Back

যৌথ পরিবারে নতুন মায়ের জন্য টিপস

১।
অনেকগুলো একক পরিবার যখন একসঙ্গে থাকে তখন সেটা একটা প্রতিষ্ঠানের মত হয়ে যায়, সেখানে সবার আলাদা কিছু দায়িত্ব থাকে এবং ছকে বাঁধা কিছু নিয়মও থাকে। একক পরিবারে আমরা নিজের মত কিছু ফ্লেক্সিবিলিটি পাই যা যৌথ পরিবারে অনেক সময়ে পাওয়া যায় না। এখানে কেউ দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে সেটা অনেক জনের উপর ইম্প্যাক্ট পরে।

যেমন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে স্ত্রী এক বেলা রান্না করতে না পারলে স্বামী সন্তান সেটা এডজাস্ট করে নিতে পারে, কিন্তু জয়েন্ট ফ্যামিলিতে যার রান্নার দায়িত্ব সে যদি দুপুরের খাবার সন্ধ্যায় রান্না করে তাহলে চার পাঁচ জন সেটা এডজাস্ট করতে চাইবেনা সাধারণত।আবার খাবারের বেলায় একেক জনের আলাদা আলাদা অভ্যস্ততা থাকে। যেমন- কেউ ফ্রোজেন ফুড খেতে চায়না। এখানে সবার দিকটা ভেবে, সবার মতামতকে ব্যালেন্স করে চলতে হয় সদস্যদের।

যৌথ পরিবারে বাচ্চা পালনে সবচেয়ে বড় সুবিধা হল বাচ্চা ভাল কমিউনিকেশন শেখে, আবার কিছু অসুবিধাও আছে। আর কিছু অসুবিধা দুনিয়ার কোন জায়গাতেই বা নেই বলুন ! বাচ্চা নিয়ে প্রোডাক্টিভ থাকার টিপস নিয়ে যে কোন লেখায় এমন অনেক কমেন্ট থাকে যে যৌথ পরিবারে থেকে এসব মেইন্টেইন সম্ভব না। তাই আজকের লেখায় স্পেশালি এমন কিছু জিনিস শেয়ার করছি যা যৌথ পরিবারে বাচ্চা পালনে মায়েদের চ্যালেঞ্জগুলোকে একটু সহজ করবে।

২।
যৌথ পরিবারে যেহেতু মানুষের সংখ্যা বেশি তাই নানা জনের নানা মতে মা কনফিউজড হয়ে যায় কোন মতটি গ্রহন করবেন, কোনটি করবেন না। সেটা বুঝতে মায়ের প্রয়োজন প্রেগনেন্সি, পোস্টপার্টাম, বেবি নার্সিং, ফিডিং, প্যারেন্টিং বিষয়ে সঠিক জ্ঞান। মা যদি এসব নিয়ে কিছু বইপত্র পড়ে, কিছু শর্ট কোর্স করে নেয় তাহলে মা এক্সপার্ট অপিনিয়ন জানবেন। তাই তখন তিনি বাচ্চার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

যারা জয়েন্ট ফ্যামেলিতে থাকার কারনে আপনার জানা জিনিসগুলো বাচ্চা পালার সময় এপ্লাই করতে পারছেন না, একেকজন একেক মত চাপিয়ে দিচ্ছে, তারা যদি বাবুর ঘুম পাড়ানো, খাওয়া, গোসল এই কাজগুলো নিজের হাতেই রাখেন অন্য কারো হাতে না দেন, তাহলে এসব এক্সপেরিমেন্ট থেকে বেবিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবেন।

আর বেবিকে অবশ্যই প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম, খাওয়া, গোসল করাতে হবে। প্রতিদিন একই সময়ে হলে বেবির বডি ক্লক ওটায় অভ্যস্থ হয়ে যাবে। তখন ওই কাজগুলোর সময় বেবিও সাপোর্টিভ রেস্পন্স করবে, জ্বালাবেনা।

কেউ বাচ্চাকে বাইরের খাবার খাওয়াতে চাইলে তার হাতে আমরা একটা স্বাস্থ্যকর খাবার ধরিয়ে দিবো খাইয়ে দেয়ার জন্য। আর সুন্দর করে এসব খাবার দেয়াতে ক্ষতির দিকটা বুঝিয়ে বলবো। তাও যদি বার বার কেউ এসব কিনে দিতে চায় তাহলে ওগুলো নিয়ে নিজের কাছে রেখে দিবো, পরে বেবীকে আর ওটা দিবো না। বেবীকে বোঝাবো যে বাইরের খাবার খেলে দাঁতে পোকা হয়, তখন ডাক্তার ইঞ্জেকশন দিবে। আমি অন্যদের বোঝাতে না পেরে আমার বেবীকে বুঝিয়েছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ কাজ করেছিলো।

৩।
জয়েন্ট ফ্যামিলিতে বাচ্চা ও স্বামীর দায়িত্বের পাশাপাশি নিজের আরও বড় পরিসরে কিছু দায়িত্ব থাকে। তাই মায়ের সেল্ফ কেয়ার এবং বাচ্চার কেয়ারের জন্য নিজে যদি একটু রুটিন করে নেয়, মোবাইলে নোট করে নেয় যে আমার এখন এই কাজের পরে এই কাজ করতে হবে বা কী কী কাজ এই সপ্তাহে শেষ করতে হবে, কী কাজ এই মাসে শেষ করতে হবে, এভাবে লিখে লিখে প্ল্যান করে কাজ ঠিক করে রাখলে, একটু এলার্ম দিয়ে টাইম মেইন্টেইন করলে মাথার উপর বেশি চাপ পরবে না।

মায়ের বাড়তি দায়িত্বের জন্য প্রয়োজন বাড়তি খাওয়া, সবার সামনে বেশি খেতে না পারলেও, মা যদি ঘরে নিজের জন্য ফল, বাদাম, খেজুর এসব রাখে এবং একটু পরপর একটু করে খেয়ে নেয় তাহলে মা কাজের এনার্জি পাবে। টায়ার্ড লাগলে একটু পর পর ক্যাফেইন নেয়ার স্বভাব মা এবং বাচ্চার দুজনের জন্যই ক্ষতিকর। এছাড়া মা বেশি বেশি পানি খেতে পারে, এজন্য নিশ্চয়ই বাসার কেউ কোনো কথা বলবে না!

একটা জিনিস মনে রাখতে হবে কে কী ভাবল এই চিন্তা করে যদি মা অসুস্থ হয়ে যায় তাহলে সবার কাছে জাজ হতে হবে এবং বাচ্চারও কষ্ট হবে। তাই মায়ের নিজের যত্ন নিতে হবে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে হবে। এতোটুকুও সময়ের অপচয় করা যাবে না, যখনই দশ বিশ মিনিটের জন্য কেউ বাচ্চা নিবে, মা হাতের টুকটাক কাজ সেরে নিবে, হতে পারে সেটা বিছানা ঝাড় দেয়া বা চুলটা আঁচড়ে নেয়া, নিজের মিনিমাম সেলফ কেয়ার কিন্তু সুস্থতার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

বাচ্চার ঘুমের সময়ে নিজের যা দায়িত্ব আছে সেই কাজগুলো একটু একটু করে হলেও করতে হবে। ঘরের কাজ টুকটাক করলে কেউ তার ওপর বেশি কথা বলতে পারে না, কেউ কাজ না করলে (অন্যের উপর ডিপেন্ডেন্ট হলে) মানুষ তাকে বেশি কথা শোনাতে পারে। ফজরের পরের সময়ের বারাকাকে কাজে লাগাতে হবে, সাধারণত এই সময় বাচ্চারা ঘুমিয়ে থাকে।

বাচ্চার মায়েরা সাধারণত লম্বা টাইম রেস্ট পায় না, ১০-১৫ মিনিটের জন্য যদি বাচ্চাকে কেউ নেয়, সেই ১০-১৫ মিনিট মোবাইল না টিপে একটু চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলে রিএনার্জাইজড হওয়া যাবে। পাওয়ার ন্যাপ নেয়া একটা সুন্নাহও। ‌সব কাজ করে একবারে রেস্ট নিব এমন ভেবে একবারে এক্সজোস্টেট হয়ে গেলে তখন বাচ্চার কাজ করতে অনেক টায়ার্ড লাগবে, বাচ্চার উপর রাগ উঠবে। ছোট ছোট ব্রেক নিয়ে নিলে সেটা মা বাচ্চা দুজনের জন্যই ভালো।

আমরা প্রয়োজনে হেল্প চাইতে দ্বিধাগ্রস্ত হবোনা। এই নাজুক সময় বেশি দিন থাকবেনা। এই সময়টায় সাহায্যের খুব প্রয়োজন। কে কী ভাবলো এর চেয়ে বড় কথা মা ও শিশু সুস্থ থাকতে পারছি কিনা।

দুয়া মুমিনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আমরা বাচ্চাকে খাওয়ানোর আগে, ঘুম পাড়ানোর আগে দুয়া করে নিব বেবি যেন ঠিকভাবে খায়, যেন একটু বেশি সময় ঘুমায় ইত্যাদি। তাহলে দেখবো সব অনেক সহজ হয়ে গেছে। আর সব সময় না হলেও তার জন্য আল্লাহর কাছে প্রতিদান তো আছেই।

৪।
আমাদের দেশে মাকে বিভিন্ন কুসংস্কার মানতে ফোর্স করা হয়। দেখবেন যারা কুসংস্কার মানতে বলছে তারা অনেকেই আগের দিনের মানুষ, প্রযুক্তি এবং আধুনিক জ্ঞান সম্পর্কে উনাদের সেভাবে ধারণা নেই। উনারা অজ্ঞতা থেকে বলছেন এই ভেবে মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে হবে যে, আল্লাহ বলেছেন, যে জানে আর যে জানে না তারা কিভাবে এক হয়। তাই তারা জানেন না এই ভেবে উনাদের কথায় এত কষ্ট পাওয়া যাবে না, কারন তারা না জেনেই বলছেন।

আর মনে মনে উনাদের হেদায়েতের দোয়া করে নিজে এবং বাচ্চার মানসিক সুস্থতার জন্য নিজের মত কাজ করে যেতে হবে, কারো কথা গায়ে লাগিয়ে নিজেকে মানসিকভাবে অস্থিরতায় ফেলা যাবে না। জিকির করে, দরুদ পড়ে নিজের মনকে শান্ত রাখতে হবে।

মায়ের মনে রাখতে হবে বাচ্চা পালা একটি ইবাদত, তার জন্য আমাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। মানুষের কথায় বাচ্চার হক নষ্ট করা যাবেনা। ডায়পার না পরালে যদি ঘুমের মধ্যে ভেজা কাঁথায় থেকে বাচ্চার ঠান্ডা লাগে আর মা ও বার বার ঘুম ভেঙ্গে অসুস্থ হয়ে যায়। তাহলে যে যাই বলুক ডায়পার আপনি পরাবেনই।
আল্লাহ মাকে ইন্টিউশন দিয়ে দেন, মায়ের মন বোঝে কোনটা আমার বাচ্চার জন্য ভাল হবে।

যৌথ পরিবারে মায়ের সব সময় একটা কথা মনে রাখতে হবে, আমি কারো সাথে বেইনসাফি করবনা ; যেমন কেউ আমার জন্য কাজ করেই যাচ্ছে করেই যাচ্ছে এবং আমি ঘরের কোন কাজই করছি না, তাহলে তো অন্যের উপর জুলুম করা হবে। আবার আমি নিজের উপরও জুলুম করবো না, আমি খাটতে খাটতে নিজে অসুস্থ হয়ে গেলে, বাচ্চাকে সময় মত খাওয়াতে না পারলে আমার নিজের শরীরের হক বাচ্চার হক নষ্ট করা হবে। তাই আমরা যেন আল্লাহর হক আমাদের নিজেদের এবং স্বামী সন্তানের হক সবার আগে রাখতে পারি। এভাবে আমাদের প্রায়োরিটি সেট করে কাজ করতে হবে।

যা আমরা কখনোই করবো না তা হল, অন্য কারো উপর রাগ বাচ্চার উপর ঝাড়বো না। এবং অন্য কারো উপর রাগ স্বামীর উপর ঝেড়েও দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট করবো না। দুজনে প্ল্যান করেই একটা টিম হয়ে আমাদের প্যারেন্টিং করতে হবে।

৫।
দুনিয়াতে এমন কেউ নাই যে পরীক্ষার মধ্যে নাই। আমরা এক পরীক্ষা থেকে বের হলে আরেক পরীক্ষায় পরবো। তবুও একদিকে বাচ্চার কান্না আর এক দিকে কেন কাঁদছে এ নিয়ে মুরুব্বির বকাঝকা আসলেই কঠিন পরীক্ষা। আমাদের হিকমা দিয়ে, দুয়া ও সবর দিয়ে দিনগুলো পার করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সব মায়েদের জীবন সহজ করুক। কোন পরিস্থিতিই চিরকাল থাকেনা। এটা ভাবলে কষ্ট একটু কম লাগবে।

জয়েন্ট ফ্যামেলির প্রতিটা সদস্যের প্রতি অনুরোধ থাকবে উনারা যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে নতুন মাকে যতটা পারেন সাহায্য করেন। মুরুব্বি যারা মাকে সারাক্ষন আগের দিনের সাথে তুলনা দেন, তাদের অন্যরা বোঝাবেন যে এ যুগের একটা মানুষ কিভাবে আগের যুগের নিয়মে চলবে! এটা তার কাছে আশা করাটাই অবান্তর। আর আগে উনাদের শাশুড়ীরা উনাদের কষ্ট দিয়ে গুনাহের কাজ করেছেন, সেই একই গুনাহ যদি উনারাও আবার রিপিট করেন তাহলে তো আল্লাহর কাছে উনাদেরও শাস্তি পেতে হবে। তাই আল্লাহর ভয়ে যেন উনারা পুত্রবধুর প্রতি রহমার সাথে থাকেন।

মনে রাখতে হবে নতুন শিশুটি, নতুন মাটি পরিবারের খুব গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। অন্য সদস্যরা যদি মায়ের এই কঠিন সময়ে মাকে সাপোর্ট দেয়, তাহলে ভবিষ্যতেও তাদের পারিবারিক সম্পর্ক ভাল থাকবে। আর এ সময়ে যদি মা সাপোর্ট না পায়, উল্টো বিভিন্ন কথায় কষ্ট পায় তাহলে সেটাও কিন্তু এই মায়ের মনে ভবিষ্যতেও থেকে যাবে।

যৌথ পরিবার যেহেতু সবাইকে নিয়ে, তাই সবার কন্ট্রিবিউশনেই নতুন শিশুকে নিয়ে পরিবারে বইবে আনন্দধারা। শিশু পাবে একটি সুন্দর শৈশব, মা পাবে নিরাপদ মাতৃত্ব।

তামান্না তাবাসসুম
লেখক ও শিক্ষক
রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল এসোসিয়েট ও পার্টিসিপ্যান্ট