Back

পেইন ম্যানেজমেন্ট টেকনিকগুলো দারুন কার্যকর

management technicque
আলহামদুলিল্লাহ, আজ আমি সত্যি বার্থ স্টোরি লিখতে পারছি। আমার পাশে আমার নিজের মেয়ে আল্লাহ পাঠিয়ে দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ।

প্রেগন্যান্সির প্রথম তিনমাস সবকিছু উল্টাপাল্টা লাগত। ভাত, মাছ, গোশত কিছু খেতে পারতাম না। ঠান্ডা ভাত আর ঠান্ডা ডিম ভাজি খেতাম। পাউরুটি, কলা আর ফলমূল এই ছিলো প্রথম তিনমাসের অবস্থা। এদিকে কোন জ্ঞান নাই প্রেগন্যান্সি সম্পর্কে। ওমুক তমুকে, গুগল, ইউটিউব এটা ওটা বলে। শুনে আরো পাজলড লাগত। তিনমাস পার হলে বগুড়া গেলাম মায়ের কাছে থাকব চিন্তা করে। কিন্তু সেখানে নরমাল ডেলিভারি সাপোর্টিভ ডাক্তার পেলাম না মন মত। আম্মুর অনেক রিকুয়েষ্ট সত্ত্বেও তাই আট মাসের শুরুতে চলে আসি ঢাকায়।

এর মধ্যে রৌদ্রময়ী প্রিন্যাটাল কোর্সে এনরোল করি যা ছিল আমার সবচেয়ে ভালো ডিসিশন। একা একা সব ম্যানেজ করার কনফিডেন্স আসলে এখান থেকেই পেয়েছি আমি। আর আল্লাহ আমাকে পুরো প্রেগন্যান্সিতে সম্পূর্ণ সুস্থ রেখেছিলেন। কোন কম্প্লিকেশন আমার হয়নি আলহামদুলিল্লাহ। কোর্সের জ্ঞান থেকে ৭ম মাস থেকে সব অনুসরণ করেছি কারণ এর আগে এসব এত ক্লিয়ারলি জানতাম না। নিজেই নিজের যত্ন নেয়া, নিউট্রিশন মেইনটেইন, সাধ্যমত ব্যায়াম, হাঁটাচলা, যতটুকু সম্ভব হয়েছে করেছি। আর যতটুকু পারতাম দুআ করতাম আল্লাহর কাছে।

ঢাকায় যে ম্যামকে দেখাতাম, উনি পুরো সময়টা আমাকে নরমালে হওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন এবং বেশ ভালো বিহেভও ওনার আলহামদুলিল্লাহ। আমি উনার আশায়ই ঢাকায় এসেছিলাম। কিন্তু ৩৯ সপ্তাহের শুরুতে উনি আমার পিভি করেন এবং বলেন আমার এখনো কোন প্রসেস শুরুই হয়নি। আমার নরমালে না হওয়ার সম্ভাবনা ৯০%। ম্যাডামের এই কথা শুনে সেদিন আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি টেনশনে। মনে হচ্ছিল সব ওলটপালট হয়ে গেল। তখনই ডিসিশন নিই ডাক্তার চেন্জ করব। পরদিন আরেকজন ম্যামকে দেখাই। আল্লাহর রহমতে এমন একজন ম্যাম পেলাম যে, তার কথায় শান্তি ফিরে পেলাম আলহামদুলিল্লাহ। ম্যাম আশ্বাস দিলেন এখনো অনেক টাইম আছে। আমরা ৪১ সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করব, তোমার কাজ শুধু বাচ্চার মুভমেন্ট চেক করা। তারপর থেকে রেগুলার মুভমেন্ট গুণতাম। ১০ বার হলে আর গুণতাম না। বাবু আমার বেশ ভালোই মুভ করত আলহামদুলিল্লাহ। ৩৯ সপ্তাহ টা যে কি লম্বা কেটেছে বোঝাতে পারব না। পেইন ওঠে না কেন এটা ভেবে খুব অস্থির লাগত। আর ডেট পার হয়ে গেলে সবাই সিজারের জন্য বলবে এজন্য খুব চাচ্ছিলাম যেন আগেই পেইন ওঠে। দ্রুত পেইন ওঠার জন্য রেগুলার আনারস, খেজুর খেয়েছি, সাধ্যমত ব্যায়াম,হাঁটাহাটি করেছি, আর দুআ করেছি। এর আগে ৩৮ সপ্তাহে একদিন ফলস পেইন ছিল ৪-৫ ঘন্টা। সেদিন ভয় পেয়ে ইমার্জেন্সিতে গেলাম। সবাই কল দিতে লাগল, আম্মু টেনশনে অস্থির। কিন্তু তারপর আবার দুই সপ্তাহ কোন খবর নাই। তাই যেদিন আসল লেবার পেইন শুরু হলো, সেদিন কাউকেই বলিনি শুরুতে। আম্মুকেও বলেছি ৭-৮ ঘন্টা পর। শুনে আম্মু আমাকে একগাদা বকা দিয়ে দিশেহারা হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বগুড়া থেকে রওনা হল।

ডিউ ডেটের ৫ দিন আগে আমার পেইন শুরু হয়েছিলো। সকাল আটটায় হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল পিরিয়ডের মত চিনচিনে ব্যথায়। ৩০ সেকেন্ড পর ব্যথাটা চলে গেল। আবার ঘুমালাম। কিন্তু নাহ, এই ব্যথাটা ঘুমাতে দেয়না। হালকা ব্যথা কিন্তু তবুও জাগিয়ে দেয়। নয়টায় উঠে পরলাম কারণ ১০-১৫ মিনিট পরপরই ব্যথা হচ্ছিল। ১০-১০.৩০ টার দিকে হাজবেন্ডকে বললাম ব্যথার কথা। ও তো খুশি হয়ে গেল, তাহলে আজকে আমরা বাবু নিয়ে আসব! আমারও খুশি লাগছিলো এই আশায় যে, সত্যি হয়তো বাবু হবে আজই। কিন্তু ব্যথাটা সারাদিন ই হালকা হালকাই থাকলো। সহ্য করার মত আরকি। আর আমার আগে থেকেই পিরিয়ডের ব্যথা হত, তাই লেবারের প্রথম দিকের এই ব্যথাটা সহ্য করতে তেমন কষ্ট হয়নি। দুপুরের পর থেকে ব্যথার ডিউরেশন আরো কমে গেলো। প্রায় ৬-৭ মিনিট পর পর আসছে এখন পেইন। সন্ধ্যা ৭ টায় হসপিটাল যাই। ডিউটি ডাক্তার পিভি করে বলে জরায়ুমুখ মাত্র ১.৫ সে.মি ওপেন হয়েছে। আমি যে ম্যাডামের আন্ডারে ছিলাম ডিউটি ডাক্তার তাকে কল দিলেন এবং উনার নির্দেশ মত আমাকে ২ টা এলজিন ইনজেকশন দিয়ে ২ ঘন্টা অবজারভেশনে রাখা হলো ফলস পেইন এক্সক্লুড করার জন্য। ইনজেকশনের পরও পেইনের কোন হেরফের হলোনা। তেমনি ৬-৭ মিনিট পর পর পেইন আসছে। অর্থাৎ এটাই লেবার পেইন। তবে প্রথম প্রেগন্যান্সির লেবার টাইম অনেক দীর্ঘ হয় এবং সাধারণত ঘন্টায় ১ সেমি করে জরায়ুমুখ ওপেন হয় এটা আমি জানতাম। আর ম্যাডামও বললেন তোমার আগামীকাল সকালের আগে ডেলিভারি হওয়ার সম্ভাবনা কম, তুমি চাইলে বাসায় গিয়ে রেস্ট নিয়ে আসতে পারো যেহেতু বাসা খুব বেশি দূরে না। পানি ভাংলে/ ব্লাড আসলে/ ২-৩ মিনিট পরপর পেইন হলে হসপিটালে চলে আসতে বললেন ম্যাডাম। আমারও খুব স্ট্রেসড লাগছিলো। তাই ওই অবস্থায় পেইন নিয়েই বাসায় চলে আসি রাত দশটায়। বাসায় এসে নামাজ পড়ে ভাত খাচ্ছিলাম। এদিকে পেইন বাড়ছে ধীরে ধীরে আর আমি সহ্য করেই যাচ্ছি। তখনও আমি খুব সুন্দর করে পেইন ম্যানেজ করতে পারছিলাম আলহামদুলিল্লাহ। বুঝতেই পারিনি আমার তখন ২-৩মিনিট পরপর পেইন হচ্ছিল। খেতে বসে হাজবেন্ড বলল তোমার তো ২-৩মিনিট পরপরই ব্যথা হচ্ছে। ও ঘড়ি ধরে কাউন্ট করল, আসলেই তাই। তাহলে তো হাসপাতালে যাওয়া লাগবে মনে হয়। ভাবতে ভাবতে খাওয়া শেষে উঠলাম। তারপর নেক্সট যখনই পেইন আসলো সাথে ঝমঝম করে লিটারখানেক পানি ভেঙে গেলো। আমার সারাদিনের সব কষ্ট, নরমাল ডেলিভারির আশা সবই শেষ হয়ে গেলো এরকম মনে হচ্ছিল আমার। পুরোপুরি মাথা খারাপ হয়ে গেলো। পানি ভেঙে গেলে বেবি কি অবস্থায় আছে এই চিন্তায়। সাথে সাথে গাড়ি ডেকে চলে গেলাম হসপিটালে। আর এক মুহূর্ত দেরী করার ফুসরত ছিলো না তখন। আমি তখন মোটামুটি ধরে নিছি, বেবির সবকিছু ঠিক না থাকলে তখনই সি সেকশনে চলে যাব। নরমাল ডেলিভারির জন্য খুব ইচ্ছা ছিলো আমার কিন্তু শেষ মুহুর্তে ও কিছু সমস্যা হলে সি সেকশনে যাওয়ার প্রিপ্রারেশন ও ছিল।

