Back

তৃতীয় সন্তানের ভিব্যাকের গল্প

আমি VBAC এর মাধ্যমে আমার তৃতীয় সন্তানের মা হয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। আমার প্রথম সন্তানও নরমাল ডেলিভারি ছিল(এখন ওর বয়স ৪+)। যদিও এবারের সাথে তুলনা করলে আমার প্রথম ডেলিভারিটাও কষ্টের ছিল, কারণ সেবার ব্যথা ছিল অসহনীয় পর্যায়ের। আমি তখন প্রচণ্ড চিতকার করছিলাম, প্রায় ৭ ঘণ্টার লেবার ছিল। শুরুর দিকে বাচ্চার মাথা একটু সময়ের জন্য বার্থ ক্যানাল এ আটকে গিয়েছিল। আটকে থাকার কয়েক মিনিট পরেই ডেলিভারি হয়ে যায়, আলহামদুলিল্লাহ। থার্ড ডিগ্রির টিয়ার হয়েছিল, যেটা সারতে অনেকটা সময় লেগেছিল এবং পরে ইনফেকশনও হয়েছিল। তবুও আলহামদুলিল্লাহ, নরমালই হয়েছিল।
 
কিন্তু দ্বিতীয় ডেলিভারিটা আমার জন্য অনেক খারাপ অভিজ্ঞতা ছিল, তবুও আলহামদুলিল্লাহ, শেষ পর্যন্ত আমি ও আমার বেবি দুজনেই সুস্থ ছিলাম। তখন ইন্ডাকশনের মাধ্যমে নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা করেছিলাম, খুব দ্রুত প্রগ্রেসও করেছিল, কিন্তু আবারও বেবি বার্থ ক্যানাল এ আটকে যায়। অনেক ঘণ্টা পার হয়ে যায়, কিন্তু ডেলিভারি হয় না। অবশেষে অবস্ট্রাকটেড লেবার হওয়ায় ইমার্জেন্সি সি-সেকশন করতে হয়। সমস্যা ছিল আমি যে ক্লিনিকে ছিলাম সেখানে সি-সেকশনের সুবিধা ছিল না। সি-সেকশনের পর থেকেই আমি মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছিলাম। ১২ দিন ক্যাথেটার পরা ছিল, ৮ দিন হাসপাতালে ছিলাম।
 
তখনই আমার মনে হচ্ছিল আমার নিজের অনেক ভুল ছিল, বারবার মনে হচ্ছিল আমার কোনো ভুলের কারণেই সি-সেকশন হয়েছে। সব বিস্তারিত বলতে গেলে খুব বড় হয়ে যাবে। সবই আল্লাহর ইচ্ছা, আলহামদুলিল্লাহ। আমার বাচ্চা,আমি পরে পুরোপুরি সুস্থ ছিল।
 
তৃতীয় বেবি কনসিভ করার আগেই VBAC নিয়ে অনেক খোঁজখুঁজি করেছি, দেশের এন্ড বাইরের বিভিন্ন VBAC রিলেটেড গ্রুপে এড হয়েছি, অনেক VBAC স্টোরি পড়েছি। তারপর ঠিক করেছিলাম VBAC ট্রায়াল দেওয়ার জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নেবো, নিজের সেরাটা দেবো যতক্ষণ পর্যন্ত VBAC ট্রায়াল নিরাপদ থাকে। কিন্তু ফলাফল অবশ্যই আল্লাহর কাছ থেকেই আসবে।
 
এইভাবে সময় যাওয়ার পর আমি কনসিভ করি যখন আমার দ্বিতীয় সন্তানের বয়স ছিল মাত্র ১৫ মাস। কনসিভ করার কিছুদিন পরই আমি একটি প্রিনাটাল কোর্স করি। যদিও লাইভ ক্লাস করতে পারিনি, রেকর্ড শুনে নিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, আমি বলবো, সব হবু মায়ের এই কোর্স একবার করে করা উচিত।
 
