Back

আমার মাতৃত্বের গল্প: ক্লান্তির মাঝে সোনালি দিন

আমার প্রথম সন্তান, আমার মেয়ে, যখন ঠিক দুই বছরের, তখন আমি দ্বিতীয়বার কনসিভ করি। একজন টডলারের দায়িত্ব আর নিজের গর্ভকালীন দিনগুলো একসাথে পার করেছি। বাবু হওয়ার আগে পরে সব মিলিয়ে মাত্র তিন মাসের মত সহায়তা পেয়েছিলাম, এরপর থেকেই আমি একা একাই সব সামলাচ্ছি—আলহামদুলিল্লাহ।
এখন প্রায় এক বছর হতে চলল, সপ্তাহের বেশিরভাগ সময় আমি দুই সন্তানকে নিয়ে একাই থাকি। সকালে একজন ছুটা খাদিমা আসে কাজের হেল্প করতে, কিন্তু বাকি সময়—দিন-রাত, ঘুম থেকে খাওয়া, খুনসুটি থেকে কান্না—সব আমার কাঁধেই।
আমার বড় সন্তান, মেয়ে, আমিনা এখন চার বছরের। ছোট ছেলে ফাতিহ দেড় বছরের। ওদের খুনসুটি, হাসি-কান্না, ছোট ছোট দ্বন্দ্ব দিয়ে দিন কেটে যায়। বড় বোনের একটা আফসোস ছিল—আল্লাহ ভাই দিলেন কেন? ভাইটা তার একেবারেই পছন্দ হচ্ছিল না। তার দরকার ছোট্ট বোন। সেই ভাইটি এখন দিনে রাতে বড় বোনের পক্ষ থেকে অবিচারের শিকার, যদিও সে বোনকে নিঃশর্ত ভালোবাসে।
শুরুর দিনগুলো খুবই কঠিন ছিল। রাতে যখন আমি ছোটটিকে ব্রেস্টফিড করতাম, তখন দুজনেই জেগে যেত। একজন খাওয়ার জন্য কাঁদলে, আরেকজন কাঁদত—“কেন ভাইকে খাওয়ানো হচ্ছে?” অনেক ধৈর্য, সাহস আর ভালোবাসা দিয়ে সে সময়টা পার করেছি। বড়টিকে সময় দিতাম, খেলতাম, বই পড়ে শোনাতাম, কোলে নিয়ে আদর করতাম।
তারপর শুরু হল—ফাতিহকে যা করবো, আমিনাকেও তাই করাতে হবে। একসাথে বসিয়ে গোসল, দুইজনকে দুই স্ট্রলারে নিয়ে সারা ঘরে ঘুরানো—এসব চলতে লাগল। একসময় দেখা গেল, ছোট বাবু হামা দেয় আর বড়বোনও হামা দিতে শুরু করল। বাবুর আধো আধো শব্দ শোনার পাশাপাশি, বড়বোনও কথা বলতে গিয়ে অদ্ভুত উচ্চারণে সাড়া দিচ্ছে।
আমিনার দেখাদেখি ফাতিহও উল্টোপাল্টা খাবারের স্বাদ পেতে লাগল—বিস্কুট, চকলেট, এসব যা সে বয়সে আমিনা চিনতও না। যদিও বাসায় খুব একটা আনা হয় না, তবুও বড়বোনের অনুসরণে ছোট ভাইও তা শিখে ফেলল।
স্ক্রিনটাইম নেই বললেই চলে। ভাই-বোন সারাদিন খেলাধুলা, বই পড়া, খুনসুটিতে দিন কাটায়। সব খেলনা, বই সারা ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে, ফ্লোরে পানি ঢেলে ফেলে, এখানে ওখানে পরে ব্যাথা পেয়ে যায়, দুজনের মারামারিও হয়।
আর আমি? আমি কখনো রান্নাঘরে, কখনো ঘুম পাড়াতে, কখনো কাওকে খাওয়াতে দৌড়াচ্ছি। ওয়াশরুমে ঢুকলে দরজায় ঠকঠক ধাক্কা, খাবার খেতে বসলে হঠাৎ হাগুর তাড়া—এসব যেন প্রতি দিনকার ছন্দ।
অনেক সময় মনে হয় আমি আর পারছি না। নিজের চাওয়া গুলো গুমরে যায়, নিজের যত্ন, নিজের জন্য একটু সময় যেন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাগ হয়, চিৎকার করি, তারপর নিজেরই কষ্ট হয়। মা হয়ে ছোট বাচ্চাদের বকা দিতে মন চায় না। তবু মানুষ তো—ভুল হয়, ক্লান্তি জমে। মন খারাপ হয়।
দিন শেষে মনে হয়, কেউ একদম কানের কাছে ফিসফিস করে বলে—”তুমি তোমার জীবনের সোনালি সময় পার করছো।”
এই নিষ্পাপ, হাসিখুশি, মমতায় ভরা শিশুদের মাঝে কাটানো দিনগুলো পৃথিবীর যেকোনো ধন-সম্পদের চেয়ে দামী। এই বাচ্চারা এখনও দুনিয়ার পাপ-কলুষতা থেকে মুক্ত। ওদের চোখে আমি “মা” পৃথিবীর সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মানুষ—ওদের একমাত্র ভরসা, ভালোবাসা, আশ্রয়স্থল।
এই ভালোবাসার গুরুত্ব আমি জীবনে আর কোথাও পাইনি।
দুনিয়ার কত মা যে নিঃসন্তান যন্ত্রণায় কাঁদে, হাহাকার করে! আর আমি আল্লাহর রহমতে সেই নিয়ামত পেয়েছি। একদিন এই বাচ্চারা বড় হবে, তাদের নিজস্ব জগত হবে। আমি নিশ্চিন্তে গোসল করতে পারব, সময়মতো ঘুমোতে পারব। আমার বাসা হয়ত সাজানো গোছানো থাকবে। হয়তো তখন এই ঝকঝকে কষ্টের দিনগুলোকে আমি ভীষণ মিস করবো।
ডিপ্রেশন কাছে আসতে চাইলেও আমার দুয়ারে দাঁড়াতে পারে না।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’তে পড়েছিলাম—”শিশুরা ভিখারীর মত মাতৃস্নেহ নেয় না, তারা উপযুক্ত মূল্য দিয়েই নেয়।”
এই মূল্য দেয় তারা তাদের হাসি, আদর, ছোট ছোট বোল দিয়ে। মায়ের মন খুশিতে ভরিয়ে দেয়।
একটা ছোট্ট আশরাফুল মাখলুকাতকে বড় করে তোলা যেমন বিরাট দায়িত্ব, তেমনি তাদের বড় হতে দেখাও আনন্দদায়ক।
মাতৃত্ব নিজেই এক অসাধারন পুরস্কার! বারাকাল্লাহু ফিক
 
ফারইয়াব হাসান
দৌলা, রৌদ্রময়ী স্কুল