Back

জীবনের প্রথম দৌলা জার্নিঃ সুখ, শোক ও শিক্ষা

ডিসেম্বর ২০২৪ এ প্রথম দৌলা ক্লায়েন্ট পাই। জানুয়ারিতে আপুর ডেলিভারি ছিলো । আপু কখনো প্রিন্যাটাল ক্লাস করেন নি। এবং এটা উনার প্রথম প্রেগ্নেন্সি ।
সবকিছুই আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো ছিল। আপুর কোন সমস্যা ছিলনা। শুধু শরীরে মাঝে মাঝে ব্যথা হতো যা নরমাল ছিল। শুরু থেকেই তিনি এমবিবিএস ডাক্তারের আন্ডারে ছিলেন । আমি আপুকে সাজেস্ট করি কোন গাইনি ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে। কারন এমবিবিএস ডাক্তার জানালেন তিনি ডেলিভারি করাবেন না।
কিন্তু আপু জানালেন এমন কোন ডাক্তার তিনি পাচ্ছেন না। ৩৭ সপ্তাহ শুরু হওয়ার পর আপুকে কিছু এক্সারসাইজ সাজেস্ট করি আর আপু খাবারে নিউট্রিশন ঠিকমত ফলো করছেন কিনা তা ট্রেক করতে থাকি। আপুকে ডেলিভারির জন্য প্রিপেয়ার করতে থাকি মেন্টাল সাপোর্ট এর পাশাপাশি পেইন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে আলোচনা করি।
আর হাসপাতাল চয়েজ কোনটা করছেন এবং সেখানে
এন আই সি ইউ আছে কিনা এসব মাথায় রাখতে বলি।
আপু ডাক্তারের সাথে কথা বলার সময় ডেলিভারিতে কি কি প্রোটকল ইউজ হবে জিজ্ঞেস করায় ডাক্তার কোন উত্তর দেন নি। আর কোন হাসপাতাল ভালো হবে জিজ্ঞেস করায় ডাক্তার বলেছেন পরের সেশনে জানাবেন। এভাবে ২ টা সেশন চলে যান কিন্তু ডাক্তার তেমন কিছু বলেন নি। আলট্রা রিপোর্ট যখন দেখাতে গেলেন ডেলিভারির ঠিক ১০ দিন আগে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলেন কোন হাসপাতাল ভালো হবে এবং হাসপাতালে এন আই সি ইউ আছে কিনা, ডাক্তার উনার উপর বিরক্ত হয়ে বললেন এসব কেন আগে থেকে ভাবছেন এবং এইবার ও হাসপাতালের ব্যাপারটা এড়িয়ে গেলেন। শেষবার ডেলিভারির ৫ দিন আগে উনি ডাক্তারের কাছে যান। সে সময় ডাক্তার উনাকে জানান সরকারি হাসপাতালে ডিউটিতে যখন যিনি থাকবেন তিনি ডেলিভারি করান। কেউ ফিক্স না।
আমি আপুকে ডেলিভারি সিম্পটম গুলো বুঝিয়ে দিলাম যেহেতু উনার ৩৮ সপ্তাহ রানিং। এবং এক্সারসাইজ ও লেবার ম্যানেজমেন্ট নিয়ে আলোচনা করতে থাকলাম। জানুয়ারির ২ তারিখ থেকে আপুর হালকা হালকা ব্যথা শুরু হয়। আমি আপুকে রিল্যাক্স করতে বলি এবং ঘুমাতে বলি। ঘুম থেকে উঠে আপু জানালেন ঘুমের মাঝেই কয়েকবার উনার তীব্র ব্যথা হচ্ছিল এবং ঘুম থেকে উঠার পর উনার হালকা খয়েরি শ্রাব যায়। আপুর বাসা থেকে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয় ।আমি আপুকে খেজুর সাথে নেয়ার কথা মনে করিয়ে দি। অনেক হাসপাতালে লেবার রুমে মোবাইল নিতে দেয়না তাই আমি আপুকে বললাম নার্স বা আয়া যেই থাকে তাদের বলবেন আপনাকে যেন ম্যাসাজ করেন । আর পেইন ম্যানেজমেন্ট কিভাবে করবেন তাও মনে করিয়ে দিলাম। জানুয়ারি ৩ তারিখ ভোর ছয়টায় আপু ম্যাসেজ করে জানান। আল্লাহ উনাকে একটা পুত্র সন্তান দিয়েছিলেন কিন্তু ঠিক শেষ মুহূর্তে বাচ্চা বের হওয়ার আগ মুহূর্তে বাচ্চা পেটেই মারা যায়।