আমি জেনেছিলাম ১৮ মাসের গ্যাপেই ট্রাই করা যায়। যদিও বাংলাদেশে সবাই চেষ্টা করেন না, তাই ২ বছরের গ্যাপ যাঁরা ট্রাই করেন এমন ডাক্তারদের খোঁজ নিচ্ছিলাম। আগে থেকেই নিপা ম্যামের নাম জানতাম, উনি VBAC ট্রাই করেন। এছাড়াও ছন্দা মজুমদার ম্যামও ট্রাই করেন। সি-সেকশনের পর এই দুইজনকেই দেখিয়েছিলাম। নিপা ম্যাম বলেছিলেন সব ঠিকঠাক থাকলে শেষে চেষ্টা করবেন। কিন্তু ছন্দা ম্যাম তখন না করে দিয়েছিলেন কারণ আমার অবস্ট্রাকটেড লেবার হয়েছিল এবং ১২ দিন ক্যাথেটার ছিল, যেটা উনার কাছে নেগেটিভ ছিল। তাই উনি বেশি গ্যাপেও ট্রাই করতে রাজি ছিলেন না।
 
তাই কনসিভ করার পর আমি শুধুই নিপা ম্যামকেই দেখাচ্ছিলাম। দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার পর্যন্ত শুধু উনার কাছেই ছিলাম, পরে উনার সাথে সঞ্জুক্তা ম্যামের কাছেও যেতাম। দুজনেই আশাবাদী ছিলেন VBAC সম্ভব। এখনো সব ঠিকঠাক ছিল।
আমার রেগুলার অ্যাক্টিভিটি বলতে দুইটা বাচ্চা সামলানোই ছিল, এবং খুব বেশি হাঁটা বা ব্যায়াম করতাম না। ৩০ সপ্তাহ থেকে হালকা হাঁটা আর ব্যায়াম শুরু করেছিলাম।
 
প্রথম আল্ট্রাসাউন্ড অনুযায়ী EDD ছিল ২২ জুন। যদিও পরে সব আল্ট্রায় ২-৩ সপ্তাহ আগে ডেট আসছিল। কিন্তু আমি জানতাম প্রথম আল্ট্রার ডেটটাই সবচেয়ে একিউরেট, তাই ওটাই হিসাব করতাম। সেই হিসেবে ৩১ সপ্তাহের আল্ট্রায় ৩৩ সপ্তাহ আসে, ওজন আসে ২০০০ গ্রাম, যেটা ৩১ সপ্তাহ অনুযায়ী বেশি। যদিও তখন দুজন ডাক্তার কেউ কিছু বলেননি।
 
২৫ দিন পরের আল্ট্রায় ৩৭ সপ্তাহ আসে, ওজন আসে ২৯০০+ গ্রাম, BPD ও বেশি আসে। এটা দেখে নিপা ম্যাম বললেন উনি আর ১ সপ্তাহ দেখবেন, নিজে থেকে ব্যথা উঠলে নরমাল ট্রাই করবেন, না হলে সি-সেকশন করতে হবে। কারণ ৩ কেজি ওজন হয়ে গেলে উনি VBAC ট্রাই করেন না। যদিও প্রথম আল্ট্রার ডেট অনুযায়ী এখনো ৪-৫ সপ্তাহ বাকি।
 
আমি আর আমার হ্যাজব্যান্ড অনেক টেনশনে পড়ে গেলাম, এই ওজনের জন্য বুঝি ট্রায়াল দিতে পারবো না। অথচ আমি শুরু থেকেই হিসেব করে খেয়েছি যাতে ওজন না বাড়ে। আমার গর্ভাবস্থায় মোট ৭ কেজি বেড়েছিল, কিন্তু এখনই বেবি ৩ কেজি কেন? ম্যাম বললেন খাবার কমিয়ে দিতে।
 
সেদিন থেকে বাসায় এসে আমি ন্যাচারালি ব্যথা উঠানোর আশায় অনেক ব্যায়াম শুরু করি। মাইলস সার্কিট দিনে দুইবার করতাম, আরও নানান ব্যায়াম করতাম, হাঁটাহাঁটি করতাম। ৩/৪ দিন পর আমি অন্য জায়গায় আল্ট্রা করলাম এই আশায় যে হয়তো আগের আল্ট্রায় ভুল এসেছে। কিন্তু উল্টা ওজন আসলো ৩১০০ গ্রাম, BPD 94! আর চিন্তায় পড়ে গেলাম। ভাবলাম এই রিপোর্ট দেখলে নিপা ম্যাম আর রাজি হবেন না। তবুও দুয়া করতে থাকলাম।
 
এই রিপোর্ট নিয়ে সঞ্জুক্তা ম্যামের কাছে গেলাম। উনিও বললেন এত ওজন কেন? খাবারদাবার অফ করে দাও, পারলে এমন কোথাও গিয়ে থাকো যেখানে কেউ খাবার খেতে বলবে না। ওজন নরমাল ডেলিভারির জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাম বললেন ১ সপ্তাহ পর আবার এসো, দেখি হয়তো ২ সপ্তাহ পর ইনডিউস করবো।
 
টেনশন আরও বেড়ে গেল। আমার প্রথম বেবি ৩ কেজি ছিল, তাও কিছুক্ষণ আটকে ছিল। আবার দ্বিতীয় বেবি জন্মপথে আটকে মাথায় ক্যাপুট হয়েছিল। মনে হচ্ছিল এই বেবি কিভাবে বের হবে! (যদিও আমার এই ধারণা ঠিক না, কারণ এখন মনে হয় তখন আটকে যাওয়ার কারণ ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। ওপেন হওয়ার আগেই পুশ করা, আল্লাহ ভালো জানেন)। আমি দুয়া করছিলাম, সাথে ব্যায়াম, খেজুর, আনারস এসব খাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম যদি ন্যাচারালি ব্যথা ওঠে তাহলে ভালো হবে।
৩ দিন পর নিপা ম্যামকে দেখানোর ডেট ছিল। সেদিন যেন উনি চেক করে পজিটিভ কিছু বলেন এই আশায় ছিলাম। রিপোর্ট নিয়ে ৩ দিন পর আবার নিপা ম্যামের কাছে গেলাম। উনি পিভি করে দেখলেন os ক্লোজ, বেবির পজিশন -৩। নিপা ম্যাম সি-সেকশনের জন্য বললেন, তাও কয়েক দিনের মধ্যেই। ম্যামের কথাটা লজিক্যাল ছিল। উনি VBAC ট্রাই করেন শুধু ব্যথা উঠলে, কোনো রিস্ক মনে হলে করেন না। আমার ম্যামকে ভালোই লেগেছে। কিন্তু সি-সেকশনের কথা শুনে মনটা ভেঙে গেল। ম্যাম বাসায় গিয়ে ডিসিশন নিতে বললেন।
 
বাসায় যাওয়ার পথে রাত ৭-৮টা হবে, আমি আর আমার হ্যাজব্যান্ড ঠিক করলাম আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মুনিরা ম্যামকে দেখাবো। সোহরাওয়ার্দীতে পড়ার সময় এই ম্যামের নাম শুনেছি। আগেও দেখাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ম্যামের চেম্বার দূরে হওয়ায় দেখা হয়নি।
 
আমার বাসা জিগাতলা, আর ম্যাম রোগী দেখেন উত্তরায়। ম্যামের কাছে সেদিনই রাত ১২টার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। জিগাতলা থেকে উত্তরা রাত ১২টায় যাওয়া আবার ডাক্তার দেখিয়ে আসা খুবই কঠিন ছিল। তবুও আল্লাহর নামে রওনা দিয়ে দিলাম রাত ১১টায়।
 
এরপর ম্যামের সাথে কথা বললাম, সব বললাম। ম্যাম পিভি করে বললেন ১ সেমি ওপেন, তবে বেবি ওপরেই আছে। কিন্তু ম্যামের মনে হলো কয়েক দিন সময় দিলে ব্যথা উঠবে। এরপর ম্যাম মেমব্রেন সুইপ করে দিলেন, আর বললেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমি চাই তুমি ভালো কোথাও একটা আল্ট্রা করো। আমি বললাম কাল সকালেই brb দেবযানী ম্যামের কাছে আল্ট্রার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে, ওখানে করলেই হবে? ম্যাম বললেন হ্যাঁ, হবে। রিপোর্ট হোয়াটসঅ্যাপে জানাতে বললেন।
সেদিন বাসায় ফিরতে দেড়টা বাজে। যাই হোক, সেদিন ঘুমানোর আগে কিছু ব্যায়াম করলাম। পরদিন সকালেই brb গেলাম, আল্ট্রা করলাম। রিপোর্ট দেখে আমি আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা। আমি একদম বসে রিপোর্টের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। হ্যাজব্যান্ড জিজ্ঞেস করছিল কী হয়েছে, আমি বললাম BPD 99.4mm এসেছে!! এটা আবার কিভাবে সম্ভব! এরপর ওজন এসেছে প্রায় ৩৫০০ গ্রাম!! পরে হাজব্যান্ডকে আবার রিপোর্ট নিয়ে ম্যাম এর রুম এ পাঠালাম যে কোনো ভুল হলো কিনা রিপোর্টে। দেবযানি ম্যাম বললেন আমি যা পেয়েছি তাই লিখেছি।
 
এই রিপোর্ট দেখে মনে হল বাংলাদেশে আর কেউই আমাকে VBAC ট্রায়াল দেবে না। পারলে সবাই বলবে এখনই ইমার্জেন্সি সি-সেকশন করো, ব্যস্। আমি মনে করছিলাম আজই আমার সি-সেকশন হবে। আমার বাচ্চা দু’টোর কি হবে? সি-সেকশন মানে তো কয়েক দিন ওদের যত্ন নেয়া সম্ভব হবে না। কিছুই ভালো লাগছিল না।
BRB-তেই বসে ম্যামকে হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠালাম। কিন্তু ম্যাম তো চেক করলেন না। সহ্য করতে না পেরে কল করলাম। রিপোর্ট শুনে ম্যামও অবাক। বললেন এটা কেমন কথা, এটা কিভাবে হয়? রিপোর্ট ভুল এসেছে, তুমি এখানেই চলে এসো। এসে ক্রিসেন্টে অমুক ডাক্তারকে দেখাও, আমি কল দিয়ে বলছি। পরে ম্যাম আবার কল করে জানালেন সেই সোনোলজিস্ট আছেন, তুমি চলে এসো।
 
আমি আর আমার হ্যাজব্যান্ড কাউকে কিছু না বলে রওনা দিলাম। ওখানে গিয়ে আল্ট্রা করলাম। আল্ট্রা করার সময় ডাক্তার বলছিলেন, “ম্যাম আমাকে কল করে বলেছেন তোমার রিপোর্ট নাকি ভুল এসেছে, এখন দেখি আমি কী পাই।” আমি আল্লাহ আল্লাহ করছিলাম। পরে ডাক্তার বললেন উনি ওজন পেয়েছেন ৩ কেজি, আর BPD 94।
 
ম্যামকে কল দিলাম, ম্যাম বললেন তিনি লেবার রুমে আছেন। ওখানে গিয়ে রিপোর্ট দেখাতে। লেবার রুমে গেলাম। আমাকে অপেক্ষা করতে বলা হল। হ্যাজব্যান্ড বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় ১ ঘণ্টার বেশি সময় পর ম্যাম আসলেন। পিভি চেক করলেন, বললেন ১.৫ সেমি ওপেন, এখনো লেবার পেইন নেই। ম্যাম বললেন তুমি অ্যাডমিট হয়ে যাও, আমরা ইনডিউস করি। নরমাল হলে তো হবেই, না হলে সি-সেকশন তো করতেই হবে। তাহলে আমরা চেষ্টা করে দেখি।
 
আমি বললাম ম্যাম আমি তো কোনো প্রস্তুতি নিয়ে আসিনি, আমার ছোট দুইটা বাচ্চা আছে, কাউকে কিছু বলেও আসিনি। ম্যাম বললেন তোমার আর ওয়েইট করা ঠিক হবে না। আমি বললাম তাহলে আমি রাতে আসি। উনি বললেন ঠিক আছে, তবে বললেন যেন কাল পর্যন্তও দেরি না করি।
বের হয়ে হ্যাজব্যান্ডের সাথে আলোচনা করে বাসায় চলে যাচ্ছিলাম। বাসায়ও জানালাম। কিন্তু হঠাৎ হ্যাজব্যান্ড বললো আমরা এখনই অ্যাডমিট হয়ে যাই, আল্লাহ ভরসা। আবার লেবার রুমে গেলাম। ম্যামকে বললাম আমি এখনই অ্যাডমিট হবো। ম্যাম বেলুন ক্যাথেটার পরিয়ে দিলেন। তখন বিকেল ৩:৩০। ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই হালকা পেইন শুরু হলো, মিউকাস প্লাগ বেরিয়ে গেল। আমার আম্মু বাসায় দুই বাচ্চা সামলে আসতে আসতে ৬টা বাজলো। এর মধ্যেই ৫ সেমি ওপেন হয়ে গেলো আলহামদুলিল্লাহ। বেলুন খুলে গেল। পেইন বাড়লো, কিন্তু সহনীয়। পেইন ম্যানেজ করার চেষ্টা করছিলাম, আর ব্রিদিং প্র্যাকটিস করছিলাম। আম্মু খেজুর এনেছিলো, খেজুর খাচ্ছিলাম, পানি খাচ্ছিলাম।
 
এরপর পানি ভেঙে গেল, অনেকক্ষণ শুয়ে ছিলাম। যত সময় যাচ্ছিল পেইন বাড়ছিল, আর আমি দুইটা কনট্রাকশনের মাঝে ঘুমিয়ে পড়ছিলাম। কনট্রাকশনের সময় জেগে উঠছিলাম। নার্সরা কন্টিনিউয়াসলি CTG মেশিনে বেবির হার্ট রেট চেক করছিলো, আমার প্রেসার দেখছিল, অক্সিজেনও দিয়ে রেখেছিল। ৭/৮ সেমি ওপেন হলো আলহামদুলিল্লাহ। এখন পর্যন্ত সময় মোটামুটি স্মুথই যাচ্ছিল আগের এক্সপেরিয়েন্সের তুলনায়।
 
প্রায় ৯টার দিকে পেইন অনেক বেড়ে গেল। কিন্তু বেবি এখনো উপরে। তখন আমার এক খালা আমাকে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে জোরে হাঁটালেন। কিন্তু পেইন অনেক ছিল। আমি জানি না হঠাৎ কী কারণে আমার ভয় লাগা শুরু হলো। ব্যথা অসহনীয় হওয়ার পর আমার আগের সব খারাপ এক্সপেরিয়েন্স মাথায় আসছিল। মনে হচ্ছিল আসলেই যদি ৩৫০০ গ্রাম হয়ে থাকে, আসলেই যদি ৯৯.৫ BPD হয়, তাহলে তো বেবি আটকে যাবেই। তখন যদি সেলাই ছিঁড়ে যায়, আবার বুঝি এমার্জেন্সি সি-সেকশন করবে। আমার বাচ্চা দুইটা কি করবে…
 
এইসব ভাবতে ভাবতে আমার প্রচণ্ড ভয় লাগছিল। আবার পেইনও খুব বেশি। ৯টার পরের ব্যথায় আমি চিৎকার করছিলাম, আবার ভয়ে বলছিলাম আমি সি-সেকশন করবো, এখনই সি-সেকশন করবো। সেলাই ফেটে যাবে, সেলাইয়ে অনেক ব্যথা, ফেটে যাবে, সি-সেকশন না করলে এপিডুরাল দিন, এত ব্যথা কেন!
আম্মু তো অঝরে কাঁদছিলেন, হ্যাজব্যান্ডও বাইরে কাঁদছিল। কিন্তু ওনারা বলছিলেন এখন ৮ সেমি ওপেন হয়েছে, এখন সি-সেকশন কেন? এপিডুরালও এখন দেওয়া যাবে না, একটু অপেক্ষা করো, সেলাইতে ব্যথা না, সবকিছু ঠিক আছে।
 
আমাকে চেক করতে আসলে আমি চেক করতেও দিচ্ছিলাম না। বলছিলাম আমি সি-সেকশন করবো, চেক করার দরকার নেই। পরে আম্মু জমজমের পানি খাওয়ালেন। এরপর আবার চেক করলেন, ৯ সেমি ওপেন। কিন্তু বেবি এখনো উপরে। আমাকে বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন চাপ আসে কিনা। আমি বলছিলাম না, আবার বলছিলাম সি-সেকশন করবো। উনারা নিজেদের মতো করেই চেষ্টা করছিলেন। যদিও একজন ডক্টর অ্যানেস্থেসিয়োলজিস্টকে কল দিয়ে রেডি থাকতে বলেছিলেন — পুরুষ অ্যানেস্থেসিয়োলজিস্ট। আমি কথা শুনে আবার চিৎকার করছিলাম — না না, আমার ফিমেল অ্যানেস্থেসিয়োলজিস্টই লাগবে।
এরপর মনে হলো ওনাদের বলেও লাভ নেই, বরং আমি শান্ত হই।
 
কিছুক্ষণ পর মনে হলো চাপ আসছে, কিন্তু আমি কাউকে কিছু বলিনি। ভয়ে চাপও দিচ্ছিলাম না। যদি আটকে যায়… আবার চাপ আসলো, তাও কিছু বললাম না। এর মধ্যে কেউ একজন ম্যামের ফোন কানে ধরিয়ে দিলেন। ম্যাম ফোনে বলছিলেন, “তাহমিনা এখন এমন করলে হবে! , একটু ধৈর্য ধরো, এখনো সবকিছু ভালো আছে, ভালো প্রগ্রেস হয়েছে।” আমি বললাম — না ম্যাম আমি সি-সেকশন করবো। এটা বলার পরেই কেউ ফোনটা নিয়ে গেল।
 
আল্লাহর নাম নিয়ে শ্বাস ভরে “মূ” টাইপ শব্দ করছিলাম আর চাপ দিচ্ছিলাম… হঠাৎ সবাই বলে উঠলো, “বাচ্চা দেখা যাচ্ছে… তাড়াতাড়ি আরেকটা গ্লাভস দাও…”
কেউ একজন ভ্যাকুয়াম নেওয়ার জন্য রেডি ছিল… আরেকজন বললেন, “ভ্যাকুয়াম লাগবে না… ও নিজে চাপ দিচ্ছে, এমনি এমনি চলে আসছে…”
আমি আবার নতুন চাপ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম… কয়েক সেকেন্ড পরেই আবার চাপ এলো… চাপ দিলাম… বাচ্চার মাথা বের হয়ে গেছে…
পরেরবার পুরো বাচ্চা… আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ বলতে থাকলাম…
 
বাচ্চার কান্না শুনলাম…
রাত ১০:২০ মিনিটে আমার লেবার পেইনের সমাপ্তি…
ডাক্তার মজা করে বলছিলেন, “তুমি এপিডুরাল আর সিজারিয়ানের খরচ দিয়ে যাবা!”
আমি হেসে দিলাম, আলহামদুলিল্লাহ!
প্লাসেন্টাও ডেলিভার করা হলো… ডাক্তার বললেন, এপিসিওটমি-ও লাগেনি… তবে হালকা টিয়ার হয়েছে… সেলাই করে দিলেন…
তবে এবার সেলাই নিয়ে শুরু থেকেই আমার কোনো সমস্যা হয়নি… আলহামদুলিল্লাহ।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমি পুরোপুরি সুস্থ…
পরের দিনই বাসায় চলে আসি…
তবে অবাক করা বিষয় হলো—আমার বেবির ওজন ছিল মাত্র ২৬৭০ গ্রাম!
 
তাহমিনা
রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স, ব্যাচ ১৯

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *