আমার সিজারিয়ান ডেলিভারির গল্প
- Posted by MNCC Moderator
- Date May 7, 2025
- Categories Birth Story, Others

আজ প্রায় ২ বছর পর লিখতে বসলাম আমার প্রথম মা হবার গল্প।
তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে আমার একটুও ঘুম হতো না। শরীরের ভার, উদ্দীপনা, অজানা এক অনুভূতি সব মিলিয়ে চোখে ঘুম আসতো না একেবারেই। ৩৯ সপ্তাহ ৬ দিন যেদিন আমার লেবার শুরু হয়, তার আগের রাতটাও কেটেছে একেবারেই নির্ঘুম। সকাল ১১টা পর্যন্ত জেগে ছিলাম। তখন থেকেই মাঝে মাঝে কিছু অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল, তবে নিশ্চিত ছিলাম না, এগুলো কনট্রাকশন কি না। দুপুর ১টার দিকে আমি নিশ্চিত হলাম, হ্যাঁ, এগুলো কনট্রাকশনই। একটা অ্যাপ দিয়ে হিসেব করলাম, সময় মিলিয়ে দেখলাম।
তখন খুব ক্লান্ত লাগছিল। দৌলা ফারইয়াব হাসানকে জানালাম, গোসল করলাম, হালকা কিছু খেলাম, একটু এক্সারসাইজ করলাম, নামাজ পড়লাম, খেজুর খেয়ে নিলাম।
বিকেল ৩টার দিকে একটু ভয় লাগলো, আমি তো একটুও ঘুমাইনি! যদি পুশ করার সময় একেবারে নিস্তেজ হয়ে যাই? তাই আবার ঘুমাতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু কিছুতেই পারলাম না। ৪টার দিকে আমার পানি ভাঙা শুরু হলো। একেবারে হালকা, ১-২ ফোঁটা পানি। মোটেও ভয় পাওয়ার মতো কিছু না।
সন্ধ্যা ৭টার দিকে আমার কনট্রাকশনগুলো আরও তীব্র ও নিয়মিত হয়ে উঠল। আমি তখন অ্যাক্টিভ লেবারে ঢুকে গেছি। বুঝলাম, এবার সত্যিই সময় এসে গেছে। ব্যাথা হচ্ছিল, কিন্তু আমি বেশ ভালোভাবে তা সামলাতে পারছিলাম। আমার সাপোর্ট পার্সন আমাকে ব্যাথার সময় ব্যায়াম করাতে সাহায্য করছিলেন, যা অনেকটাই স্বস্তি দিচ্ছিল।
রাত ৯টার দিকে হাসপাতালে পৌঁছালাম। তখন আমার ডায়ালেশন ছিল ৭ সেমি। শুনে অবাক হলাম, আমি আরও বেশি ব্যাথা আশা করেছিলাম। লেবার শুরুর আগেই আমার ৩ সেমি ডায়ালেশন ছিল। ডাক্তার বললেন স্লো আগাচ্ছে, উনি পানি ভাঙতে চান। একটা ইনজেকশন দিলেন এবং দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই পানি ভাঙলেন।
সেই পানি ছিল সম্পূর্ণ সবুজ, গাঢ় সবুজ। বেড, ফ্লোর সবদিকে সবুজ আর সবুজ। বুঝলাম, বাবু অনেক আগেই মেকোনিয়াম পাস করে ফেলেছে। আমার মনে হয় না এটা ইনজেকশনের কারণে, কারণ সেটা তো মাত্র কয়েক মিনিট আগে দেওয়া হয়েছে। আমি জানিনা Recurring UTI এবং diet controlled gestational diabetes fetal distress এর কারণ হতে পারে কিনা। হয়তো lengthy labour এর কারণ।
পরের এক ঘণ্টার মধ্যে ব্যাথা আরও বেড়ে গেল এবং আমার ডায়ালেশন খুব ধীরে ৮ সেমিতে পৌঁছাল। তখনও আমি ব্যাথা খুব তীব্র হলেও সহ্য করছিলাম, দুয়া করছিলাম, স্কোয়াট করছিলাম।
তবে যেহেতু বাচ্চা অনেক আগেই মেকোনিয়াম পাস করেছিল এবং ডায়ালেশন ৮ সেমিতে হল্ট হয়েছিলো, ডাক্তার বললেন সিজার করতে হতে পারে। তখন বাচ্চার হার্টবিট চেক করা হয়। সবসময়ই ১৫০-১৫৭ এর মধ্যে থাকত, বাসায় ফিটাল ডপলার দিয়ে চেক করতাম। কিন্তু সেদিন ওর হার্টরেট আস্তে আস্তে কমেই যাচ্ছিল, আর অনেকক্ষণ ধরে নিচেই ছিল। একবারও বাড়েনি। আবারও OT তে নিতে চাইলো। আমি রাজি হইনি, কিন্তু ডাক্তার বললেন, তাহলে একটা বন্ড সাইন করতে হবে যদি কিছু হয়, হাসপাতাল বা ডাক্তার দায়ী থাকবে না। সাইন করলাম। এনেস্থেসিয়া ডাক্তারও বাসায় চলে গিয়েছিলেন। যাওয়ার আগে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, “আপনি কি নিশ্চিত নরমাল ডেলিভারি করবেন?” আমি বলেছিলাম, “হ্যাঁ।”
কিন্তু রাত ১২টার দিকে হঠাৎ করেই বাচ্চার হার্টবিট অনেক কমে গেল এবং বেশ কিছু সময় ধরে কমই থাকল। তখন আর দেরি না করে আমি নিজেই বললাম, এখন OT-তে নেন। ডাক্তার বাসা থেকে ফেরত আসলো আবার।
ডাক্তার দুবার সুই ঢুকালেন এবং বললেন, পা একসাথে করে ফিটাল পজিসনে যেতে। আমার ডায়ালেশন তখন ৯ সেমি ছিল, বাচ্চা নিচে নেমে গিয়েছিল। আমি পা একসাথে করতে পারছিলাম না। কাঁদছিলাম। মনটা খুব খারাপ লাগছিল। আমি আরও দ্বিগুণ ব্যাথা সহ্য করতে পারতাম, কিন্তু তখন আমার সি-সেকশন করতে হবে। আমি একটা নার্সকে ডেকে বলি, “আমার পা দুটো একটু একসাথে চেপে ধরেন,”। আমি পুরো অপারেশনটাই অজ্ঞান ছিলাম। একেবারে কিছুই মনে নেই।
বাবু জন্মের পর ইনফেকশন ছিল, কারণ ও কিছুটা মেকোনিয়াম গিলে ফেলেছিল। ডাক্তার বললেন, ওকে এনআইসিইউতে রাখতে হবে, কিন্তু আমি রাখতে চাইনি। ও তিন দিন ক্যাবিনে ছিল, অ্যান্টিবায়োটিক চলছিল। আলহামদুলিল্লাহ, পরে ঠিক হয়ে যায়।
এই পুরো অভিজ্ঞতার পরে আমার বেবি ব্লু ছিল। নরমাল ডেলিভারি না হওয়ার একটা কষ্ট ছিল। তিন সপ্তাহ পর সেই ভারী মনটা একটু হালকা লাগতে শুরু করেছিল আলহামদুলিল্লাহ।
এই হলো আমার গল্প।
আমি মনে করি, প্রিনেটাল কোর্স আর আমার দৌলার সঙ্গ আমাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছিল। এই সময়টাতে সবসময় পাশে ছিল দৌলা ফারইয়াব হাসান আপু। উনি যেন আমার কাছে আল্লাহর পাঠানো একটা গিফট, আলহামদুলিল্লাহ। উনার সময়, সময়োপযোগী তথ্য, ভালোবাসা, পাশে থাকা, সবকিছু আমাকে জ্ঞান ও মানসিক দিক থেকে অনেক শক্ত করে তুলেছিল। আল্লাহ উনাকে উত্তম প্রতিদান দিক। এখন আমি নিজে দৌলা হতে চাই। আমি চিরকাল কৃতজ্ঞ আমার দৌলা আপুর কাছে। আর আমি এখন প্রতিটি মাকে বলি, প্রিনেটাল কোর্স করো। যদি পারতাম, আমি সবাইকে ধরে বেঁধে কোর্স করাতাম।
সিজার দরকার ছিল এবং সেটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। যদিও আমি বিশ্বাস করি, নরমাল ডেলিভারিতেও আমার বাচ্চা বেঁচেই থাকত, হায়াত যেহেতু ছিলই—হয়তো কিছু জটিলতা থাকত। কিন্তু আমার মনে হয়, যদি আমি নিজে না বুঝতাম আর ডাক্তার বলেছে বলেই সি-সেকশন করতাম, তাহলে আমি হয়তো এখন পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে থাকতাম।
ফারিসা তাযরী আহমেদ
রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স পার্টিসিপ্যান্ট, রেকর্ড ব্যাচ
Other post
You may also like
লেবারের লক্ষণ নেই ভাবছিলেন যে মা, তার ন্যাচারাল ভিব্যাক হয়েছে — দৌলা ডায়েরী সিরিজ (পর্ব ৪১)
September 3, 2026
ভিব্যাক তা-ও ন্যাচারাল! আলহামদুলিল্লাহ!! অথচ এই মা ৩৮ সপ্তাহেও ভাবছিলেন, উনার লেবারের কোন লক্ষ্মণ নেই কেন! আসলে, নরমাল ডেলিভারি এমনই। সবাই পূর্ব লক্ষ্মণ দেখে না। তবে বডি রেডি থাকলে ফুল টার্মের কাছাকাছি গিয়ে হঠাৎই পেইন শুরু হয়ে যেতে পারে। এই …
আমি পেরেছি আপু! — মারুফা আপুর বার্থ স্টোরি (দৌলা ডায়েরী সিরিজ: পর্ব ৪০)
September 3, 2026
মারুফা আপু ৩৭ সপ্তাহ থেকে আমার দৌলা সার্ভিস নিচ্ছিলেন। প্রেগন্যান্সিতে আপু খাবার ও এক্সারসাইজ মোটামুটি মেইনটেইন করেছেন। শেষের দিকে হাঁটতে গেলে পায়ে কোথাও যেন কিছু একটা বাধে, এমন অনুভূতির কথা বলেছিলেন। বাবুর পজিশন নিয়ে আমার একটু সন্দেহ হয়। কিছু প্রশ্ন …
ইডিডি পার হয়ে নরমাল ডেলিভারি — দৌলা ডায়েরী সিরিজ (পর্ব ৪২)
September 3, 2026
আপু খুবই শান্ত মানুষ। এতই শান্ত যে হ্যালো হ্যালো বলে বুঝতে হতো লাইনে আছেন কিনা। এই শান্ত সভাবই হয়তো আপুর স্টোরির স্পটলাইট। ৩৬ সপ্তাহ থেকে দৌলা সার্ভিস নেন। আলহামদুলিল্লাহ উনার পুরো প্রেগন্যান্সি একদম স্মুথ ছিল। নিউট্রিশন ও এক্সারসাইজও ভালোভাবে মেইনটেইন …
