Back

আমার ন্যাচারাল ডিব্যাকের গল্প

সমস্ত প্রশংসা মহান রবের জন্য যিনি আমাকে মুসলিম নারী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, এরপর ২য় বারের জন্য আমাকে মাতৃত্বের নেয়ামত দান করেছেন। পাশাপাশি মহান রবের কাছে আবারো শুকরিয়া জানাই, কারণ তিনি আমাকে প্রথমবার সিজারের পর ২য় বার ন্যাচারাল বার্থের তাওফিক দান করেছেন।

এই দীর্ঘ অথচ প্ল্যান্ড জার্নিতে রৌদ্রময়ী স্কুল আমাকে আমার ফুসফুসের মতো সাপোর্ট দিয়েছে। পুরো রৌদ্রময়ী টিমের যে ঋণ, সেটা আমার জীবন দিয়েও শোধ করতে পারবো না। আমি মনে প্রাণে কামনা করি, রৌদ্রময়ী টিমের সবাইকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা দুনিয়া ও আখিরাতে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসীনে প্রতিষ্ঠিত করুন। অন্তরের এই দোয়া রব যাতে কবুল করেন, আমীন!

কোর্স চলাকালীন সময় থেকেই আমি বাবুর আব্বুর সহযোগিতায় একদম পুরোপুরি রুটিনে থাকার চেষ্টা করি। এক্সারসাইজ, নিউট্রিশন ইত্যাদি সবকিছুই রুটিনে রাখার চেষ্টা করি। পাশাপাশি রুটিন করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার কাছে ন্যাচারাল বার্থের জন্য দোয়া করতে থাকি।

আমার আল্ট্রাতে EDD আসে জানুয়ারীর ২৫ তারিখ। ডাক্তারকে দেখানোর পর উনি আমাকে বলেন ২৭ তারিখ। এরপর আমাদের ন্যাচারাল বার্থের আগ্রহ শুনে আমাদেরকে ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে দেখা করতে বলেন!

এটা ছিলো VBAC আর তাই আল্ট্রা থেকে শুরু করে সবকিছুতে বাবুর আব্বু কড়া নযরদারিতে রাখে। জানুয়ারীর ১০ তারিখ Scar thickness এর রিপোর্ট পারফেক্ট থাকার পর আমরা পুরোপুরি VBAC এর জন্য প্রস্তুত হয়ে যাই, মেন্টালি ও ফিজিক্যালি।

ডেলিভারির জন্য আমাদের পারিবারিক পরিচিত একজন মিডওয়াইফকে ঠিক করি, হোম বার্থ নিয়ে যার প্রায় ৫৫ বছরের এক্সপেরিয়েন্স ও উনি VBAC-ও করিয়েছেন। কিন্তু ২৩ তারিখ জানতে পারি তার পেস মেকার চেঞ্জ করার কারণে বাম হাত নাড়াতে সমস্যা হচ্ছে। এক্ষেত্রে তিনি ডেলিভারি করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এই সিচুয়েশনে এসে আমি ও আমার বাবুর আব্বু একটু টেনশনে পড়ে যাই। তবে ভেংগে না পড়ে আমরা প্ল্যান আরো ভালোভাবে গুছানোর দিকে মনোযোগী হই।

পরেরদিনই ডা. ফাতেমা ইয়াসমিন ম্যামের এপয়েন্টমেন্ট নেই। ম্যামকে সবকিছু খুলে বলি, ম্যাম আরো কিছু রিপোর্ট করাতে বলেন। পরেরদিন রিপোর্ট দেখে আমাদের VBAC এর জন্য প্রস্তুত হতে বলেন।

আমাদের মূল কনসার্ন ছিলো সবকিছু ঠিকঠাক রেখে বাচ্চার ওজন যাতে কোনমতেই ৩৫০০ গ্রামের বেশী না হয়, এবং পেইন যাতে নিজে নিজেই ওঠে। ২ তারিখে ম্যাম দেখা করতে বলেছিলেন। চাচ্ছিলাম এর আগেই যাতে ন্যাচারালি পেইন উঠে যায়।

