Back

জুলাই আন্দোলন ও আমার মা হওয়া

(১)
বিয়ের অল্প কিছুদিন আগে Mother And Child Care পেইজের প্রিনাটাল কোর্সের একটা পোস্ট নিউজফিডে দেখতে পাই। মূলত সিজারিয়ান ডেলিভারির প্রতি ভয় আর নরমাল ডেলিভারির প্রতি আগ্রহ থেকে কোর্সটির প্রতি আগ্রহী হই এবং ভবিষ্যতে কাজে আসতে পারে ভেবে পেইজটি ফলো করি। আলহামদুলিল্লাহ, এই ছোট্ট একটা কোর্সটিই যে ডেলিভারির কঠিন সময়ে আমাকে কতটা সাহসী করে তুলেছে, কতটা উপকৃত করেছে তা আপনারা পরবর্তী পর্বগুলোতে জানতে পারবেন।
নভেম্বর ২০২৩ এর মাঝামাঝিতে একপ্রকার জানা-অজানায় কোনোভাবে আল্লাহর ইচ্ছাতে আমি কনসিভ করি। কনসিভ করার ১ সপ্তাহ থেকেই আমার শারীরিকভাবে মনে হতে থাকে আমি কনসিভ করেছি, কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার জন্য ১ মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। এরপর লুকিয়ে লুকিয়ে টেস্ট করার পর স্পষ্ট ২টা দাগ আসে কিটে, কিন্তু তবুও অযথাই কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না।
যেহেতু তখন বিয়ের মাত্র ৪ মাস চলছিল, আমাকে শ্বশুড় বাড়িতে তুলে নেওয়া হয়নি, তাই নিশ্চিত না হয়ে কাউকে জানানো যাচ্ছিল না। পিরিয়ড মিস হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে ৫/৬ বার টেস্ট করেও যখন পজিটিভ আসছিল তখন বিশ্বাস না করে উপায় ছিল না। বাসার সবাইকে জানালে সবাই খুবই খুশি হয়, এমনকি শ্বাশুড়িমা ২ সপ্তাহের মধ্যে আমাকে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যান।
এরই মাঝে কনসিভ করার ১ সপ্তাহের মধ্যে ( নিশ্চিত হওয়ার ১ মাস আগেই) আমি আমার হাসবেন্ডকে বলি এই কোর্সটির কথা, উনি আমার রেজিষ্ট্রেশন কনফার্ম করে দেন।
আমি ক্লাসের ভিডিওগুলো বারবার দেখতে থাকি আর ক্লাস নোটগুলো A-Z একটা ডাইরিতে নোট করতে থাকি। যত বেশি জানতে থাকি, তত বেশি ভাবতে থাকি যে এই কোর্সটি এনরোল করা না হলে আমি কত বড় আনারী একটা মা হতাম, মুরব্বিরা এটা করো না, ওটা করো না, বলে বলে আমার প্রেগন্যান্সি লাইফ তেজপাতা করে দিত। কিন্তু কোর্সটি করার পর আমি নিজেই বুঝতে পারি মুরব্বিদের কোন পরামর্শগুলো ভুল, কোনগুলো সঠিক। আলহামদুলিল্লাহ।
আমার কিছু শারীরিক অসুস্থতা ছিল প্রেগনেন্সির আগে থেকেই। যেমন-খাবারে অরুচি, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট হয়ে হুটহাট যেখানে সেখানে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। আলহামদুলিল্লাহ, আমার বাচ্চাটা এতোটা বরকতময় ছিল যে আমার সকল শারীরিক সমস্যা অটোমেটিক চলে যায়, মুখে এতো রুচি চলে আসে যে সবরকম পুষ্টিকর খাবার বেছে বেছে খেতে পারতাম, কোনো রকম সমস্যা হতো না। এমনকি প্রেগ্ন্যাসির যে নরমাল সিস্মটমস থাকে, আমার মাঝে সেগুলোও ছিল না। পুরো ৯ মাসে ১টি দিনের জন্য আমার বমি হয়নি, প্রায় ৫ মাস পর্যন্ত প্রতিবেশীরা বুঝতেই পারতো না যে আমি অন্তঃসত্ত্বা। শুরু থেকেই আমি একদম একটিভ ছিলাম।
জানুয়ারি ২০২৪ এ প্রথমবারের মতো আমি চেকআপে গিয়েছিলাম, ১০ সপ্তাহে বাবুর হার্টবিট চলে আসে আলহামদুলিল্লাহ। একেবারে শুরু থেকেই বাবু সেফালিক পজিশনে ছিল। কোর্স থেকে আমি সাপ্লিমেন্টের গুরুত্ব সম্পর্কে জেনেছিলাম, কিন্তু ডাঃ তখন আমাকে কোনো সাপ্লিমেন্ট দেননি…
(২)
২য় বার যখন চেকআপে যাই, কৌতুহল বসত লেবার রুমটা দেখতে যাই। লেবার রুমটা দেখে মনটাই ভেঙে যায়। কারন ছোট্ট এই রুমে একটা বেড, একটা পুশিং বেড, একটা ছোট টেবিল আর একটা বেসিন ছাড়া কিছু নেই। আর রুমটা ছিল অপরিস্কার, মাকড়শার জালে ভরা। রুমটা অনেকদিন কেউ ব্যবহার করেনি সেটা দেখলেই বোঝা যায়।
তাই অনলাইন-অফলাইনে নরমাল ডেলিভারি সাপোর্টিভ ডাক্তার খুজতে থাকি। কিন্তু অফলাইনে কাউকেই পাইনি। অনলাইনে যাদের পেতাম, তারাও হাতের নাগালের বাইরে।
আল্লাহর কাছে অনেক দুআ করতাম একজন নরমাল সাপোর্টিভ ডাক্তারের জন্য, নরমাল ডেলিভারির জন্য। ৩৮ সপ্তাহের মধ্যেই যেন বাবু দুনিয়ায় এসে যায়, এই দুআও করতাম খুব।
এরপর আরও ২বার চেকআপে যাওয়া হয়। ৩৬ সপ্তাহে চেকআপে গিয়ে দেখি রক্তের পয়েন্ট কমতে কমতে ১১ থেকে ৯.৯ এ চলে এসেছে। কারন পাকনামি করে ডাক্তারের দেওয়া সাপ্লিমেন্টগুলো খাইনি। শুধু ফলিক এসিড খেয়েছিলাম ১ মাস। এই পাকনামির ফল আমার ডেলিভারির পরেও ভোগ করতে হয়েছে…
যাই হোক, এরপর ডাক্তার রক্তের পয়েন্ট বাড়ানোর জন্য ইঞ্জেকশন দেন। তখন বাচ্চার ওজন ২৬০০ গ্রাম আসে। ওজন বাড়ানোর জন্য কোনো মেডিসিন দেননি।
এরপর আর ইচ্ছে করেই চেকআপে যাইনি। ডেলিভারির সময় এই হসপিটালে না গিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার প্ল্যান ছিল। আশেপাশে ৩টা হসপিটালে নরমাল ডেলিভারির ব্যপারে খোঁজখবর নেওয়ার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু ব্যস্ততার কারণে সে সুযোগ হচ্ছিল না।
৩৭ সপ্তাহ শুরু হলো।
হাঁটাহাটির পরিমান বাড়িয়ে দৈনিক দেড়/দুই ঘন্টায় নিয়ে এলাম। ইউটিউব দেখে দৈনিক টানা ৩০ মিনিট ব্যয়াম করতাম। কিন্তু ভয় হতো যদি অসময়ে পানি ভেঙ্গে যায়। প্রতিদিন ৮/১০ টা বড় সাইজের পাকা খেজুর খেতাম। (শুরু থেকেই রান্না বাদে সংসারের সবরকম কাজই করতাম, কিন্তু ৮ মাসের পর বাবার বাসায় এসে কাজ কর্ম একবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।)
১৭ জুলাই।
সকাল থেকে অল্প পরিমাণে বার বার স্রাব যাচ্ছিল। গুগল করে দেখলাম এটাই মিউকাস প্লাগ। কিন্তু কোনো রকম ব্যথা ছিল না। যেহেতু মিউকাস প্লাগ যাওয়ার কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েক সপ্তাহ পরেও পেইন শুরু হতে পারে, তাই বাসার কাউকে জানাইনি, শুধু হাসবেন্ডকে জানালাম। পেইন উঠার অপেক্ষায় ছিলাম, কিন্তু সারাটাদিন এভাবেই মিউকাস গেছে, কোনোরকম ব্যথা আসেনি।
১৮ জুলাই
পরেরদিন সকালেও একই অবস্থা। ব্যথা কবে কখন আসবে তার ধারণা ছিল না। তাই দুপুরের কিছু আগে হাসবেন্ডকে বাসায় (ভিন্ন জেলায় ) পাঠিয়ে দিলাম। যদিও মনে হচ্ছিল অর্ধেক রাস্তা যেতে না যেতেই আমার পেইন শুরু হয়ে যাবে। আসলে হলোও অনেকটা তাই।
শক্তি সঞ্চয় করার জন্য দুপুরের দিকেও ঘুমাতাম রোজ, শেষের দিনগুলোতে। দুপুর দিকে পেটে একেবারে মৃদু একটা ব্যথা অনূভব করছিলাম। ব্যথাটা এতোটাই হালকা ছিল যে অন্য কোনো দিকে মন দিলে কখন ব্যথা এসে চলে যাচ্ছিল তা খেয়ালও করতে পারছিলাম না। কনস্ট্রাকশন মাপার অ্যাপ দিয়ে ব্যথার সময়কাল মাপছিলাম। প্রায় ২৫/৩০ মিনিট পরপর নিয়মিতভাবে একেবারেই সামান্য ব্যথাটা আসছিল। তাই ঘুমানোর চেষ্টা বাদ দিয়ে গোসল করে নিলাম, মনে মনে একা একাই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।
আমার সাথে হসপিটালে যাদের যাওয়ার কথা, তারাও কিছুটা অসুস্থ। বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করেও দেখি ঘুম থেকে উঠছে না। পরে বাধ্য হয়েই তাদের ডেকে তুলে বললাম, এই এই অবস্থা, কথা শুনে লাফিয়ে উঠে বসে পড়লো। পরে সন্ধ্যায় একজন প্রতিবেশী ধাত্রীকে ডেকে এনে পিভি চেক করানোর পর বললেন জরায়ুর মুখ ২ আঙ্গুল খুলেছে।
(৩)
এশার পর এই সামান্য একটু ব্যথা নিয়ে হসপিটালে গেলাম। পুরো প্রেগন্যান্সিতে এই হসপিটালে একবারও যাইনি আমি। মূলত নরমাল ডেলিভারির আশায় এখানে গিয়েছিলাম শেষ মুহুর্তে এসে।
আমার পুরনো রিপোর্টগুলো চেক করে আমাকে আল্ট্রা করতে পাঠানো হলো। রিপোর্ট অনুযায়ী বাচ্চার মাথা ৯.১৪ সে.মি. বার বার জিগ্যেস করছিলেন বাচ্চার মুভমেন্ট টের পাই কিনা, হয়তো তাদের ইচ্ছে ছিল এটা বলার যে বাচ্চার নড়াচড়া কমে গেছে বা বন্ধ হয়ে গেছে, আমি আলহামদুলিল্লাহ তখনও বেশ ভালোই মুভমেন্ট ফিল করছিলাম। এমনিওনেটিক ফ্লুইড ছিল ২.৭ পয়েন্ট। বাচ্চার চারপাশে কালো জায়গাগুলো দেখিয়ে ডাক্তার আমার আপুকে বললেন এই জায়গাগুলোতে একদম পানি নেই, শুধু নিচের দিকে একটু পানি আছে। তাদের ভাষ্যমতে পানি না ভাঙ্গলেও প্রস্রাবের সাথে বেড়িয়ে গেছে। যদিও এই আজগুবি কথা আগে কখনো শুনিনি তবু বিশ্বাস হয়নি কারন এক সপ্তাহ আগেও পানির পরিমাণ Adequate ছিল। উনাদের কথা শুনে আপু বললো, আমার বোন তো প্রচুর পানি পান করতো, খাওয়া দাওয়া ঠিক ছিল, পানি এতো কম কিভাবে সম্ভব। আপুর কথা শুনে সিনিয়র নার্স বিদ্রুপ করে বললেন, পানি খেলেই ফ্লুইড বেশি থাকে এসব কোথায় পেয়েছেন? আপু একটু বিব্রতবোধ করে চুপ হয়ে গেলো।
এরপর আমাকে পিভি চেক করতে নেওয়া হয়। নার্স এমন জোড়ে মোচড় দিয়ে পিভি করলো যে মনে হলো ইচ্ছে করেই পানি ভেঙ্গে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো, যদিও ব্যর্থ হয়েছেন উনি। নার্স উনার হাতের গ্লোভসে লেগে থাকা কিছু কালো পদার্থ আমাদের দেখালেন এবং অনেক আতঙ্কিত স্বরে ডাক্তারকে বললেন কালো কালো কী যেন দেখা যায় পায়খানার মতো। তিনি আমাদের বোঝাতে চাইলেন বাচ্চা পায়খানা করে দিয়েছে পেটের ভিতর। অথচ উনিও জানতেন, আমিও জানতাম এটা মিউকাস প্লাগ।
উনারা বললেন এই সিচুয়েশনে বাচ্চা বেশিক্ষণ পেটে সুস্থ অবস্থায় থাকবে না। এই রিপোর্টে নরমাল ডেলিভারিও পসিবল না। আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করারও সুযোগ নেই, এখনই সিজার করতে হবে। বললেন যে আমরা রাজি থাকলে উনারা সিজারের ব্যবস্থা করবে। উনাদের সিরিয়াসনেস দেখে মনে হচ্ছিল ১ ঘন্টার মধ্যে সিজার না করলে বাচ্চা আল্লাহর মেহমান হয়ে যাবে। আপু জিজ্ঞেস করলো নরমাল ডেলিভারি কি কোনোভাবেই সম্ভব না? নার্স বললেন হবে না কেন? অবশ্যই হবে। আগের দিনে কি সিজার ছিল? একদিন, দুইদিন, তিনদিন গেলেও, মরা বাচ্চাও তো নরমালেই ডেলিভারি হতো…
পুরো প্রেগন্যান্সি জুড়ে আমার প্রস্তুতি দেখে পরিবারের সবার কাছে যেমন আমার নরমাল ডেলিভারির প্রত্যাশা আর ভরসা তৈরি হয়েছিল, এক মূহুর্তে সব নষ্ট হয়ে গেল। সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়লো৷ মনে মনে হয়তো সিজারের সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছিল, তবু দায়িত্ব রক্ষার্থে আমাকে জিজ্ঞেস করলো আমি কি করতে চাই।
আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে হাসপাতালের অনেকগুলো মিথ্যা বুঝিয়ে বললাম আপুদেরকে প্রিনাটাল কোর্সে পাওয়া অর্জিত জ্ঞান থেকে। আরও বললাম আমি এখানে চিকিৎসা নিবো না। সিজারের প্রয়োজন হলে সিজার করবো, কিন্তু তার আগে আমি অন্য হসপিটাল থেকে আরেকবার আল্ট্রা করে দেখতে চাই বাচ্চার অবস্থা। তখনও সবাই দোটানার মধ্যে ছিল।
এদিকে নার্সদের সেলাইন নিয়ে ছোটাছুটি দেখে অবাক হলাম যে উনাদের অটি রেডি করার অনুমতি কে দিল? মূলত তারা যতপ্রকার ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন তাতে যে কোনো মা সন্তানের কল্যানের কথা চিন্তা করে ১ মূহুর্তও বিবেচনা না করে সিজারের সিদ্ধান্ত দিয়ে দিবে। কিন্তু আমার বেলায় এই টোটকা কাজে দিলো না।
সব ধান্দাবাজি বুঝেও না বোঝার ভান করে বাসায় চলে যাবো বললাম উনাদের। বারবার বোঝাচ্ছেন বাচ্চার ক্ষতি হয়ে যাবে। এই কন্ডিশনে বাসায় যাওয়া ঠিক হবে না।
শেষে বাধ্য হয়ে বললেন যে তাহলে ভর্তি হোন নরমালের জন্য ট্রাই করি। কিন্তু আমি আর তাদের বিন্দু পরিমাণ ভরসা করতে পারলাম না, যদি মাঝপথে গিয়ে আবার কোনো গন্ডগোল করে, তখন তো চলে যেতেও পারবো না অন্য কোথাও।
ভাইয়া বললো ও শিক্ষিত মেয়ে, বুঝে শুনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমরা আর কী করতে পারি বলেন। নার্স রাগ হয়ে বললেন শিক্ষিত হয়েই ডাক্তার হয়ে যায়নি। আরও অনেক রকম টালবাহানা চলছে…
আমি আর কথা না বাড়িয়ে আল্ট্রার বিল দিতে গেলে উনারা বললেন, আপনাদের যতসময় ধরে বোঝালাম তার বিলই তো ৫০০০ টাকা… বেড়িয়ে আসার আগে নার্স বললেন, কী মেয়ে রে বাবা, বাচ্চার ভালোটা একটুও চিন্তা করলো না…
অনেক কষ্ট লাগছিল এটা চিন্তা করে যে মানুষ সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য মিথ্যা বলতেও দ্বিধা বোধ করে না একটু!
আমরা আর এক মূহুর্ত দেরী না করে বেড়িয়ে গেলাম অন্য আরেকটি হসপিটালের উদ্দেশ্যে, যেখানে আমার পুরো প্রেগন্যান্সিতে চেকআপ করিয়েছি।
২ মিনিটের মধ্যে সেখানে পৌছে আমি আল্ট্রা করতে চলে যাই। ৫ মিনিটের মধ্যে রিপোর্ট হাতে পাই। আলহামদুলিল্লাহ, আল্ট্রার রিপোর্ট দেখে আমি খুশি হয়ে যাই।
(৪)
এবারের আল্ট্রায় ফ্লুইড ছিল Adequate. বাচ্চার মাথা ছিল ৮+ সে.মি., পানি তখনও ভাঙ্গেনি, আল্লাহর রহমতে বাচ্চাও একদম সুস্থ ছিল।
সম্ভবত রাত ১০টা তখন। হসপিটালে ভর্তি হয়ে গেলাম।
আমি যার আন্ডারে চেকআপে ছিলাম, সে শহর থেকে আসে, তাই আগে না জানানোর কারনে তাকে পাওয়া যায় নি। ভালো আর কোনো ডাক্তার এভেইলেবল ছিল না ইমার্জেন্সি সিচুয়েশনে সিজারিয়ান ডেলিভারি করানোর মতো।
হসপিটাল থেকে জানিয়ে দেওয়া হলো, মাঝ রাতে রোগীর অবস্থা বেগতিক হলে বা ব্যথা সহ্য করতে না পারলে অতো রাতে ডাক্তার আসবেন না, (৩০/৪০ মিনিটের পথ) ডাক্তার আসবেন সকাল ৬ টায়। তাই চাইলে এখন সিজার করে ফেলতে পারি৷ কিন্তু আমরা নরমালের আশায় রইলাম।
আমি হাঁটাহাটি শুরু করলে আমাকে পানি ভেঙ্গে যাবে বলে হাটতে নিষেধ করা হলো। পরে আমরা কেবিনে চলে যাই। ছোট বোন আর ধাত্রী ঘুমাচ্ছে। বড় আপুও ঘুম ঘুম চোখে একটু পর পর জিজ্ঞেস করছে ব্যথা বাড়ছে কিনা। আমি একটু শক্তি সঞ্চয় করার আশায় ঘুমানোর চেষ্টা করলেও ব্যথার তীব্রতা হালকা একটু বেড়ে যাওয়ায় ঘুম বারবার ভেঙে যাচ্ছিল।
আস্তে আস্তে ব্যথা বাড়ছিল। আমি কনট্রাকশন কাউন্টার অ্যাপ দিয়ে ব্যথার গতিবিধি শনাক্ত করছিলাম। কিন্তু কিছুক্ষন পর পরই নোটিফিকেশন আসছিল যে এটা ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন হচ্ছে।
১৯ জুলাই ২০২৪,
হঠাৎই ইন্টারনেট বন্ধ। সেই দুঃসময়ে এই প্রিয় গ্রুপ আর গ্রুপের হেল্পফুল আপুদের পরামর্শ নেওয়ার জন্য কত যে খুঁজেছিলাম এই দিন।
যাই হোক, প্রতি ২ বার ব্যথা আসার পর আমি ২টা করে খেজুর ও পানি খাচ্ছিলাম আর ব্লাডার খালি করতে যাচ্ছিলাম।
একটা সময় আর শুয়ে থাকতে ভালো লাগছিল না। তাই আপুর নিষেধ সত্বেও হাটাহাটি শুরু করি আর ব্যাথার সময় স্কোয়াট করতে থাকি। ব্যথা অনেকটাই বেড়ে যায়।
সারা রাতে কোনো নার্স তো দূর, একজন আয়া এসেও খোঁজ নেয়নি রোগী কেমন আছে। ভোরের দিকে একজন নার্স আমাকে কেক আর জুস খেতে দেখে খাওয়া থামিয়ে দেয়। ৩য় বারের মতো পিভি করে দেখে দেড় আঙ্গুলই রয়ে গেছে তখনও। আমার আপু বার বার পিটোসিন দেওয়ার কথা বললেও তারা দেয়নি। জরায়ুর মুখ এতোটুকু নাকি কুমারী মেয়েদের খোলা থাকে তাই। এমন সময় পিটোসিন নাকি দেওয়া যাবে না।
ব্যথা বাড়ার আরও পরে আবারও পিভি চেক করা হয়, তখনও নাকি কোনো পরিবর্তন নেই, অথচ আমার ব্যথা প্রচুর ছিল তখন।
আপু বার বার বলছিল সিজার করবো কিনা? হাসবেন্ড বার বার কল করে বলছিল যেন কোনো রিস্ক না নেই। শ্বাশুড়ি মা বার বার সিজার করতে বলছিলেন। ননাসও তাই বলছিলেন কারন তারও একই অবস্থা হয়েছিল, আর শেষমেশ সিজার তো করতে হয়েছিলই সাথে মা আর সন্তান দুজনেরই খারাপ অবস্থা হয়েছিল। এসব ভেবে ভেবে গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল বার বার।
সকাল ১০ টায় শহর থেকে ডাক্তার আসার কথা। কিন্তু বাসার নিচে কোটা বিরোধী আন্দোলনের কারণে ঝামেলা চলায় ডাক্তার আসেননি। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে উনি রওনা হোন। ১২ টায় আমাদের হসপিটালের নিকটবর্তী আরেকটা হসপিটালে এসে রোগী দেখা শুরু করে এবং আমাকেও সেখানে নিয়ে যেতে বলে। কিন্ত আমার তখন আর যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। একবার বসে, একবার দাঁড়িয়ে, একবার শুয়ে তো একবার ফ্লোরে পেলভিক রক পজিশনে ব্যথা সামলানোর চেষ্টা করছিলাম। ব্যথার তীব্রতা এমন ছিল যে আমি শুধু আল্লাহ নামটি উচ্চারণ করতে পাড়ছিলাম, তাও দুই বারে ভেঙ্গে ভেঙ্গে… (আল-লা…হ) কখনো কখনো বলছিলাম (আমাকে) নিয়ে যাও আল্লাহ। (নাউজুবিল্লাহ)
ডাক্তার দুপুর ২ টায় আসবেন এদিকে। আমি বার বার দুআ করছিলাম মনে মনে, আল্লাহ মিরাকেল করে দিন। কত আপুদের শুনি অপারেশন থিয়েটারে বেবি হয়ে যায়, আমার জন্যও এমন কিছু করে দিন। আল্লাহ আমার দুআ কবুল করলেন। হঠাৎ কিছু একটা পরিবর্তন মনে হলো। পা বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো প্রথম বারের মতো। আমাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে দ্রুত লেবার রুমে নেওয়া হলো। পিভি করে বললো ১০ সে.মি. ডায়লেটেড কিন্তু বাচ্চা উপরে। পিটোসিন দেওয়ার ২/৩ মিনিটের মধ্যে পুশ করার তাড়না আসতে থাকল। নার্স সাইড কাটার জন্য রেডি। সারা রাত এক প্রকার না খাওয়া, না ঘুম আর ২৪ ঘন্টার লেবার পেইনে ক্লান্ত। ৩-৫ টা পুশ দিয়েও পারলাম না। অবশেষে অনুমতি দিলাম। তবে অনুরোধ করেছিলাম নিচে না কেটে সাইডে কাটার জন্য, কনস্টিপেশনের প্রবলেম নিয়ে ভয় পাচ্ছিলাম। নার্স আমার এই অনুরোধটা রেখেছিলেন।
শেষ বার জোড়ে একটা পুশ দেই, এপিসিওটোমি দেওয়ার সাথে সাথে গলায় কর্ড পেচানো অবস্থায় ১২:৫০ মিনিটে জু’ম্মার পবিত্র দিনে আমার সোনামানিক বেড়িয়ে এসে পৃথিবীর আলো দেখে আলহামদুলিল্লাহ। তারপর বাচ্চার চিৎকারে সকল যন্ত্রণা বিদায় হয়ে যায় আমার শরীর থেকে আলহামদুলিল্লাহ। এভাবেই সেই অব্যবহৃত ভুতুড়ে লেবার রুমটাতে আমার ডেলিভারি হয়।
এরপর আমাকে কেবিনে দেওয়া হয়। বাচ্চার জন্মের ১ ঘন্টা পর তার বাবা হসপিটালে এসে পৌঁছায়। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে এই কঠিন সময়ে হাসবেন্ড দূরে ছিল। নয়তো আমার কষ্ট আর হসপিটাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা দেখে হসপিটাল মাথায় তুলে নিতো।
ঐদিনই রাত ৯টায় আমরা বাসায় চলে আসি।
আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, শেষটা সুন্দর করে দেওয়ার জন্য। অনেক কৃতজ্ঞতা রৌদ্রময়ী টিম এবং প্রিনেটাল কোর্সের সাথে সংযুক্ত সকলের প্রতি।
 
উম্মে আয়ান
রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স পার্টিসিপ্যান্ট, ব্যাচ ১৫