Back

নাজুক আমারও নরমাল ডেলিভারী হয়েছে

আল্লাহর ইচ্ছায় ১৭ মে আমার মেয়ে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে দুনিয়াতে এসেছে।
আমি নাজুক প্রকৃতির মেয়ে। আমার আম্মু কখনো ভাবেনি আমার নরমাল ডেলিভারি হবে। আমার হাজবেন্ডও মনে মনে হয়তো দ্বিধায় ছিল। যদিও মুখে কখনো প্রকাশ করেনি।
প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর, এই নিয়ে পড়াশুনা করতে খুব ইচ্ছে করছিলো। জেনে কোনোকিছু মানার বিষয়টাই অন্যরকম। কতকিছু যে নিষেধ করা হয় আসলেই তা সঠিক কিনা জানতে খুব ইচ্ছে করতো। এর মধ্যে ফেইসবুকে এবং আমার ফ্রেন্ডের মাধ্যমে রৌদ্রময়ী প্রিন্যাটাল কোর্সের কথা জানতে পারি। সীমাবদ্ধতা থাকা স্বত্ত্বেও কোর্সে ভর্তি হই৷ লাইভ ক্লাস করেছি। যদিও ক্লাসে এক্টিভ ছিলাম খুবই কম। পরে ক্লাস করে এপ্লাই করেছিলাম।
খাবার দাবার মেইনটেইন করার চেষ্টা করেছি ক্লাসে যেভাবে বলেছে সেভাবেই। রেগুলার প্রোটিন মেইনটেইন করার চেষ্টা করেছি, খেজুর খেয়েছি, পানি পান করেছি। যেই আমি এক থেকে দেড় লিটার পানি পান করতে কষ্ট হতো, সেই আমি আলহামদুলিল্লাহ সাড়ে চার লিটার পানিও খেয়েছি। হাটাহাটি করেছি প্রচুর। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট এবং সর্বোচ্চ ২ ঘন্টাও হেঁটেছি। লাস্ট দিকে স্কোয়াটিং আর মাইলস সার্কিট ব্যায়াম করেছিলাম। ৩৮ সপ্তাহ থেকে প্রতিদিন ১টা করে আনারস খেয়েছি। ইউটিউবে ঘাটাঘাটি করে কিভাবে ন্যাচারালি লেবার ইনডিউস করবো জেনে মানার ট্রাই করেছি। আর অনেক দুয়া করেছিলাম আল্লাহ যেন সহজ করে দেন, কোনো জটিলতা যেন না দেন।
ক্লাস করার পাশাপাশি রৌদ্রময়ী প্রিন্যাটাল টিমের “মা হওয়ার গল্প” বইটা পড়েছি। বার্থস্টোরিগুলো এতোবার পড়েছি যে এখন প্রায় সব গল্পই মুখস্থের মতো। বিস্তারিত ইনফরমেশনগুলোও অনেক কাজে দিয়েছে – পানি ভাঙা, ইনডাকশন প্রসেস, টিয়ার এসব নিয়ে বিস্তারিত জেনেছি। আমানি বার্থও পড়া হয়েছে টুকটাক। পুরোটা পড়তে পারিনি।
পিরিয়ডের ডেইট অনুযায়ী আমার ইডিডি ছিল ১৭ মে।
লাস্ট আল্ট্রায় ইডিডি ছিল ২৯ মে। ম্যাম বলেছিল ৪ জুন পর্যন্ত ওয়েট করতে। ১০ মে পিভি চেক করে বলেছে এখনো কোনো লক্ষণ নেই, বাচ্চা এখনো উপরে। টেনশনে পড়ে গিয়েছিলাম এটা শুনে। পরে মাইলস সার্কিট ব্যায়াম করেছি অনেক। স্কোয়াটিং করেছি। ওইদিন পিভি চেক করার পর মিউকাস প্লাগ গিয়েছে। দুয়েক ঘন্টা পর ব্যথা শুরু হয়। হালকা হালকা পেইন ছিল। আমি হাটাহাটি করছি, খেজুর খাচ্ছি। রাতে তেমন পেইন ছিল না। পরের দিন আবারও পেইন উঠে। অনেক তীব্র ব্যথা। আসল লেবার কিনা বুঝতে পারছিলাম না। হাটাহাটি করছিলাম। দুপুর তিনটায় পেইন একেবারেই গায়েব হয়ে যায়। অথচ ব্যথা এতো বেশি ছিল যে সালাত পড়তেও কষ্ট হয়েছে। এরপর আর কোনো পেইন নেই।
