প্রেগন্যান্সি নিয়ে পড়েছি, নরমাল ডেলিভারি সহজ হয়েছে
- Posted by Sumaiya Snigdha
- Date August 3, 2026
- Categories Birth Story

বন্দর নগরীর এক কোলাহল বিহীন হসপিটালের বারান্দায় বসে অপেক্ষা করছি রিপোর্ট এর জন্য। গত কয়েকদিন শরীর মাত্রাতিরিক্ত খারাপ লাগছে, শোয়া থেকে উঠতে পারি না, মাথা ঘোরায়, খেলেই বমি লাগে। ক্লাসে যাচ্ছি না ভয়ে মাথা ঘুরে রাস্তায় পরে যাই যদি।
প্রেগ্ন্যাসির এত কমন লক্ষণ দেখেও মাথায় প্রেগ্ন্যাসির কথা আসলো না। তার উপর পিরিয়ড মিস গেল ১৫ দিন হয়ে যাচ্ছে। এটাও সাধারণ বিষয় ছিল আমার কাছে কারণ পিরিয়ড টাইম আমার এরকম ১২/১৫ দিনও দেরীতে হতো। তাই এত এত লক্ষণ দেখেও প্রেগ্ন্যাসির চিন্তা মাথায় আসে নাই।
গেলাম নৌকা পার হয়ে ভাইয়ের বাড়ীতে। গিয়ে ওখানে শুধু শুয়ে থাকি, বোন লক্ষণ দেখে বলে তোর তো খবর আছে বোধহয়, আমি বললাম আরে না, শরীর অন্য সময়ের মতোই দূর্বল মনে হচ্ছে।
এভাবে কয়েকদিন কাটলো। কিন্তু শরীর দিনের পর দিন খারাপ হতে থাকলো। তারপর আম্মাকে নিয়ে গেলাম ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার বললো বাসায় কিট টেস্ট করেছেন? বললাম না তো,
তাহলে এই টেস্টগুলো করে আমাকে এখন দেখান।
টেস্ট করে রিপোর্ট হাতে আসলো। পজেটিভ!
আমি পজেটিভ শব্দটার দিকে তাকিয়ে আছি অপলক। তখন ওই সময় মাথায় কিছুই কাজ করছেনা।
পরম আরাধ্যর চাওয়া এটা, বিয়ের আগ থেকেই আমি চাইতাম দ্রুত বিয়ে হলেই আমি মা হতে দেরী করব না, বিয়ের আগে বাচ্চার জন্য দোয়ার কোন কমতি রাখিনি।
কিন্তু এখন বিয়ের পর পরিবেশ পরিস্থিতি এমন যে এসময়ে বাচ্চার কথা শুনলে কে কী রিয়েক্ট করবে চিন্তার বিষয়। দুজনই স্টুডেন্ট, আলাদা জায়গায় থাকি। যদিও বাচ্চা পালবো আমি। কিন্তু আশেপাশের মতের তো অভাব নেই।
আমার পাশে আমার আম্মা ছিলো, আমি জানি আম্মা ভীষণ খুশী। আম্মার সারাজীবনের সম্পদ ছিলাম আমি। কারন আমার আম্মা নিঃসন্তান ছিলেন। আমাকে দিয়ে উনার সন্তানের স্বাদ-আহ্লাদ পূরণ করেছেন (দত্তক নিয়ে)। তাহলে আমার বাচ্চা উনার কাছে কত মূল্যবান হবে!
