Back

হোম বার্থঃ স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা (পর্ব ১)

বাচ্চাটা ভূমিষ্ঠের সাথে সাথে আমাকে এক ঝলক দেখিয়েই লেবার রুমের সবাই যেন কোথায় চলে গেল! এমন দৌড়ে চলে গেল বাচ্চাটা নিয়ে! সবার চোখেমুখে টেনশন। কিছু একটা হয়েছে! কিন্তু আমার সামনে বলা হচ্ছে না। আমি তখন সারা রাতের পেইনের ধকলে, নতুন একটা মানুষকে পৃথিবীতে আনার প্রবল পরিশ্রমে, মোটামুটি ঘোরের মাঝে চলে গিয়েছি। একদিকে এপিসিওটমির সেলাই চলছে, অন্যদিকে ঘোরের মাঝে ঠিকভাবে ভাবারও সুযোগ পাচ্ছিলাম না—কেন আমি আমার বাচ্চাকে দেখতে পারলাম না? নরমাল ডেলিভারিতে নাকি বাচ্চা হওয়ার সাথে সাথেই মায়ের কাছে নিয়ে আসা হয়। কই, ওরা তো নিয়ে এলো না! আমার বিয়ের সাড়ে আট বছর পর মা হতে পারলাম। কত সাধনার সন্তান! সেদিন বাবু নরমালেই হয়েছিল। কিন্তু তার নাড়ী এমনভাবে গলায় পেঁচিয়ে গিয়েছিল যে, গলায় ফাঁসের মতো আটকে ছিল। যে কারণে জন্মের সাথে সাথে সে নিজ থেকে নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অক্সিজেনের অভাবে নীল হয়ে যায়। ডাক্তাররা সেটা বোঝামাত্র ওকে নিয়ে দ্রুত দৌড়ে চলে যায় অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে। কারণ, এধরনের কন্ডিশনে এক মুহূর্ত দেরি করলেও ভয়ংকর বিপদ হয়ে যেতে পারে। বাবুকে সেদিন অক্সিজেন দেয়ার পর ধীরে ধীরে শ্বাস নেয়া শুরু করে আলহামদুলিল্লাহ, যদিও ২৪ ঘণ্টা তাকে NICU-তে রাখতে হয়। যারা নরমাল ডেলিভারি প্রমোট করে, আমার মতো যাদের এ বিষয়ে চূড়ান্ত রকমের প্যাশন আছে, তাদের সবসময়ই স্বপ্ন থাকে সম্পূর্ণ ন্যাচারালি হোম বার্থ করানোর। এই স্বপ্ন দেখায় কোনো দোষ নেই। কিন্তু স্বপ্নটা দেখার সময় কিছু বিষয় ভেবে দেখা জরুরী, যেমন: প্রথমত, আমি যে দেশে বসবাস করছি, সেই দেশে কি হোম বার্থের পর কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা দেখা দিলে ইমার্জেন্সি হাসপাতালে নেয়ার সুযোগ আছে? যে দেশে একটা অ্যাম্বুলেন্স ভীড়ের মাঝ থেকে বের হতে না পারায় পথেই রোগী মারা যায়, সেখানে যদি নিজের গাড়িও থাকে, এমতাবস্থায় দ্রুত হাসপাতালে নেয়া কি সম্ভব?দ্বিতীয়ত, আমার বাচ্চাটার মতো কেইস যদি কারও হয় (যা আনকমন কোনো কেইস নয়), যেখানে বাচ্চাকে বাঁচানোর জন্য মুহূর্তের মাঝে তাৎক্ষণিক অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়া লাগতে পারে; সেক্ষেত্রে বাসা থেকে হাসপাতালে যাওয়ার সময়টুকু কি পাওয়া যাবে? কিংবা আরও কত রকমের জটিলতা দেখা দিতে পারে। সব তো এক লেখায় বলা সম্ভব নয়। অনেকে ভাবে, আমাদের কাছে প্রিন্যাটাল কোর্স করলেই সে হোম বার্থ করাতে পারবে। এমন অনেক মেসেজও আমরা পাই যে, সে হোম বার্থ করাতে চায়, তাই প্রিন্যাটাল কোর্স করবে৷ উন্নত দেশে থাকলে আলাদা কথা, কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আমরা কাউকেই প্রথমে ‘হোম বার্থ কনসেপ্ট’-এর ব্যাপারে এনকারেজ করি না। ‘ঘরে মৃদু আলো জ্বলছে, সঙ্গী হাত ধরে বসে আছে। ঈষদুষ্ণ পানির টাবে বসে পেইনের সাথে কোপ আপ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, স্বামী ব্যাক ম্যাসাজ করে দিচ্ছে। উবু হয়ে পছন্দের পজিশনে বসে মা পুশ করলেন, টিয়ার ছাড়াই বাবু হয়ে গেল’—শুনতে যতই স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বপ্নময় লাগুক না কেন, বাস্তবতা এত সহজ নয়। একজন মা যখন সন্তান-সম্ভবা হন, এই বাচ্চা তার কাছে আমানত, এটা মাথায় রাখতে হবে৷ তার জান নিয়ে ছিনিমিনি খেলা যাবে না, তাকে যথাযথভাবে ভূমিষ্ঠ করাতে হবে। অতএব, ইনশাআল্লাহ আমরা মায়েরা এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করব। অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান করাব না, অহেতুক মেডিক্যাল হস্তক্ষেপ অ্যাভয়েড করার চেষ্টা করব।কিন্তু সত্যিকারের প্রয়োজনে সি-সেকশন বা মেডিক্যাল ইন্টারভেনশনকে মেনে নেব৷ হোম বার্থের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আমরা কোন দেশে বসবাস করি, সেখানে রিস্ক ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি কতটা সহজসাধ্য তারও হিসাব কষে নিব। কারণ আমাদের মূল লক্ষ্য হলো, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা প্রদত্ত নিয়ামত এই সন্তানকে সুস্থ ও সুষ্ঠুভাবে পৃথিবীতে আনা৷‘সুস্থ মা, সুস্থ শিশু ও নিরাপদ মাতৃত্ব’—এই হোক মূল প্রতিপাদ্য। হাসনীন চৌধুরীকো ফাউন্ডার, রৌদ্রময়ী স্কুলMother & Child Care BD.
২য় পর্ব এখানে