Back

গর্ভকালীন পড়াশোনা, মধুর প্রেগন্যান্সি জার্নি

আমার অনেক আগে থেকেই ইচ্ছা ছিল নরমাল ডেলিভারি করার। এইজন্য যখন বুঝতে পারলাম আমি কন্সিভ করেছি। তখন থেকেই এই বিষয়ে জানা শুরু করি। একটি প্রেগন্যান্সি এপের সাবস্ক্রিপশন কিনে ফেলি। সংগ্রহে থাকা “আমানি বার্থ” বইটাও পড়া শুরু করি।

কিন্তু এতো কিছুর পরেও আমার কিছু কনফিউশান থেকে যায়। কিছু প্রশ্ন মাথার মাঝে ঘুরপাক খেতে থাকে। গুগল করেও মন মতো উত্তর পাই না। মনে মনে খুব করে খুঁজেছি একটা কোর্স যেখান থেকে এ বিষয়ে খুব ভালো ভাবে জানতে পারবো।

ঠিক তখনি আমার বাসায় আমার কাজিন আসে। তাঁর থেকেই জানতে পারি রৌদ্রময়ী টিমের প্রিনেটাল কোর্সের বিষয়ে। রৌদ্রময়ী টিম সম্পর্কে অনেক আগে থেকেই আমার জানা ছিল তাদের কিছু বইও আমার পড়া। তাই আপুর কথা শুনে দেরি না করে তাদের প্রিনেটাল কোর্সে ভর্তি হয়ে যাই।

আমি জানি না প্রিনেটাল কোর্সটা না করলে আমার প্রেগন্যান্সি জার্নি এতটা মধুর হতো কি না! গ্রুপে ইন্সট্রাক্টর আপুদের পরামর্শ, পাশাপাশি ডাঃ ফাতেমা ইয়াসমিন ম্যামের চিকিৎসা সব মিলিয়ে দারুন এক অভিজ্ঞতা। যদিও শেষ পর্যন্ত আমার ঢাকায় না থাকার কারণে ডাঃ ফাতেমা ম্যামের কাছে ডেলিভারি করাতে পারিনি। কিন্তু যে জ্ঞানটা পেয়েছিলাম তাই বা কম কিসের?

আমার প্রেগ্ন্যান্সি জার্নিটা আল্লাহর রহমতে অনেক ভালো ছিল। তেমন কোনো শারীরিক সমস্যা ছিলনা। শুধু একটা সমস্যাই ছিল, যে নিজের রান্না নিজে খেতে পারতামনা। যার কারনে আমি পুরোপুরি নিউট্রিশন পাচ্ছিলাম না। তাই ৩২ সপ্তাহে আমি ঢাকা থেকে রাজশাহী চলে আসি।

রাজশাহী এসে এখানে নরমাল সাপোর্টিভ ডাক্তার এর খোঁজ শুরু করি। রাজশাহীতে নরমাল ডেলিভারির জন্য মিশন হাসপাতালের অনেক নাম। এই জন্য সেখানেই ডেলিভারি করাবো বলে সিদ্ধান্ত নেই আর ৩৮ সপ্তাহ পর্যন্ত সেখানেই ডাক্তার দেখাই৷

কিন্তু লাস্ট মুহুর্তে এসে মিশন হাসপাতালের ব্যাপারে কিছু কথা শুনে ও সাপোর্টিভ পার্সোন এলাও না করার কারনে আমি আবার ডাক্তার খোঁজা শুরু করি। আল্লাহ’র অশেষ দয়ায় আমার সেই কাজিনের মাধ্যমে একজন ডাক্তার পেয়েও গেলাম।

আর দেরি না করে তার একটা এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে চলে গেলাম দেখা করতে ডাক্তারের সাথে। কথা বলে অনেক ভালো লাগলো। আর সিদ্ধান্ত নিলাম এই ডাক্তারের কাছেই ডেলিভারি করাবো। ডাক্তার কিছু টেস্ট দিলেন। করালাম, সব কিছুই নরমাল ছিলো আলহামদুলিল্লাহ। উনি বললেন ব্যথা উঠলে, পানি ভাংলে, বাচ্চার মুভমেন্ট কম বুঝা গেলে, উনার সাথে যোগাযোগ করতে।

ডাক্তারের কাছ থেকে আসার ৩ দিন পর রবিবারে হটাৎ করে দুপুরে আমার বমি হয়। আর পেটে ব্যথা করে। ব্যথার পেটার্ন অনেকটা লেবারের মত। সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করি ব্যথা বাড়েনি তবে কমেওনি।

ডাক্তারকে জানালাম ব্যথার কথা। উনি বলেন লেবার হতে পারে। ব্যথা বাড়লে উনাকে কল দিতে। রাত ১১ টায় হাসবেন্ড এর সাথে কথা বলি সে শুনা মাত্র রওনা দিয়ে দেয়। রাতে অনেক কষ্ট করে ঘুমাই। ঘুম ভাঙলে দেখি হাসবেন্ড চলে আসছে। ওকে দেখে আমার পেইন নাই হয়ে যায়।

আর কোনো পেইনই থাকে না। হাসবেন্ডও দোটানায় পরে যায় কী করবে এই ভেবে, থাকবে না চলে যাবে, চলে গেলে যদি পেইন উঠে আবার থেকে গেলেও যদি পেইন না উঠে অনেক চিন্তা ভাবনার পর হাসবেন্ড ঠিক করে ও থেকেই যাবে।

এইদিকে বৃহস্পতিবার রাত থেকে দেখি বেবির মুভমেন্ট কমে গেছে। সকালে অনেকক্ষন দেখলাম তাও মুভমেন্ট বুঝলামনা। ডাক্তার এর সাথে কথা বলে বিকালে গেলাম চেকআপে। ডাক্তার সাথে সাথেই আল্ট্রাসাউন্ড করতে দিলেন, রিপোর্ট আলহামদুলিল্লাহ ভালো ছিল।

ডাক্তার পিভি চেক করে দেখলেন। জরায়ু খোলা শুরু করেছে। আর বললেন পানি ভাংতে পারে। পিভি করার পর শরীরের মধ্যে একটা কাঁপুনি অনুভব করলাম। হাসবেন্ডকে নিয়ে দ্রুত বাসায় চলে আসলাম। রাস্তায়ও আমার কাঁপুনি ছিল।

তারপরও আমি আর হাসবেন্ড খুব এক্সাইটেড ছিলাম এই ভেবে যে, বেবি আসতে আর দেরি নেই। বাসায় এসে হাঁটতে পারছিলাম না ঠিকমত ব্যথা করছিল। তাই একটু খেয়ে ঘুমিয়ে গেলাম। রাতে ব্যথায় ঘুম ভেঙে গেলে ওয়াসরুমে গেলাম দেখি ব্লাড যাচ্ছে।

শুক্রবার সকালে ব্যথা হচ্ছিল হালকা হালকা। আসল পেইন কিনা বুঝার জন্য হালকা উষ্ণ পানি দিয়ে গোসল করলাম। গোসল করে ছাদে গিয়ে বসে বসে কন্ট্রাকশন মাপছিলাম। মৃদু পেইন আসছিল ১০ মিনিট ৫ মিনিট পরপর ৩০ সেকেন্ড এর মত করে। সারাদিন এমন মৃদু পেইনই ছিল।

আর সাথে ব্লাডি শো আসাও বন্ধ হয়ে গেল। রাত ১০ টার দিকে ব্যথা একটু বাড়লো। কিছু ব্যায়াম করে ঘুমিয়ে গেলাম। আবারও সেদিনের মত রাতে ব্যথা গায়েব, রাত ৩ টায় ঘুম ভেঙে ওয়াসরুমে গেলাম হাসবেন্ড তখনও কাজ করছিলো ওকে নিয়ে আবার ঘুমাতে গেলাম। ৬ টায় ঘুম ভাংলো ওয়াসরুমে গিয়ে দেখি ব্লাডি শো ভালোই যাচ্ছে।

খুব খুদা লেগেছিল তাই কিছু খেজুর, আর কেক খেলাম। তারপর আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। শুয়ে থেকে দেখি আমার গায়েব ব্যথা হঠাৎই মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। আর একটু তীব্র হচ্ছে। আমার আর বুঝতে বাকি রইলনা আমার আসল লেবার শুরু হয়ে গেছে। লেবার পেইন উঠায় ভেতরে অনেক খুশি লাগছিলো। চুপচাপ শুয়ে আছি আর ঘুমানোর চেষ্টা করছি। যখনি পেইন আসছে এপাশ ওপাশ করছি।

সাড়ে ৮ টা পর্যন্ত শুয়ে থেকে উঠে পরলাম। তখনও আমি কাউকে কিছু বলিনি ব্যথার বিষয়ে। এর মধ্যে আমার এক ফ্রেন্ড আমার সাথে দেখা করতে আসে। ওর সাথে কথা বলছিলাম আর যখন পেইন আসছিল তখন কাচুমাচু করছিলাম বসে থেকে।

আম্মু ভাপা পিঠাসহ অনেক নাস্তা দেয় আমি ব্যথায় কিছুই খেতে পারছিলাম না। সাড়ে ১০টার দিকে ও চলে যায়। অন্যদিন হলে ওকে আরো কিছুক্ষণ আটকে রাখতাম। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে যত তাড়াতাড়ি যায় তত ভালো।

আমার রুমে এসে দেখি হাসবেন্ড উঠে গেছে। নাস্তা করে কাজ করছে ওকে লেবার শুরু হয়ে গেছে জানাই। সাথে ডাক্তারকেও রিপোর্ট করি আমার অবস্থা সম্পর্কে। হাসবেন্ড তো অনেক এক্সসাইটেড হয়ে যায় আমি তাকে শান্ত হয়ে কাজ করতে বলি। আর হাসপাতালে যাওয়ার টাইম হলে জানাবো বলি।

এদিকে শনিবার হওয়ায় বাসায় আব্বুও ছিলো, সাথে আমার মেজোখালাও ছিলো। তিনি একজন দাঈ। অনেকেরই ডেলিভারি করিয়েছেন। আমার পেইন আর ব্লাড গেসে শুনে আম্মু আসতে বলছে। এদিকে আমার পেইন আমার ম্যানেজের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে আম্মুকে বললাম, আম্মু খালামনিকে বললে উনি আমার পিভি করেন সাড়ে ১১টার দিকে দেখেন বাবুর মাথা নিচে নেমে গেসে।

তখনি ডাক্তারকে কল দেন, আমার অবস্থা সম্পর্কে শুনেন। শুনে হাসপাতালে চলে আসতে বলেন।

দেরি না করে রেডি হয়ে হাসপাতালে চলে যায় ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে। ভর্তি হয়ে একটা কেবিন নেই। এইসময় ব্যথা ভালোই তীব্র ছিলো।

পেইন আসলে বার্থ বলে বসে থাকছিলাম, আয়াতুল কুরসী পড়ছিলাম ভালো লাগছিলো। কিছুক্ষণ পর একজন নার্স আসলো বাবুর হার্ট বিট মাপার জন্য। হার্টবিট আলহামদুলিল্লাহ ভালোই ছিল। হার্টবিট মাপার জন্য আমাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিলো।

বিছানায় শুয়ে পড়ার পর আমার আর উঠতে ইচ্ছা করছিল না। পেইন আসলে ওখানেই ছটফট করছিলাম আর দোয়া করছিলাম আল্লাহ আমাকে সহজ করে দিন। ১০ মিনিটের মধ্যে আমার পানি ভেঙে গেলো। নার্স এসে বললেন ডাক্তার ২ টার দিকে এসে পিভি করবেন।

