Back

আরামের জন্য সিজার না, প্রয়োজনের সময় জেদ না

নরমাল ডেলিভারি vs সিজারিয়ান ডেলিভারি—
বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুক সরব এই এক টপিক নিয়ে…
সবাই বারবার নরমাল ও সিজারিয়ান ডেলিভারিকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে, কিন্তু সত্য হলো এই যে এই দুটো শব্দ আলাদা কোনো বিষয়ই নয় যে এদের মধ্যে “Vs” শব্দ আসবে। বরং এই দুটো শব্দই একজন শিশুকে পৃথিবীতে আসার জন্য ভিন্ন পদ্ধতি মাত্র।
আমি কোন ডক্টর বা মেডিক্যাল পার্সন নই, তাই কোন পদ্ধতি অবলম্বন করা বেশি ভালো—এ বিষয়ে কথা বলাও আমার সাজে না।
তবে আমি একজন মা, যে চারবার সন্তান জন্ম দিয়েছে—দুই পদ্ধতিতেই দু’বার করে। তাই আমি আমার অভিজ্ঞতার ছোট্ট একটা অংশ তুলে ধরতে চাই।
১ম বার কন্সিভ করি এবং মাত্র তিন মাসের মাথায় মিসক্যারেজ হয়। তারও এক বছর পর আমাদের দরজায় নতুন সুখবর কড়া নড়ে। নিয়মিত চেকআপ, যত্ন—সবকিছুর পর নরমাল ডেলিভারির মধ্য দিয়ে আমার প্রথম সন্তান পৃথিবীতে আসে। যদিও ১৮ ঘন্টার অসহ্য লেবার পেইনের ব্যথার গল্পও যোগ হয়েছিল এই অধ্যায়ে। তবুও মাতৃত্ব সুন্দর… আলহামদুলিল্লাহ।
এরপর আমার মেডিক্যাল হিস্ট্রিতে একে একে আরও তিনটি মিসক্যারেজ যোগ হয়। তবে আমি সবসময়ই নিয়মিত ফলোআপে ছিলাম।
এই সবকিছুর পর আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা আবার আশার আলো দেখতে পাই। আবার স্বপ্ন বুনি নতুন করে। আর এই স্বপ্ন ধীরে ধীরে আমার খুব কাছাকাছি চলে আসে। আলট্রা রিপোর্টসহ সবকিছুই ভালো ছিল। ১৫ দিন পরপর চেকআপ এবং নিয়মিত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ চলছিল।
৩৯ সপ্তাহে আমার হাসবেন্ড নিজ দায়িত্বে ডাক্তারের কাছে নিয়ে বলেন, চাইলে আমার স্ত্রীকে এডমিট রাখতে পারেন। কিন্তু সবকিছু স্বাভাবিক থাকায় আমার ডাক্তার বাসায় যেতে বলেন এবং নরমাল ডেলিভারির সিদ্ধান্ত নেন।
আমরা তবুও ঝুঁকি এড়াতে হাসপাতালের খুব কাছেই দেবরের বাসায় উঠি। কিন্তু তার ১০ দিনের মাথায় হঠাৎ আমার অস্থিরতা বাড়ে। কোনো পেইন নেই, কিছুই না—শুধু মন ছটফট করছিল। তাই দ্রুত হাসপাতালে আসি।
এডমিট হই নগরীর পার্কভিউ হাসপাতালে, কারণ আমার ডাক্তার সেখানেই চেম্বার করেন। কিন্তু সেদিনের রিপোর্ট আমাকে দাঁড় করায় জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে।
হ্যাঁ, আমার স্বপ্ন—আমার লালিত স্বপ্ন আমার কাছে আসার আগেই তার হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়। নরমাল ডেলিভারিতেই সে পৃথিবীতে আসে, কিন্তু পৃথিবীর আলো তার দেখা হয়নি।
নিশ্চয়ই আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী।
তারপর আবার ডাক্তারের পরামর্শে আমরা প্ল্যান করি। ওনার পাশাপাশি আরও একজন ডাক্তারের পরামর্শও নিয়েছিলাম। সবকিছু ঠিক আছে—এই আশ্বাস নিয়েই আবার পথচলা শুরু।
এবারের প্রেগন্যান্সিতে সবাই খুব কেয়ারফুল ছিলাম। প্রতি সপ্তাহে চেকআপ হতো। কিন্তু প্রতিটা মুহূর্তেই ভয় যেন আমাকে গিলে খেত।
২৯ সপ্তাহে কভিড পজিটিভ হয়ে নতুন একটা অধ্যায়ের সূচনা হলো। আলহামদুলিল্লাহ, জটিল কোনো পরিস্থিতি আসেনি। ডাক্তারের কাছেও কিছু লুকাইনি। বাসায় সব নিয়ম মেনে চলেছি, ১৫ দিন পর আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরলাম।
সব ঠিকঠাকই চলছিল। ৩৫ সপ্তাহে আবার আলট্রা করি। তবে এবার ফ্লুইড বেশি ধরা পড়ে। রিপোর্ট নিয়ে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাই। তিনি ১০ দিন পর আবার আলট্রা করে সি-সেকশনের পরামর্শ দেন। আমরা সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করে একমত হই। তবুও নিশ্চিত হতে আরও একজন ডাক্তারের পরামর্শ নিই—তিনিও একই কথা বলেন।
তবে আমরা ১০ দিন অপেক্ষা না করে ৬ দিন পরই একজন অভিজ্ঞ সনোলজিস্টের কাছে আলট্রা করি। রিপোর্ট ডাক্তারের হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাই এবং রাতে রিপোর্টসহ পার্কভিউতে এডমিট হতে যাই।
কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে মেডিক্যাল অফিসার আমাদের জানান—সব ঠিক আছে, বাসায় চলে যান, পেইন উঠলে আসবেন।
কেমন যেন ধাক্কা খেলাম। দ্রুত রিপোর্ট কাজিনদের পাঠাই—যাদের একজন গাইনোকলজিস্ট, আরেকজন সিএমএইচ-এর সিনিয়র নার্স। তারা রিপোর্ট দেখে অবাক হয়ে জানতে চায়—আমি এখনো বাসায় কেন!
তাদের একজন আমার রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি এবার দায়সারা ভাবে বলেন—“চাইলে নরমাল করতে পারো, নাহয় সিজার… চান্স ৫০/৫০।”
কাজিন ফিরে আসে হতাশ হয়ে। পরিস্থিতি সবাই বুঝছিল, কিন্তু ডাক্তারের সেই দিনের আচরণ আমাদের আরও অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়।
সেদিনই আমরা দ্রুত সিএসসিআর হাসপাতালে যাই এবং ডা. শাহেনা আক্তারের শরণাপন্ন হই। তিনি আমার সব রিপোর্ট দেখে দেরি না করে এডমিট করেন। রেফারেন্স থাকায় সবকিছু দ্রুতই হয়।
এরপর সিটিজি করিয়ে তিনি দ্রুত সিজারের সিদ্ধান্ত নেন। আমি এবং আমার হাসবেন্ড সাথে সাথেই সম্মতি দিই।
জীবনের সবচেয়ে কঠিন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, সিজারিয়ানের মাধ্যমে জন্ম দিই আমার তৃতীয় সন্তান—আমার ছেলেকে।
সে এনআইসিইউতে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে দুই দিন… তারপর সেও চলে যায়—দূরে, অনেক দূরে…
আলহামদুলিল্লাহ আলা কুল্লি হাল। নিশ্চয়ই আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী।
আমার ১ম সিজার—আমার সন্তানকে না পাওয়া। এরপরও আমাদের জীবনের বেস্ট ডিসিশন ছিল সেদিনের সিজারিয়ান। নাহলে কি নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম? বারবার মনে হতো—হয়তো আমাদেরই কোনো ভুল ছিল…
আমার জীবনকে তছনছ করে দিয়েছিল সন্তান মৃত্যুর আরও ৫ দিন পর, যখন আমাকে জানানো হয়—আমার ছেলে আর আমার মাঝে যে বিচ্ছেদ, তা দুনিয়া আর কবরের দূরত্ব।
শুরুর দিকে স্বামীর উপর প্রচণ্ড অভিযোগ থাকলেও, উম্মে সুলাইম (রাঃ)-এর জীবনী শুনে আমার স্বামীর প্রতি সম্মান আরও বেড়ে যায়।
তারপর ডা. শাহেনা আমাদের পরামর্শ দেন ৬ মাস পর আবার প্ল্যান করতে। তবে আমরা ২ বছর সময় নিই। এরপর আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে আবার ট্রিটমেন্ট শুরু করি।
এবার প্রেগন্যান্সি সুখবর নয়, বরং ভয়ে ভরা এক অধ্যায় মনে হতে থাকে। তবে এই সময়ে আমার সবচেয়ে বড় সাপোর্ট হয়ে দাঁড়ায়—আমার অনলাইনে পরিচিত কোরআন ক্লাসের সাথী, ডা. উম্মে সুমাইয়া আক্তার। সে আমার জন্য এক বড় মানসিক শক্তি হয়ে ওঠে।
এবার সবকিছু আরও কেয়ারফুলি চলছিল। ৩২ সপ্তাহে মুভমেন্ট কমে গেলে দ্রুত হাসপাতালে এডমিট করা হয়। এরপর চার সপ্তাহে চারবার এডমিট থাকতে হয় আমাকে।
এই সময়টাতে আমি আমার জীবনের সেরা ডাক্তার এবং সেরা টিমের দেখা পাই। কোনো অবহেলা ছিল না, কিছুই লুকানো হয়নি—সবকিছু দ্রুত ও যত্ন নিয়ে করা হচ্ছিল।
তবুও আমার প্রতিটা মুহূর্তের ভয় আমাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছিল। আর সহ্য হচ্ছিল না…
অবশেষে ৩৭ সপ্তাহে, যেদিন ম্যাম প্রতিদিনের মতো আমাকে দেখতে আসেন—সেদিনই দ্রুত ওটিতে নেওয়া হয়। আর তারপর,আমার ঘর আলো করে আসে আমাদের কন্যা সন্তান।
আমি সহ অনেকে—আমার মেয়েকে দোয়ার জবাব বলেই মানি। আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ।
এবার আসি মূল কথায়— আমার চারটি ডেলিভারির কোনো একটাকেও আমি কখনো অন্যটির সাথে তুলনা করিনি। কোন পদ্ধতি “বেস্ট”—এই প্রশ্নটাই আমার কাছে কখনো গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
কারণ, আমার জন্য যখন যেটা প্রয়োজন ছিল—আমরা সেটাই গ্রহণ করেছি।
তাই আপনাদেরও বলছি— “নরমাল না সিজার?”—এই প্রশ্নে না গিয়ে ভাবুন, আপনার সন্তানের নিরাপদ আগমনের কথা।
নরমাল হলে হয়তো অসহনীয় ব্যথার গল্প থাকে, সিজার হলে দীর্ঘমেয়াদি কষ্টের অভিজ্ঞতা থাকে— কিন্তু এর আগে ভাবুন, আপনার গর্ভে লালিত স্বপ্নের জন্য কোনটা সবচেয়ে নিরাপদ।
আরামের জন্য সিজার যেমন ঠিক নয়, প্রয়োজনের সময় অহেতুক জেদ দেখানোও তেমনই বোকামি।
 
আনিকা
রৌদ্রময়ী প্রেগন্যান্সি, মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার বিডি,
গ্রুপ মেম্বার