৩১ তারিখ রাত থেকে একটু টেনশন হতে থাকে। ১ তারিখ সকালে “রৌদ্রময়ী – Pregnancy, Mother & Child Care BD” ফেসবুক গ্রুপে ব্যাথা না উঠার ব্যাপারটা শেয়ার করার পর গ্রুপ মেম্বাররা কয়েকজন মাইলস সার্কিট ব্যায়াম করতে বলেন। মাশাআল্লাহ! বাবুর আব্বুর সহযোগিতা নিয়ে সেটা করার সাথে সাথে দুপুর থেকে হালকা হালকা পেইন উঠে যায়। ১ তারিখ রাত ১১/১২ টার দিকে প্রচন্ড পেইন শুরু হয়।

একটা ইচ্ছা ছিলো যে হোম বার্থ করানোর, তাই বাসায়ই থাকি ২ তারিখ রাত ১২টা পর্যন্ত। (নোট: রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্সে ভিব্যাক ক্লাসে জানানো হয় যে বাসায় ভিব্যাক ট্রায়াল দেয়া রিস্কি। এটি ছিল সম্পূর্ণ এই দম্পতির নিজস্ব ইচ্ছে।) কিন্তু VBAC ট্রায়ালের জন্য ও আশেপাশের কারো VBAC এর অভিজ্ঞতা না থাকায় আমরা একটু টেনশনে পড়ে যাই, কেননা অলরেডি ২৪ ঘন্টা ক্রস হয়ে গিয়েছিলো। যদিও আমি জেনেছিলাম প্রথমবার ১৮-৩০ ঘন্টা লাগতে পারে, তবুও টেনশন হচ্ছিলো VBAC এর জন্য।

তাই বাবুর আব্বুর কুইক ডিসিশনে এম্বুলেন্স এনে ডা. ফাতেমা ইয়াসমিন ম্যামের হাসপাতালে চলে আসি। পুশিং এর সময় এপিশিওটমির জন্য প্রিপারেশন নিতে থাকলে আমরা বিনয়ের সাথে তাদের জানাই, আমরা ন্যাচারাল টিয়ারকেই প্রেফার করছি। আর তারাও এই ব্যাপারে আমাদের মতামত মেনে নেন। এরপর আলহামদুলিল্লাহ ভোর ৪:২৩ মিনিটে – দীর্ঘ ২৯ ঘন্টা পেইন সহ্য করার পর কোন ধরণের ফার্মাসিউটিক্যাল হস্তক্ষেপ ছাড়াই ন্যাচারাল টিয়ারসহ ন্যাচারাল ভিব্যাকের মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা ছোট্ট “যাইনাব” – কে উপহার দেন।

টিয়ার ছিলো খুব সামান্য এবং ডা. ফাতেমা ইয়াসমিন ম্যাম খুব যত্নের সাথে, অনেক সময় নিয়ে সেলাইয়ের কাজ সম্পন্ন করেন।
কাজ শেষে ম্যামের যে কথাটা শুনে আমি ও বাবুর আব্বু হেসে দিয়েছিলাম তা হলো – “আপনারা কোর্সের পয়সা উসুল করে ফেলেছেন!” 😃😃

সবশেষে বলতে চাই, রৌদ্রময়ীর প্রিনেটাল কোর্স আমার, পুরো বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষাভাষী মা-বাবাদের জন্য মহান রবের পক্ষ হতে বিশাল বড় একটি নিয়ামত। কামনা করি বাংলাদেশের সব মায়েরা স্বশিক্ষিত হয়েই মাতৃত্বের জার্নিটা শুরু করুন।

কেননা, সুস্থ মা, সুস্থ শিশু, সুস্থ জাতি!

মাইমুনা
রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স পার্টিসিপ্যান্ট, ব্যাচ ২৩