যাইহোক ডক্টর ঔষুধ দিল,নিয়মিত চেকআপে থাকলাম। দিন চলতে লাগলো, এদিকে আমার মিড পরীক্ষা শুরু হবে। সপ্তাহে ৫ দিন বাধ্যতামূলক ক্লাস করতে যেতে হয়। সেমিস্টার ড্রপ দিব না রান করব চিন্তায় পরে গেলাম। কারন সকালে অনেক খারাপ লাগে, ঘুম থেকে উঠলেই চরম খিদা লাগে, আবার খেলেই বমি। এদিকে ভার্সিটির বাস আসে সকাল ৭ টায়। সবমিলিয়ে টেনশন। পরে বান্ধবী, পরিবার সবার সাথে বসে সিদ্ধান্ত নিলাম এই সেমিস্টার কষ্ট করে হলেও শেষ করব, কারন ডেলিভারির পর পরবর্তী ৬ মাস তো বাচ্চার আমাকেই প্রয়োজন হবে।
ভার্সিটি যাওয়ার পথে নিজেকে অনেকভাবে শান্ত রাখতাম যেন বমি না হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়ে যেত।
আবার যাওয়ার পথেও বমি।
এই বমি নিয়ে সপ্তাহে ৩/৪ দিন অন্তত ক্লাস করতে গিয়েছি।
একবার পরীক্ষার হলে আমার এডমিট ডাউনলোড হচ্ছিল না বলে নিয়ে যাইনি। কিন্তু এডমিট ছাড়া এলাউ করবে না। হল ছিল ৬ তলায় উঠলাম একবার বললো এডভাইজরের সাইন নিয়ে আসো এডমিট নেই যে।
আবার ৬ তলা থেকে নামলাম, আবার উঠলাম। দিনটার কথা অনেকবার মনে উঠে। আসলে প্রেগ্ন্যাসির সময় কেউ একটু কটু কথা বললেও মনে সেটা দাগ কেটে যায়, আবার একটু যত্ন করলে সেটা আজীবন মনে থাকে।
প্রেগ্ন্যাসির সময়ের আগে থেকে রৌদ্রময়ী প্রিন্যাটাল ক্লাসের পোস্টগুলো পড়তাম। ইচ্ছে ছিলো ভর্তি হব। কারণ যে কোন বিষয়ের ক্লিয়ার জ্ঞান থাকলে বিষয়গুলো ফেস করতে সহজ হয়।
ভর্তি হওয়ার শেষ সময়ে হাতে পর্যাপ্ত ফি দেওয়ার টাকা না থাকায় জয়েন করিনি।
তবে Mother & child care bd ওয়েবসাইট থেকে তাদের সব লেখা পড়তাম। যখন ভালো লাগত না তাদের ওয়েবসাইটে উঁকি দিয়ে আসতাম।
আমানি বার্থ, মা হওয়ার গল্প বই দুইটা পড়েছি। মা হওয়ার গল্প বইয়ের বার্থ স্টোরিগুলো কতবার পড়েছি হিসেব নেই। সবার জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো জানতে, বুঝতে ভালো লাগত। নিজের ব্যাপারে কনফিডেন্স ফেতাম।
প্রেগ্ন্যাসি এপে প্রতিদিন নিজের অবস্থা দেখতাম। বাচ্চা কত বড় হলো, এখন কিসের মতো দেখতে। এগুলো পড়তে বেশ মজাই লাগত। এপে থাকা আর্টিকেল গুলোও নিয়মিত পড়তাম।
যখন যেখানে প্রেগ্ন্যাসি রিলেটেড যা দেখেছি, পেয়েছি, পড়ে রাখতাম।
আরেকটি কাজ করতাম ইউটিউবে ডেলিভারির ভিডিও ডকুমেন্ট দেখতাম। কারন আমি ওই সময়টা কেমন হবে তা খুব ফিল করার চেষ্টা করতাম। আমার পাশের বাসায় এক আপুর পেইন উঠেছিল তখন উনি কান্নাকাটি করছে আমি দেখতে গেলাম। আম্মা, আন্টিরা বলে তুই এখান থেকে যা, এগুলা দেখলে তুর কইল্লা ধরি যাইবো (ভয় পাবো)।
আমি বললাম আশ্চর্য কয়দিন পর আমার নিজেরও তো এই সময় আসবে এখন এই আপুকে দেখলে তো আমার একটু বুঝতে সুবিধা হবে আমি কিসের মধ্যে দিয়ে যাবো।
কিন্তু না তারা আমাকে জোর করে ঘরে পাঠিয়ে দিলো।
কিন্তু তারা তো জানে না আমি ইউটিউবে বিভিন্ন বার্থ ব্লগ দেখতাম।
এবং সবাই এই সময়টা উপভোগ করছে।
একদিন মাগরিবের পর কি কাজে যেন বের হয়েছি, হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো আচ্ছা প্রিন্যাটাল কোর্স পুরোটা না করে যদি প্রেগ্ন্যাসির শেষ সময়ের সাপোর্ট পাওয়া যেতো। Mother & child care bd তে দৌলা সাপোর্ট আছে, কিন্তু আমার মতো স্টুডেন্টের ক্ষেত্রে এটাও নেওয়া একটু কষ্ট সাধ্য ছিলো।
কয়েকদিন পর দেখি মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার দৌলা সপ্তাহ উপলক্ষে ডিসকাউন্ট প্রাইজে ১ মাসের একটা সাপোর্ট সিস্টেম উনারা অফার করলো।
আল্লাহ আমি কী খুশি হয়েছিলাম এটা দেখে! কারন তখন আমার ৩৫ সপ্তাহ চলছিলো। এসময় এরকমই কিছুর দরকার ছিলো আলহামদুলিল্লাহ।
তো এটাতে এড হলাম, অনেক আপুরা অনেক প্রশ্ন করতো, দৌলা আপুরা সময় নিয়ে উত্তর দিতেন, যে সময়ই জিজ্ঞেস করা হোক না কেন।
শেষ দিকে আমার ডায়রিয়া হয়ে গেলো একদিন, স্যালাইন খাচ্ছিলাম। ডাবের পানি, পানি বেশী বেশী খেতে বললেন আপুরা, ইমার্জেন্সি ডক্টর দেখাতে বললেন। সেটাই করলাম।
আমি যেহেতু কম পরিচিত, কোলাহল বিহীন একটা মেডিকেল ডক্টর দেখাতাম, কারন তাদের সার্ভিস ভালো লাগে শহরের এক কোণে হওয়ায় তেমন ঝামেলা নেই, পর্দার বিষয়টাও আছে এখানে। আবার খরচও কম পরতো।
কিন্তু আমার ভাইয়া বারবার বলতো একটু আরো ভালো মেডিকেলে ডক্টর যেন দেখাই, সে হিসেবে বাইরে প্রাইভেট ডক্টর দেখাতে গেলাম। আমি একটু হালকা পাতলা গড়নের তো প্রেগ্ন্যাসির শেষ সময়ও আমাকে খুব বেশী ভারী দেখা যায়নি।
এই ডক্টর আমাকে দেখেই বলে আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে বাচ্চার ওজন অনেক কম, দ্রত আল্ট্রা করে আমাকে দেখান তো, দেখালাম, রিপোর্ট আসলো ওজন মোটামুটি ঠিকই আছে, না বেশী না কম। ওজনের ব্যাপারে উনি আরো অনেক কথাই বললো, আমি এতে আসলে একটু আতংকিতও হয়েছিলাম। তবে খারাপ লাগলো আমার আগের মেডিকেলের ব্যাপারে উনি একটু ছোট করে কথা বললেন। যা আমার ভালো লাগেনি। এরপরে আর উনার কাছে যাইনি। আগে যেটাতে নিয়মিত চেকআপ করতাম সেখানেই গিয়েছি।
রোজা রেখেছিলাম ২৬টা। তেমন খারাপ লাগেনি রাখতে। তবে রোজার পর যখন চেকআপে গেলাম তখন আমার অ্যামনিউটিক ফ্লুইডের পরিমাণ আসলো ৬.৬। আগে ছিল ১২.৭ এর মতো।
দৌলা আপুদের গ্রুপে জিজ্ঞেস করলাম উনারা বললো রোজা রাখায় এরকম হয়েছে হয়ত। আপনি বেশী বেশী পানি, ডাবের পানি তরল জাতীয় খাবার খান। খেজুর খেতাম রেগুলার। শেষ দিকে বাড়িয়ে খাওয়ার চেষ্টা করতাম।
খেজুর, বাদাম এগুলা নিয়ম করে খাওয়ার চেষ্টা করতাম কারন এগুলা খাওয়ার উপকারিতা বলে শেষ হবে না। এবার আসি ব্যায়ামের ব্যাপারে আসলে শুরু থেকে যেহেতু এই রিলেটেড অনেক পড়া পড়েছি সেখানে জানতে পারি ব্যায়ামের কথা। তো শুরু থেকে ডিপ ব্রিদিংটা করার চেষ্টা করতাম। কেগেল ব্যায়ামটা ভীষণ উপকারি। রাবেয়া রওশীন আপু কেগেল এক্সরসাইজের ব্যাপারে বলেছিলেন উনার কাছ থেকেই জানলাম এটা আসলে কত সহজ, না হলে আগে এটাকে খুব কঠিন মনে করতাম। এছাড়া বাটারফ্লাই ব্যায়ামটা করতাম নিয়মিত। হিপ রোটেশন মাঝে মাঝে করতাম।
যথারীতি আমার ডিউ ডেট পার হয়ে গেলো, পরদিন ডক্টর চেকআপে গেলাম, বললো আপনি ২/৩ দিন দেখেন এরপর কোন পেইন না উঠলে হসপিটালে এডমিট হয়ে যাবেন। বাসায় আসলাম,পরের ৩ দিনও গেলো এখনো কোন লক্ষণ কিছু নেই। চিন্তা হচ্ছে, সবাই সকাল থেকে প্রতিদিন কল করে জানতে চায়। এতে আরো টেনশন হয়।
এমনিতে আমি মুভমেন্ট খেয়াল রাখি। কিন্তু মানসিকভাবে অস্থির লাগে, সময় চলে যাচ্ছে। দৌলা আপুদের জিজ্ঞেস করলাম এই ব্যাপার উনারা বললেন এরকম হয় ডিউ ডেটে হবে যে এরকম কোন কথা না। এক সপ্তাহ লেটে হওয়াও স্বাভাবিক। তবে আপনি হাঁটাহাঁটি, সিঁড়ি উঠানামা করুন বেশী বেশী। হাঁটাহাঁটি করতাম নিয়ম করে। কিন্তু সময় তো আসলে যাচ্ছে না।
৭ দিন পার হলো, গেলাম আবার ডক্টরের কাছে। আমি সবসময় যে ডক্টর দেখাই উনি ছিলেন না আরেকজন দেখাতে হলো। এই ডক্টর বেশ অমায়িক। উনি আমার পিভি চেক করলেন, বললেন মাত্র ১.৫ সেমি তবে পুরাপুরি না এমনভাবে ওপেন হয়েছে। আপনার বাসা যেহেতু কাছে একটা আলট্রা করে আমাকে দেখান।
রিপোর্ট আসলো পানির পরিমাণ মাত্র ৫.৮। আল্ট্রার ডক্টর বললো আপনার তো ডিউ ডেট পার হয়ে গেছে, পানির পরিমাণও কম, তো আপনি বসে আছেন কেন.?
একটু আতঙ্কিতও হলাম, কারণ বার্থ রিলেটেড অনেক ব্লগ যখন পড়েছি সেখানে পানির পরিমাণটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ দেখলাম। একজনের পানির পরিমাণ ৮ ছিলো যে ডক্টর বারবার সিজার করার জন্য বলছিলো, সেখানে আমার তো মাত্র ৫.৮।
রিপোর্ট নিয়ে গেলাম আবার ডক্টরের কাছে, উনি বললেন আপনার বাবুর ওজন ঠিক আছে, নরমাল হওয়ার জন্য এর চেয়ে বেশী লাগবে না। আর পানির পরিমাণ যা আপনি আরো ২ দিন অপেক্ষা করে দেখতে পারবেন যদি না এর ভিতর পেইন উঠে। তবে মুভমেন্ট খেয়াল রাখবেন।
আমি নিজেই আশ্চর্য হলাম এত কম পানির পরিমাণ নিয়ে উনি এটা কীভাবে বললো!
তবে এই ডক্টরের কথায় আমি সাহস পেলাম। কনফিডেন্স ফিরে আসলো, না আমার সব ঠিক আছে, আল্লাহ চাইলে সব ঠিকঠাক হবে ইন শা আল্লাহ।
বাসায় আসলাম। বাসায় আসার পর দুইবার ব্লাডি শো দেখা গেলো।দৌলা আপুদের জিজ্ঞেস করলাম উনারা বললেন পিভি চেকের কারনে। তবে আপনার হয়ত খুব তাড়াতাড়ি পেইন উঠবে। আপনি বেশী বেশী হাঁটাহাঁটি ও সিঁড়ি উঠানামা করুন।
তখন বিকেল ছিল এরপর অনেক হাঁটলাম, সিঁড়ি উঠানামা তো আছে।
বেশী বেশী পানি খাচ্ছিলাম, টুকটাক কিছু না কিছু খাচ্ছি। কারণ একটা জায়গায় পড়েছিলাম এই সময়ে নিজেকে স্ট্রং থাকতে হবে, তার জন্য তো নিজের খাওয়া দাওয়া ঠিক রাখতে হবে।
আমার টিউশন ছিলো রাতে, স্টুডেন্টদের বন্ধ দিইনি, কারণ ডেলিভারির পর বন্ধ দিব এর আগে যতটুকু পারি ওদেরকে পড়ানোর চেষ্টা করেছি। ওরা যখন পড়তে আসলো তখন আমার হালকা হালকা ব্যথা হচ্ছিল ওদেরকে পড়তে দিয়ে যখনই ব্যথা আসতো একটু হেঁটে আসতাম। তখন রাত ৮ টা সম্ভবত।
এরপর নামাজ, খাওয়া দাওয়া করলাম।
রাত ১২ কী ১২:৩০ এর দিকে হালকা পেইন আসে, কতক্ষণ থাকে আবার আসে যায় এরকম। বাসার সামনে হাঁটাহাঁটি করি।মোবাইলে কনট্রাকশন এপ ডাউনলোড করছিলাম। ব্যথা আসলে কতক্ষণ থাকে জানার জন্য। দেখলাম পেইনটা ৩০ মিনিট পর পর আসছে ৫ মিনিট, ৬ মিনিট থাকে বা আরো কম ও থাকে।
আমি চিন্তা করছিলাম রাতেই কি হসপিটাল যেতে হবে? এত রাতে কেমনে কী.. এরকম হালকা পেইন আসছে যাচ্ছে বাসার কাউকে জানাইনি। এমনকি আমার স্বামীকেও না। জানিনা অদ্ভুত এক বিশ্বাস আসলো যে সকাল পর্যন্ত ওয়েট করতে পারব।
সকালে ঘুম ভাঙলো পেইনের কারনে যেটা রাত থেকে একটু তীব্র ছিলো। আমি একজনের লেখায় পড়েছিলাম পেইন উঠলে গোসল করে ফেলতে কারণ ফলস পেইন হলে চলে যাবে আর না হলে তীব্র হবে।
উঠে গোসল করলাম, গোসলের পর পেইনের মাত্রা বাড়ছে।
যখনই পেইন আসে আমার মা অথবা husband কে বলতাম কোমরের নিচের অংশে ম্যাসাজ করে দিতে। আর হিপ রোটেশনটা করতাম। এটা ভালো লাগত, ব্রিদিং করার চেষ্টা করছি।
আরেকটা ব্যায়ামের কথা বলতে ভুলে গেছি, স্কোয়াটিংও মাঝে মাঝে করতাম। পেইন যখন উঠলো তখনও এটা করছিলাম। তবে এগুলা খুব দ্রুত হচ্ছিল।
ব্যথার সময়টা খুব কমে আসছিলো ৫/৬ মিনিট ব্যবধানে আসছিলো। আর খুব তীব্র। সিএনজি ডেকে আনলো, হসপিটাল ব্যাগ আগেই রেডি করা ছিলো। হসপিটাল যাওয়ার পথে পেইনটা মনে হয় সহ্য সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। হসপিটালে ডক্টর তখন রোগী দেখছেন, আমি ইমার্জেন্সিতে গেলাম। আমার আম্মা খুব তাড়া দিচ্ছিলেন নার্সদের যে আমার মেয়েকে একটু দ্রুত দেখেন।
আমাকে নিয়ে গেলো, ব্যাথায় আমি তখন শেষ, নার্স তখন আমাকে বললো এরকম সহ্য করতে হবে এসময়, আপনার মা যেমন বললো আমি তো মনে করছিলাম আপনার এখনই বাচ্চা হয়ে যাচ্ছে। নার্সের এইকথা ভালো লাগলো না। এসময়টা কেমন তারা তো জানে, এরকম কর্কশ করে না বললেই হতো। ডক্টর পিভি চেক করলেন।
এই পিভি চেক করাটা আমার কাছে খুব আতঙ্ক লাগে।এখনও ভয় লাগে এটার কথা মাথায় আসলে।