ম্যাসেজটা পড়ে আমি সেদিন যেমন নাম্ব ফিল করছিলাম আজকে এই পোস্ট টা লিখার সময়ও একই অনুভুতি আমার কাজ করছে। আমি এরপরও আরো অনেক দৌলা সাপোর্ট দিয়েছি কিন্তু আমি লেখা শুরু করতে পারিনি । কারন শুরুর গল্পটাই লিখতে পারছিলাম না। এখনো মাথা ঝিমঝিম করছে। সেদিন সারাদিন একটু পরপর কেঁদেছি । রান্না করতে গিয়ে কেঁদেছি । একা চুপচাপ বসে থেকে কেঁদেছি।
কিন্তু নিজেকে বুঝালাম এই মুহূর্তে আপুকে আমার মেন্টাল সাপোর্ট দিতে হবে আমি নিজে ভেঙে পড়লে চলবেনা। আপুকে সান্তনা দিলাম খায়ের বুঝালাম। আপু বললেন সব ঠিক ছিল জরায়ুর মুখ খুলেছিল। বাবুর মাথা দেখা যাচ্ছিল।
সাইড ও কাটা হয়েছিল। শেষ মুহূর্তে বাচ্চার জাগায় কর্ড আগে বের হয়ে আসছিল। তখনই তাড়াহুড়ো করে সিজারের জন্য উনাকে রেডি করা হলো ।এই সিচুয়েশনে এটাই নিয়ম।
সিজারের আগে একবার চেক করে বুঝা গেল বাচ্চা আর নেই। পরে নরমালি বাচ্চাকে বের করা হলো।
এমন কেন হলো জানার জন্য আমি সিস্টার আইশাকে(আমানি বার্থ) নক দিয়েছিলাম তিনি জানালেন এটা রেয়ার একটা ঘটনা যেখানে বেবির মাথা এবং মায়ের পেলভিক বোনের মাঝে কর্ড কম্প্রেসড হয়ে আগে চলে আসে। তিনি বলেছিলেন ৫০% এমন ঘটনা ঘটে যখন ডাক্তাররা আগেই ওয়াটার ব্রেক করে দেন। আর বাকি ৫০% হলো ভাগ্য। আমার ক্লায়েন্ট আপুর ওয়াটার ব্রেক করে দেয়া হয়নি এটা এম্নিই এমন হয়েছিল।
পরবর্তীতে আমার ডাক্তার বোনকে জিজ্ঞেস করি এমন কেন হল, সেও জানালো এটা পুরাটাই ভাগ্য।
আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা করেন সন্তান সন্ততী দিয়ে। আর আপুকে মনে করিয়ে দিলাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন কোন বান্দার সন্তান মারা যায়, তখন মহান আল্লাহ স্বীয় ফেরেশতাদেরকে বলেন, তোমরা আমার বান্দার সন্তানের জীবন হনন করেছ কি? তাঁরা বলেন, হ্যাঁ। তিনি বলেন, তোমরা তার হৃদয়ের ফলকে হনন করেছ? তাঁরা বলেন, হ্যাঁ। তিনি বলেন, সে সময় আমার বান্দা কী বলেছে? তারা বলে, সে আপনার হামদ (প্রশংসা) করেছে ও ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রা-জিঊন (অর্থাৎ, আমরা তোমার এবং তোমার কাছেই অবশ্যই ফিরে যাব) পাঠ করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, আমার (সন্তানহারা) বান্দার জন্য জান্নাতের মধ্যে একটি গৃহ নির্মাণ কর, আর তার নাম রাখ, ’বায়তুল হামদ’ (প্রশংসাভবন)।
(তিরমিযী ১০২১)
তবে খুশির খবর হলো আপু ইন শা আল্লাহ আবার মা হতে যাচ্ছেন। আপনারা খাস করে উনার জন্য দু’আ করবেন। খুব অল্প বয়সে আপু অনেক বড় একটা পরীক্ষা দিয়েছেন এইবার আল্লাহ যেন উনাকে নেক সন্তান দান করেন।
 
তাসনিম সুশান আজাদ
দৌলা ও চাইল্ডবার্থ এডুকেটর