হসপিটালে গিয়ে দেখি বাবুর হার্টবিট ঠিক আছে আর fluid এখনো এনাফ আছে বেবি সার্ভাইভালের জন্য। এদিকে তখন মাত্র ৩ সেমি ওপেন হয়েছে জরায়ুমুখ। রাত ১১.৩০ টায় ৩ সে.মি তাহলে তো ফুল ডায়ালেট হতে আরো ৭-৮ ঘন্টা লাগবে। উফ্, এদিকে পেইন বাড়ছে তো বাড়ছেই। ১২টার পর মনে হয় মিনিটে মিনিটে পেইন আসছে। আর কি তার তীব্রতা! আহ্!! মাতৃত্বের কি স্বাদ!! ব্যথায় আমি ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছিলাম। ডিপ ব্রিদিং করে করে পেইন ম্যানেজের চেষ্টা করছি। হাজবেন্ডকে পাশে পাচ্ছি না সবসময়। কারণ এলাউড না। তবে খুব রিকুয়েষ্ট করে মাঝেমাঝে ও একটু আসছে। হাতটা একটু ধরে, মাথায় হাত দেয়। মনে হয় আমি ওর মুখটাও দেখতে পাচ্ছি না। আম্মু বগুড়া থেকে বাসে করে রওনা দিয়েছে সন্ধ্যা ৭ টায়। রাত ২ টায় আম্মু আসলো আমার পাশে। তখন আমি একদম ঘোরের মধ্যে। দেখি আম্মু কান্না করতেছে। আম্মুর কন্ঠ শুনছিলাম আর ভাবছিলাম, এই একই পেইন কি আম্মুও পেয়েছিল? আল্লাহ পৃথিবীর সব মেয়েদের জন্য এই পেইনটাই নির্ধারণ করেছেন? মনে হচ্ছিল নাহ কোথাও ভুল হচ্ছে। এত পেইন আল্লাহ নরমালি নির্ধারণ করলেন সবার জন্য? আমরা মেয়েরা কি আসলেই এতটাই শক্তিশালী???

সৃষ্টিকর্তা তিনিই জানেন, তিনি কি সৃষ্টি করেছেন আমাদের। যতটা সহ্য শক্তি তিনি দিয়েছেন, তার বেশি ব্যথা কাউকে তো দেননা তিনি।
আমার ঘোরময় ব্যথার আর মাত্র কয়েক ঘন্টা বাকি। রাত ২টায় ৫ সে.মি। রাত সাড়ে ৪টায় ফুল ডায়ালেটেড আলহামদুলিল্লাহ। সেসময় ডিউটি ডাক্তার ৬-৭ সে.মি হবে আশা করে চেক করে ফুল ডায়ালেট পেল আলহামদুলিল্লাহ। দ্রুত ম্যামকে আনতে এম্বুলেন্স পাঠায় হাসপাতাল থেকে। এবং একটু পরেই ম্যাম এসে খুব সুন্দরভাবে আমার মারইয়ামকে পৃথিবীতে নিয়ে আসেন। আমার পুশিং স্টেজ খুব দ্রুত কেটে গেছে। ৫-৭ বার পুশ করার পরই বাবু চলে এসেছে আলহামদুলিল্লাহ। বাবু হওয়ার পর ওরা বেবিকে ক্লিন করছে আর ও কান্না করছে। আমি খুব দেখতে চাচ্ছিলাম আমার মেয়েটাকে।

আমি তো তার আগে কোনদিন ওকে দেখিনি। আলহামদুলিল্লাহ আমাকে চোখ জুড়ানো একটা কন্যা দিয়েছেন আল্লাহ।
আমার এপিশিওটমি দিতে হয়েছিলো। এবং ম্যাম খুব সুন্দর ভাবে লোকাল এনেস্থিসিয়া দিয়ে সেলাই দিয়েছিলেন। এসময় আমি কোন ব্যথাও পাইনি এবং ১২-১৫ দিনে আমার সেলাই মোটামুটি ভালো হয়ে গিয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।

লেবারের পুরো ব্যথাটা আমি ডিপ ব্রিদিং করে করে ম্যানেজ করেছি। আর স্কোয়াট, হাঁটাহাটি করা, দেয়ালে ধাক্কা দেয়া, পানি ও খেজুর খাওয়ার চেষ্টা করেছি সারাদিনই। শেষে এসে আর কিছু খেতে পারছিলাম না। আর পানি ভাঙার কারণে হাঁটতেও ভয় হচ্ছিল যে আরো পানি পরে যাবে কিনা। তবে দেয়ালে ধাক্কা দিলে পেইন কমে, আর ডিপ ব্রিদিং এর কোন তুলনা নাই। আমি খুব আবেগপ্রবণ মানুষ হওয়ার সত্ত্বেও একবারও কান্না করিনি বা জোরে চিৎকারও দেইনি আমার এই ২১ ঘন্টা লেবার টাইমে। আলহামদুলিল্লাহ এটা শুধু সম্ভব হয়েছে পেইন ম্যানেজ করার টেকনিকগুলো জানার কারণে।

আমার এই জার্নিতে প্রিন্যাটাল কোর্সের জ্ঞান এবং টিমের আপুরা আমাকে যেভাবে সাহায্য করেছে, তা অতুলনীয়।
আল্লাহ তাদের উত্তম প্রতিদান দিবেন ইনশাআল্লাহ। আমার ছোট্ট মেয়েটা এবং আমার জন্য দুআ করবেন আপুরা।
 
ডা: উম্ম মারইয়াম
প্রিন্যাটাল কোর্স, ৮ম ব্যাচ