আমার সাড়ে ৩ কেজি বাবুর ভিব্যাকের গল্প
- Posted by MNCC Moderator
- Date June 11, 2026
- Categories Birth Story, Others
- Comments 0 comment

প্রথম বাবুর সময় অকারণে সিজার করেছিলো আমার। এই একটা কষ্টে আমি দীর্ঘদিন ডিপ্রেশনে ভুগেছি। আমার পোস্ট পার্টামে আমার দুঃখ আর হতাশা বলতে দুটো জিনিসের কথাই মনে পড়ে, আমার সিজার কেন হলো, জাওযী কেন পাশে নাই!
আলহামদুলিল্লাহ গত মে মাসে আমি আবার কন্সিভ করি। টুইন ছিল, একটা বাচ্চা প্রচন্ড ব্লিডিং এর ফলে মারা যায়। বাকিজন যেন ভালো থাকে, এই নিয়ে শুরু হলো চিকিৎসা। আলহামদুলিল্লাহ ধীরে ধীরে রিস্ক জোন কাটিয়ে ৩৭ সপ্তাহ পার করলাম ভালো থাকা আর খারাপ থাকা মিলিয়ে।
৩৮ সপ্তাহ পার হলো। ১৪ই ফেব্রুয়ারি সারাদিন অনেক কন্ট্রাকশন ছিল। রাত বাড়তে বাড়তে কন্ট্রাকশনের পরিমাণ আর সময়ও বাড়ছিলো। যেহেতু ভিব্যাক এর চেষ্টা করার নিয়ত আছে, তাই রিস্ক না নিয়ে রাত ১টার দিকেই হাসপাতালে চলে গিয়েছিলাম। হাস্পাতালে যাওয়ার পর আমার ব্যথা অনেকটা থেমে যায়। সারারাত সিজি আই মনিটরিং চলছিলো। সকালে ডাক্তার চেক করে বললেন অনেক দেরি আছে, মাত্র ২.৫ সেমি খুলেছে। আমি চাইলে দুইদিন বাসা থেকে ঘুরেও আসতে পারবো।
তবুও সেদিন সারাদিন হাসপাতালে ছিলাম। হাঁটাহাঁটি করছিলাম। তবুও লেবার প্রোগ্রেস নাই। পিভি তখনও ২.৫ সেমি। তাই বিকেলে বাসায় চলে আসি। রাতে মিউকাস প্লাগ বের হচ্ছিলো একটু একটু করে। সারারাত প্রচন্ড ব্যথা হচ্ছিলো। আলহামদুলিল্লাহ লেবার প্রগ্রেস করছিলো ন্যাচারালি। আমি ভালো করে খাবার খেলাম। সামনে আমার শক্তি প্রয়োজন হবে।
ব্যথার ফাঁকে ফাঁকে আমি ঘুমিয়ে যাচ্ছিলাম।। ঘুমের ভেতর ব্যথা এলে আবার গোঙ্গানি শুরু হয়ে ঘুম ভেঙে যেতো। ধীরে ধীরে ব্যথা বাড়ছিল। ভোর ৪/৫ টা থেকে আর ঘুমাতে পারছিলাম না।
টাইম কাউন্ট করছিলাম। ৫/৬ মিনিট পর পর ২ মিনিটের মতো পেইন থাকে। কষ্ট হচ্ছিলো খুব। ছোট বোনকে কল দিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে বললাম পাশে এসে বসতে। ওকে পাশে রেখে আরও কিছু সময় ধৈর্য্য নিয়ে পেইন ম্যানেজ করলাম। পাশাপাশি খেজুর খেয়েছি। জাওযী সারারাত ঘুমান নাই, ফজরের দিকে ঘুমিয়ে ছিলেন। আমি রুমে যেয়ে উনার পাশে বসলাম। উনাকে একবার ডাকতেই বসা অবস্থা ভেতরে কিছু একটা ফেটে যাওয়ার অনুভূতি হলো। সাথে সাথে অনেকগুলো পানি বের হয়ে গেলো আমার। জাওযী তখন স্বপ্নে দেখেছেন আমার নরমাল ডেলিভারিতে বেবি হয়েছে।
