Back

“বি বাবো”: ব্রেস্ট ফিডিং বন্ধের গল্প

ফাতিহ হওয়ার পর প্রথম মুহূর্তটা আজও চোখে ভাসে।

আল্লাহর রহমতে, জন্মের পরই আমি ওকে স্কিন-টু-স্কিন কন্টাক্টে রাখি। এত ছোট্ট, ভীতু, কাঁপা কাঁপা হাত-পা… তখনও ও জানত না কীভাবে ব্রেস্ট মিল্ক খেতে হয়। আমি শুধু ওকে বুকে জড়িয়ে রেখেছিলাম, যেন ও বুঝতে পারে — “আমি পাশে আছি, মা তোমাকে অনেক ভালোবাসে।” ধীরে ধীরে খেতে শিখল, মায়ের সাথে মজবুত বন্ধন তৈরি হল, বুঝে নিল এখানেই ওর নিরাপত্তা, ভালোবাসা, ঘুমের আশ্রয়।

আমি ফাতিহকে বিসমিল্লাহ শিখাতে চেয়েছিলাম। কথার দিক দিয়ে সে দুর্বল। অনেক উল্টাপাল্টা উচ্চারণ করে। নিজেকে বলে “আতি”, আমাকে বলে “মাম মাম”। আর বলে “বি বাবো”, মানে সে ব্রেস্ট মিল্ক খাবে।
দিন-রাত “বি বি” করতো — না পেলে জেদ করতো, কাঁদতো। বাইরে কিছু খেতে চাইতো না। আমি চেষ্টার পর চেষ্টাও করেছি, কিন্তু কোনোভাবেই ওকে ম্যানেজ করতে পারছিলাম না। বাসার মধ্যে ঘুরেফিরে শুধু আমাকে দেখে। আমার কাছে ওর আহ্লাদ, সব আবদার।

এখন ওর বয়স দুই বছর হতে চলল। দিন-রাত বি খাওয়ার কারণে ওর দাঁতে ক্ষয় ধরছে, শরীরে এনিমিয়া হওয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। আমারও শরীর ব্যথায় ভরা, ক্যালসিয়ামের ঘাটতি, বিশ্রামের অভাব। অবশেষে একদিন চুপচাপ সিদ্ধান্ত নিলাম —
সময় এসে গেছে, এবার থামতে হবে।

চিন্তা করিনি, ভয় পাইনি। মনে সাহস রেখেছি। কঠিন বিষয় হচ্ছে, পুরো সময়টা আমার একাই ম্যানেজ করতে হবে। আমি জানতাম — এখন এটা আমাদের দুজনের জন্যই ভালো।

ওর প্রিয় কিছু খাবার আনিয়েছি। ওকে এভাবে বুঝিয়েছি,
“ফাতিহ বাবু, তুমি এখন বড় বাবু হয়েছো, এখন থেকে কাপে করে দুধ খাও। মামপটি পানি খাও। বড় বাবুরা সাইকেল চালায়।”
সাইকেল আর “পি পি বুম” তার অনেক প্রিয়।
এরপরের অভিজ্ঞতাগুলো সহজ ছিল না।
রাতগুলো কেটেছে কান্নায় — ঘুমের মধ্যেও খাওয়ার ইচ্ছে জাগত।
পেট ভরে খাবার খাওয়া হতো না, পেটে ক্ষুধা থেকেই যেত।
একটু পরপর জেদ চলে আসত, কান্না আর অভিমান মিশে যেত একসাথে।
মাকে খুব ঠান্ডা মাথায় সামলাতে হতো —
কখনও কখনও রাগ উঠত, এমনও মনে হতো,
মাকে আর দেখতে ইচ্ছে করছে না…।
মন কাঁদে, বুক ভারী হয়, তবুও জানি — এটা আমাদের দুজনের জন্যই ভালো।
এখন ও মাঝে মাঝে বলে “বি বাবো।”
ওর মুখে এই কথা শুনে আমার বুক কেঁপে ওঠে, কারণ এই শব্দটার সাথে জড়িয়ে আছে অনেক মায়া, ভালোবাসা, একজন মা ও সন্তানের সুন্দর সব স্মৃতির মুহূর্ত।

মনে মনে বলি —
এই বিদায়ও ভালোবাসার,
এই থামাটাও খুব সুন্দর।

ফারইয়াব হাসান
দৌলা, রৌদ্রময়ী স্কুল