আমাকে শুয়ে থাকতে দেখে বললেন উঠে হাঁটতে। খুব কষ্ট করে উঠে হাঁটছিলাম, আর যখনি পেইন আসছিল স্কোয়াট হয়ে বসে পরছিলাম আম্মু অথবা খালামনির গলা ধরে।

এ সময় আমার পাশে হাজব্যান্ড ছিল না। ও মেডিসিন কিনতে বাহিরে গেছিল। মেডিসিন নিয়ে আসলে নার্স আমাকে ক্যানুলা করে দেয়। ক্যানুলা করার ১০ মিনিটের মধ্যে আমার ব্লাড দেখা দেয় আর ভেতর থেকে খুব রিল্যাক্স লাগতে শুরু করে। আমি বুঝতে পারলাম আমার পুশিং স্টেজ চলে আসছে। এরপর দ্রুত আমাকে ওটি রুমে নিয়ে যাওয়া হয়।

ওটি রুমে আমাকে রেডি করে শুইয়ে দেয়। শুয়ে থেকে রিল্যাক্স ফিল করছিলাম। এক দুই মিনিট পর পর ব্যথা আসছিল। ব্যথা আসলে পুশ করছিলাম আলহামদুলিল্লাহ দুই তিনটা পুশেই আমার মেয়ে বের হয়ে আসে। আমার মেয়েকে বের করে আমার বুকের উপর দেয়, আলহামদুলিল্লাহ।

আমার মেয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল। ৩ কেজি ২০০ গ্রাম ওজন এসেছে। আমার এপিসিওটমি লেগেছিল। ডাক্তার আপু আমাকে অনেক সুন্দর করে সেলাই দিয়ে দেয়। এরপর আমার মেয়েকে আমার বুকের উপর দেয়, আমি ব্রেস্ট ফিড করাই। আর ১০ মিনিটের মত স্কিন টু স্কিন করাই। ডেলিভারির ৬ ঘন্টা পর হসপিটাল থেকে আমাকে রিলিজ দিয়ে দেয়, বাসায় চলে আসি।

এখন আমার মেয়ের বয়স আড়াই মাস আলহামদুলিল্লাহ। আমি আমার মেয়েকে সুন্দরভাবে ব্রেস্ট ফিড করাচ্ছি আমার পোস্ট পার্টাম পিরিয়ড অনেক সুন্দর যাচ্ছে। আমরা মা মেয়ে দুজনেই সুস্থ আছি।

পরিশেষে আমি একটা কথায় বলতে চাই, “জ্ঞানের চাইতে বড় কিছু আর হতে পারে না”। আমি যখন সবাইকে জানাতাম আমার নরমাল ডেলিভারির ইচ্ছা তখন সবাই আমাকে বলতো প্রচুর পেইন সহ্য করতে হবে, প্রচুর কষ্ট সহ্য করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু আমি বলব আপনার যদি সঠিক জ্ঞান ধারণা থাকে আপনি আপনার বডিকে নরমাল ডেলিভারির উপযোগী করে তৈরি করেন হোক সেটা এক্সারসাইজ বা পুরোপুরি নিউট্রিশন ফলো করে নরমাল ডেলিভারির মতো সহজ আর কোন ডেলিভারি হতে পারে না। আর সবকিছুর মধ্যে তাকদীরকে তো বিশ্বাস করতেই হবে। দোয়ার বিকল্প কিছু হতে পারে না। আপনি দোয়া করবেন, আল্লাহর কাছে চাইবেন, আপনার ডেলিভারি নিশ্চয় ইনশাল্লাহ সহজ হবে।

অনেক অনেক দোয়া জাযাকাল্লাহ রৌদ্রময়ী টিমের সকল আপুদের জন্য। আল্লাহ আপনাদের বারাকাহ্ দান করুন দীনের জন্য কবুল করে নিক। আপনাদের সকলের পরিবার সুস্থ থাকুক।

উম্মে ইক্বরা
রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স পার্টিসিপ্যান্ট, ব্যাচ ২৩