অপারেশন সাকসেসfool
- Posted by MNCC Moderator
- Date February 4, 2026
- Categories Doula Service, Doulas

দৌলা ইন্টার্ন হিসেবে রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্সের ২০তম ব্যাচে জয়েন করার পর বুঝতে পারি একজন ভালো দৌলা হওয়ার জন্য মায়েদের সাথে মেশার, তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে চিন্তা করার কোন বিকল্প নেই। পুরো কোর্সের সময়টুকু মায়েদের থেকে অনেক কিছু শিখেছি।
এর ধারাবহিকতায় প্রথম দৌলা সার্ভিস দেওয়ার সুযোগ হয় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের শুরুর দিকে।
প্রথমেই অফলাইন সার্ভিস। আমার ক্লায়েন্ট আপুরও ফার্স্ট প্রেগনেন্সি। সব মিলে একটু নার্ভাস ছিলাম। রাবেয়া রওশীন আপুর কাছ থেকে অনেক হেল্প পেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ।
ক্লায়েন্ট আপু ছিলেন প্রিনেটাল ১৯ ব্যাচের পার্টিসিপ্যান্ট। মোটামুটি অনেক কিছুই জানা ছিল তাঁর। এপ্রিলের ৬ তারিখ EDD। তিনি প্রেগনেন্সিতে ফেস করতে থাকা সমস্যাগুলো শেয়ার করতেন। ডায়েট চার্ট আর এক্সারসাইজ কাউন্টও শেয়ার করতে বলেছিলাম। এরই মধ্যে একদিন জানালেন বমি হচ্ছে, সাথে ওয়াটারি ডায়রিয়া। হালকা কনট্রাকশনও ছিল। একটা স্যালাইন খেয়েছেন বললেন। ডাবের পানি খেতে বললাম। ওনার শরীর বেশ দূর্বল হয়ে গিয়েছিল। বুঝলাম ভালোই ডিহাইড্রেশন দেখা দিয়েছে। বেশ পপুলার নরমাল সাপোর্টিভ একজন ম্যামের আন্ডারে ছিলেন। ম্যামকে দেখাতে বললাম।
একদিন এডমিট ছিলেন হসপিটালে। বাবুর অক্সিজেন লেভেল কমে গিয়েছিল, হার্ট রেট ছিল ২১৯। দুইটা স্যালাইন আর পাঁচটা ইঞ্জেকশন নেওয়ার পর বাসায় ব্যাক করেছেন বলে জানালেন। ম্যাম দুই সপ্তাহ বেড রেস্ট দিলেন আর এক্সারসাইজ আপাতত অফ রাখতে বললেন।
খাওয়া দাওয়ার বিষয়ে যত্নশীল হতে বললেন। এর মাঝে জানতে পারি, ম্যাম ওমরাহ করতে যাবেন। লেবার টাইমে নাও থাকতে পারেন।
অফলাইন সার্ভিসে লেবার অ্যাটেন্ড করার আগে একবার ক্লায়েন্টের হোম ভিজিট করার নিয়ম। সেই সূত্রে আপুটিকে দেখতে তার বাসায় যাই ফেব্রুয়ারীর শেষের দিকে। মোটামুটি সবই ঠিক ছিল তবে মনে হয়েছিল নিউট্রিশনের ক্ষেত্রে আসলেই কিছুটা ঘাটতি আছে ওনার। ওয়েটও তুলনামূলক কম ছিল।
মার্চের শুরুতে বার্থ বল এক্সারসাইজ শুরু করলেন। ৩৭ সপ্তাহ শুরু হলো। ফলো আপের জন্য ম্যামও যেতে বলেছিলেন ১৪ তারিখ। সবকিছু এ পর্যায়ে আলহামদুলিল্লাহ ভাল ছিল। নিয়মিত এক্সারসাইজ কাউন্ট পাঠাতেন। স্কোয়াটিং, বাটারফ্লাই, ডাক ওয়াক, মাইলস সার্কিট, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা নামা প্র্যাকটিস করছিলেন। শরীরে ব্যথা হলে আপাতত শুধু হাঁটার কথা বললাম। আগের ডিহাইড্রেশন আর ফিটাল ডিসট্রেসের বিষয়টা মাথায় রেখে কমফোর্টেবল পজিশনে থেকে এক্সারসাইজ করার পরামর্শ দিলাম। রিল্যাক্সেশন প্র্যাকটিস, ম্যাসেজ নেওয়া আর ডিপ ব্রীদিং করার কথাও বললাম।
দেখতে দেখতে মার্চ মাসও প্রায় শেষ হয়ে গেল। ৩৯ সপ্তাহের শুরুর দিকে কনস্টিপেশনের একটু সমস্যা হচ্ছিল। রমাদান টাইম বলে রোজাও রাখছিলেন। ফ্লুইড ইনটেক বাড়ানোর পাশাপাশি খাওয়া দাওয়ার চাহিদা পূরণ করে ফেলতে বললাম ইফতার থেকে সেহেরির মধ্যে।
২৬ তারিখ জানালেন এক ঘণ্টা ধরে কনট্রাকশন আসছে যদিও পেইন বেশি না। ব্র্যাক্সটন হিক্স। ট্র্যাকিং এ রাখতে বললাম। প্রথম দিকে কন্ট্রাকশনগুলোর মধ্যে পার্থক্য ছিল প্রায় ১০ মিনিটের মত। রাত সোয়া নয়টার পর পেইন আসে ১০ টা ৫৬ তে। সেদিনের মতো লাস্ট পেইন আসে এর আধা ঘণ্টা পর।
২৮ তারিখ দুপুর ১২ টা। ১১ টা ২০ থেকে ২০ মিনিটে ৩ বার কনট্রাকশন এসেছে বললেন। তখন পর্যন্ত কোনো ভ্যাজাইনাল ডিসচার্জ ছিল না। ওনার যেহেতু তেমন কম্প্লিকেশন নেই, আমি বললাম পেইন ম্যানেজ করতে পারলে লেবারের ল্যাটেন্ট ফেজ পর্যন্ত বাসায় থাকতে পারেন। জানালেন পেইন সহ্য করার মতই। তাও হসপিটালে যাচ্ছেন।
২৯ মার্চ সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে জানালেন কিছুটা ব্লাডি শো দেখা যাচ্ছে। এক ঘণ্টার মাঝে ৫ মিনিটের ব্যবধানে স্ট্রং কনট্রাকশন আসতে থাকে। দুপুর বারোটা নাগাদ জানতে পারলাম পিটোসিন দেওয়া হচ্ছে। সার্ভাইকাল ডায়ালেটেশন ৩ সে. মি.।
দুপুর আড়াইটার দিকে আমি হসপিটালে পৌঁছালাম। কেবিনে আপু একটা বেডে শুয়ে ছিলেন। হাতে ক্যানুলা করা, পাশেই স্ট্যান্ড থেকে পিটোসিন দেওয়া হচ্ছে। ওনার সাথে ওনার মা আর হাসব্যান্ড ছিলেন। উনার নিয়মিত ডাক্তার যেহেতু ছিলেন না, আরেকজন ডক্টর এসে মায়ের অবস্থা ব্রিফ করলেন। সাথে ৫ টা পর্যন্ত প্রগ্রেস দেখবেন বললেন। মোটামুটি পজিটিভ ছিল সব। প্রগ্রেসও ভাল বলা যায়।
এরপর বেশ খানিকটা সময় মায়ের সাথে ছিলাম। যতটা সম্ভব ওনাকে এক্টিভ রাখার চেষ্টা করছিলাম। পেলভিক রক, হাফ স্কোয়াট, ওয়াকিং। সাথে ওনার প্রয়োজনমতো রিল্যাক্সেশন ম্যাসেজ দিচ্ছিলাম। বিশেষ করে কন্ট্রাকশনের সময় হিপ ম্যাসেজ বেশ হেল্পফুল ছিল। খেজুর, পানি খাচ্ছিলেন, প্রয়োজনমতো ওয়াশরুমেও যেতে পারছিলেন।
নামাজের জন্য একটু উপরে ছিলাম। এর মধ্যে খবর পেলাম সার্ভিক্স ১০ সে.মি. ডায়ালেটেড।
ইতিমধ্যে লেবার রুমে নেওয়া হয়েছে মাকে। লিথোটোমি পজিশনে শোয়ানো। মা চাচ্ছিলেন অন্য কোন পজিশন নিতে। সাপোর্ট পার্সন হিসেবে আমি একাই ছিলাম, মার কাছে গিয়ে বললাম চাইলে অন্য পজিশন নিতে পারেন। লেবার৷ রুমের সবাই খুব সাপোর্টিভ না হলেও বাধা দেননি তখনো। বেড থেকে নামতে দেওয়া হচ্ছিল না কাজেই চাইলেই যেকোন পজিশন নেওয়া সম্ভব ছিল না। পেলভিক রক করতে বললাম। অ্যাটেনডিং ডক্টর বলছিলেন এসব এক্সারসাইজের এখানে কোন কাজই নেই, তাও মায়ের মানসিক শান্তির জন্য করতে দিচ্ছেন।
ওদিকে যত কন্ট্রাকশন বেশি আসছে মা ব্যাথায় তত বেশি চিৎকার করছেন। এবার ডক্টর বিরক্ত হয়ে বললেন, “অনেক সুযোগ দিয়েছি। এভাবে ডেলিভারি হয় কখনো দেখিনি। লিথোটোমি পজিশনে পেলভিস প্রপার পজিশনে থাকে। এবার যেভাবে বলি শুয়ে থাকো।”
আবার লিথোটোমি পজিশনে নেওয়া হলো মাকে। আমি চেষ্টা করছিলাম তাকে কমফোর্ট দেওয়ার। ডক্টর পুশ করতে বললেন। মা চেষ্টা করলেন। ডক্টর সাফ জানিয়ে দিলেন এত অল্পে হবে না। আমার মনে হচ্ছিল তার নিউট্রিশনাল ল্যাকিং এবার বেশ ভোগাবে। বেশ খানিকক্ষণ পর ডক্টর জানালেন বেবির হেড দেখা যাচ্ছে। ওনেক জোরে পুশ করতে হবে।
আমি জানিনা ঐ মুহুর্তে মা কতটা কমফোর্টেবল ছিলেন কিন্তু অপটিমাম পুশ করতে পারছিলেন না। এক পর্যায়ে নিজেই হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন তিনি সি সেকশনে যেতে চান। উপস্থিত সকলে বোধ হয় এটাই চাচ্ছিলেন। না হলে কোনো জটিলতা ছাড়াই সম্ভাব্য ৬ এপ্রিলের ডেলিভারি ডেট ২৮ মার্চ ইনডিউস করা, বাঁধা ধরা সময়ের মধ্যেই ডেলিভারি করানোর তেমন কোন কারণ পাইনি। তবে হ্যাঁ, আমার ক্লায়েন্ট আপু একটু দুর্বল ছিলেন অবশ্যই। এছাড়া হয়ত সবার এমন ডমিনেশন মানসিকভাবে তাকে দুর্বল করে ফেলেছিল। ফ্যামিলি অনেক আগে থেকেই চাচ্ছিলেন ডিরেক্ট সি সেকশন হোক। এত “রিস্ক” নেওয়ার পক্ষে ছিলেন না।
এরপর সেখানেই ও.টি. রেডি করার প্রস্তুতি শুরু হলো। যে ডক্টর সার্জারি করবেন, তিনি এসে আমাকেই মারাত্মক ধমক দিয়ে বললেন, কী ধরনের সাপোর্ট পার্সন আমি, কিছুই ম্যানেজ করতে পারিনা।
আমাকে বাইরে চলে আসতে হলো। এরপর ২ ঘণ্টার মতো অপেক্ষা। মেয়ে বাবু হলো আলহামদুলিল্লাহ।
বাবুকে একবার দেখে যখন বের হই তখন রাত ৯ টার কিছু বেশি বাজে। আম্মু ছিলেন সাথে, অনেকটা সময় তাঁর ওপর দিয়ে বেশ ধকল গেছে। ক্লায়েন্ট আপুর আম্মুর সাথে বসে ছিলেন বাইরে।
রাবেয়া আপুকে টেক্সট করলাম। আপু জিজ্ঞেস করছিলেন ফোরসেপস ট্রাই করা যেতো কিনা। আমি ভাবছিলাম, যতটুকু করা যেত ততটুকু করলেও হতো। তাছাড়া তাদের কাছে ফোরসেপস ছিল বলেও মনে হয়নি।
যাই হোক, এরপর বেশ কিছুদিন অফলাইন সার্ভিস থেকে দূরেই ছিলাম। তবে দৌলা হিসেবে আমি বিশ্বাস করি বিভিন্ন সমাপ্তির গল্প অভিজ্ঞতার ঝুলিকে ভারি করার জন্য অপরিহার্য।
এরপর আর একজন আপুর কথা রাখতে আবার অফলাইনে লেবার অ্যাটেন্ড করতে গিয়েছিলাম একই বছরের শেষের দিকে। সে গল্প তোলা রইল আরেক দিনের জন্য।
ইল্লিন সাইয়্যারা
দৌলা, রৌদ্রময়ী স্কুল
মেডিকেল স্টুডেন্ট
Other post
Tag:দৌলা, দৌলা ডায়েরী, দৌলা সার্ভিস
You may also like
মায়ের নিঃশব্দ কান্না, আমরা কি শুনি?
September 3, 2026
‘খুব কাঁদত, রাতে ঘুম হত না! যমজ সন্তানকে ফাঁস দিয়ে মারল মা। সন্তানদের কান্না থামানোর জন্য একটি লেপ দিয়ে মুখ ঢেকে দেয়। তাতে আরও জোরে চিৎকার শুরু করলে ওড়না দিয়ে তাদের শ্বাসরোধ করে মারে মা।’ কিছুদিন পরপরই এমন ঘটনা ঘটে …
দৌলা ডায়েরী সিরিজ — পর্ব ৩৯
August 15, 2026
সাদিয়া আপু আমাকে দৌলা সার্ভিস এর জন্য নক করেন উনার ২য় প্রেগন্যান্সির ৩৬ সপ্তাহে। আপুর ফর্ম থেকে জানতে পারি উনার প্রায় ৩ বছরের একটি বাবু আছে এবং ১ম প্রেগন্যান্সিতে উনার লেবার ট্রায়াল দেয়ার সময় ৭সেমি ডায়লেশনের (জরায়ু মুখ খোলার) পর …
এপিডুরাল শুধু একটি পেইন কিলার নয়
May 18, 2026
আব্দুল্লাহর জন্মের সময় এপিডুরাল নেওয়ার আগে আমি ভেবেছিলাম এটি শুধু একটি পেইন কিলার। ব্যথা একটু কমবে, কিছুটা বিশ্রাম পাব, আর এর মধ্যেই বেবি হয়ে যাবে।কিন্তু আমি যা বুঝিনি তা হলো— এটি লেবরের স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়াকে বদলে দেয়।লেবর মানে শুধু জরায়ুর Contractions …