দেরি না করে হাসপাতালে যাওয়ার প্রিপারেশন নিলাম।
হাসপাতালে অনেক ডেলিভারি পেশেন্ট তখন। অনেক ব্যস্ততার মাঝে একজন নার্স এসে প্রেশার, ডায়াবেটিস আর পিভি চেক করে গেলেন। তখনও মাত্র ৩ সেমি খুলেছে। প্রচন্ড ব্যথা! কিন্তু আমি জানতাম পথ এখন পুরোটাই বাকি। এখনই ভেঙে পড়লে চলবেনা।
কিছুক্ষণ পর নার্স এসে জানালেন আমার যদি (চট্টগ্রাম) ন্যাশনাল হাসপাতালে যাওয়া সম্ভব হয় সেখানে গেলে ম্যামকে তাড়াতাড়ি পাওয়া যাবে।
আমি দ্রুত সম্মতি জানিয়ে চলে গেলাম ন্যাশনালে। হাসপাতালে যাওয়ার পর সোজা লেবার রুমে পাঠিয়ে দিলো। জাওযী থেকে বিদায়টুকু নিতে পারিনি। তাই মন খারাপ ছিল।
শুরু হলো একা একা একটা যুদ্ধের গল্প…
ঘড়িতে মাত্র সকাল ৭টা পার হলো। বেডে শুয়ে আছি, পেইন ম্যানেজমেন্ট এর জন্য গভীর শ্বাস নিচ্ছি। কিন্তু শুয়ে থাকলে খুব বেশি কষ্ট হচ্ছিলো দাঁড়িয়ে থাকার তুলনায়। তবুও নার্সরা শুয়ে থাকতে বললেন ডিউটি ডাক্তার এসে চেক করবে তাই৷ ডাক্তার চেক করে বললেন ৪ সেমি খুলেছে। হাঁটাহাঁটি আর স্কোয়াট দিতে বললেন। আমি প্রচন্ড ব্যথায় দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিলাম। তবুও একটু করে হাঁটার চেষ্টা করেছি। একটু ঝুঁকে বেডে দুই হাত রেখে হিপ রোটেশন করলে পেইন ম্যানেজমেন্ট অনেক সহজ লেগেছে। এটাই বারবার করছিলাম। এভাবে আরও ২ ঘন্টা কেটে গেলো… ৫ সেমি….
ব্যথা সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে…কিন্তু আমি একেবারে নিঃশব্দে সব ম্যানেজ করছিলাম। বড় মেয়ের বেলায় ৬/৭ ঘন্টা লেবারে আমি পুরা পাড়া চিৎকার করে মাথায় তুলেছিলাম। সেই আমি এবার উঁহ শব্দটাও সহজে করছি না। পুশের জন্য শক্তি সঞ্চয় করতে হবে তো!
এরমধ্যে ম্যা’ম কল করে জানালেন আমার বাচ্চার ওয়েট ৩৪০০ গ্রাম ২৬ জানুয়ারিতে, যা ভিব্যাক ট্রায়ালের জন্য বেশি। এখন ইমার্জেন্সি একটা আল্ট্রা করে ওয়েটটা দেখতে চান তিনি। তারপর এই পেইনের মাঝে নিয়ে গেলো আল্ট্রা রুমে। সাথে জাওযীও গেলেন। উনাকে দেখে হুইল চেয়ারে বসা অবস্থায় উনাকে পাশ থেকে শক্ত করে ধরে উনার পেটে আমার মাথা চেপে রাখলাম। খুব কান্না আসতেছিলো। পাশে চাচ্ছিলাম জাওযকে। কিন্তু সুযোগ নেই….
আল্ট্রা করে জানা গেলো বাবুর ওজন ৩৭০০ গ্রাম।
ম্যাম খুব ভয় পেলেন এই ওজনে ভিব্যাক ট্রায়াল দিতে। নার্সরা বারবার নিষেধ করছিলেন আমাকে। আমি কেন জানি খুব কনফিডেন্ট ছিলাম। মনে হচ্ছিলো আল্লাহ আমাকে নরমালেই দিবেন। আমি নার্সদের হাত ধরে ধরে অনুরোধ করলাম, ম্যামকে যেন একটু রিস্ক নিয়ে চেষ্টা করতে বলেন। নার্সরা ম্যাম আসার জন্য অপেক্ষা করলেন।
সময় যেন থেমে গেছে। ৪/৫ মিনিট পর পর ব্যথা আসছে। মরে যাওয়ার মতো কঠিন ব্যথা। হাত দিয়ে নিজের কোমর সজোরে চেপে ধরে মাসাজ করছিলাম। এতে বেশ আরাম পেয়েছি। নার্সদের বললাম আমার ছোট বোনকে আসার অনুমতি দেয় যেন। কিন্তু দিলো না। তাই কন্ট্রাকশনের সময় নিজের কোমর নিজে ম্যাসাজ করে পেইন ম্যানেজ করছিলাম। কিন্তু এত তীব্র ব্যথার মধ্যে আমি শক্তি পাচ্ছিলাম না নিজেকে ম্যাসাজ করার। একজন আয়াকে অনুরোধ করলাম আমাকে যেন একটু ম্যাসাজ করে দেন। তিনি কিছুক্ষণ ম্যাসাজ করে দিলেন।
এভাবে সকাল ১০ টা বাজলো…
ব্যথা ধীরে ধীরে কঠিন থেকে কঠিনতম হচ্ছিলো। দাঁড়িয়ে থাকার, হিপ রোটেশন করার শক্তি ফুরিয়ে গেছে। ব্যথার মাঝখানে কয়েক মূহুর্ত সময় পেলেই শুয়ে পড়তাম। আবার ব্যথার সাথে সাথে দাঁড়িয়ে স্যালাইনের স্ট্যান্ডটা ধরে পেইন ম্যানেজ করতাম। একবার দাঁড়াচ্ছি, একবার শুয়ে পড়ছি! এভাবেই প্রায় দুপুর ১২টা বাজলো। প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক একটা বছরের মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছিলো।
ক্ষুধা পেলো আমার। লাচ্ছি খেতে ইচ্ছে করছিলো। জাওযী পুডিং, লাচ্ছি আর সাথে একটা স্যান্ডুইচ পাঠালেন। আমি কয়েক টুকরা পুডিং খেলাম বসে বসে। তখনই ম্যা’ম এলেন। আমাকে চেক করলেন। মাত্র ৬ সেমি। ম্যাম ভয় পাচ্ছেন। তিনি ইচ্ছে করেই দেরি করে এলেন যেন উনি ডেলিভারিটা করে যেতে পারেন। কিন্তু এত ঘন্টায়ও মাত্র ৬ সেমি। আমার জাওযের সাথে কথা বললেন যে, এই বাচ্চা নরমালে পসিবল না। আমার ওজন প্রায় ১০০ কেজি, বাবু ৩৭০০ গ্রাম। অনেক রিস্ক হয়ে যায়। জাওযী তবুও শক্ত থাকলেন। সাহস দিলেন। রিস্ক বন্ডে সাইন করলেন।
ম্যাম বললেন তিনি ওটিতে যাচ্ছেন। এরপর এসেও যদি প্রোগ্রেস না দেখেন, তাহলে সিজার করে ফেলবেন। আমাকে বললেন স্কোয়াট দিতে বারবার। কিন্তু আমার শরীরে তখন একটা চড়ুই পাখিরও শক্তি নেই। আমি চোখ মেলতে পারছিলাম না। একেবারে শক্তিহীন, দূর্বল হয়ে গেলাম। একেকটা কন্ট্রাকশন… মনে হচ্ছিলো মৃত্যু এর চেয়ে সহজ… এত ব্যথা! এত কষ্ট!!
হঠাৎ আমার বড় মেয়ের কান্না শুনতে পেলাম। সে লেবার রুমে আসার জন্য খুব কাঁদছে। তার মাকে দেখবে একটাবার! ম্যা’ম অনুমতি দিলেন। আমার কলিজা দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। লেবারের পুরাটা সময় আমি একটাবারও কাঁদিনি। কিন্তু মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলাম। বললাম- মাম্মামের জন্য দুয়া করো, খুব কষ্ট হচ্ছে মায়ের! মেয়ে কান্না চেপে চলে গেলো। দরজার বাইরে গিয়েই চিৎকার করে কেঁদে বললো- আমি আমার মা’কে ছাড়া থাকতে পারিনা….
এই কান্নাটা শুনে আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল সব ফেলে রেখে আমার ইনায়ার কাছে চলে যাই… ছোট বাবুটা যদি তাড়াতাড়ি বের হতো! ইনায়া বাবুকে দেখলে কতোই না খুশি হবে!!
ম্যাম চলে গেলেন।
ইনায়া চলে গেলো।
নার্সরা অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলো৷
একা একা, বুকভর্তি আশা আর ভয়ের মিশ্র অনুভূতি নিয়ে ব্যথার কাছে নিজেকে সঁপে দিচ্ছিলাম…
ম্যাম ফিরে এলেন। ওটি শেষ করে দেখলেন আমি এখনো আগের অবস্থায়। এবার তিনি সিজারের সিদ্ধান্ত নেন। আমি প্রচন্ড ব্যথায়, যন্ত্রণায় বললাম- ম্যাম সিজার করলে এখনই করে ফেলেন, আমি আর পারছিনা। ম্যামের হাত ধরে ফেললাম, সিজারের জন্য অনুরোধ করতে শুরু করলাম ব্যথার কষ্টে! মুখে সিজারের কথা বললেও ভেতরে ভেতরে রৌদ্রময়ীর প্রিনেটাল কোর্সের সময় শিখে রাখা একটা লাইন আমি স্মরণ করছিলাম, “যখনই মায়েদের মনে হয় আর সম্ভব না, আর পারছিনা, সিজার করে ফেলেন, তখন তারা ডেলিভারির খুব কাছাকাছি থাকে। এর একটু পরেই ডেলিভারি হয়ে যায়।” (এটি মূলত লেবারের ট্রানজিশন স্টেজ হয়ে থাকে।)
তখন ম্যাম আমার লোকদের ডাকলেন, আমার ছোট বোন এলো। ম্যাম বললো- এত বড় বাচ্চা নরমালে খুব রিস্ক হয়ে যাবে, ওর সিজার করা সেইফ হবে।
আমার বোন আগা মাথা বুঝে না, তাকিয়ে ছিলো চুপচাপ। ভালোই হয়েছে, সম্মতি দেয় নি! আমি নিসুকে বললাম – আর পারতেছিনা রে! এত কষ্ট এই জীবনে কোনোদিন হয়নি।
ও জিজ্ঞেস করলো কত সেমি?
বললাম- এক ঘন্টা ধরেই ৬ সেমি। বোন বললো-
আর তো বেশি সময় লাগার কথা না। ৬ সেমির পরে খুব তাড়াতাড়ি ডেলিভারি হয়ে যায়।
নিসু চলে গেলো।
ম্যাম আবার এলেন। আমি সিজার করালে আমার লাভ নাই। নরমাল করালেই বরং টাকা বেশি পাবো। আমি তো বাচ্চাটার কথা চিন্তা করে বলতেছি!
এরপর ম্যাম আরেকবার পিভি দেখলেন। হঠাৎ পেটে চাপ দিলেন, তারপর আমি প্রচন্ড চিৎকার করে উঠলাম। বাবুর মাথা অনেকটুকু বেরিয়ে এসেছিলো সেই মূহুর্তে। কিন্তু আমি তখন বুঝতে পারিনি এটা আমার পুশিং আর্জ ছিল। চলে গেল সেই আর্জটা। ম্যাম স্কোয়াট করতে বলে ওটিতে গেলেন। আর একটা ব্যথা বাড়ার ইঞ্জেকশন পুশ করতে বললেন। ইঞ্জেকশন এর পর ব্যথা আরও অনেক বেড়ে গেলো!
এভাবে আরও ভয়ংকর কিছু কন্ট্রাকশন ম্যানেজ করতে পারলাম চুপচাপ। আল্লাহ’র রহমত না থাকলে আমি কবেই হাল ছেড়ে দিতাম। প্রতিটি ব্যথা আমার চোখ দিয়ে বের হচ্ছিলো কষ্ট হয়ে। চোখ দুটো ইয়া বড় বড় হয়ে যেতো ব্যথার সাথে!
রুমে তখন একজন সিজারের রোগী এসেছিলেন সেলাই কাটতে। আমি উনাকে বললাম – বোন আমার পাশে এসে আমাকে একটু জড়িয়ে ধরেন না!
আমি এই বাক্যটা কতোটা কষ্ট আর অসহায়ত্ব থেকে বলেছিলাম তা শুধু রব্ব জানেন!
তবে উনার সেলাইয়ের ব্যথার জন্য তিনি আসতে পারলেন না। আমাকে বললেন –
উঠ-বস করেন আপু।
তারপর আমি একটা কন্ট্রাকশন এর সময় স্কোয়াট দিতেই প্রচন্ড পুশিং আর্জ এলো। আমি আবারও বিকট চিৎকার করলাম। বুঝতে পারলাম এর পরেরটা আরও জোরালো হবে। আমি বেডে শুয়ে গেলাম। আবার এলো, প্রচন্ড ব্যথার সাথে খুব জোরালো পুশিং আর্জ…. আমি ব্যথার সাথে চিৎকার করে নার্সদের ডাকলাম… ” কেউ আছেন?”
একজন নার্স এসে চেক করে বললেন পুরো ডায়ালেটেড। তাড়াতাড়ি লেবার রুমে নিয়ে গেলেন আমাকে। সেখানে অন্য রোগী থাকায় হুইল চেয়ারে বসিয়ে ওটিতে নিয়ে গেলেন। ম্যাম এলেন। আরও কয়েকটা পুশ করলাম। নিচে চাপ দিলাম। আমার পটি বের হচ্ছিলো বারবার। নার্সরা সবাই খুব সাপোর্ট করলো। ভালো ব্যবহার করছিলো পুরোটা সময়। দুই পা ধরে পুশ করতে বলছিলো। পা ধরতে গেলে খুব খুব ব্যথা নিয়ে পুশ আসতো। কিন্তু বাবু বের হচ্ছিলো না। ম্যাম সিজারের সিদ্ধান্ত নিলেন। নার্সরাও ভয় পাচ্ছিলেন, সবাই সিজারের কথা বললেন। কিন্তু ম্যাম আবার চেষ্টা করলেন, অনেকটুকু কেটে দিলেন, বুঝতে পারলাম। আমি কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে শক্তি জোগালাম। পা ধরলে পুশ আসে তাই পুরো শক্তি নিয়ে আমি নিজের দু’পা ধরে মুখ বন্ধ করে একটা পুশ করলাম তারপর সাথে সাথে আমার পেট থেকে আমার কলিজার টুকরা, আমার মা, আমার নুরাইজা সাজ্জাদ খাঁন ইনশিরাহ বের হয়ে এলো পৃথিবীতে! ম্যাম, আমি, আমরা সবাই জোরে আলহামদুলিল্লাহ পড়লাম। ম্যাম বাবুকে আমার পেটের উপর রেখে বললো- কাঁদো কাঁদো! আমার মা কেঁদে উঠলো আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! আমি আমার মুখ থেকে হাসি সরাতে পারছিলাম না। একটা বিধ্বস্ত চেহারায় সুকূনের হাসি, কষ্টের পরে প্রশান্তির হাসি, ইনশিরাহ-র হাসি! আলহামদুলিল্লাহ!
ম্যা’ম জরায়ু চেক করে দেখলেন সেলাই ঠিক আছে। ম্যা’ম খুশি হয়ে বললেন – যাই, খুশির খবরটা বাচ্চার বাবাকে দিয়ে আসি! সবাই অনেক খুশি! ম্যা’মও অনেক খুশি! নার্সরাও অনেক খুশি! মনে হচ্ছিলো আল্লাহর দয়ায় আমার এই ভিব্যাক সাকসেসফুল হওয়ায় পুরো দুনিয়া আজ অনেক খুশি! পৃথিবীতে কোথাও আর কোনো কষ্ট নেই…..
ম্যামের মতো ডাক্তার আমার জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে রাহমাহ হয়ে এসেছে। তিনি এতোটা ভালো ব্যবহার করেছেন, এতকিছুর পরও, এত রিস্ক নিয়েও বারবার চেষ্টা করে গেছেন। আমি এই কৃতজ্ঞতা আদায় করে শেষ করতে পারবো না। বাবু বের হওয়ার পর আমার অজান্তেই অন্তরভর্তি কৃতজ্ঞতা নিয়ে ম্যামের জন্য দুয়া বের হয়ে গেছে মুখ দিয়ে। ম্যাম যেন আমার চেয়েও বেশি খুশি ছিলেন আমার এই সফলতায়! আলহামদুলিল্লাহ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রব্বুল আলামিনের।
ম্যামও আমার প্রশংসা করলেন। বললেন- ওর ধৈর্য্য ছিল। পুশিং আর্জ খুব স্ট্রং হওয়ায় ডেলিভারিটা সহজ হয়েছে।
বাবুর জন্মের পর বাবুর ওজন দেখে ৩৫০০ গ্রাম। আমার পেটে অনেক চর্বি। যার ফলে ওজন বেশি এসেছিলো আল্ট্রায়। বাবু ছোটই ছিল, কিন্তু আমার চর্বির জন্য পুরো ব্যপারটা এত জটিল হয়ে গিয়েছিল।
বাবু বের হওয়ার ২ মিনিটের মধ্যেই প্লাসেন্টা বের হয়ে এলো। এরপর শুরু হলো সেলাই। এই কষ্ট ডেলিভারির ভয়ংকর ব্যথার মতোই কঠিন ছিল। অনেক সময় ধরে সেলাই করলেন। বাইরে লম্বা ৭/৮ টা সেলাই। ভেতরে ৩ স্তর। অনেক কঠিন ছিল সেলাইয়ের এই পর্বটা। তবুও আলহামদুলিল্লাহ আলা কুল্লি হাল। সবর রেখে, শক্তি রেখে এই পর্বও শেষ করতে পারলাম রব্বের দয়ায়।
ওটি থেকে হুইল চেয়ারে করে আমাকে সেই লেবার রুমে আনা হলো যেখানে এতগুলো ঘন্টা কাটিয়েছিলাম। লেবার রুমের দরজার বাইরেই জাওযী বাবুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সাথে আমার বড় মেয়ে। আমার তিনজনের পরিবার এখন চার জনের হলো আলহামদুলিল্লাহ।
আমার পুরো প্রেগন্যান্সিতে আমাকে ডাক্তার বেডরেস্ট দিয়েছেন। গত অক্টোবর এর ৭ তারিখ বাবার বাড়ি থেকে নিজের বাসায় চলে এসেছিলাম। তখন থেকে এই পর্যন্ত আমার ছায়া হয়ে, আমার জীবনের রহমত হয়ে জাওযী আমাকে আগলে রেখেছেন। এত কষ্ট, এত ব্যথা, এত অসুস্থতা, ডাক্তার-হাসপাতাল, ঘরের কাজ, রান্নাবান্না, ইনায়াকে সামলানো, আমাকে খাওয়ানো, ঔষধ খাওয়ানো সব সব সবকিছু উনি একা