ডক্টর জানালেন আমার ৬ সেমি ডায়ালেট, তবে বাচ্চার হার্টবিট কমে গেছে। পরে শুনেছি আম্মা আর আমার স্বামীকে ডক্টর বলেছিলো ওর সব ঠিক আছে নরমালে ট্রাই করবো, তবে বাচ্চার জন্য NICU লাগতে পারে। এটা শুনে আমার আম্মা তো কান্নাকাটি, কারণ ওই মেডিকেলে NICU এর ব্যবস্থা ছিল না, অন্য মেডিকেল নিয়ে যেতে হবে লাগলে। আমাকে দ্রুত বেডে নিল, অক্সিজেন দিলো। ডোজ দিলো পেট পরিষ্কার করার জন্য। এরপর পিটোসিনও দিলো।
ওয়াশরুম থেকে আসার পর আমাকে বললো কিছু খেয়ে নিতে, আম্মা আমাকে খাইয়ে দিলেন। ব্যথার মাত্রায় আর কিছু সহ্য করতে পারছিলাম না। জোরে জোরে কান্নাও করছি। তবে আল্লাহু আকবার বার বার বলছিলাম। আগে থেকেই মাথায় সেট করে রেখেছি যখন ব্যথায় কাতরাবো তখন আল্লাহু আকবার বলবো, দরূদ পড়বো, আর এই দোয়া পড়বো,
اللَّهُمَّ لَا سَهْلَ إِلَّا مَا جَعَلْتَهُ سَهْلًا، وَأَنْتَ تَجْعَلُ الْحَزْنَ إِذَا شِئْتَ سَهْلًا
বাংলা উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা লা সাহলা ইল্লা মা জা‘আলতাহু সাহলান, ওয়া আনতা তাজ‘আলুল হাজনা ইযা শি’তা সাহলান।
বাংলা অর্থ:
হে আল্লাহ! আপনি যা সহজ করে দেন, তা ছাড়া কিছুই সহজ নয়। আর আপনি চাইলে কঠিন বিষয়কেও সহজ করে দেন।
কালেমা শাহাদাত, দোয়া ইউনূসও পড়ি।
পিটোসিন দেওয়ার ৫/৬ মিনিটও হয়নি আমি আর নিতে পারছিলাম না পেইনটা, আম্মাকে বললাম নার্সকে ডাকেন, আর পারছি না। নার্স আসলো আবারও পিভি চেক। নার্স বললো আপনি হেঁটে ওটি রুমে যেতে পারবেন, আমি হ্যাঁ, না কিছুই বলতে পারিনি। তবে হেঁটেই নিয়ে গেছে আমাকে। দুই আন্টি দুই দিকে ধরে।
ওটি রুমে প্রবেশ করে হাঁটাছি আর মনে হচ্ছে রুমটা এত বড় কেন কই নিয়ে যাচ্ছে, আর হাঁটতে পারছি না, মনে হচ্ছে নিচের দিকে কিছু নেমে যাচ্ছে। আমি বসে পড়লাম, বললাম আর পারব না, আমার মনে হয় ওয়াশরুমে যেতে হবে। নার্স বললো আরে আপনার এখনই বাচ্চা হবে এজন্য এরকম লাগে। ধরে বেডে শোয়ালো।
আমার কাছে মনে হচ্ছিল বসে পুশ করলে সুবিধা হতো কারন বসার পজিশনটা সহজ ছিলো। কিন্তু সব হসপিটালে তো একই নিয়ম বেডে শোয়াবে।
বেডে নেওয়ার পর আমার আর পেইন আসছে না, কিন্তু কিছুক্ষণ আগে যখন আমি উপুড় হয়ে বসছিলাম তখনই মনে হচ্ছিল বাচ্চা এখনই হয়ে যাবে।
নার্সরা বলছে এই আপনাদের এই এক সমস্যা বেডে আনলে ব্যথা গায়েব হয়ে যায়।
এরপর ব্যথা আসলো পুশ করতে বললো, করলাম, ব্যথা যখন নাই তখনও নার্সদের তাড়াহুড়োয় পুশ করলাম যার ফলাফল টিয়ার হলো। এপিশিওটোমি তো তারা দিলোই, আবার টিয়ারও হলো। ব্যথার সময় আমি কান্না করছি, আল্লাহু আকবার বলছি আর দোয়া তো পড়ছিই। ডক্টর বললো তুমি শান্ত থাকো, চিৎকার করো না। আর নার্সরা শুধু তাড়াহুড়ো। এরপর বাচ্চা হওয়ার আগে পানি ভাঙলো টুস করে আমার পাখিটা দুনিয়ায় চলে আসলো আলহামদুলিল্লাহ।
বাবুকে দ্রুত নিয়ে গেলো এদিকে আমাকে সেলাই দিচ্ছে।
সেলাই দিচ্ছে যে আমি তখনও আল্লাহু আকবার, আর আল্লাহুম্মা লা সাহলা….. দোয়াটা পড়ছি..
নার্সের সাথে টুকটাক কী বিষয় নিয়ে কথাও বললাম।
কতক্ষণ পরে আমার কাছে বাবুকে নিয়ে দেখালো এই যে তোমার ছেলে হয়েছে, দেখো। আলহামদুলিল্লাহ লাল লাল কিউট ঠোঁট, আর ছোট্ট মুখখানি দেখে কী যে প্রশান্তি লাগলো আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ।
তারপর আমাকে ওটি থেকে নিয়ে আসলো, জেনারেল বেডে দিলো। বললো ওকে কিছু খাওয়ান। আমি বললাম ডাবের পানি খাব। তখন শরীরে কেমন যেন এক স্বস্তি আসলো আলহামদুলিল্লাহ। হ্যাপিনেস ও রিল্যাক্স দুইটা একসাথে। এরকম শান্তি মনে হয় কোনসময় লাগেনি। এক অদ্ভুত প্রশান্তি আলহামদুলিল্লাহ।
ডক্টর বললো আপনাদের সব ঠিক থাকলে বিকেলের মধ্যে চলে যেতে পারবেন। ৬ ঘন্টা থেকে আমরা সন্ধ্যা ৭টার সময় বাসায় চলে আসি,আলহামদুলিল্লাহ।
আমি আমার প্রেগ্ন্যাসির শুরু থেকে শুধু দোয়া করতাম আল্লাহ আমার হসপিটালে থাকতে ভালো লাগেনা আমার বিষয়টা এমনভাবে সহজ করে দিন যেন হসপিটালে আমাকে খুব বেশি সময় থাকতে না হয়।
কারন অনেক আপুদের বার্থ স্টোরি পড়েছি যেখানে লেবার পেইন দীর্ঘসময় ছিলো, ওনারা অনেক কষ্ট করেছেন। এই বিষয় গুলো নিয়ে খুব চিন্তিত থাকতাম, আর দোয়া করতাম। আল্লাহ সহজ করেছেন।
তবে ডেলিভারির এপিশিওটোমির কষ্ট নিয়ে ভুগতে হয়েছে দেড় মাস। পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশন নিয়ে বলতে হলে বলব পরিবারের সদস্যরা যদি সাপোর্টিভ হয় তাহলে মা রিল্যাক্স থাকেন।
আমার পাশে আমার মা, স্বামী, আমার মামী ছিলেন বাবুর দেখাশোনা করতে, তারা অনেক হেল্প করেছেন।
বাচ্চার বাবা যখন এক সপ্তাহ পর তার নিজের জায়গায় চলে গেলো তখন আম্মা আর অন্যরা পাশে থাকলেও একটা শূন্যতা ঘিরে ধরলো। Husband এর সহযোগীতা, মানসিক সাপোর্ট অনেক গুরুত্বপূর্ণ আফটার ডেলিভারিতে, পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে।
এজন্য পুরো প্রেগ্ন্যাসিতে আমি আমার স্বামী এবং মায়ের প্রতি অনেক অনেক কৃতজ্ঞ। যখন যা খেতে চেয়ছি হোক ভোর ৪টা, রাত ১২টা বানিয়ে আমার মা দিয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ। ডেলিভারির পরে বাচ্চার যত্ন, আমার যত্ন সব একা হাতে সামলেছেন। আসলে মা ছাড়া মা হওয়ার জার্নিটা খুব কষ্ট। আল্লাহ পৃথিবীর সব মায়েদের নেক হায়াত দিক,তাদের প্রতি ইহসান করুক যেভাবে তারা আমাদেরকে করেছেন।
رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
অর্থ:
হে আমার প্রতিপালক! আমার মা-বাবার প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা ছোটবেলায় আমাকে লালন-পালন করেছেন।
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ
বাংলা উচ্চারণ:
রব্বিগফির লি ওয়া লি-ওয়ালিদাইয়া ওয়ালিল মুমিনীন ইয়াওমা ইয়াকূমুল হিসাব
বাংলা অর্থ:
হে আমার রব! আমাকে, আমার মা-বাবাকে এবং সব মুমিনকে ক্ষমা করুন, যেদিন হিসাব কায়েম হবে।
সন্তানের জন্য এই দোয়াগুলো করতাম :
১. (সন্তানকে নেককার করার জন্য)
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي
বাংলা উচ্চারণ:
রব্বিজ‘আলনী মুকীমাস সালাতি ওয়া মিন যুররিয়্যাতী
বাংলা অর্থ:
হে আমার রব! আমাকে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বানান এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও (এ গুণ দিন)।
২. (সন্তানের জন্য সামগ্রিক দোয়া)
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ
বাংলা উচ্চারণ:
রব্বি হাবলি মিনাস
২. (সন্তানের জন্য সামগ্রিক দোয়া)
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ
বাংলা উচ্চারণ:
রব্বি হাবলি মিনাস সালিহীন
বাংলা অর্থ:
হে আমার রব! আমাকে নেক সন্তান দান করুন।
৩. (সন্তানদের চোখের শীতলতা বানানোর দোয়া)
আরবী (হরকতসহ):
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ
বাংলা উচ্চারণ:
রব্বানা হাবলানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ‘ইউন
বাংলা অর্থ:
হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন।
৪. (সন্তানের হেফাজতের জন্য)
أُعِيذُهُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ
বাংলা উচ্চারণ:
উঈযুহু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাহ
বাংলা অর্থ:
আমি তাকে আল্লাহর পূর্ণ বাণীর মাধ্যমে আশ্রয় দিচ্ছি, সব শয়তান ও ক্ষতিকর জিনিস থেকে।
(মেয়ে হলে “أُعِيذُهَا” পড়বে)
৫. (দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণের জন্য)
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً
বাংলা উচ্চারণ:
রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ
বাংলা অর্থ:
হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দিন।
সর্বশেষ বলতে চাই, মহান আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া কিছুই সহজ নয়। আমরা শুধু চেষ্টা আর দোয়া করে যাব ইন শা আল্লাহ।
উম্মে জারীর
পার্টিসিপ্যান্ট, অনলাইন দৌলা কনফারেন্স ২০২৫, মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার বিডি
Other post
Tag:বার্থ স্টোরি
You may also like
লেবারের লক্ষণ নেই ভাবছিলেন যে মা, তার ন্যাচারাল ভিব্যাক হয়েছে — দৌলা ডায়েরী সিরিজ (পর্ব ৪১)
ভিব্যাক তা-ও ন্যাচারাল! আলহামদুলিল্লাহ!! অথচ এই মা ৩৮ সপ্তাহেও ভাবছিলেন, উনার লেবারের কোন লক্ষ্মণ নেই কেন! আসলে, নরমাল ডেলিভারি এমনই। সবাই পূর্ব লক্ষ্মণ দেখে না। তবে বডি রেডি থাকলে ফুল টার্মের কাছাকাছি গিয়ে হঠাৎই পেইন শুরু হয়ে যেতে পারে। এই …
আমি পেরেছি আপু! — মারুফা আপুর বার্থ স্টোরি (দৌলা ডায়েরী সিরিজ: পর্ব ৪০)
মারুফা আপু ৩৭ সপ্তাহ থেকে আমার দৌলা সার্ভিস নিচ্ছিলেন। প্রেগন্যান্সিতে আপু খাবার ও এক্সারসাইজ মোটামুটি মেইনটেইন করেছেন। শেষের দিকে হাঁটতে গেলে পায়ে কোথাও যেন কিছু একটা বাধে, এমন অনুভূতির কথা বলেছিলেন। বাবুর পজিশন নিয়ে আমার একটু সন্দেহ হয়। কিছু প্রশ্ন …
ইডিডি পার হয়ে নরমাল ডেলিভারি — দৌলা ডায়েরী সিরিজ (পর্ব ৪২)
আপু খুবই শান্ত মানুষ। এতই শান্ত যে হ্যালো হ্যালো বলে বুঝতে হতো লাইনে আছেন কিনা। এই শান্ত সভাবই হয়তো আপুর স্টোরির স্পটলাইট। ৩৬ সপ্তাহ থেকে দৌলা সার্ভিস নেন। আলহামদুলিল্লাহ উনার পুরো প্রেগন্যান্সি একদম স্মুথ ছিল। নিউট্রিশন ও এক্সারসাইজও ভালোভাবে মেইনটেইন …
