Back

হোম বার্থঃ স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা (পর্ব ২)

বার্থ প্ল্যানের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ডেলিভারি কোথায় হবে—বাসায় নাকি হাসপাতালে? হোম বার্থের জন্য সবার আগে প্রয়োজন ডেলিভারিবান্ধব পরিবেশ। এক্ষেত্রে মা যদি নিজ বাসায় তার পরিচিত জায়গায় ডেলিভারির সময়টাতে থাকতে পারে, যা তাকে মানসিকভাবে ধীর, স্থির ও শান্ত রাখবে, তা হলেই নরমাল ডেলিভারির সম্ভাবনা বেশী থাকে। তবে, এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে—মা’র অবশ্যই কোনো ধরনের গর্ভকালীন জটিলতা থাকতে পারবে না, মায়ের লেবার ও ডেলিভারি সম্পর্কিত পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে, সাথে পরিপূর্ণ শারীরিক এবং মানসিক প্রস্তুতিও থাকতে হবে। সাপোর্ট পারসন হিসেবে যিনি থাকবেন তাকে অবশ্যই একজন মিডওয়াইফ হতে হবে এবং এমন একজন দৌলা হবেন যার এ ব্যাপারে সঠিক প্রশিক্ষণ আছে। সেই সাথে মায়ের কোনো জটিলতা দেখা দিলে কাছের কোন্ হাসপাতালে নেয়া হবে সেই ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় অর্থ, রক্ত দেওয়ার লোক এবং গাড়ির ব্যবস্থা ইত্যাদিও প্রস্তুত করে রাখতে হবে।
 
কিন্তু বাস্তবে আমরা কি দেখি? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গর্ভবতী মায়েদের এ সম্পর্কিত কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা থাকে না, সাপোর্ট পারসন হিসেবে থাকেন দাদী-নানী অথবা অন্য কোনো দাই যার এ ধরনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান নেই, শুধুমাত্র নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কাজ করেন। সেই সাথে অনেক ক্ষতিকর কাজও তারা করেন, যেমন: ব্যথা ওঠানোর জন্য ইনজেকশন দেয়া (যেটা দেয়ার অনুমতি তাদের নেই), ডেলিভারি সহজ হওয়ার জন্য ভ্যাজাইনাতে বিভিন্ন ধরনের জিনিস ব্যবহার করা, টানাটানি করে বাচ্চা বের করতে গিয়ে মা এবং বাচ্চা উভয়ের ইনজুরি করা, ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। কেউ যদি একটা দিন কিংবা অন্তত কয়েক ঘণ্টা সরকারী কোনো হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগে রোগী ভর্তির সময় উপস্থিত থাকেন, তা হলেই এর বাস্তব প্রমাণ পেয়ে যাবেন। দেখবেন—কত রোগী যে জরায়ু ফাটিয়ে নিয়ে আসে, হতে পারে তা প্রথম বাচ্চা অথবা দ্বিতীয় বাচ্চা, অথবা আগের সিজারের পর বাসায় নরমাল ডেলিভারিৱ চেষ্টা। হয়তো লম্বা সময় লেবার নিয়ে বাসায় থেকে ডেলিভারি হয়নি, অতঃপর যখন এসেছে তখন ইমারজেন্সি সিজার করে যদিও মাকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে, কিন্তু বাচ্চাকে বাঁচানো যায়নি, অথবা অক্সিজেনের অভাবে বাচ্চা প্রতিবন্ধী হয়েছে, অন্যদিকে মায়ের ফিস্টুলা হয়ে গিয়ে অবিরত প্রস্রাব ঝরছে ইত্যাদি।
 
আরও কত যে জটিলতা নিয়ে মায়েরা উপস্থিত হয় তার ইয়ত্তা নেই। যদি সবকিছু বাদ দেই এবং ধরে নেই যে, হোম বার্থের জন্য প্রয়োজনীয় সব রকম প্রস্তুতি ছিল, তারপরও হতে পারে ডেলিভারির পর অক্সিজেনের অভাবে বাচ্চা কান্না করছে না অথবা মায়ের প্রচণ্ড রকম রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এগুলো এমন কিছু জটিল সময় যার প্রতিটা মুহূর্ত অত্যন্ত জরুরি। বাচ্চা জন্মের পর প্রথম মিনিটকে বলা হয় ‘The Golden Minute’। এই এক মিনিটের মধ্যে যদি বাচ্চা কান্না না করে, যদি অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় ও তা সঠিক সময়ে দেওয়া না যায়, তা হলে বাচ্চার ব্রেনের একটা অংশ পরবর্তীতে আর কাজ না-ও করতে পারে; কিংবা বাচ্চার খিঁচুনি হতে পারে, বাচ্চা প্রতিবন্ধী হতে পারে, অথবা মৃত্যুও হতে পারে। একইভাবে মায়ের রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য যদি সাথে সাথে ব্যবস্থা নেওয়া না যায়, তা হলে মাকে বাঁচানোও অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাৎক্ষণিক এই ব্যবস্থাপনার কারণেই মা এবং বাচ্চাকে আমরা সুস্থ রাখতে সমর্থ হতে পারি, অথবা তাদেরকে চিরদিনের জন্য হারাতে পারি।
 
তাই বাংলাদেশ সরকার ও অবসটেট্রিক্স অ্যাণ্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)-এর পরামর্শমূলক নির্দেশনা হচ্ছে—প্রতিটি নিরাপদ ডেলিভারি অবশ্যই নিকটস্থ হাসপাতালে করুন। এমনকি সরকারী স্বাস্থ্যকর্মীরা যারা নিয়মিত প্রতিটা ইউনিয়নে গর্ভকালীন সময়ে মায়েদের স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে আসছেন, তারাও ডেলিভারির সময় রোগীদেরকে কাছের হাসপাতালে রেফার করুন।
 
এক্ষেত্রে মায়েদের অভিযোগ থাকতে পারে যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারিতে তারা সহযোগী চিকিৎসক, সিনিয়র নার্স অথবা পরিবেশ পান না। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তারা বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতেই ব্যতিব্যস্ত। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও জরুরি প্রসূতি সেবা (Emergency Obstetric Care)-এর মাধ্যমেই বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার অনেকাংশে কমে এসেছে। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাসে সবচেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ।
 
তবে আশার কথা এই যে, সিজারিয়ান ডেলিভারির হার কমানো ও নরমাল ডেলিভারির হার বাড়ানোর জন্য বর্তমানে সরকারীভাবে বেশকিছু কর্মসূচি হাতে নেয়া হচ্ছে। অনেক অনেক মিডওয়াইফ তৈরি হচ্ছে। সরকারী হাসপাতালগুলোতে স্বাভাবিক প্রসববান্ধব পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে রৌদ্রময়ী প্রিন্যাটাল টীম ওজিএসবি হাসপাতালে একটি ওয়ার্কশপের আয়োজন করে যেখানে চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফরা প্রাকৃতিক প্রসবের ওপর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। ভবিষ্যতে এরকম আরও অনেক ওয়ার্কশপের পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের স্বপ্ন—গর্ভবতী মায়েদেরকে প্রশিক্ষিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সেবা খাতে যারা প্রসব সেবার সাথে জড়িত তাদেরকেও প্রাকৃতিক প্রসব (normal delivery) সম্পর্কে জানানো, যেন ডাক্তার ও রোগীদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া উন্নত হয় এবং মায়েরা আস্থার সাথে হাসপাতালে ডেলিভারি সম্পন্ন করাতে পারেন। সুস্থ থাকুক সকল মা ও সকল শিশু।
 
ডাঃ ফাতেমা ইয়াসমিন
প্রিন্যাটাল ইন্সট্রাক্টর, রৌদ্রময়ী স্কুল।

প্রথম পর্ব পড়ুন এখানে