Back

একবার সি-সেকশন মানেই বারবার নয়- শারমিন আপুর ভিব্যাকের গল্প

শারমিন আপুকে নিয়ে আমি আগেও দৌলা ডাইরিতে লিখেছিলাম। আপু তাঁর হাসবেন্ডের সাথে স্পেনে থাকেন। প্রথম সন্তানের সময় তিনি প্রিনেটাল কোর্স করেছিলেন, একজন দৌলার সাপোর্টও নিয়েছিলেন। মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন। সব ঠিকঠাক থাকলেও, হঠাৎ লেবার শুরু হওয়ার আগেই পানি ভেঙে যায়।
ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি দ্রুত হাসপাতালে যান। স্বাভাবিকভাবে কনট্রাকশন শুরু হওয়ার জন্য ডাক্তার ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। কিন্তু পেইন না আসায় ইন্ডাকশন শুরু করা হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রসিডিউরের মাঝে শিশুটি পর্যাপ্ত অক্সিজেন পাচ্ছিল না। জরুরি ভিত্তিতে সি-সেকশন করতে হয়।
আলহামদুলিল্লাহ, মা ও বাচ্চা দুজনেই সুস্থ ছিল। বাবুকে কিছুদিন এনআইসিইউ-তে রাখা হয়েছিল।
আপু সি-সেকশনকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছিলেন, কারণ সেসময় তা না হলে শিশুটিকে বাঁচানো যেত না। অনেকের মনে হয় একবার সি-সেকশন মানে সব শেষ। নরমাল ডেলিভারি আর সম্ভব না, বেশি সন্তান নেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ।” আসলে সব সময় তা নয়। শারমিন আপুর গল্পটা একদম ব্যতিক্রম।
অল্প সময়ের মধ্যেই আপু আবার কনসিভ করেন। স্পেনের চিকিৎসকরা পর্যালোচনা করে জানান, সবকিছু ঠিক থাকলে নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা
করা যাবে।
এইবার আপু খুব প্রস্তুতি নিতে না পারলেও সচেতন ছিলেন। তিনি আগের প্রিনেটাল কোর্সের জ্ঞান, আমার দেওয়া দৌলা ইনপুট—সবকিছু নিজের হাতে লিখে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলেন যেন লেবার সময়ে কিছু ভুলে না যান।
এইবার স্বাভাবিকভাবেই পেইন ওঠে। আপু কনট্রাকশন মেনে নিতে পারেন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেকে খুব ভালোভাবে সামলান। এপিডুরাল ছাড়াই অনেক দূর এগিয়ে যান, শেষে কিছুটা সাপোর্ট হিসেবে এপিডুরাল নেন।
আলহামদুলিল্লাহ, ১৮ মাসের ব্যবধানে সফল VBAC হয়।
এই গল্পটি শুধু একটি মায়ের নয়—এটি তাদের জন্য যারা প্রথম সি-সেকশনের পর নিজেকে দুর্বল ভাবেন। বাংলাদেশে থাকা আত্মীয়রা আপুকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যেন রিস্ক না নিয়ে সি-সেকশন করান। এই ধরনের পরামর্শ দিতে সবাই খুব উৎসাহী। “একবার সি-সেকশন হয়েছে, নরমালের ঝুঁকি নিও না”—এটাই সবচেয়ে বেশি শোনা যায়।
আপু বলেছিলেন যদি ডাক্তার মনে করেন সি-সেকশন লাগবে, তাহলে তখন সেই ডিসিশন নেবেন।”
আমাদের দেশে হয়তো এত অল্প ব্যবধানে ডাক্তার VBAC-এর অনুমতি দেবেন না। কারণ এখানে বিবেচনা করতে হয়—
আগের সি-সেকশন কোথায় হয়েছিল, কীভাবে হয়েছিল
মায়ের সুস্থতার হার কেমন
আগের সেলাই এখন কেমন অবস্থায় আছে
ভিব্যাক (ভ্যাজাইনাল ডেলিভারি আফটার সি সেকশন) নিয়ে দুটো প্রশ্ন সবচেয়ে বেশী শোনা যায়।
১. ভিব্যাক কেন করবেন?
সি-সেকশনের পরেও যদি নরমাল বা ন্যাচরাল ডেলিভারি হয়, তাহলে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়:
✔️ মায়ের শরীর যেভাবে জন্ম দেওয়ার জন্য আল্লাহ বানিয়েছেন, সেই পথে বাচ্চা জন্ম নেয়। এতে মা-শিশু দুজনেই দ্রুত সেরে ওঠে।
✔️ শিশু মায়ের শরীর থেকে ভালো ব্যাকটেরিয়া পায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো হয়।
✔️ শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো সহজ হয়।
✔️ মা দ্রুত হাঁটাচলা করতে পারেন, কোলে নিতে পারেন, দুধ দিতে পারেন।
✔️ ইনফেকশন, রক্তক্ষরণ, অ্যানেস্থেশিয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
✔️ ভবিষ্যতের প্রেগন্যান্সিগুলো সহজ হয়, কারণ বারবার সি-সেকশন করা হলে প্লাসেন্টা সংক্রান্ত জটিলতা বেড়ে যায়।
✔️ একবার ভিব্যাক সফল হলে ভবিষ্যতে আবার নরমাল ডেলিভারির সম্ভাবনা বাড়ে।
২. ভিব্যাক কি রিপিটেড সি-সেকশনের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ?
না, ভিব্যাক সাধারণত নিরাপদ। তবে কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হয়:
➡️আগের সি-সেকশন কীভাবে হয়েছিল — নিচের দিকে আড়াআড়ি কাট (low transverse) হলে ইউটেরাইন র্যাপচার বা জরায়ু ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে কম, আর লম্বালম্বি (vertical) কাট হলে ঝুঁকি বেশি থাকে।
➡️ আপনার শারীরিক অবস্থা—ডায়াবেটিস, হাই ব্লাড প্রেসার, প্রি-এক্লেম্পসিয়া থাকলে সতর্ক হতে হয়।
➡️আগের সি-সেকশনের কারণ—যদি পেলভিস খুব চাপা ছিল বা জরায়ুতে গঠনগত সমস্যা আছে, তাহলে পুনরায় ট্রায়াল না দেওয়াই ভালো।
➡️গর্ভের শিশুর পজিশন—যেমন ব্রীচ হলে নরমাল ট্রায়াল দেওয়া যায় না।
ভিব্যাকের এর সবচেয়ে আলোচিত ঝুঁকি:
ইউটেরাইন র্যাপচার – মানে আগের সি-সেকশনের সেলাই ফেটে যাওয়া।
যদিও এটা খুবই বিরল, মাত্র ০.৫% – ১% ক্ষেত্রে হয়।
তবে যদি র্যাপচার হয়, তাহলে তা জরুরি অবস্থা, তৎক্ষণাৎ চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। এজন্য ভিব্যাকের ক্ষেত্রে হোমবার্থের ব্যাপারে অনুৎসাহী করা হয়।
বারবার সি-সেকশন করলে যে ঝুঁকি থাকে:
➡️রক্তপাত অনেক বেশি হতে পারে,
➡️মূত্রথলি ও অন্ত্রে আঘাত লাগতে পারে
➡️ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ে
➡️প্লাসেন্টা নিচে চলে আসা (Placenta previa)
➡️প্লাসেন্টা জরায়ুতে ঢুকে যাওয়া (Placenta accreta)
আজকের মায়েরা কেন VBAC চান?
আগের সি-সেকশনের অভিজ্ঞতা যদি খারাপ হয়, ইনফেকশন হয়, মানসিকভাবে আঘাত লাগে, তাহলে মায়েরা নরমাল ডেলিভারির দিকে আগ্রহী হন।
আরেকটা সন্তান থাকলে তাকে সময় দিতে, দ্রুত সুস্থ হতে চাওয়াও একটা বড় কারণ।
আমার দেখা ভিব্যাক মায়েরা সাধারণত আরও বেশি সচেতন ও দায়িত্বশীল থাকেন।
প্রিনেটাল শিক্ষা ও মানসিক প্রস্তুতি—মহান আল্লাহর রহমতে ভিব্যাককে নিরাপদ ও সম্ভব করে তোলে।
সি-সেকশনের পরও নরমাল ডেলিভারি সম্ভব। আল্লাহ্‌ চাইলে, সুস্থ ও স্বাভাবিক জন্ম সবসময়ই সম্ভব।
 
ফারইয়াব হাসান
দৌলা, রৌদ্রময়ী স্কুল