Back

শিশুর অসুখ পরবর্তী যত্ন

ছেলেটার জ্বর ছিল টানা তিন দিন। ভেতরে ঠান্ডা না থাকায় ডাক্তার কোনো ওষুধ ছাড়াই বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। শুধু বলেছে জ্বর উঠলে নাপা খাইয়ে দিতে।
দু’দিন হলো জ্বর ছেড়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কিচ্ছু খাচ্ছে না। খালি কান্না করছে। আমার ছেলেটা মাশাআল্লাহ খুবই শান্ত। কখনো কোনোকিছু নিয়ে কষ্ট দেয়নি আমাকে। খাওয়া ঘুম সব নিয়মিত ছিল।
 
জ্বরের সময় থেকেই খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়েছে বললেই চলে। এত্তো দূর্বল হয়ে গিয়েছিল যে হাঁটতে গেলেও পড়ে যেতো। তারওপর অল্পতেই রাগ দেখানো, কান্নাকাটি করা এসব তো আছেই। একজন তো বলেই ফেললো “বদমেজাজি হয়ে গেছে”। আমিও সাথে সাথে তার মুখের কথা কেঁড়ে নিয়ে বললাম “ জ্বর ছিল তো, একটু ইমোশনাল হয়ে গেছে। কয়েকদিন হয়তো এমন থাকবে, তারপর ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।”
 
পোস্টটা দেয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে এখন আমি কিভাবে এই ইস্যুটা হ্যান্ডেল করবো সেটা আপনাদের সাথে শেয়ার করা।
ঋতু পরিবর্তনের কারণে এখন অনেক বাচ্চাই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মায়েদের আসল যুদ্ধ শুরু হচ্ছে অসুখ সেরে ওঠার পর থেকে। বাচ্চা আর আগের মতো খায় না, বিরক্ত করে, দূর্বল হয়ে গেছে, শুকিয়ে গেছে – হাজারটা কারণ হয়ে উঠে মায়েদের মানসিক চাপের।
ও খাচ্ছে না, আমিও ওকে খাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছি না। খেয়াল করে দেখলাম যেকোনো খাবার ও একবার করেই মুখে নিচ্ছে। দ্বিতীয় বার অফার করলে আর নিচ্ছে না। তাই আমি ওকে কিছুক্ষণ পরপর একটা খাবার একবারই অফার করছি।
 
আজকে সারা দিনে কি খেয়েছে বলি, কয়েক চিমটি খেজুর, দুয়েকটা ছোলা, হাপ লোকমা ভাত, ১০-১২ টা মুড়ি, দু কোয়া কমলা, হাফ কলা, হাফ বরই, একটা আখরোট, দু টেবিল চামচ বেলের জুস। ব্রেস্টফিডিং এর বাইরে এই ছিল তার খাবারের তালিকা।
 
আমি একটু পর পর ওকে নতুন নতুন খাবার একবার করে অফার করছিলাম, যা মুখে নিচ্ছিল তাতেই আলহামদুলিল্লাহ। আমার কথা হচ্ছে ও এখন জাস্ট সার্ভাইব করুক। মুখে রুচি ইনশাল্লাহ কয়েক দিনের মধ্যে ফেরত আসবে, কিন্তু খাবার নিয়ে একবার নেগেটিভ ইম্প্রেশন তৈরি হলে সেটা পরিবর্তন করতে আমাকে আরো বেশি কষ্ট করতে হবে। সলিড শুরুর প্রথম থেকেই আমি খাবারের পরিমাণের থেকে খাবারের প্রতি ওর পজিটিভ ইমপ্রেশন তৈরির উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছি।
এছাড়াও ওকে কালকে শিমের বীজ, মটরশুঁটি, বেদানা, ভাতের মাড়, জাও ভাত দিয়েছিলাম। যে পরিমাণে খেয়েছে সেটা খুবই নগণ্য। সাথে ঘন ঘন পানিও দিয়েছি। সবসময় খায় নি, যা খেয়েছে তাতেই আলহামদুলিল্লাহ।
 
অন্যদিকে, যখনই কান্নাকাটি করছে আমার ফুল এটেনশন দিচ্ছি ওর দিকে। কোলে নিচ্ছি, জড়িয়ে ধরছি, চুমো খাচ্ছি, ওর ছোট ছোট এক্টিভিটিতে পাহাড় সমান উৎসাহ দেখাচ্ছি। খুশি হচ্ছে ছেলেটা আমার। কিন্তু আবার টেম্পার লুজ হয়ে যাচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যেই। তখন আমিও ওকে আবার ভালোবাসা দেখাচ্ছি। এ
ভাবেই চলছে।
 
বাচ্চারা অনেক সময় ইনসিকিউরিটি থেকেও অনেক জ্বালাতন করে। আম্মা ওকে ভালোবাসে না বা খেয়াল করে না এমনটা যেন কখনো ওর মনে না হয়।
আরেকটা কথা, বাচ্চাদের সামনে কখনো নেগেটিভ কথা বলতে হয় না। বিশেষ করে মায়েদের এ বিষয়ে আলাদা করে সতর্ক থাকতে হয়। বাচ্চাদের জন্য মায়েদের মুখের কথা অনেকটা কনস্টিটিউশন এর মত।
আপনার বাচ্চা যদি সত্যিও রাগী, জেদি, বদমেজাজি, অলস বা বোকা হয় তারপরও কখনো তাদেরকে এই শব্দ দ্বারা সম্বোধন করবেন না। এতে ও সত্যি সত্যিই নিজেকে ওমন ভাবতে থাকবে এবং ওর পরিবর্তন হওয়ার স্পৃহাটাই চলে যাবে।
 
একই নিয়ম খাবারের ক্ষেত্রেও। বাচ্চা কোনো খাবার না খেলে ওর সামনে কখনোই বলবেন না আমার বাচ্চা ওই খাবারটা খায় না। এতে পরবর্তীতে ওই খাবার খাওয়ার আগ্রহটা ওর হয়তো একেবারেই চলে যাবে।
আপনি নিজে তো এসব করবেনই না বরং অন্য কেউ করলে সাথে সাথে তাকে শুধরে দেবেন। ধৈর্যের উপর আসলে কোনে কৌশল নেই।
সবশেষে, আপনাদের কাছে দোয়া চাই বোনেরা।
আপনাদের জন্যও দোয়া থাকবে। আল্লাহ যেন আমার প্রতিটা বোন আর তাদের সন্তানদের সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করেন। মাতৃত্বের জার্নি সহজ করেন। দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দান করেন। আমিন।
 
রেজওয়ানা রাজ্জাক
দৌলা ইন্টার্ন, রৌদ্রময়ী স্কুল
চাইল্ডবার্থ এডুকেটর ও দৌলা ট্রেইনী, আমানি বার্থ