আমার বিয়ে হয় ২০২২ এর আগস্টে। বিয়ের পর থেকেই আমরা প্রেগনেন্সির জন্য আগ্রহী ছিলাম, কিন্তু অজানা কারনে কনসিভ হচ্ছিলো না। এক বছর পর একজন ইনফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট দেখাই এবং তার দেয়া কিছু টেস্ট করাই, টেস্টে সব কিছু ঠিকঠাকই আসে। তিনি কিছু ঔষধ দিয়েছিলেন সেগুলোও খাই। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছিলো না দেখে হাজবেন্ড এর সাথে পরামর্শ করি। দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিই যে ইন শা আল্লাহ যতদিন কন্সিভ না করবো ততদিন পর্যন্ত মাসে কিছু টাকা এই নিয়তে সাদাকাহ করতে থাকবো। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ তায়ালা আমাদের আর্জি শুনেছেন, ২০২৪ এর মে মাসে আমি নিশ্চিত হই যে আমি কন্সিভ করেছি।
এরপর পুরো প্রেগনেন্সি বড় কোনো জটিলতা ছাড়াই অতিক্রম হয়। প্রথম এবং শেষের দিকে স্বাভাবিক শারিরিক দুর্বলতা গুলো ছিল। নিউট্রিশন এর জন্য প্রতিদিন স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি এক টা ডিম, একগ্লাস দুধ, যেকোন একটি ফল, ৪/৫ পিস খেজুর খাই। পাশাপাশি ডাক্তারের পরামর্শে কিছু ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট নিই (ক্যালশিয়াম, ফলিক এসিড, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি)। শারিরিক ভাবে এক্টিভ থাকার জন্য ঘরের কাজকর্ম এবং বিকালে ছাদে হাটতে যেতাম।
আমার শুরু থেকেই নরমাল ডেলিভারির ব্যাপারে আগ্রহ ছিল। পরিচিত অনেকের কাছে রৌদ্রময়ী স্কুল প্রিনাটাল কোর্সের ব্যাপারে জানতে পেরে ১৮তম ব্যাচে রেজিট্রেশন করে ফেলি। আগস্টে ক্লাস শুরু করার পর বুঝতে পারি যে এটা গতানুগতিক কোনো কোর্স নয়। ব্যাপক আগ্রহের সাথে আমানি বার্থ বই কিনি এবং দৌলা সার্ভিসের জন্য বুকিং দিয়ে দিই। পাশাপাশি ক্লাসগুলো করতে থাকি। ২২তম সপ্তাহে এনোমালি স্ক্যান করি এবং রিপোর্টে সবকিছু ঠিকঠাক আসে আলহামদুলিল্লাহ।
আমানি বার্থ বই পরে সিদ্ধান্ত নেই যে ইন শা আল্লাহ বাড়িতেই ডেলিভারি করাবো। এলাকায় খোঁজ নিয়ে দুজন নার্সের ব্যাপারে জানতে পারি যারা বাড়িতে নরমাল ডেলিভারির কাজ করেন। হাজবেন্ডকে সাথে নিয়ে তাদের সাথে দেখা করতে যাই। ইতিমধ্যে তাদের সাথে কী কী বিষয়ে আলোচনা করা যায় এ ব্যাপারে দৌলা আপুর সাথে কথা বলে নিয়েছিলাম। তাদের সাথে কথা বলে মুটামুটি কনভিন্সড হই এবং কনফার্ম করি।
এরপর শুরু হয় প্রস্তুতির পালা। দৌলা আপুর সাথে কথা বলে ঘরে ডেলিভারির জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু সংগ্রহ করে ফেলি। আমরা একটি ফেটাল ডপলার মেশিনও কিনি যাতে লেবারের সময় মিডওয়াইফ আসার আগে ঘরেই বাচ্চার হার্ট রেট চেক করতে পারি। দৌলা আপু যেভাবে পরামর্শ দিয়েছিলেন সেভাবে বিভিন্ন শারীরিক ব্যায়াম চালিয়ে যাই। ৩২ সপ্তাহের পর একদিন দীর্ঘক্ষন রান্নার জন্য দাঁড়িয়ে থাকার কারনে প্রচুর সিয়াটিকা পেইনের শিকার হই। নানা ভাবে ব্যাথা কমানোর জন্য চেষ্টা করি, অতঃপর খেয়াল করলাম বার্থ বলে হিপ রোটেশন ব্যায়াম করলে ব্যাথা কমে যায়।
৩৬ সপ্তাহের পর সবকিছু গুছিয়ে বাবার বাড়ি চলে আসি। বাড়িতে এসে মা এবং বড় বোনকে আমার পরিকল্পনার কথা খুলে বলি এবং আলহামদুলিল্লাহ তারা আমার প্ল্যানে কনভিন্সড হয়। এখানে আমি একটা ভুল করেছিলাম আমার বাবা এবং বড় ভাইকে এ বিষয়ে তেমন কিছু না জানিয়ে। এব্যাপারে বিস্তারিত সামনে জানাচ্ছি।
১৬ জানুয়ারী ২০২৫ আমার ৩৮ সপ্তাহ ৪ দিনের সময় সন্ধ্যা বেলা থেকে হালকা হালকা ব্যাথা হতে থাকে। ব্যাক্সটন হিক্স কি না বোঝার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। রাত ৪ টার দিকে বুঝতে পারি যে ব্যাথা ক্রমশ রেগুলার হচ্ছে। বুঝতে পারি যে এটা ডেলিভারি পেইন। গোসল করে কিছু খাওয়াদাওয়া করে বিশ্রাম + ব্যায়াম চালিয়ে যাই। কন্ট্রাকশন কাউন্টার এপে হিসাব রাখতে থাকি ব্যাথার ধরন। এবং দৌলা আপুকে মেসেজ দিই। তিনি পেইন ম্যানেজমেন্ট এর পদ্ধতি গুলো মনে করিয়ে দিতে থাকেন। পেইন ম্যানেজমেন্ট এর জন্য ডিপ ব্রিদিং, হাটাচলা করা এগুলো করেছি পুরোটা সময়। সকাল ৯টার দিকে নার্সদের কল দিই। ১০ টার দিকে তারা এসে একবার দেখে যায় এবং ক্যানোলা লাগিয়ে দিয়ে যায় এবং জানায় যে সময় লাগবে। তখন জড়ায়ুর মুখ ৩ সেমি খুলেছিল। ক্যানোলা দেয়ার সময় কিছুটা বাধা দেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু তাদের উপর সামনে যেহেতু আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে ডিপেন্ড করতে হবে, তাই অত জোড়ালো ভাবে বলতে পারি নাই। একটা ব্যাথা নাশক দিতে চেয়েছিল, দৌলা আপুকে জিজ্ঞেস করে জেনে কোনোভাবে তাদেরকে এটা না দিতে কনভিন্সড করি। এরমধ্যে আমার বড় ভাই এবং বাবা টের পায় যে আমার পেইন উঠেছে। হাসপাতালে যাচ্ছি না দেখে বড় ভাই প্রচুর রাগ করতে থাকে। তাকে আগে থেকে বুঝিয়ে ম্যানেজ করলে হয়তো এমনটা হতো না। যাই হোক এটা নিয়ে আমার মামা বাবা দুলাভাই আর আমার হাজবেন্ড পরামর্শ করতে বসে যে কি করা যায়।
হাজবেন্ড তাদেরকে আমার প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনার ব্যাপারে জানানোর পর বড় ভাই কিছুটা শান্ত হয়। দুপুর ১ টার দিকে নার্স রা আবার আসেন। আমি পর্যায়ক্রমে বিশ্রাম এবং ব্যায়াম চালিয়ে যেতে থাকি। একটা জিনিস খেয়াল করলাম, যখনই আমি খেজুর খেয়েছি ব্যাথা অনেক দ্রুত রেগুলারের দিকে এগিয়েছে। দুপুর ২/৩ টার দিকে আমার ব্যাথা খুব ঘন ঘন হতে থাকে বুঝতে পারলাম যে এক্টিভ ফেজে আছি। নার্সরা ব্যাথা নাশক দিয়েই দেয়। পরে স্যালাইনের মাধ্যমে পিটোসিন দেয়ার প্রিপারেশন নেয়। শারিরিক মানসিক অবস্থার কারনে এসবের দিকে কোনো খেয়াল ছিলো