৫দিন পর ১৬ মে রাত ৯টায় ওয়াশরুমে গিয়েছি। দেখি পিরিয়ডের মতো ব্লাড যাচ্ছে। সাথে হালকা পেইন ছিল। পেইন আসতো যেতো। হাজবেন্ডকে বলি। উনি বলছেন আরেকটু দেখো। আবার ওয়াশরুমে গিয়েছি। সেইম অবস্থা। এবার আম্মুকে বলি। রাত সাড়ে দশটায় হসপিটালে চলে যাই। ওখানে গিয়ে একটুও বসে থাকিনি। হাটাহাটি করেছি। অনেকে বলছে এখন হেটে লাভ নাই। যাই হোক, ম্যাম স্যালাইন দিলেন সম্ভবত ব্লিডিং বন্ধ হওয়ার জন্য। আমি স্যালাইন নিতে চাচ্ছিলাম না। তাহলে আর হাটতে পারবো না। পরে স্যালাইন নিলাম। রাতে কয়েকবার উঠেছি। ঘুমিয়েছি ভালোই।
ফজরের সময় পেইনের তীব্রতা বেড়ে যায়। উঠতে বসতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। একটু পরপর পেইন আসছিলো। একেকটা পেইন অনেক তীব্র ছিল। তাও ম্যানেজ করতে পারছিলাম। নাস্তা খেয়ে হাটা শুরু করলাম স্যালাইন নিয়েই। কখনো আম্মু স্যালাইন ধরে, কখনো আমার হাজবেন্ড, কখনো বা আমার বোন। পেইন আসলেই আম্মু বা আমার বোন কোমর ম্যাসাজ করে দিতো। আর আমি ফোকাস পেইন থেকে অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টা করতাম। যখনই পেইন আসতো কখনো বেড ধরে জোরে ধাক্কা দিতাম, কখনো গ্রিল ধরে ধাক্কা দিতাম। আর পেইন কমে গেলে হাটতাম। এর মধ্যে ম্যাম আসে।
সকাল ১০টায় পিভি চেক করে অন্য ডাক্তারকে ম্যাম বলছেন জরায়ু থ্রি ফিংগার খুলেছে, ইফেসমেন্ট ৫০% এর বেশি, স্টেশন ০। স্টেশন কত শুনতে না পেরে ম্যামকে জিজ্ঞেস করলাম ম্যাম স্টেশন কত? অন্য ডাক্তার বললেন, “স্টেশন কি, তুমি বুঝো?” বললাম, “জ্বি মানে, বাচ্চা মিড পয়েন্টে চলে এসেছে।” পাশ থেকে ইন্টার্ন ডাক্তার নার্সকে বলছে ও কিভাবে বুঝলো। ম্যাম যা বললো আমিই তো বুঝিনি।
যাই হোক, লেবারের প্রগ্রেস দেখে এতো খুশি লাগছিলো। অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছি লেবার পেইনের। পেইনও ম্যানেজ করতে পারছিলাম। ম্যাম বললেন স্যালাইন খুলে হাটাহাটি করো। এরপর আবার হাটতে লাগলাম আর স্কোয়াট করলাম। স্টেশন ০ শুনে স্কোয়াটিং বাড়িয়ে দিলাম। আস্তে আস্তে পেইন বাড়তে লাগলো। এবারের কন্ট্রাকশনগুলো এতো তীব্র ছিল.. পেইন আসলেই কান্না করে দিতাম। এতো কষ্ট হতো।
পেইন আসলেই নিজেকে বলতাম, “এটা আমার দ্বারা সম্ভব তাই আল্লাহ মেয়েদের দিয়েছেন। আর যুগে যুগে সবাই এভাবেই ডেলিভারি করেছেন। আমি কেন পারবো না? “আল্লাহ সাধ্যের বাইরে কাউকে বোঝা দেন না এই আয়াতটা বারবার মনে করেছি। এভাবে নিজেকে ভরসা দিতাম। লা হাওলা ওয়ালা কুয়্যতা ইল্লা বিল্লাহ পড়তে লাগলাম আর হাটলাম। মাঝে মাঝে হাজবেন্ড এসে অনেক সাহস দিতো। বলতো, এই তো তুমি পারবা। আর বেশিক্ষণ নাই। অনেকটা এগিয়ে গেছো। আরেকটু ধৈর্য ধরো। সাহস পেয়েছিলাম অনেক।
দুপুর ১২টায় লেবার রুমে নিয়ে যায়। হাটাহাটি করছি। নার্স এসে বললো শুয়ে থাকো। হাটতে হবে না। আরেকজন বলছে এতো পানি খেয়ো না। আমি বললাম, হাটলে আমি পেইন ম্যানেজ করতে পারি। হাটতে চাই। শুয়ে থাকলে অনেক কষ্ট হয়। অসহ্য ব্যথা হয়। উনি আমার কথা শুনলেনই না। বারবার শুতে বললেন। এর মধ্যে ম্যাম এসে আবার পিভি চেক করে জানালেন জরায়ু আরেকটু খোলা বাকি। নার্সকে পেইন কমার স্যালাইন দিতে বললেন এরপর হাটাহাটি করতে বললেন। আমার প্রচন্ড পেইন। পেটে খিদা ছিল। আম্মু মুখের সামনে খাবার ধরছিলো তাও খেতে পারছিলাম না পেইনের কারণে। আমি আম্মুকে বললাম আম্মু চাপ আসছে। আম্মু বললেন চাপ দাও। হাটু ভেঙে বসে দুইবার চাপ দিলাম। জানতাম না এটা পুশিং স্টেইজ। এরপর নার্স স্যালাইন দেওয়ার জন্য শুতে বললেন। আমি রাজি হচ্ছিলাম না। জোর করে শোয়ানোর সময় দেখলেন বাবুর মাথা দেখা যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি করে বেড রেডি করে বেডে শোয়ালেন। ডাক্তার আসলেন। বললেন,চাপ আসলে নিচের দিকে পুশ করবা।
৪-৫ বার পুশ করার পরই আমার সোনামণিটা দুনিয়ায় আসলো দুপুর প্রায় ১টা ৪৫ মিনিটে। মাথা বের হওয়ার পরই কি শান্তি লাগছিলো। নার্স বললেন, মেয়ে হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ বললাম। ডাক্তার সেলাই করছেন বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করলাম,” বেশি টিয়ার হয়েছে?” বললো, “না সামান্যই”। নার্সকে স্কিন টু স্কিন দিতে বললাম। উনারা কাপড় সহই দিয়ে দিলেন। আমার হাজবেন্ড কানে আযান দিলেন, খেজুর চিবিয়ে মুখে দিলেন। বেডে এসে উনি স্কিন টু স্কিন কন্টাক্ট করলেন। বেডে আসার প্রায় ১৫ মিনিট পর আমার অনেক কাঁপুনি আসলো। যাচ্ছিলোই না। নার্সকে জানানো হলো। অনেকক্ষণ পর কাঁপুনি কমলো। পরেরদিন বাসায় চলে আসলাম। এই জার্নিতে এক ফ্রেন্ডের অনেক হেল্প নিয়েছিলাম যে নতুন মা এবং কোর্সটা করেছে। ওর থেকে অনেককিছু জেনেছি। নতুন নতুন অভিজ্ঞতাগুলো ওর থেকে বুঝে নিয়েছিলাম। আর কারো থেকে পরামর্শ নেইনি।
এখানেই শেষ না। ব্রেস্টফিডিং এর কষ্টকর জার্নি ছিল। বাবু দুধ পাচ্ছিলো না। আর আমি প্রচুর ব্যথা পাচ্ছিলাম। বাবু কান্না করছে, আমি কান্না করছি। আমার হাজবেন্ডও কান্না শুরু করেছে আমাদের অবস্থা দেখে। প্রায় ১৫-২০ দিন খুব কষ্ট পেয়েছি ব্রেস্ট ফিড করাতে গিয়ে। এই জার্নিটা আরো কঠিন ছিল। ক্লাস করেও ল্যাচিং আর এটাচমেন্টের গুরুত্ব দেই নি শুরুতে। এজন্য আরো বেশি কষ্ট পেয়েছি। এখনো প্রায়ই ব্রেস্ট ফিডিং এ কষ্ট হয়।
কোর্স করেও যেটা প্র্যাক্টিস করিনি সেটা হলো ডিপ ব্রিথিং। আর এটার জন্যই আফসোস করেছি পেইনের সময়। ডিপ ব্রিথিং ব্যথা অনেক কমিয়ে দেয়। ডিপ ব্রিথিং করলে আমার ডেলিভারির পুরো অভিজ্ঞতাটা আরো পজিটিভ হতো। নেক্সটে ইন-শা-আল্লাহ আরো বেশি প্রিপারেশন নিবো।
আমার পুরো জার্নিতে কোর্সের গুরুত্ব তো ছিলই। উল্লেখযোগ্যভাবে পেইনের সময় সবচেয়ে বেশি ফিল করেছি এই কোর্সটা কতোটাই দরকারি ছিল। ওইদিন মনে হয়েছে আসলেই যারা জানে আর যারা জানে না তারা কখনোই সমান নয়। এই জানাটা এতো এমপাওয়ার্ড ফিল করিয়েছে আমাকে…
প্রেগন্যান্ট কাউকে পেলেই সাজেস্ট করি কোর্সটা করতে। বার্থস্টোরিও শেয়ার করেছি অনেককে যেন কোর্সের গুরুত্ব বুঝে। আসলেই যে কতোটা দরকার পড়াশুনা করা।
পড়াশুনা করে এপ্লাই করে এতো মজা পেয়েছি। এখন ইচ্ছে করে সবকিছু জেনেই কাজে লাগাই। এজন্য সলিড ফুডের কোর্সটাও কিনে ফেললাম। রৌদ্রময়ী টিমকে অনুরোধ করবো সম্ভব হলে এমন একটা কোর্স আনতে যেটাতে বাবু হওয়ার পর কি করতে হবে তা নিয়ে। অন্তত প্রথম ৬মাস কি করবো না করবো তা নিয়ে বিস্তারিত কোর্স আনতে। বাবু হওয়ার পর এতো দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছি। একজন বলে এটা করো, আরেকজন বলে ওটা করো। এই নিয়ে যেহেতু পড়াশোনা নাই তাই বুঝতেও পারি না কোনটা ঠিক। প্রিন্যাটাল কোর্সে ক্লাস তো আছে তবে আরো বিস্তারিত জানলে ভালো হতো।
অনেক অনেক জাযাকিল্লাহ রৌদ্রময়ী টিমকে এবং ইন্সট্রাকটর আপুদের। কখনো ভাবিনি নরমাল ডেলিভারি হবে আমার। শুধুমাত্র আল্লাহর ইচ্ছায় কোর্সটা করে এতোটা এগিয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। প্রতিটা মেয়ের উচিত কোর্সটা করা।
 
আফরিন
রৌদ্রময়ী প্রিন্যাটাল কোর্স পার্টিসিপ্যান্ট, ব্যাচ ১৯

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *