Back

প্রি নেটাল স্টাডি, কনফিডেন্ট প্রেগন্যান্সি

study & confident
রব্বে কারীমের অশেষ রহমত যে এমন একটা বার্থ স্টোরি লেখার তাওফিক দিলেন তিনি, আলহামদুলিল্লাহ।
প্রেগ্ন্যাসির প্রথম থেকেই ইচ্ছা ছিল নরমাল ডেলিভারির, ১ম ৩ মাস তেমন কোনো এক্টিভিটিজ করিনি, জানতামও না। আমার বমির সমস্যা ছিল না। মাছ আর মুরগি বাদে সবই খেতে পারতাম আলহামদুলিল্লাহ।

৪র্থ মাস থেকে ডেলিভারি সংক্রান্ত group খুজতে খুজতে মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার group পেয়ে যাই আর মনে হল এটা প্র্যাক্টিসিংদের জন্য ভাল একটা প্লাটফর্ম। তারপর প্রিন্যাটাল কোর্সের ব্যাপারে জানলাম। নিউট্রিশন মেইনটেইন, ব্যায়াম, শোয়ার নিয়ম, লেবার ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে অনেককিছু জানতে পারলাম আলহামদুলিল্লাহ। পর্যাপ্ত পরিমান পানি, প্রোটিন, ক্যালসিয়ামের নির্দিষ্ট চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করতাম দৈনন্দিন খাবারে।

পুরো প্রেগনেন্সিতে আমি অনেক এক্টিভ ছিলাম এটা বলব না কারণ দিনের বেশিরভাগ সময় আমি আমাদের মাদ্রাসার হিফয ক্লাসে বসতাম, এসময় টেইলর সিটিং এ বসতাম + হেলান দিতাম না। অনেকে মাজায় ব্যাথার জন্য হেলান দিয়ে বসে যেটা একদম করা যাবেনা, মাজায় ব্যাথার জন্য ইফেক্টিভ ব্যায়াম করলে আর অসুবিধা হয়না। ক্লাস ফজর থেকে একদম এশা অব্দি হয়। মাঝে ঘুম খাওয়া নাস্তার বিরতিতে হাটাহাটি করতাম ঘরের মধ্যেই। আর বাইরে হাটতে যাওয়ার চেষ্টা করতাম যদিও প্রতিদিন হয়ে উঠত না। স্কোয়াট ও অন্যান্য কিছু ব্যায়াম করতাম অল্প অল্প করে। সবসময় বামকাতে শুয়ে থাকতাম। একদম শেষ সময়গুলোতে ঘর মুছতাম, অল্প স্বল্প কাপড় কাচতাম, বসে গোসলখানার মেঝে ডলতাম। ন্যাচারাল পেইন ইনডিউসের জন্য বিভিন্ন স্টেপ ও ব্যায়ামগুলো করতাম।

এভাবে ৩৩ উইক অব্দি ভালই চলছিলো, এরপর একদিন মাথা ঘুরে পড়ে গেছিলাম, আল্লাহর অনেক রহমত সোজা চিত হয়ে পড়েছিলাম আমার বা বাবুর কারোর কোনো ক্ষতি হয়নি, তবে এ সময় টেস্ট করে জানতে পারলাম হিমোগ্লোবিন ৮ হয়ে গেছে (প্রেগ্ন্যাসির শুরুতে ১৪.৭ ছিল)। ডক্টর বলল, কিছুদিনের মধ্যে খেয়ে কভার করতে নইলে ইঞ্জেকশন দিবে। আলহামদুলিল্লাহ কিছুদিন পর খাওয়া দাওয়া করে দেখা গেলো আয়রন ১১.৫ ঠিকঠাক।

৩৭ উইকে টেস্ট করে দেখলাম fluid লেভেল ৭.৭, ডক্টর বলে সিজার লাগতে পারে! এই সময় প্রিনাটাল কোর্সের টেলিগ্রাম গ্রুপের মডারেটর ডাক্তার আপু আমাকে কিছু পরামর্শ দিলেন fluid লেভেল বাড়ানোর বিষয়ে, এগুলো মেনে চললাম। ৩৯ সপ্তাহে ভিন্ন জায়গায় আল্ট্রা করে দেখি ফ্লুইড ১৮.৭! আগের রিপোর্ট ভুল ছিল নাকি আসলেই ঠিক ছিল এখনো সন্দেহ আছে।

