উচ্চ ডায়বেটিস নিয়ে আমার নরমাল ডেলিভারির গল্প
- Posted by MNCC Moderator
- Date February 4, 2026
- Categories Birth Story, Others

১২.০১.২৫
তৃতীয় বারের মতো কন্সিভ করি আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু সন্তান কোলে নেওয়ার সেই তৌফিক আমার হয়নি। পর পর দুই বার মিস্কারেজ হয়। কিন্তু হতাশ হয়নি রবের প্রতি তাওয়াক্কুল করেছি। রব আমাকে দিবেনই ইনশাআল্লাহ।
সেদিনই ডাক্তারের কাছে যাই। ডাক্তার বেশ কিছু টেস্ট দিলেন। সব রিপোর্ট নরমাল ছিল। প্রেশার বেশি থাকায় প্রেশারের মেডিসিন, ইঞ্জেকশনসহ আরও কিছু মেডিসিন দিলেন। সাথে সম্পূর্ণ বেড রেস্ট।
প্রথম তিন মাস যে আমার কতটা কষ্টে কেটেছিল, সেটা শুধু আমার রবই জানেন। খুব ভয়, দুশ্চিন্তা হতো বেবির হার্টবিট আসবে কিনা (২য় বার হার্টবিট মিসিং ছিলো)।
একেকটা দিন একেকটা বছরের মতো লাগতো। দুরুদ, ইস্তেগফার, নফল সালাতের সাথে লেগে থাকতাম। প্রচুর দুয়া করতাম। অবশেষে এসেছে আমার সেই কাঙ্ক্ষিত দিন।
সনোলজিস্ট যখন বললেন বাবুর হার্টবিট এসেছে। আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে আর রবের শুকরিয়া আদায় করছি। ইচ্ছে করেছিলো তখনই সিজদায় লুটিয়ে পড়ি। সেদিনও ডাক্তার বেশ কিছু টেস্ট দিলেন সব রিপোর্ট নরমাল।
২ টা রিপোর্ট ২ দিন পর দিবে। পরবর্তী রিপোর্টে এইচবিএ১সি (hbA1C) ( টেস্ট এর নাম) ৬.৪ আসে, প্রি ডায়াবেটিক। এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট দেখালে উনি ওজিটিটি করতে বললেন। ওজিটিটি ১১.৭৬ হাই লেভেলের ব্লাড সুগার।
তখন আমার ১২ সপ্তাহ মাত্র। ডাক্তার ইনসুলিন দিলেন বেলা। ডায়াবেটিসই ছিলো আমার মিস্কারেজ এর কারন। অথচ আমি ২ জন ডাক্তার দেখিয়েছিলাম একবারও ব্লাড সুগার চেক করা হয়নি। এভাবেই তিনমাস পার হলো।
১৪ সপ্তাহ পর্যন্ত এইচসিজি। ২৪ সপ্তাহ পর্যন্ত এইচপিসি ইঞ্জেকশন চলে। প্রতি মাসেই চেকআপ করেছি। বেড রেস্ট থাকায় কোনো একটিভিটি ছিলনা। শুধু প্রতিদিন ৩০মিনিট এর বেশি হাঁটাতাম।
সুগার কন্ট্রোলের জন্য কার্ব কম, প্রোটিন, ক্যলসিয়াম, পর্যাপ্ত নিউট্রিশান নিয়েছি। শেষ দিকে বেবি গ্রোথ ২ সপ্তাহ পিছিয়ে যায়, ওজন ও কম। ৩৬ সপ্তাহ পর কিছু এক্টিভিটি শুরু করি স্কোয়াট, ডাক ওয়াক, হিপ রোটেশন, প্রতিদিন ১ঘন্টা+ হাঁটা।
প্রেশার, ডায়াবেটিস থাকায় ডাক্তার ৩৮সপ্তাহ ৩ দিনে ভর্তি হতে বলেন। ইন্ডিউজ করবেন, নয়তো শেষদিকে বেবির জন্য রিস্ক হতে পারে। বেবি মুভমেন্ট ভালো থাকায় সেদিন আর ভর্তি হইনি।
বেবি যেহেতু আন্ডার ওয়েট তাই চাচ্ছিলাম ওয়েট আরেকটু বাড়াতে। হাসবেন্ড সব রিপোর্ট নিয়ে অন্য একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেয়। (আগের গাইনোকলজিস্ট পুরুষ ছিলেন) উনি ডেট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন।
আমার ডেট ছিল ১৬ সেপ্টেম্বর। আগের ডাক্তার আমাকে ৫ তারিখ ভর্তি হতে বলেছিলেন। ডাক্তার পরদিন আমাকে নিয়ে যেতে বলেন। আরেকটা আল্ট্রা করে দেখবেন সব ঠিক থাকলে অপেক্ষা করবেন।
পরদিন আমি গিয়ে আল্ট্রা করি। আল্ট্রার রিপোর্ট ভালো থাকায় বাসায় চলে আসি। সেদিন রাতেই সাড়ে তিনটায় আমার কন্ট্রাকশান আসে। আগেরদিন ফলস পেইন আসায় আর গুরুত্ব দেইনি।
হাঁটাহাঁটি, রেস্ট নিলেও ব্যথা কমেনি। ২০/৩০ মিনিট পর পর ব্যথা আসছে। স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যাই। কাউকে কিছু বলিনি। বললে সবাই অস্থির হয়ে যাবে। দুপুর পর্যন্ত স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যাই।
গোসলের পর কন্ট্রাকশান তীব্র হয়। কাউন্ট করে দেখি ৫ মিনিট পর পর আসছে। তখন শ্বাশুড়ি আর হাসবেন্ডকে জানাই। হাসবেন্ড অফিস থেকে আসলে আসরের সালাত আদায় করে হাসপাতাল এর জন্য রওনা হই।
ডাক্তার পিভি চেক করে বলেন, ২ সে.মি. ডায়ালেট হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাই। রাত সাড়ে ১০টায় ডাক্তার পিভি চেক করে, পিটোসিন দেয়। এর কিছুক্ষণ পরই কন্ট্রাকশন তীব্র হয়।
একেকটা কন্ট্রাকশন আসে আর মনে হয় আমি কতটা দুর্বল, কতটা শক্তিহীন, আর আমার রব কতটা দয়া, মায়া করে আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন আলহামদুলিল্লাহ। স্যলাইন + অক্সিজেন দেওয়াতে আর হাঁটাহাঁটি এর সুযোগ হয়নি।
তবে আমার মনে হচ্ছিলো শুয়ে না থেকে যদি হাঁটাহাঁটি করতাম পেইন কিছুটা কম অনুভব হতো। আরও দ্রুত প্রোগ্রেস করত। ব্যথা আরও তীব্র হতে থাকে। পুশিং আর্জ আসে। টয়লেটের চাপ ও আসে অনেক বেশি।
পিভি চেক করে বলে এখনো অনেক সময় লাগবে। আমি একটু বেশিই করছি এমনই বললেন। আমার ছটপট দেখে আবার পিভি চেক করে বলে ভালোই আছে। বাবুর হার্টবিট মনিটর করা হচ্ছে নিয়মিত।
আমিও বাবুর মুভমেন্ট কাউন্ট করছিলাম। ব্যথা আরও তীব্র হতে থাকায় বেবি মুভমেন্ট ও কম পাচ্ছিলাম। এদিকে বেবি হার্টবিট ও কমে যাচ্ছে। তখন মাত্র ৭ সে.মি. ডায়ালেট হয়েছে।
তীব্র ব্যথায় মনে হচ্ছিল আমার নিচের অংশ নেই। বার বার চিৎকার দিয়ে বলেছি আমার কোমরটা নেই ,,, ৭ সে.মি .এর পর বেশ কিছু সময় গেলেও আর ডায়ালেট হচ্ছিলো না। তীব্র ব্যথায় বেবির মুভমেন্ট ও কম পাচ্ছিলাম।
ডপলারে বেবি হার্টবিট ও কমে যাচ্ছে। তখন শুধু আল্লাহকে বলেছি, ইয়া আল্লাহ আমার ও আমার সন্তানের জন্য যা কল্যানকর সেটাই আপনি সহজ করে দিন। আমি আর পারছিনা। আমার যে আর সহ্য করার ক্ষমতা নেই।
সুবহানআল্লাহ এর একটু পরই ফুল ডায়ালেট হয়। ওটিতে নিয়ে যায়। ওটিতে যাওয়ার পর আমার ব্যথা একদম নাই হয়ে যায়। অথচ এর কিছুক্ষণ আগেও তীব্র ব্যথায় ছটপট করছিলাম। ব্যথা না থাকায় পুশ করতে পারছিনা।
গ্যপ দিয়ে একটু একটু ব্যথা আসে। তখন পুশ করি। বাবুর মাথা আসে। কিন্তু এরপর আর পুশ করতে পারছিলামনা। তখনই নার্স দ্রুত পেটে অনেক জোরে জোরে চাপ দেয়।
এর একটু পরই, ৮ ই সেপ্টেম্বর রাত ৩.৪৫ মিনিটে ২৪ ঘন্টা লেবার পেইনের পর আমার পূর্নতা, আমার মায়া, আমার ভালোবাসা, আমার সন্তান, আমার ফারিস দুনিয়ার আলো দেখে আলহামদুলিল্লাহ।
ওঁর কান্নার আওয়াজ কানে আসতেই মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত সুখ আমার। ২৬০০ গ্রাম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহন করে আলহামদুলিল্লাহ। ২ দিন হাস্পাতালে অবজারভেশনে ছিলাম বাবু নিয়ে।
যেহেতু আমার ডায়াবেটিস ছিল। আমার এপিসিওটমি লেগেছে ৪টা সেলাই। ব্লাড সুগারের জন্য রিকভারি হতে অনেক সময় লেগেছে। নরমাল না হয়ে যদি সিজার লাগতো এ কষ্ট আরও বহুগুনে বেড়ে যেতো।
আল্লাহ তার বান্দাকে সাধ্যের বাইরে কিছুই দেন না। আল্লাহর কাছে সব সময় কল্যাণের সহিত দোয়া করতাম। সিজার অথবা নরমাল যেভাবেই হোক, শুধু আমার বাচ্চা সুস্থভাবে আমার কোলে আসুক।
দোয়া অনেক বড় হাতিয়ার। আল্লাহ আমার জন্য সব কিছু আমার ধারনার বাইরে সুন্দর ও সহজ করে দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ।
শারিন আপুর প্রেগন্যান্সি রিলেটেড একটা সেশান থেকে রৌদ্রময়ী সম্পর্কে জেনেছিলাম। ফেসবুক পেজ ফলো করি তখন থেকেই। ২য় মিস্কারেজের লেবার রুমের সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা।
নিজের অজ্ঞতা,ভয় সেদিন এতো বেশি ছিল যে, আমার মনে হয়েছিলো আমি আর বেঁচে ফিরতে পারবনা কোনোদিন। সন্তান নিবোনা, পাশে যারাই ছিল তাদের বলেছিলাম আমি মনে হয় বাঁচবোনা আমাকে মাফ করে দাও।
বার বার তাওবা আর কালিমা পাঠ করছিলাম।রৌদ্রময়ী সম্পর্কে জানার পর আফসোস হয়েছিল। কেন আরও আগে খোঁজ পাইনি? আরও আগে খোঁজ পেলে হয়তো এতো ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা হতোনা।
নিয়ত করি আল্লাহ যদি আমাকে আবার মা হওয়ার সুখবর দেন। আমিও কোর্স করবো ইনশাআল্লাহ। জানতে হবে। ২৫ সপ্তাহে রৌদ্রময়ী প্রিনাটাল কোর্সের ২১ তম ব্যচে যুক্ত হই।
লাইভ ক্লাসের পাশাপাশি, জেনারেল গ্রুপে ইন্সট্রাকটর আপুদের পরামর্শ। যেকোনো প্রশ্নের সুন্দর ও সাবলীল ভাষায় উত্তর দেওয়া যা ছিলো আমার জন্য একটা ব্লেসিং।
কৃতজ্ঞতা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার প্রতি। তিনি আমার জন্য সব কিছু সহজ ও সুন্দর করে দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ। আমার স্বামীর প্রতি উনি আমাকে সাপোর্ট ও সাহস দিয়েছেন বলেই আমি এই জার্নি শেষ করতে পেরেছি।
কৃতজ্ঞতা রৌদ্রময়ী টিমের প্রতি, তারা এতো সুন্দর একটা কোর্স নিয়ে এসেছেন, বলেই আমাদের মতো অজ্ঞ মায়েরা কিছু জানতে পারে। লেবারের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে। এর বাইরেও অনেকে আমাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছেন।
হবু মায়েদের জন্য পরামর্শ নিজে জানবেন সাথে আপনার সাপোর্টিভ পার্সনকেও জানাবেন তাহলেই আপনার প্রেগন্যান্সি, লেবার সহজ হবে ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা। অনেক বেশি কল্যাণের সহিত দুয়া করা। সম্ভব হলে প্রিনাটাল কোর্স করবেন।
সবাই আমার সন্তানের জন্য দুয়া করবেন।
উম্মে ফারিস
রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স পার্টিসিপ্যান্ট, ব্যাচ ২১
Other post
You may also like
লেবারের লক্ষণ নেই ভাবছিলেন যে মা, তার ন্যাচারাল ভিব্যাক হয়েছে — দৌলা ডায়েরী সিরিজ (পর্ব ৪১)
September 3, 2026
ভিব্যাক তা-ও ন্যাচারাল! আলহামদুলিল্লাহ!! অথচ এই মা ৩৮ সপ্তাহেও ভাবছিলেন, উনার লেবারের কোন লক্ষ্মণ নেই কেন! আসলে, নরমাল ডেলিভারি এমনই। সবাই পূর্ব লক্ষ্মণ দেখে না। তবে বডি রেডি থাকলে ফুল টার্মের কাছাকাছি গিয়ে হঠাৎই পেইন শুরু হয়ে যেতে পারে। এই …
আমি পেরেছি আপু! — মারুফা আপুর বার্থ স্টোরি (দৌলা ডায়েরী সিরিজ: পর্ব ৪০)
September 3, 2026
মারুফা আপু ৩৭ সপ্তাহ থেকে আমার দৌলা সার্ভিস নিচ্ছিলেন। প্রেগন্যান্সিতে আপু খাবার ও এক্সারসাইজ মোটামুটি মেইনটেইন করেছেন। শেষের দিকে হাঁটতে গেলে পায়ে কোথাও যেন কিছু একটা বাধে, এমন অনুভূতির কথা বলেছিলেন। বাবুর পজিশন নিয়ে আমার একটু সন্দেহ হয়। কিছু প্রশ্ন …
ইডিডি পার হয়ে নরমাল ডেলিভারি — দৌলা ডায়েরী সিরিজ (পর্ব ৪২)
September 3, 2026
আপু খুবই শান্ত মানুষ। এতই শান্ত যে হ্যালো হ্যালো বলে বুঝতে হতো লাইনে আছেন কিনা। এই শান্ত সভাবই হয়তো আপুর স্টোরির স্পটলাইট। ৩৬ সপ্তাহ থেকে দৌলা সার্ভিস নেন। আলহামদুলিল্লাহ উনার পুরো প্রেগন্যান্সি একদম স্মুথ ছিল। নিউট্রিশন ও এক্সারসাইজও ভালোভাবে মেইনটেইন …
