Back

ধৈর্য, প্রস্তুতি আর আল্লাহর রহমতে আমার নরমাল ডেলিভারির গল্প

আমি যখন প্রথম কনসিভ করি, তখন প্রথমেই অনুভব করেছিলাম যে, সঠিক প্রস্তুতি ছাড়া এই যাত্রা সম্পূর্ণ করা কঠিন হতে পারে। সেই কারণে, আমি ফেইসবুক থেকে রৌদ্রময়ী স্কুলের পেইজ সম্পর্কে জানতে পারি। আমার এবং আমার বেবির কথা চিন্তা করে, আমি এই কোর্সে ভর্তি হই। এই কোর্সটা আমার জন্য ছিল এক আশীর্বাদ। এখান থেকে আমি প্রেগন্যান্সি, ডেলিভারি এবং পোস্ট পার্টাম যত্ন সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও প্রস্তুতি পেয়েছি।
 
প্রেগন্যান্সি চ্যালেঞ্জ এবং সমাধান:
প্রথম দিকে আমি গ্যাস্ট্রিক এবং হাইপোথাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছিলাম, যা একেবারে শারীরিকভাবে আমাকে দুর্বল করে তুলেছিল। সাথে বমির জন্য কোন কিছুই খেতে পারতাম না। তবে, আমি নিয়মিত ডাক্তারি পরামর্শ নিয়েছি এবং খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক ছিলাম। কোর্স থেকে শিখেছি যে, পুষ্টি এবং খাদ্যাভ্যাস প্রেগন্যান্সি সময়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চার মাস থেকে একটু একটি করে খেতে পারতাম।
তাই খাবারের চার্ট ফলো করে প্রতিদিন প্রোটিন ৬০ গ্রাম, আয়রন ৪০ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ১৫০০ গ্রাম, জিংক ১৫ গ্রাম এবং আয়োডিন ১৭৫ মাইক্রোগ্রাম খাওয়ার চেষ্টা করতাম। ৩-৪ লিটার পানি খাওয়ার চেষ্টা করতাম যাতে শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য ঠিক থাকে।
 
ফিজিক্যাল একটিভিটি:
প্রথম তিন মাস, আমি লং জার্নি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছি এবং প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি করেছি। তবে ভারি কাজ করা থেকে বিরত থেকেছি। এর পাশাপাশি, আমি ব্যায়াম করতে শুরু করি ৪ মাস পর। স্কোয়াটিং, পেলভিক রক, প্রজাপতি, পেলভিক ফ্লোর, রিলাক্সেশন এবং ডিপ ব্রিদিং করতে থাকি, যেগুলো আমি ইউটিউবে এবং পরবর্তীতে রৌদ্রময়ী স্কুলের প্রিনেটাল কোর্স থেকে ভালোভাবে জানতে পেরেছি।
 
ডাক্তার নির্বাচন এবং সাপোর্ট:
যেহেতু এটা আমার প্রথম প্রেগন্যান্সি ছিল, আমি একজন সাপোর্টিভ ডাক্তার খোঁজার চেষ্টা করছিলাম। আমি বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি হসপিটাল দেখেছি।অনেক খোঁজাখোঁজির পর ২ জন সরকারি ডাক্তার এবং একজন বেসরকারি ডাক্তার ছিলেন যিনি আমাকে বেশি সময় দিয়ে প্রশ্ন করতেন এবং শুনতেন। এজন্য আমি তাদের সাথে যোগাযোগ রাখতে শুরু করি।
এছাড়া, আমি ঢাকা শহরে একা থাকতাম। ডেলিভারির আগে আমার মায়ের কাছে চলে আসি।তাই বাড়িতে একজন ট্রেনিং প্রাপ্ত মিডওয়াইফ রাখি, যিনি নিয়মিত আমার সাথে যোগাযোগ রাখতেন। এছাড়া, আমি দুটি হসপিটালের সাথে যোগাযোগ রাখি এবং গাড়ি প্রস্তুত রাখি, যেন কোনও জরুরি পরিস্থিতি হলে হাসপাতালে যেতে পারি।
 
শেষের দুই মাসের প্রস্তুতি:
ডেলিভারির আগে শেষের দুই মাসে, আমি দিনে ৭-৮টি খেজুর এবং ১ কাপ আনারস নিয়মিত খেতাম। এছাড়া, আমি ইন্টিমেসিতে একটিভ থেকেছিলাম, কারণ এগুলো জরায়ুর মুখ নরম করতে সাহায্য করে এবং ডেলিভারির প্রস্তুতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই খাবারগুলোও আমি কোর্সের মাধ্যমে শিখেছি এবং সেগুলো আমাকে প্রাকৃতিকভাবে ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করেছে।
 
ডেলিভারি এবং লেবার এক্সপেরিয়েন্স:
আমার EDD ছিল ১, ৭, ৯ ডিসেম্বর। EDD date ওভার হয়ে যাওয়ায় সবাই দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। তবে আমি ভেবেছিলাম ১২-১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ডেলিভারি হবে। ডিসেম্বরের ১ তারিখ থেকে হালকা ব্যথা শুরু হয়েছিল, কিন্তু তা সময়ের সাথে সাথে চলে যেত। আমি জানতাম এটা ফলস পেইন, যেটা আমি কোর্স থেকেই শিখেছিলাম।
১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফলস পেইন আসছিল এবং আমি ধৈর্য্য ধরছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ, আমার বেবির মুভমেন্ট ঠিক ছিল। ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে পেইন না উঠলে আমি ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম।
 
১৫ ডিসেম্বর সকাল ০৭:০০ থেকে পেইন শুরু হয়। ১০ সেকেন্ড থেকে চলে যায়। আবার ১০ মিনিট পরপর পেইন আসতো।এভাবে পেইন আসার সময় কমতে থাকে আর পেইন থাকে বেশিক্ষণ। আমি বুঝতে পারি সেই মাহেন্দ্রক্ষণ চলে এসেছে। এভাবে কনস্ট্রাকশন আসতে থাকে। ধীরে ধীরে কনস্ট্রাকশন এর খুব দ্রুত আসে এবং দীর্ঘক্ষন থাকে। আমি ওজু করে ২ রাকাত নফল নামাজ আদায় করি।আম্মুকে জানালাম এবং আম্মু আমাকে নরম খিচুড়ি, খেজুর এবং পানি খাওয়ালো। তারপর আমি হাঁটাহাঁটি এবং ব্যায়াম করতে থাকি, যেমন মাইলস সার্কিট, রিলাক্সেশন এবং ডিপ ব্রিদিং এগুলো আমাকে খুব সাহায্য করে।
মিডওয়াইফকে জানানো হলে তিনি বললেন, প্রথম বাচ্চার জন্য একটু সময় লাগবে, তাই অপেক্ষা করতে বলেছেন। তবে ধীরে ধীরে পেইন বাড়তে থাকলে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করতে শুরু করি এবং পেইন সহ্য করার শক্তি চাই।
 
আসরের পর মিউকাস প্লাগ যায়। তখনও অসহ্য রকমের ব্যথা। মনে হচ্ছে আগুনের ভেতরে আছি। মাগরিবের পর পানি ভাঙল এবং কিছুক্ষণের মধ্যে মিডওয়াইফ আসে। তিনি ইনডাকশন দেয়ার পর আমার পেইন হালকা কমে যায়, যদিও আমি চাইনি, তবে তার কথায় শুনে নিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পর আবার পেইন শুরু হয়। আমি ডেলিভারি জন্য হেলান দিয়ে বসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু মিডওয়াইফ বলল, এভাবে ওনার অভিজ্ঞতা নেই। তাই আমি চিৎ হয়ে শুয়ে ডেলিভারি করলাম। পুয়িং স্টেপে এসে ৪/৫ বার পুস করার পর আমার বেবি পৃথিবীতে আসে। তখন মনে হলো আমার শরীর থেকে এক কষ্টের যন্ত্রণা বেরিয়ে আসলো। প্রশান্তি তে চোখে ঘুমঘুম লাগলো। প্রায় ১২ ঘন্টা লেবার পেইন সহ্য করার পর ১৫ই ডিসেম্বর ২০২৪ সন্ধ্যা ০৬:৫০ এ আমার বেবি পৃথিবীতে আসে। তখনো জানতাম না সে মেয়ে নাকি ছেলে। কিছুক্ষণ পর জানতে পারি আমার ফুটফুটে কন্যা সন্তান হয়েছে।
 
ডেলিভারির পর:
ডেলিভারির ২ মিনিট পর প্লাসেন্টা ডেলিভারি হয়। তারপর পর আমি আমার প্রিন্সেসকে দেখতে পাই। সব কষ্ট যেন এক নিমেষে ভুলে গেলাম। স্কিন টু স্কিন কনটাক্ট করি। যেটা আমি আগেই আমার আম্মু কে বলে রেখেছি। ওর বাবা আযান দেয় এবং নানাভাই খেজুর দিয়ে তাহনিক করায়। সেলাইয়ের কাজ শেষ হওয়ার পর ব্রেস্ট ফিডিং করাই।
ডেলিভারি পরবর্তী সময়ে কোর্স থেকে শিখে আমি নিজের যত্ন নিতাম এবং বাচ্চার যত্নও সঠিকভাবে নিতাম। প্রথম সপ্তাহে বাচ্চার খাওয়ার সমস্যা ছিল, কিন্তু পরের সপ্তাহ থেকে ব্রেস্ট মিল্ক আসা শুরু হয়।
ব্রেস্টফিডিং নিয়ে অনেক কষ্ট হয়েছে, তবে আমি চেষ্টা করেছিলাম কোন ফর্মুলা না দিতে। আমার হাসবেন্ড ও পরিবার আমাকে সার্বিকভাবে সাপোর্ট করেছে।
 
পোস্ট পার্টাম কেয়ার এবং সেলাইয়ের যত্ন:
বেবি ব্লু আমারও হয়েছে যেহেতু আমি বাড়িতে ছিলাম।হাসবেন্ড কে কাছে পেতাম। এজন্য বেশি খারাপ লাগতো। তবে কেউকে বুঝতে না দিয়ে এই সময়টাও পার করেছি আলহামদুলিল্লাহ।
আমি সেলাইয়ের জন্য প্রথম এক সপ্তাহ চলতে পারতাম না, তবে আমি প্রতিদিন ৩০ মিনিট সেলাইয়ের জায়গায় সময় দিতাম। ১৫ দিন পর থেকে আমি খুব ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করি এবং ৪৫ দিনের মধ্যে সেলাই পুরোপুরি সেরে যায়।
এছাড়া, ১ সপ্তাহ পর থেকে আমি নিয়মিত হালকা গরম পানির সাথে বায়োডিন মিশিয়ে সেলাইয়ের জায়গা পরিষ্কার করতাম এবং খুব ধীরে হাঁটতাম।
 
বেবির যত্ন এবং ব্রেস্টফিডিং:
আমার মেয়ে প্রথম ১ মাস খুব কান্না করতো এবং রাতে ঘুমাতো না, তবে আমি নিশ্চিত ছিলাম, আমি তাকে শুধুমাত্র ব্রেস্ট মিল্কই দিব। প্রথম তিন মাস অনেক কষ্ট হলেও আমার হাসবেন্ড, আম্মু এবং আমার পরিবার আমাকে সমর্থন দিয়ে আমাকে ধৈর্য্য ধরে থাকতে সাহায্য করেছে।
এছাড়া, ১৫ দিন পর আমার ফাইনাল এক্সাম ছিল, যেটা ছিল সত্যিই চ্যালেঞ্জিং। তবে আল্লাহর সাহায্যে আমি সেই সময়ও পার করে ফেললাম।
 
রৌদ্রময়ী স্কুলের অবদান:
এই কোর্স থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান আমাকে প্রতিটি ধাপে সাহায্য করেছে। আমি প্রত্যেক বিবাহিত এবং প্রেগন্যান্ট মা-বোনদের এই কোর্সটি করার অনুরোধ করবো, কারণ এটা শুধুমাত্র শারীরিক নয়, মানসিক প্রস্তুতির জন্যও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই কোর্সটি আমার এবং আমার বেবির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। আলহামদুলিল্লাহ, আমি এবং আমার প্রিন্সেস ভালো আছি।
 
আফরোজ
রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স পার্টিসিপ্যান্ট, ব্যাচ ১৯