে “অবশেষে আমারও নরমাল ডেলিভারি হলো? আমিও পারি?

ডাক্তার বাবুকে ধরে নিলো কোলে করে আমার পেটের উপর রাখলো আমি তাকিয়ে দেখতেছিলাম।পুরো শরীর একদম নীল, মাথাটা অনেক লম্বা পিছনের দিকে।বুঝলাম মোল্ডিং হয়ে এই অবস্থা হয়েছে। বাবুর নাক মুখ থেকে fluid বের করা হলো কান্না করে না। ডাক্তার নার্সকে কর্ড কাটতে বলে বাবুকে কোলে করে পাশের রুমে নিয়ে চলে গেলো।আমাকে বাবু হওয়ার সাথে সাথে দুই পায়ের থাই-এ দুইটা ইঞ্জেকশন দিয়েছে। নার্স প্লাসেন্টা আস্তে আস্তে টেনে ডেলিভারি করিয়ে দিল।বাবু পুরো ৫ মিনিট পরে কান্না করেছে আলহামদুলিল্লাহ।

বাবুকে শিশু ডাক্তার দেখে বলে NICU তে নিয়ে যেতে সদর হসপিটালে। অক্সিজেন দেওয়া হয়েছিল বাবুকে সাথে সাথেই।ডাক্তার আন্টি এসে সেলাই করতে চায়, আমি ভাবছিলাম এত খেয়াল রাখলাম এপিসিওটমি দেয় কিনা দেয়নি তাও সেলাই কেন? দিয়ে দিয়েছে আমি টের পাইনি নাকি?আন্টি বললো সামান্য ছিড়ে গেছে, আস্তে করে সেলাই করে দিবো কিছু হবে না।

আলহামদুলিল্লাহ বাবুর ওজন হয়েছিল ৩২০০ গ্রাম।
বাবুকে ৪ টার দিকে NICU তে নিয়ে যায় হসপিটালে।শিশু ডাক্তার বাবুর রিলিজের ব্যবস্থা করে ৯ টায় আমার কাছে পাঠিয়ে দেয় বাবুকে।বলেন যে বাবু যদি সাক করে খেতে পারে তাহলে কোনো সমস্যা নেই।কিছু ইনজেকশন দেয় বাবুকে।আমি বিকাল ৪ টায় দৌলা আপুকে কল দিয়ে আমার বাবু হওয়ার খবর জানাই।

আলহামদুলিল্লাহ আমি এবং বাবু দুজনেই ভালো ছিলাম।বাবুর আর কোনো সমস্যা হয় নাই।৭ দিন পরে আবার ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম চেকাপের জন্য।

ডাক্তার নার্স সবাই খুবই সাপোর্টিভ ছিলেন। আল্লাহ আমার জন্য সব কিছু এত্ত সহজ করে দিয়েছেন।
আলহামদুলিল্লাহ!
 
উম্ম উরওয়াহ
প্রিনাটাল কোর্স, ব্যাচ ৭