যাহোক, ৩৯ সপ্তাহ ৩ দিনে সরকারি মাতৃসদনে চেকাপ করাতে গেলাম যেহেতু ডেট একদম কাছে জরায়ু খুলছে কি না এটা জানার উদ্দেশ্য ছিল আর হাসপাতালটা কেমন তা জানতে চাইছিলাম। এখানের ডক্টর পিভি চেক করে বলে এক্ষুণি ভর্তি হয়ে যান, আজই। প্রেসক্রিপশনে লেখা জরায়ু ৪.৫ সেমি খোলা, আমার তো পেইন বা লক্ষণ কিছু নাই। হাসবেন্ড বাসায় বলছে এ কথা, ওদিকে আমার আম্মু আর শাশুড়ি দুজনই একরকম দৌড় দিত ভর্তি করতে যাওয়ার জন্য😑

 অনেক কষ্টে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আমার গাইনি ডক্টর যে ম্যম ছিলেন উনাকে ফোন দিলাম, উনিও আমার মতই বললেন, যখন পেইন উঠে তখন ভর্তি হতে, বাসা তো কাছে অযথা এখনই ভর্তি না হলেই ভাল, হাসপাতালের ওরাও নাছোড়বান্দা কতকিছু যে বোঝালো ভর্তি করেন এখন স্যালাইন দিলে বিকালেই বাচ্চা হয়ে যাবে হেন তেন, এগুলো শুনে আমার হাসবেন্ড কনফিউজড। উনি মনে করছেন তাহলে তো ভালই।

যাহোক শেষ পর্যন্ত বাড়ি এলাম আর শাশুড়ীকে বললাম পরিচিত নার্স এনে পিভি চেক করাতে, নার্স দেখে বলে রিপোর্টে যা লিখছে আমি তো তা দেখছিনা, জরায়ু খুলছে কিন্তু খুব সামান্য, ভর্তি হওয়ার মত না। এরপর তো খুব টেনশনে কয়টা দিন কেটেছে যে পেইন কেন উঠেনা, যে রাতে পেইন উঠে সেদিনও ইচ্ছামত বাজার করে এনেছি। রাতে আড়াইটার দিকে হঠাৎ ঘুম ভেংগে মনে হল শুয়ে আরাম পাচ্ছিনা, আমি লাস্টের দিকে সাইড লায়িং পজিশনে শুতাম, আরো উচু করে দিলাম বালিশ তাও ভাল্লাগেনা। মনে হল টয়লেট হবে, দ্রুত টয়লেট করলাম, টয়লেট থেকে বেরিয়েই পেইন শুরু।
কন্ট্রাকশন ট্র্যাকার এপে ট্র্যাক করলে এপ থেকে নোটিশ এলো হসপিটাল যাওয়ার। হাসবেন্ডের সাহায্যে পেইন নিয়েই ধীরে সুস্থে গোসল নামায পড়ে এরপর আম্মু, শাশুড়ীকে ডাক দিলাম। ততক্ষনে ঘন ঘন পেইন আসছে। পেইন এলেই আমি স্কোয়াট করছিলাম বা কিছু ধরে সামনের দিকে ঝুকে থাকছিলাম। আর বিরতিতে হাটছিলাম জা-কে ধরে। হসপিটালে পৌছানোর পর কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলাম পিভি চেক করে গেল তখন ৬ সেমি ডায়ালেটেড ছিল!
আলহামদুলিল্লাহ।

উঠে আস্তে আস্তে আম্মু আর শাশুড়িকে ধরে হাটলাম কিছুক্ষণ এরপর টয়লেট এর চাপ আসছিলো, টয়লেট হলো। কিন্তু এত পেইন লাগছিলো, নার্স এসে শোয়ায় দিল। কিছুক্ষণ পর ডক্টর পিভি চেক করে বলে ফুল ডায়ালেটেড। এ পর্যায়ে আমি নার্সের কথায় একটু কনফিউজড হয়ে ঠিকঠাক পুশ করিনি প্রথমদিকে। পরে সাহস করে পেইন আসলেই পুশ করছিলাম ১ম বারে অল্প পানিসহ লালস্রাব গেল। ওটিতে নেয়ার পথে ২য় বার দাঁড়িয়ে চাপ দিলাম তবে এই দুই চাপে শরীরের সব শক্তি দিইনি, স্টাডি করার পরও আমি কনফিউজড হয়ে গেছিলাম নার্স বলে বেশি চাপাচাপি করলে বাচ্চার মাথা বড় হয়ে যাবে।

এরপর ওটিতে ৩-৪ বার পুশ করলাম। প্রথমদিকে পুশিং এ সব শক্তি নিচের দিকে দিতে পারছিলাম না মনে হচ্ছিলো যেন গলায়ই জোর দিচ্ছি, একটু থেমে অনেক জোরে পুশ করলাম, একজন পেটেও চাপ দিয়ে ধরেছিলো, এসময় এপিসিওটমি দিলো এটা সব পেইনের থেকে এই সময় চিৎকার করছিলাম কিভাবে নিজেই জানিনা। যাহোক কাটার পর আরেকবার চাপ দিতেই বাবুকে ধরে বাইরে বের করে আনলো সকাল সাড়ে নটার দিকে, ওইদিনই ইডিডি ছিল, ১৪ জুলাই। তবে বাবুর গলায় দুইটা কর্ড ছিল যা লাস্ট আল্ট্রায় আসেনি, যার কারণে একটু দেরি হয় বাবু আসতে।

এরপর তো শান্তি আর শান্তি আলহামদুলিল্লাহ। আমি খুব বেশি খুশি হয়েছি যে তারা আমাকে পিটোসিন দেয়নি, আসলে যে পর্যায়ে গেছিলাম তখন পিটোসিনের দরকারও ছিল না। যদিও এপিসিওটমি দেওয়াতে খুব মন খারাপ লাগছিল, তবে অনেক বেশি টিয়ার বা আরো বড় কাটাও লাগতে পারত সেসব তো হয়নি এটাই আলহামদুলিল্লাহ। আড়াইটা থেকে সকাল ৯টা প্রায় সাড়ে ৬ ঘন্টার মত লেবার ছিল, ১ম প্রেগ্ন্যাসি অনুযায়ী আমার কাছে খুবই কম সময় লেগেছে। ভোর ৬টা অব্দি পেইনগুলো সহ্য করতে পারছিলাম। পরেরগুলো বেশি কষ্টকর ছিল।

পুরো জার্নিতে আমার হাসবেন্ড, শাশুড়ি পরিবারের সবার সাপোর্ট আর যত্ন খুব ছিল। তবে শেষেরদিকে এসে সিজার না করে ওয়েট করা, মাতৃসদনে ভর্তি না হওয়া এসব বিষয়ে মনে মনে যুদ্ধ করে সিদ্ধান্তগুলো নিতে হয়েছে কারণ সবাই ভয় পাচ্ছিল যদি ক্ষতি হয়ে যায়। আমি ডিটারমাইন্ড থেকে অপেক্ষা করেছিলাম একটাই কারণে আমার বাবু সুস্থ ছিল তাহলে কেন অপেক্ষা না করে তাড়াহুড়ো করব। এখন সবাই সেই সিদ্ধান্তগুলো মনে করে আর বলে তুমিই সঠিক ছিলে আলহামদুলিল্লাহ। তবে আমি কিন্তু আমার গাইনি ডক্টর, অভিজ্ঞ আপুদের পরামর্শ নিয়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, একা একা না জেনে কিছু করা উচিত না তাহলে বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে।

রৌদ্রময়ী প্রিন্যাটাল কোর্স আর এর সূত্রে পাওয়া অভিজ্ঞ আপুদের পরামর্শ, এই দুই সোর্স আমার জন্য কী পরিমাণ উপকারী ছিল! আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা উনাদের উত্তম জাযা দিন এর প্রতিদান আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব না। এই দীর্ঘ যাত্রায় সবচেয়ে বেশি যা করেছি তা হল আল্লাহর কাছে চেয়েছি, জ্ঞান অনুযায়ী যে যে জটিলতা সব থেকে পানাহ চেয়েছি, সংক্ষিপ্ত লেবার চেয়েছি, সুস্থ বাচ্চা চেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ কবুল করেছেন। দুয়ার সাথে চেষ্টা চালাতে হবে আর প্রেগনেন্সি স্টাডি মন দিয়ে কনফিডেন্টলি করতে হবে, লেবার টাইমে কারো কথায় কনফিউজড হওয়া যাবেনা – এগুলো আমার শিক্ষা নিজের জার্নি থেকে। দুয়াপ্রার্থী সকলের কাছে।
 
উম্মে মুহাম্মাদ
প্রিনাটাল কোর্স, ব্যাচ ৮