Back

কষ্টের পরেই আসে সবচেয়ে সুন্দর নেয়ামত

যাবতীয় প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার, যিনি আমাকে মা হওয়ার সেই মহামূল্যবান সম্মান দান করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ…

অশেষ শুকরিয়া রৌদ্রময়ী টিমের প্রতি যারা এত সুন্দর একটি আয়োজন করেছেন। যেখানে কিনা বাচ্চা জন্ম দেওয়ার বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। পুরো প্রেগন্যান্সি জুড়ে কত কিছু জানার, বোঝার থাকে, কত সংশয় থাকে—যেগুলো হয়তো আমরা ডক্টরের কাছেও এত বিস্তারিত জানার সুযোগ পাই না। আল্লাহ তায়ালা আপনাদের কাজে বারাকাহ দিন। আল্লাহ তায়ালার কাছে অশেষ শুকরিয়া যে আমাকে রোদ্দ্রময়ীতে প্রিনেটাল কোর্স করার তাওফিক দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা আপনাদের দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান ও সম্মান দান করুন।

আমার পুরো প্রেগন্যান্সি জার্নি ছিল যেন একটা দোয়া কবুলের গল্প। আমার মনে হয়, একটা মেয়ের জীবনের সবচেয়ে কষ্টের আর নাজুক সময়গুলোর একটি হলো এই প্রেগন্যান্সির দিনগুলো, আবার সবচেয়ে সুন্দর সময়ও এই দিনগুলোই। এই সময়গুলোতে আমরা আমাদের রবের কতটা নিকটে থাকি, কত দোয়া করি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ক্ষমতা ও মহিমা আমরা তখনই গভীরভাবে অনুভব করি, যখন সেই ছোট্ট প্রাণটাকে নিজের মধ্যে ধারণ করি।

অনেকবারই এই ডেলিভারি স্টোরিটা লিখতে বসে থেমে গেছি… কারণ সেই কঠিন সময়গুলোর কথা মনে পড়লেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। পরে মনে হলো, এত কঠিন একটা পথ পেরিয়ে আল্লাহ তায়ালা আমাকে যে এত বড় নিয়ামত দিলেন, সেই গল্পটা না বললে যেন অপূর্ণ থেকে যায়। সবাই জানুক—আমার রব আমাকে কতটা ভালোবাসেন, আর আমার দোয়াও তিনি কত উত্তমভাবে কবুল করেছেন। আমার এই অভিজ্ঞতা থেকে আমার বোনেরাও যেন জানতে পারে, সচেতন হতে পারে।

“আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তিনি তার জন্য যথেষ্ট।” (সূরা আত-তালাক, আয়াত ৩)

ভীষণ ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তার মধ্যে আমার হাসবেন্ড অপেক্ষা করছিল—সে কি আমাদের দু’জনকে ফিরে পাবে, নাকি কাউকে হারাবে! চারপাশের সবকিছুর বিপরীতে গিয়ে সে কি ভুল করল, নাকি আল্লাহ তায়ালা শেষ পর্যন্ত তাকে সাহায্য করবেন।

আমার প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ আসার পর ডক্টর আগের ওভারিয়ান সিস্টের ওষুধই আবার লিখে দেন। পরে রিপোর্ট দেখে আমরা আবার ডক্টরের কাছে যাই। তখন থেকেই ভেতরে একটা ভয় কাজ করতে শুরু করে। নিজের শরীর সম্পর্কে আরও সচেতন হতে হবে, আর সবকিছু শুধু ডক্টরের ওপর ছেড়ে না দিয়ে নিজেকেও জানতে ও বুঝতে হবে। তারপর থেকেই মাথায় ঘুরত কী খেতে হবে, কী খাওয়া যাবে না, কী করলে বাচ্চার জন্য ভালো হবে। ধীরে ধীরে প্রতিটা বিষয় নিয়েই সচেতনতা বাড়তে থাকে।

আপু আমাকে রোদ্দ্রময়ীর কোর্স করতে বলেন, আর আমার হাসবেন্ড পুরো সাপোর্ট দেন। আলহামদুলিল্লাহ, এই কোর্স করার পর বুঝতে পারি প্রেগন্যান্সি নিয়ে শেখার কত কিছু আছে।

পুরো প্রেগন্যান্সি জুড়েই আমি নরমাল ডেলিভারির জন্য চেষ্টা করেছি। ক্লাস অনুযায়ী সঠিক খাওয়া-দাওয়া, নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম করেছি, তবে নিয়ম করে আমার ব্যায়ামগুলো করা হতো না। একা বাসায় আমি আর আমার হাসবেন্ড ছাড়া সাহায্য করার কেউ ছিল না, প্রায়ই ক্লান্ত থাকতাম। খুবই খারাপ লাগত, দোয়া করতাম যেন আল্লাহ তায়ালা আমার সংসারের কাজগুলোই যথেষ্ট করে দেন। কেননা শক্তি ও সময় কোনোটাই থাকত না ঘরের কাজ করতে গিয়ে। পুরো প্রেগন্যান্সি জুড়ে আমার হাসবেন্ডের সাপোর্ট ছিল অপরিসীম। তিনি আমাকে এত সাহস দিতেন, সাপোর্ট দিতেন যেন নরমাল ডেলিভারিতে বাবু হয়।

পুরো প্রেগন্যান্সি জুড়ে এত পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছি সেগুলো বললে হয়তো একটা বই লেখা হয়ে যাবে। তবে এটুকু বলতে চাই, আমি প্রিনেটাল কোর্স থেকে অনেক কিছু জেনেও সেভাবে মানতে পারিনি। পরিস্থিতিটাই ভিন্ন ছিল। যেমন—চাহিদামাফিক খাওয়া, জার্নি করা সবকিছুতেই একটা সীমাবদ্ধতা ছিল। আমি অনেক কিছুই ঠিকভাবে করতে পারিনি। আর্থিকভাবে অভাব ছিল না, কিন্তু শারীরিকভাবে তা সামলাতে পারিনি। দুর্ঘটনাক্রমে ২ ঘণ্টার জার্নি ৫ ঘণ্টা লেগেছিল, যেখানে জার্নি করা নিষেধ ছিল। তখন শুধু দোয়া করতাম—ইয়া রব, এই খাবারই আমার অনাগত সন্তানের জন্য যথেষ্ট করে দিন, এই জার্নিটা আমাদের জন্য কল্যাণকর করে দিন। এমন কোনো দোয়া কবুলের সময় নেই যে আমি দোয়া করিনি।

“মানুষ তাই পায়, যা সে চেষ্টা করে।” (সূরা আন-নাজম, আয়াত ৩৯) — তাই আমি চেষ্টা করেছি, দোয়া করেছি, হতাশ হইনি।

যেহেতু অক্টোবরে আমার EDD ছিল, তাই আমরা প্রিনেটাল কোর্সের যে গ্রুপ ছিল সেখান থেকে রাজশাহীতে কোন কোন ডক্টর নরমাল ডেলিভারি করান তার একটা লিস্ট তৈরি করি। যদিও ম্যাম বেশ সাপোর্টিভ ছিলেন, তবুও আমাদের প্রিনেটাল কোর্সে বলা হয়েছিল লাস্ট মুহূর্তে অনেক ডক্টর সাপোর্টিভ থাকেন না। তাই আমরা অপশন হিসেবে তাদের রাখি। যে হাসপাতালে ডেলিভারি হবে, ম্যামের সাথে কথা বলে কেমন পরিবেশ তা জানার পর ম্যাম বলেন পর্দার কোনো অসুবিধা হবে না।

আমার EDD ছিল ২৫ অক্টোবর, অর্থাৎ ৩৯ সপ্তাহের প্রেগন্যান্সি। এর এক সপ্তাহ আগে থেকেই মিউকাস প্লাগ বেশি বের হতে শুরু করে, ধীরে ধীরে নিচের দিকে চাপ ও পেট একদম নেমে যায়। ফলস পেইন দিনে দিনে বাড়ছিল। আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল, আমার ২৫ তারিখ পর্যন্ত যাবেই না। আমি এত বেশি দোয়া করেছি যেন ২৫ তারিখের আগেই হয়। কেননা আমি আর আমার হাসবেন্ড একদম শক্তপোক্তভাবে প্রস্তুত আছি। শারীরিক ও মানসিক সব দিক থেকেই আমরা প্রস্তুত, শুধু ব্যথা ওঠার অপেক্ষায় আছি। আর আরেক দিকে সবার মন-মানসিকতা এমন হয়ে আছে যে, ডেট ওভার হলেই একটা ঝামেলা বাধবে। এটা আমি টের পাচ্ছিলাম, আর দোয়া করছিলাম যেন ২৫ তারিখ না পেরোয়।

এরপর ১৯ তারিখ সকাল থেকে আমার ফলস পেইন বেড়ে যায়। অ্যালজিন খেয়েও কমছিল না। দুপুরের দিকে কাপড়ে কিছুটা পানির মতো জিনিস দেখি, যেটা ছিল মিউকাস প্লাগেরই অংশ। আমি আপুকে ছবি তুলে দেখাই। আপু তখন বলেন রেস্টে থাকতে, এক্সারসাইজগুলো চালিয়ে যেতে এবং লক্ষণগুলো খেয়াল রাখতে।

২০ তারিখ রাতে ঠিকভাবে ঘুমাতে পারিনি, ব্যথা আরও বেড়ে যায়। সকালবেলা ফজরের পর আমার রেগুলার একটা রুটিন ছিল—নামাজ পড়ে কালোজিরা আর মধু খাওয়া। প্রতিদিনের মতো একা একা ডাইনিংয়ে বসে খাচ্ছিলাম, হঠাৎ আমার মনে হচ্ছিল কিছু একটা শরীর থেকে যাচ্ছে। বাথরুমে গেলাম, টিস্যু দিয়ে চেক করে দেখি আমার ব্লাড শো যাচ্ছে। ভয় আর আনন্দ যেন একসাথে কাজ করছিল। ইচ্ছে ছিল শুধু হাসবেন্ডকে জানানো এবং পাশে শুধু ওনাকেই রাখা, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। পরিবারের সবাই জানতে পেরে হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন, যেহেতু প্রথম বাচ্চা। আমার ডক্টরের সাথে কথা বলে সব গুছিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। সাথে মধু মিশানো পানি আর এক বাটি খেজুর নিয়েছিলাম।

হাসপাতালে যাওয়ার পর একজন ইন্টার্ন ডক্টর এসে PV check করে বলেন যে সার্ভিক্স প্রায় ১ ফিঙ্গার ওপেন হয়েছে, কিন্তু তখনও আমার কোনো ব্যথা ছিল না। আমি তখন কেবিনে বসে ছিলাম। এরপর প্রায় ১২টার দিকে ডক্টর আসেন এবং আবার PV check করে বলেন, ১ ফিঙ্গারই এখনও আছে, কী করবা ভেবে দেখো। আমি বললাম, ম্যাম, আজকের দিনটা একটু দেখতে চাই। বাবু তো সুস্থ আছে, ম্যাম আমি কি অপেক্ষা করতে পারব না? উনি বললেন, দেখো কী হয়। এরপর আমাকে বিকেলে আবারও PV check করেন। সব মিলিয়ে পুরো দিনে প্রায় ৫ বার!

এরপর বিকেলে আমাকে অ্যালজিন (Algin) ইনজেকশন দিতে আসে, যেটা আমি নিইনি। আমি চাচ্ছিলাম পুরোপুরি ন্যাচারালভাবে ব্যথা উঠুক। বাবু একদম সুস্থ ও ভালো আছে, কোনো জটিলতা নেই। আর কোনো মেডিকেল ইমার্জেন্সি বা বাচ্চার কষ্ট (fetal distress) না থাকলে, প্রসবের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে কৃত্রিম উপায়ে ত্বরান্বিত করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু ইনজেকশন না নেওয়ার কারণে নার্স এবং আয়া যারা ছিলেন, তারা আমার ওপর বিরক্ত হলেন। কেবিনে থাকা সবাই ক্ষোভ প্রকাশ করতে লাগলেন যে কেন আমি ইনজেকশন নিলাম না।

যাইহোক, অলরেডি একদিন পার হওয়ার পর ওই ফ্লোরের সবাই আমাকে চিনে ফেলেছিল। আমি ওই ফ্লোরে একটু হাঁটাহাঁটি করতাম আর রেস্ট নিতাম। আমাকে দেখে ওখানকার আয়া নার্স কত কী যে বলেছে এই রুগি এখনো আছেই, এভাবে হেঁটে কি আর কাজ হয়!

সন্ধ্যায় ম্যামের সাথে আবারও দেখা হলে আমি বললাম, ম্যাম, আজকে রাতটা একটু অপেক্ষা করা যায় না? তখন সবার সামনেই উনি বললেন, দেখো, আজ রাতে কিছু হলে হলো, না হলে রিস্ক নেওয়া যাবে না। কাল একটা ব্যবস্থা করতে হবে।

এরপর ২১ তারিখ সকালবেলা ভোররাতে ইন্টার্ন ডক্টর এসে আমার PV check করে বলেন যে সার্ভিক্স ৪ ফিঙ্গার খুলেছে। আমি অবাক হলাম, কারণ তখনও আমার লেবার পেইন (labour pain) ওঠেনি। তখন ইন্টার্ন ডক্টর বলেন, ৪ ফিঙ্গার খুলে গেলে কৃত্রিম উপায়ে স্যালাইন (Oxytocin) দিয়ে ব্যথা ওঠানো সম্ভব। এরপর ইন্টার্ন ডক্টর ম্যামকে বিষয়টি জানান। অর্থাৎ ২০ তারিখ সারাদিন আর ২১ তারিখ ভোর পর্যন্ত—তারা একদিনে ৫ বার এবং ভোরে মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে ২ বার, মোট ৭ বার আমার PV check করেন!

ইন্টার্ন ডক্টরের ফোন পেয়ে ম্যাম যখন আসলেন, তখন আমি বললাম, ম্যাম, আমার তো কোনো জটিলতা নেই, বাবুও সুস্থ আছে। মাত্রই ইন্টার্ন ডক্টর চেক করলেন, এখন আবারও আমি চেক করাতে চাচ্ছি না। উনি তখন বললেন, ইন্টার্ন ডাক্তার করেছে বলে আমি করব না? তার দেখা আর আমার দেখার পার্থক্য জানতে হলে পড়াশোনা করতে হবে। দরকার আছে বলেই এতবার করছি। ম্যাম PV check করে বললেন, ৪ ফিঙ্গার কোথায়? এ তো ১ ফিঙ্গারই আছে!

দোয়া করলাম, আল্লাহ, তুমি একটা ফয়সালা দাও, আমি আর ধৈর্য ধরতে পারছি না। তাদের মেডিকেল টিম যে কতটা অনভিজ্ঞ, সেটা বুঝতে আর বাকি ছিল না। তাছাড়া তাদের কথামতো কোনো ওষুধ বা ইনজেকশন না নেওয়ায় অলরেডি তাদের সাথে আমার সম্পর্ক খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আমি প্রতিনিয়ত মনে মনে দোয়া করে যাচ্ছিলাম, কিন্তু পরিস্থিতি এমন দিকে যাচ্ছিল যে ম্যাম শেষ মুহূর্তে এসে তাঁর আচরণ পুরোপুরি বদলে ফেললেন। তাঁর কথার ধরন একদম পাল্টে গেল। উনি এবার আমার হাসবেন্ডকে ডেকে এবং পরিবারের সবাই ছিলেন সেখানে সবার সামনেই। কেবিনে বললেন:

“এর নরমাল ডেলিভারি হবে না। দুদিন ধরে ব্লাড শো যাচ্ছে অথচ ব্যথার কোনো লক্ষণই নেই। যার হওয়ার, তার আগেই হয়। আপনারা রিস্ক নিলে নেন।”

ওই মুহূর্তে আসলে আমার মাথা কাজ করছিল না। একদিকে ফ্যামিলির প্রেসার, অন্যদিকে ৭ বার PV check করার ধকল, চিন্তায় ঠিকমতো খেতেও পারছি না। তার ওপর যে ম্যাম এতদিন এত সাপোর্ট দিলেন, তিনিই এখন বলছেন পসিবল না!

এটা শোনার পর আমার হাসবেন্ড বললেন, ঠিক আছে, আমরা ভেবে জানাচ্ছি। আমার হাসবেন্ড আমাকে বলেন, সবকিছু ভালো হবে, ধৈর্য ধরো। উনার ডিসিশন উনি জানিয়েছেন। আমরা আমাদের চেষ্টা করার পর যদি সিজার করতে হয়, তারপর করব। আগে চেষ্টা যা করার, করে নিই।

এটা বলে উনি বেরিয়ে যান প্রিনেটাল কোর্সের যে লিস্ট ছিল, সেখানে কোন কোন ডক্টর রাজশাহীতে নরমাল ডেলিভারি করান, তাদের খোঁজে। এই ফাঁকে আমি আপুকে ফোন দিই। আপুকে সব বলি। আপু বলেন যেন ভাইয়ার (দুলাভাই) সাথে আমি সব খুলে বলি, যিনি একজন ডক্টর। ভাইয়া যখন শুনলেন যে অলরেডি ৭ বার PV check করা হয়েছে, উনি বললেন, ব্যথা যেহেতু নেই এতবার চেক করার তো কোনো প্রয়োজনই হয় না! উনি পরামর্শ দিলেন, সম্ভব হলে দ্রুত একটা ভালো অভিজ্ঞ ডাক্তার দিয়ে (USG) করিয়ে দেখতে যে বাবু সুস্থ আছে কিনা, আর বাবু সুস্থ থাকলে যেন আমরা এখনই এই হাসপাতাল চেঞ্জ করি।

এদিকে আমি তো গ্রুপের সব বোনদের সাথেও কথা বলছিলাম। আরও কিছু গ্রুপে অ্যাড ছিলাম, সেখানকার বোনেরাও পরামর্শ দিলেন যে বাচ্চার কন্ডিশন ঠিক থাকলে যেন বাসায় চলে যাই, কারণ হাসপাতালের এই পরিবেশে লেবার প্রোগ্রেস হতে দেরি হয়। কিন্তু আমার পক্ষে তখন বাসায় যাওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না। অলরেডি একটা বাজে পরিবেশ তৈরি হয়েছে যে আমরা স্বামী-স্ত্রী মিলে ডক্টরের কথাকে পাত্তা দিচ্ছি না!

এখানে একটা কথা বলা দরকার, আমার আর আপুর প্রেগন্যান্সি জার্নি ছিল একসাথে। দুই দিনের গ্যাপে জানতে পারি। এতক্ষণ আপুকে সবকিছু জানানো থেকে বিরত ছিলাম। পরে দেখলাম, এই কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে আমি যা জানি, সব ভুলে যাচ্ছিলাম। তাই এরপর থেকে আপুর সাথে সবসময় যোগাযোগ রাখি।

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার হাসবেন্ড ‘শাম্মী লিওনার্দো কেয়া’ ম্যামের সন্ধান পান। হাসপাতালে ফিরে এসে আমার হাসবেন্ড আমাকে বলেন তুমি রেডি হও, আমরা এখান থেকে চলে যাব। কেয়া ম্যামের আন্ডারে ভর্তি হব। ভাইয়া ও আমার হাসবেন্ড সিদ্ধান্ত নেন যে, কেয়া ম্যামও যদি একই কথা বলেন তাহলে যেটা ভালো হয় ওটাই করবেন, আর যদি সব ঠিক থাকে তাহলে নরমালে চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। এরপর আমরা হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে ডিরেক্ট ইবনে সিনাতে যাই। সেখানে গিয়ে দ্রুত একটা USG করাই এবং রিপোর্ট নিয়ে দুপুর ১২টার পর কেয়া ম্যামের আন্ডারে ভর্তি হয়ে যাই।

এখানে এসে ভর্তি হওয়ার পর ডিউটি ডক্টর আমার হিস্ট্রি লিখলেন। উনি রিপোর্ট দেখে এবং সব শুনে বললেন, সব তো নরমাল। ম্যাম আসুক, আপনারা কথা বলেন। আলহামদুলিল্লাহ, কী যে একটা শান্তি কাজ করছিল!

এরপর দুপুর দুইটায় ম্যাম এসে আমাকে বললেন, বলেন তো আম্মা, কী হয়েছে আপনার সাথে? আমার কাছে কেন আসলেন? আমি সব খুলে বলি। পরে ম্যাম বেশ আফসোস করে বললেন, আহা আম্মা জান, এই ১ ফিঙ্গারে ৭ বার হাত! তারা কীভাবে দিয়েছে? এতবার দেওয়ার কোনো মানে হয়? তারপর বললেন, কিন্তু আম্মা, আমি আর একবার PV check না করলে তো বুঝতে পারব না। আর একবার কষ্ট করেন।

ম্যাম PV check করার পর বললেন, আপনার দেরি হবে। যদি ধৈর্য ধরতে পারেন, ইনশাআল্লাহ নরমালই হবে। রিপোর্ট সব নরমাল। বেবির মুভমেন্ট খেয়াল রাখবেন। অবশ্যই ধৈর্য রাখতে হবে, দোয়া করবেন, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবেন। এত লম্বা-ফরসা মেয়ে, ৭–৮টা বাচ্চা না হলে হয়? সি-সেকশনে গেলে তো এতগুলো বাচ্চা নেওয়া যাবে না, আম্মা জান!

আমি বললাম, ম্যাম, আমি আমার প্রিনেটাল কোর্স থেকে আপনার রিভিউ পেয়ে এসেছি। ম্যাম হেসে বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে, রেস্ট নেন। চাইলে বাসায় চলে যেতে পারেন। বাসা যেহেতু কাছে… আমি কিছুই বলতে পারছিলাম না। ম্যাম আমার চুপ থাকা দেখেই বললেন, ২–৩ দিন সময় লাগতে পারে। বাসার পরিবেশ ভালো না হলে এখানেই থাকতে পারেন। ম্যাম বুঝেই গিয়েছিলেন হাসপাতাল চেঞ্জ করায় বাসার মানুষজন বেশ বিরক্ত। কী অভিজ্ঞতা, তাই না? আমার বলতেও হলো না, অথচ উনি বুঝে নিলেন।

যাক, এবার আমার অনেক ভালো লাগছিল।

আলহামদুলিল্লাহ, কত দোয়া করলাম সকাল থেকে যেন মনের মতো একজন ডক্টর খুঁজে পাই যিনি মেয়েদের পর্দার বিষয়েও বেশ সাপোর্টিভ। পরিবেশ ভালো, ডক্টর ভালো।

এরপর আমি ভালোভাবে ধীরে-সুস্থে গোসল করে নামাজ পড়ি। সারাক্ষণ দোয়া করছি—আল্লাহ আমার জন্য আপনি যথেষ্ট হয়ে যান। হঠাৎ করেই এমন একটা ব্যথা অনুভব করি যা আমার কখনো হয়নি। আমি টের পেলাম, এই সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যথা। কয়েক সেকেন্ডের জন্য এসে আবার চলে গেল।

আমার মা বারবার বলেছিলেন, যেন বাবু হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি নামাজ মিস না দিই। শুধু দোয়া করছিলাম আল্লাহ যেন সব সহজ করে দেন। বিকেল থেকে ব্যথা ওঠা শুরু হলো, এরপর রাত পার হলো। আমি তেমন কিছুই খেতে পারিনি, শুধু খেজুর আর পানি খাচ্ছিলাম। সকালে ডিউটি ডক্টর এসে জিজ্ঞেস করলেন, কী অবস্থা আপনার? আমি হেসে বললাম, এই তো, ব্যথা আসছে আর যাচ্ছে। উনি বললেন, আপনাকে দেখে তো বোঝাই যাচ্ছে না আপনি লেবারে আছেন! এমন হলে আপনার ঠিক থাকার কথা না।

আসলে আমি অনেক স্ট্রং থাকার চেষ্টা করছিলাম। মনে হচ্ছিল, এটা তো ন্যাচারাল—সব মায়েরাই এই কষ্ট সহ্য করেন। কিন্তু সময় যত যাচ্ছিল, ব্যথাও তত বাড়ছিল। এরপর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো, তখন আমার আর কোনো হুঁশ ছিল না। টানা দুই দিন এক রাত পার হলো। বিকেলে নানা অজুহাতে কাঁদছিলাম, আর কাছে দোয়া করছিলাম। ডিউটি ডক্টর বারবার বলছিলেন, ধৈর্যই সব। আপনাকে আগেই বলেছি, আপনার সময় লাগবে।

এদিকে পরিস্থিতি এমন হয়ে যায় যে, আমার হাসবেন্ডকে সবাই বলেন যেন সিজার করে নিই। এত দীর্ঘ সময় লেবার পেইন কেউ কখনো আগে দেখেনি, এটাই তাদের অভিজ্ঞতা। কিন্তু আমার হাসবেন্ড কারও কথা শোনেননি, কারণ বাবুর মুভমেন্ট আর হার্টবিট সব ঠিক ছিল। ম্যামও বলেছেন আমি ধৈর্য ধরতে পারলে হবে, সব ঠিক আছে। ফার্স্ট বেবির ক্ষেত্রে লেবার একটু দীর্ঘ হয়। আমি বুঝতে পারছিলাম আমার হাসবেন্ডের ওপর ঠিক কতটা প্রেসার যাচ্ছিল! কেউ একজন তো বলেই দিয়েছিলেন যে আমরা বাচ্চাটাকে মেরে ফেলছি।

আমাদের বুঝিয়ে যখন কোনো কাজ হলো না, তখন আমাদের বোঝানোর জন্য একজন আত্মীয়কে পাঠানো হয়েছিল। উনি এসে দেখলেন আমি চুপচাপ শুয়ে আছি। আসলে আমি তখন সারাক্ষণ তিলাওয়াত, দোয়া আর চুপচাপ চোখের পানি ফেলছিলাম। উনি আসার পর আমার এত অস্বস্তি লাগছিল! আল্লাহ! জোরে কাঁদতেও পারছিলাম না, কাপড় ঠিক থাকছিল না, মন খুলে দোয়াও করতে পারছিলাম না। কী যে অসহায় লাগছিল নিজেকে! আমার চুপ থাকা দেখে উনি আমাকে আর আমার হাসবেন্ডকে বললেন, দুই মাতব্বর! এই ব্যথায় বাচ্চা হয়? ওই ব্যথা হলে ঠিক থাকতে পারবা না।

অথচ তখনও আমি জানতাম না আমার কত ফিঙ্গার ওপেন হয়েছে। এর মধ্যেই উনি আমাকে বলছেন ব্যথা উঠলেই চাপ দিতে। সেই মুহূর্তে আমি কীভাবে বোঝাই যে তখনো pushing stage আসেনি? পরে আমি শুধু চাপ দেওয়ার ভান করলাম। ওরে বাবা! মুখে বললে হবে না, যেভাবে দেখাচ্ছে সেভাবে করতে হবে! আল্লাহ তখন আমাকে কত ধৈর্য দিয়েছিলেন… আলহামদুলিল্লাহ। যাইহোক, উনি কিছুক্ষণ পর চলে গেলেন।

অলরেডি কেবিনে ৭ জন মানুষ ছিল। এরপর সন্ধ্যার দিকে যখন ব্যথা তীব্র হয়ে গেল, তখন আমার আর কোনো হুঁশ ছিল না যে নামাজ পড়তে হবে। বুঝতেই পারিনি কখন কোন ওয়াক্ত চলে গেছে।

এরপর আমার ঠিক এত মানুষ সহ্য হচ্ছিল না। আমার বড় ভাবি আর ছোট ভাইয়া ছিলেন। ভাইয়ার আমি অনেক আদরের—সবার আদরের সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। আর আমার ভাবিদের কাছে আমি সন্তানের মতো। ভাইয়া চেয়েছিলেন এই সময় আমার পাশে থাকতে। আমার অবস্থা দেখে সবাই কান্না করছিলেন, শুধু আমার হাসবেন্ড পাশে বসে বলছিলেন, এই তো আর একটু, তুমি কত ধৈর্য ধরছ।

এরপর আমার অবস্থা দেখে ডিউটি ডক্টর PV check করলেন, এই হসপিটালে দ্বিতীয়বারের মতো। উনি বললেন কেবলমাত্র ৪ ফিঙ্গার খুলেছে, আজকে পুরো রাত লেগে যেতে পারে। মানে সিরিয়াসলি! তখন আমার মনে হয়েছিল এর থেকে মৃত্যুই উত্তম। এটা শুনে আরও খিটমিটে হয়ে যাই, মনে হলো আমার দ্বারা আর সম্ভব না। এরপর আমি আমার হাসবেন্ডকে বলেই ফেলেছি, আমি আর পারছি না, আমার দ্বারা আর এক ঘণ্টাও সম্ভব না। আমার হাসবেন্ড বলছিল, “আর একটু ধৈর্য ধরো।” আমার অনেক রাগ হচ্ছিল ওনার ওপর। সে সময় আমার কাউকে সহ্য হচ্ছিল না, এমনকি আমার হাসবেন্ডকেও না—কেন তিনি আমার কথা শুনছেন না!

আমি তখন আপুকে কল করে বলি, আপু আমি আর পারছি না, ওরা বলছে আজকের রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। আপু তখন বললেন, ধৈর্য ধর, ৪ ফিঙ্গার মানে অনেক, আর বেশি সময় লাগবেই না, আজকের রাত লাগবেই না। আমি তখন কাঁদতে কাঁদতে বলছিলাম, ঠিক আছে, আমি আর ৩০ মিনিট অপেক্ষা করব। আপু বলল, ঠিক আছে, তাই হবে। মনে কর রাবেয়া নওশিন আপু কী বলেছিলেন—যে কেউ যদি বলে আমি আর পারছি না, আর পারব না, তার মানে আর একটু সময় অপেক্ষা করতে হবে, লাস্ট মুহূর্তে এমন মনে হয়। আমার তখন মনে হলো, আসলেই তো!

সন্ধ্যার দিকে যখন আমি লেবারের একদম শেষ পর্যায়ে ছিলাম, তখন খুব ইচ্ছা করছিল কিছুক্ষণ একা থাকতে। কেন জানি না, কাউকে ভালো লাগছিল না। মনে হচ্ছিল একটু মন খুলে কান্না করি, আল্লাহর কাছে দোয়া করি। আমি তখন সবাইকে বলেছিলাম কিছুক্ষণ বাইরে যেতে, কিন্তু কেউ যাচ্ছিল না। আমি মানছি তাদের আমার জন্য কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু এই সময় নিরিবিলি পরিবেশ কতটা দরকার তা তাদের বোঝাতে পারছিলাম না। পরে আমি আপুকে মেসেজ দিলাম যে আমি একটু একা থাকতে চাই, কেউ বাহিরে যেতে চাচ্ছে না।

এরপর সেই কথাকে ঘিরে একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর বাইরে গিয়ে দেখি পরিবেশ এতটা অস্বস্তিকর। আমার চোখের সামনেই দেখলাম সবাই মন খারাপ করে আছে আর আমার হাসবেন্ড তাদের হাত ধরে বুঝাচ্ছে, আর আমি এ দৃশ্য লেবার পেইনের শেষ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। তখন আমার ওই সময় কী যে খারাপ লাগছিল! আমি কাউকে কষ্ট দিতে চাইনি, শুধু কয়েক মিনিট নিজের মতো থাকতে চেয়েছিলাম। ভুল বোঝাবুঝির কারণে আমার হাসবেন্ডও মন খারাপ করে বাইরে চলে গিয়েছিলেন। ইশশশ, কতটা যে অসহায় লাগছিল তখন! মনে হচ্ছিল, এই কঠিন সময়টাতে যে মানুষটাকে আমার পাশে সবচেয়ে বেশি দরকার, সেই ভুল বুঝে চলে গেল। আমি ওনাকে ফোন দিয়ে কান্না করতে করতে বুঝিয়ে বলি যে আমি শুধু একটু একা থাকতে চেয়েছিলাম। যাইহোক, এরপর আমার হাসবেন্ড তাদের থাকার জন্য আলাদা কেবিনের ব্যবস্থা করেন। কারণ এই অবস্থায় আমাদের একা রেখে কেউ বাসায় যেতে রাজি ছিল না।

আমার তখন শো যাচ্ছিল, এরপর পানি যাচ্ছিল একটু একটু করে… আমার ভাবি তখন আমার পাশে বসে কান্না করছিলেন। আর একমাত্র আমার হাসবেন্ডই শক্ত হয়ে ছিলেন, কিন্তু এক পর্যায়ে উনিও আর সহ্য করতে না পেরে আমার পাশে থাকতে পারেননি। আমার কনট্রাকশনের গ্যাপ তখন ৫ মিনিট ছিল, কিন্তু জরায়ুর মুখ তখনো মাত্র ৪ ফিঙ্গার ওপেন (ডাক্তারের শেষ চেক অনুযায়ী)। ব্যথার তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, আমি কোনোভাবেই চিন্তা করতে পারছিলাম না আজকে সারারাত আমি এই কষ্ট কীভাবে সহ্য করব!

সেদিন প্রথম আমার কষ্ট দেখে আমার হাসবেন্ড কেঁদেছিলেন। আমার সামনে কান্না চেপে রাখতে না পেরে উনি কেবিনের বাইরে চলে যান। ব্যথার চোটে আমি তখন নাকি বলেছিলাম, “আল্লাহ, এর থেকে মৃত্যুই উত্তম।” আমি তো শুধু লেবার পেইনের তীব্রতার জন্য এমন বলেছিলাম। মনে মনে এই ভয়ও ছিল যে, না জানি আজ আবার কিসব ঝামেলা হয় আর আমার এই অবস্থায় সেসব দেখতে হয়। এসব ভেবেই আসলে কথাগুলো বলছিলাম।

আমার হাসবেন্ড যখন বাইরে কাঁদছিলেন, তখন আমার ভাইয়া আর শ্বশুরবাড়ির সবাই বলছিলেন সিজার করতে। আমিও যেহেতু শেষ মুহূর্তে বলে দিয়েছি যে আর সম্ভব না, আমার হাসবেন্ডও তখন আর নিজেকে শক্ত রাখতে পারেননি। উনি তখন আপুকে বলেন যে, সবাই সিজার করতে বলছে, ওর অনেক কষ্ট হচ্ছে। তখন আপু বলেন, দেখো, যে আল্লাহ ওকে ভালোবাসেন, সেই আল্লাহই ওকে কষ্ট দিচ্ছেন, এর মাঝেই কোনো কল্যাণ আছে। তবুও আমার হাসবেন্ড সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না যে তিনি সিজারের অনুমতি দেবেন কি না। আমি যেহেতু শেষ মুহূর্তে ‘আর পারব না’ বলেছি, তার মানে সময় হয়তো সত্যিই কাছে চলে এসেছিল। এদিকে সবাই এই সুযোগে সিজার করতে বলছিল, আবার ডক্টরও বলেছিলেন যে আজ পুরো রাত লেগে যেতে পারে।

আমার হুট করে মনে পড়ল, এই সময়ে পিঠে একটু ম্যাসাজ করে দিলে অনেকটা আরাম পাওয়া যায়। এজন্য আমি আগে থেকেই আমার হাসবেন্ডকে শিখিয়ে রেখেছিলাম পিঠে ম্যাসাজ করে দিতে। কিন্তু তখন আমার পিঠে হাত দিতে দেখে পাশে থাকা একজন বলে উঠলেন, “ইশশ! বাচ্চা আঘাত পাবে! পিঠে এভাবে হাত দেওয়া যাবে না।”

তখন কি আর রাগ করব! কষ্টে আমি সবার সামনে জোর গলায় দোয়া করলাম, “আল্লাহ, আমি বড্ড অসহায়, আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, আপনি সাহায্য না করলে আমি কবেই মাটিতে মিশে যেতাম। আপনি যেভাবে হযরত মারইয়াম (আঃ)-কে সাহায্য করেছিলেন, আমাকেও ঠিক সেভাবে সাহায্য করুন… আল্লাহ, আমি যদি আমার অনাগত সন্তানকে এবং আমার স্বামীকে আপনার সন্তুষ্টির জন্য ভালোবেসে থাকি, তবে সেই উসিলায় আপনি আমাকে সাহায্য করুন।”

এর ঠিক ১০–১৫ মিনিট পরই আমাকে লেবার রুমে নেওয়া হয়। ম্যাম PV check করে অবাক হয়ে দেখেন যে ততক্ষণে ৯ ফিঙ্গার ওপেন হয়ে গেছে! অর্থাৎ, মাত্র ৩০ মিনিট আমি লেবার রুমে ছিলাম… আলহামদুলিল্লাহ, ৩ থেকে ৪ বার পুশ করার পরেই আমার ‘নূর’, আমার হুরাইন নুর, আমার পেট থেকে বুকে আসে। আমার হুরাইন নুর হওয়ার পরপরই ম্যাম ওকে আমার বুকে স্কিন-টু-স্কিন দেন। দীর্ঘ ৩৬ ঘণ্টার ব্যথার কষ্ট যেন উধাও হয়ে গেল আমার হুরাইন নুরকে দেখে।

আমি হাত তুলে ওই অবস্থায় দোয়া করলাম, কিন্তু তখন আমার নিজের মেয়ের জন্য আমি নিজে কোন অবস্থায় আছি, সেই হুঁশটুকুই আমার ছিল না। এদিকে আমার হাসবেন্ড আর দুই পরিবার যখন বাইরে খুব দুশ্চিন্তা নিয়ে বসে আছেন, আমার হাসবেন্ড মনে মনে তখন ভাবছিলেন যে উনি কি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিলেন? আমাদের কোনো ক্ষতি হবে না তো? নানান রকম চিন্তায় উনি তখন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন।

ঠিক তখনই বাবুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পান। প্রথমে ওনার মনে হয়েছিল, না জানি অন্য কোনো বাবুর কান্নার আওয়াজ! কিন্তু তখনই একজন নার্স এসে বলেন, “না, আজকে আর কেউ নেই, আপনাদেরই বাবু এটা।” আমার হাসবেন্ড এই কথা শুনে খুশিতে যেন পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন!

আমার ভাইয়ার ভাষ্যমতে, আমার হাসবেন্ড তখন খুশির চোটে বাবুর সুরক্ষার জন্য ওখানেই সবার হাতে স্যানিটাইজার দিচ্ছিলেন, যেন কারও হাত নোংরা না থাকে। এরপর বাবুকে বাইরে নিয়ে আসা হলে উনি জিজ্ঞেস করেন আমি কেমন আছি। তারপর বাবুকে দেখেই আমার হাসবেন্ড সবার মাঝে শুকরিয়ার সেজদায় লুটিয়ে পড়েন। ওনার মুখ দিয়ে যেন কোনো আওয়াজ বের হচ্ছিল না, খুশিতে কথা বলার ভাষাই হারিয়ে ফেলেছিলেন উনি। মনে মনে ভাবছিলেন—তিনি পেরেছেন, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ আমাদের সাহায্য করেছেন! এরপর বাবুকে কোলে নিয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে আজান দিলেন।

সবাই যখন বাবুকে কোলে নিচ্ছিল, উনি নাকি তখন সবাইকে শিখিয়ে দিচ্ছিলেন যে—বাবুর থুতনিটা যেন গলার সাথে লেগে না থাকে এবং মাথাটা যেন উঁচুতে রাখা হয়, যাতে বাবু ঠিক পজিশনে থাকে এবং অক্সিজেন নিতে কোনো কষ্ট না হয়। ঠিক যেমনটা আমি ওনাকে আগে শিখিয়েছিলাম!

এরপর আমি যখন লেবার রুম থেকে বাইরে আসলাম, উনি দৌড়ে আসলেন আমার কাছে। ওনার মুখে কী যে এক হাসি, দাঁতগুলো যেন আর লুকানো যাচ্ছিল না। ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছিল, এই তিন দিনে আমাদের ওপর দিয়ে যে ধকল গেছে তা যেন কিছুই না! এক প্রশান্তি চারপাশে। 🌸

পরের দিন সকালবেলা ম্যাম আমাকে দেখতে এসে বলেন, আমার সাহসী আম্মা, কতই না ধৈর্য ধরেছো।

এই তিন দিনে তিনটি হাসপাতালে ঘুরে আমার অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। কষ্টও ছিল, আফসোসও ছিল। একদিন লেবার পেইন শুরু হওয়ার আগে আমি ভাইয়ার সঙ্গে বসে গল্প করছিলাম। “জানো ভাইয়া, মারইয়াম (আ.)-এর ঘটনাটা পড়লে আমার খুব ভাবতে ইচ্ছে করে। সন্তান জন্মদানের সেই কঠিন সময়ে আল্লাহ উনাকে নির্জনে যেতে বলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছেন, তাঁর জন্য রিযিকের ব্যবস্থা করেছেন, খেজুর খেতে বলেছেন। দেখো না, আমারও খুব ইচ্ছা ছিল বাসার খাবার খাওয়ার। কিন্তু আল্লাহ আমার রিযিকে সেভাবে রাখেননি। আবার আমার কোর্সে শিখেছি, এই সময় একজন মাকে যত্নে রাখা উচিত, তার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা উচিত, তাকে ভালোভাবে খেতে দেওয়া উচিত, নিরিবিলি শান্তিময় পরিবেশে রাখা উচিত। কিন্তু সব সময় কি সবকিছু সবার ভাগ্যে জোটে?

আমরা অনেক কিছু শিখি কী করা উচিত, কী খাওয়া উচিত, কেমন পরিবেশ দরকার। কিন্তু অনেক মায়ের তাকদীরে সেই পরিবেশ থাকে না। তাই বলে হতাশ হওয়া যাবে না। আমাদের কাজ হলো চেষ্টা করা, এরপর যা না পাই, তা আল্লাহর কাছে চাওয়া।

আর দেখো, মারইয়াম (আ.)-ও তো সেই কঠিন মুহূর্তে বলেছিলেন, হায়! আমি যদি এর আগে মরে যেতাম! তিনি ছিলেন একজন নেককার মুমিনা নারী তবুও সন্তান জন্মদানের সেই কঠিন পরীক্ষার মুহূর্তে তাঁর মুখ থেকে এমন কথা বের হয়েছিল। তাহলে আমরা তো সাধারণ মানুষ। আমাদের জীবনে হয়তো এত কঠিন ঈমানি পরীক্ষা না আসলেও আল্লাহর দয়া যেমন থাকবে, তেমনি পরীক্ষাও থাকবে। কিন্তু একজন মুমিন জানে, আল্লাহ কোনো কষ্টই বৃথা দেন না। তিনি এর উত্তম প্রতিদান অবশ্যই দেবেন।

“নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষা করেন।” (সূরা আল-হাজ্জ ২২:৩৮)

উম্মে হুরাইন নুর
রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স
পার্টিসিপ্যান্ট, ব্যাচ ২১