না। আসরের পর ব্যাথা প্রচুর তীব্র হয়, মনে হচ্ছিল বোধ শক্তি লোপ পাচ্ছে। নিজে থেকেই নার্সদের দ্রুত কিছু একটা করার জন্য কান্না কাটি শুরু করে দেই। তারা স্যালাইনের মাধ্যমে পিটোসিন দেয়া শুরু করে এবং আমাকে সান্তনা দিতে থাকে। হাজবেন্ডকে চলে যেতে বলে। বাবু নিচের দিকে চলে আসলে তারা নিজে থেকেই পানি ভেংগে দেয়। পরে বের হতে কষ্ট হওয়ায় এপিসিওটমি করে। তারা আগে থেকেই এগুলোর প্রিপারেশন নিয়ে এসেছিল। আমি কিছু বলার মত পরিস্থিতিতে ছিলাম না। যাইহোক মাগরিবের কিছুক্ষন আগে আমার কন্যা সন্তান জন্ম নেয় আলহামদুলিল্লাহ।
বাবু জন্মের পর কান্না করছিলো না। নার্সরা নাক পরিষ্কার করে মুখে ফু দিতে থাকে আর কাপড় গরম করে তাপ দিতে থাকে এবং পিঠ চাপড়াতে থাকে। ৭/৮ মিনিট পর আলহামদুলিল্লাহ বাবু কান্না শুরু করে। এরপর কর্ড কাটে। রাতে বাবুকে স্কিন টাচ করাই। এর আগে সুযোগ পাই নাই। প্রথম দিন বাবু দুধ পাচ্ছিলো না দেখে আমার বড় বোনের দুধ খাওয়াই। পরদিন থেকে আলহামদুলিল্লাহ পর্যাপ্ত পরিমান দুধ আসা শুরু করে।
পরদিন বিকালে বিকালে বাবুকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাই। ডাক্তার নার্সদের আমাকে দেয়া এপিসিওটমি জন্য এন্টিবায়োটিক গুলোর ডোজ কারেক্ট করে দেন, আর বাবুকে দেখে সবকিছু ঠিকঠাক আছে জানান। এপিসিওটমির ক্ষতের কারনে প্রথম ২ সপ্তাহ বাবুর দেখভাল, নিজের কাজকর্ম ভালো ভাবে করতে পারছিলাম না বিধায় কিছুটা মানষিক পিড়ায় ছিলাম। এরমধ্যে ৪র্থ দিন নার্স এসে ড্রেসিং করে দেয়। প্রতিদিন ২ বার সিটয বাথ দিয়েছি। এখন আলহামদুলিল্লাহ সব গুছিয়ে এসেছে, ক্ষতও প্রায় ভালো হয়ে এসেছে।
আমি বিশ্বাস করতাম, যে জানে এবং যে জানে না, দুইজন কখনো সমান হতে পারে না। আমার পুরো জার্নিতে রৌদ্রময়ী স্কুলের কোর্স, দৌলা রাবেয়া রওশীন আপুর পরামর্শ আমকে এই বিষয়ে পুরোটা সাপোর্ট দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তাদের কাজে বারাকাহ দান করুন। আমার মা বোন হাজবেন্ড এবং পরিবাবের অন্যান্য বেশিরভাগ আত্মীয় আমাকে প্রচুর সাপোর্ট দিয়েছেন। উপরে বলা কিছু বিষয় বাদে নার্স আপুরাও অনেক ভালোভাবে সবকিছু হ্যান্ডেল করেছেন। সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
সর্বপরি মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে তিনি এতবড় নিয়ামত আমাকে দান করেছেন। সবার কাছে আমার অনুরোধ থাকবে আপনার সমস্যাগুলো আল্লাহ তায়ালা সমাধান করবেন, এই বিশ্বাস রেখে আল্লাহর কাছে চাইবেন এবং অবশ্যই সাধ্যমত দান সদকা করবেন। আপনি প্রত্যেক পদে পদে অনুভব করবেন যে আল্লাহ তায়ালা আপনার সমস্যাগুলো সমাধান করছেন ইন শা আল্লাহ।
উম্মু যাহরা
রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স পার্টিসিপ্যান্ট, ব্যাচ ১৮
ক্লায়েন্ট, রৌদ্রময়ী দৌলা সার্ভিস