করেছিলেন। একটা মানুষ ছিল না আমার পাশে। একজন পুরুষ হয়ে একাই সব করেছেন। আমার ভিব্যাক এর সফলতার আনন্দ আমার চেয়ে এই মানুষটার জন্য অনেক বেশি!! ১৪ তারিখে লেবার পেইন উঠার পরে তিনি আসমাউল হুসনা পড়ে পড়ে দুয়া করেছেন। আমাকে বলেছিলেন- আল্লাহর ৯৯ টা নাম পড়ে দুয়া করলে দুয়া ক্ববুল হয়। আমি স্বপ্নে দেখেছি আমাদের নরমালে বাবু হয়েছে। ইনশাআল্লাহ নরমালেই হবে।
আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা আমাদেরকে নরমাল ডেলিভারিতেই দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ।
আমি লেবার রুমে ঢুকতেই বাকি রোগীরা আমাকে অভিনন্দন জানালেন। সবাই অনেক খুশি। বারবার ডেকে ডেকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন। আমি আমার ঠোঁট থেকে হাসি সরাতে পারছিলাম না।
তারপর আমাকে বেডে শুইয়ে দেয়ার পর সেলাইয়ের ব্যথার সাথে প্রচন্ড কাঁপুনি এলো আমার। প্রায় ১০/২০ মিনিট কাঁপুনি ছিল। ডোজ দিলো। এরপর বাবুকে দুধ খাওয়াতে দিলো। তারপর কেবিনে নিয়ে গেলো। তারপর সেদিন তার ৮ টায় বাসায় ফিরে এলাম আলহামদুলিল্লাহ…..
উম্মে ইনশিরাহ
রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স পার্টিসিপ্যান্ট
Other post
Tag:ভিব্যাক
You may also like
আমার ন্যাচারাল ডিব্যাকের গল্প
সমস্ত প্রশংসা মহান রবের জন্য যিনি আমাকে মুসলিম নারী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, এরপর ২য় বারের জন্য আমাকে মাতৃত্বের নেয়ামত দান করেছেন। পাশাপাশি মহান রবের কাছে আবারো শুকরিয়া জানাই, কারণ তিনি আমাকে প্রথমবার সিজারের পর ২য় বার ন্যাচারাল বার্থের তাওফিক দান …
Elementor #25093
গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই আমার প্রবল ইচ্ছা ছিল একটি ন্যাচারাল বার্থের। সেই ইচ্ছা থেকেই আমি ‘রৌদ্রময়ী’ (Roudromoyee) থেকে প্রিনেটাল কোর্সটি করি। আর আজ আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, সেই কোর্স থেকে পাওয়া জ্ঞানই ছিল আমার পুরো লেবার পিরিয়ডের একমাত্র শক্তি। এই কোর্সের …
গর্ভকালীন পড়াশোনা, মধুর প্রেগন্যান্সি জার্নি
আমার অনেক আগে থেকেই ইচ্ছা ছিল নরমাল ডেলিভারি করার। এইজন্য যখন বুঝতে পারলাম আমি কন্সিভ করেছি। তখন থেকেই এই বিষয়ে জানা শুরু করি। একটি প্রেগন্যান্সি এপের সাবস্ক্রিপশন কিনে ফেলি। সংগ্রহে থাকা “আমানি বার্থ” বইটাও পড়া শুরু করি। কিন্তু এতো কিছুর …
