এপিশিওটমি ছাড়া আমার সাড়ে ৩কেজি বাবুর তিব্যাকের গল্প
- Posted by MNCC Moderator
- Date June 12, 2026
- Categories Birth Story, Others

আলহামদুলিল্লাহ গত ২১-০২-২৬ তারিখ রাত ১০:২২ মিনিটে ভিব্যাকের মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা আমার আয়িশাহকে আমার কোলে দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ ছুম্মা আলহামদুলিল্লাহ। সর্বোপরি আল্লাহ তায়ালার প্রতি হাজার হাজার শুকরিয়া তিনি আমাকে ভিব্যাকের জন্য কবুল করেছেন। অতঃপর রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল টিমের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা, তারা বাংলাদেশে এত স্বল্প মূল্যে এত সুন্দর তথ্যবহুল একটা কোর্সের আয়োজন করেছেন। এই কোর্সটা যে কতটা উপকারী সুবহানাল্লাহ, যে এটা করেছে কেবল সেই বলতে পারবে। আল্লাহ তায়ালা তাদের উত্তম জাযা দান করুন। আর আমি কৃতজ্ঞ আমার দৌলার (লেবার-ডেলিভারি সাপোর্ট পারসন) প্রতি, আল্লাহ তায়ালা তাকেও উত্তম জাযা দান করুন।
প্রথমবার ধোয়াশা জ্ঞান আর সাপোর্টিভ ডক্টর না থাকার কারণে ফুল প্রেগন্যান্সিতে প্রচুর একটিভ আর সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরেও সি সেকশন করতে হয়েছে। যেই ট্রমা থেকে বের হতে আমার অনেক সময় লেগে যায়, সত্যি কথা বলতে এখনো আমি ভুলতে পারিনা। যাই হোক, সেই চিন্তা থেকে এইবার কনসিভের ট্রাই করার আগেই রৌদ্রময়ীর প্রিনেটাল কোর্সে ভর্তি হয়ে যাই। আলহামদুলিল্লাহ কোর্স শেষ করার আগেই কনসিভ করি। প্রেগন্যান্সিতে আমার বমির সমস্যা হয় প্রচুর, একেবারে বিছানায় পরার মতো অবস্থা, যার কারণে প্রথম ক্লাসগুলো মনোযোগ দিয়ে করতে পারলেও পরেরগুলো আর করতে পারিনি, সেগুলো রেকর্ড দেখেছি পরে। আর আমার লোকেশনে (টাংগাইল) সাপোর্টিভ ডক্টর খুঁজতে থাকি, আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ তায়ালা সঠিক সময়ে এত ভালো নরমাল সাপোর্টিভ ডক্টর আর লেবার টিম মিলিয়ে দিয়েছেন সুবহানাল্লাহ যেটা ছিলো আমার লোকেশনে অসম্ভব প্রায়। সাপোর্টিভ ডক্টর যে কতটা জরুরি এইবার বুঝেছি, এরজন্যই কোর্সে প্রথমেই বলা হয় সাপোর্টিভ ডক্টরের আন্ডারে থাকতে। আল্লাহ তায়ালা উনাদের উত্তম জাযা দান করুন। আবার কল্পনাতীত ভাবে আমার দৌলাকেও পেয়ে যাই আমার লোকেশনেই। যার জন্য আমার সাহস আরও একটু বেড়ে যায়।
শুরু থেকেই আমি রেগুলার ডক্টরের চেকাপ করাতাম যেহেতু ভিব্যাক ট্রায়াল দিব তাই কোনো রিস্ক নিতে চাইনি। বমির সমস্যার কারণে প্রথম ট্রাইমিস্টারে কিছুই করিনি শুধু ডিপ ব্রিদিং আর রিল্যাক্সেশনটা ট্রাই করতাম আর মাঝেমধ্যে কেগেল এক্সারসাইজ। প্রথম প্রেগন্যান্সিতে একদম ফিট থাকলেও এইবার আমার শরীর খুব দূর্বল লাগতো, কিছুই খেতে পারতাম না। এমনিতে কোনো কমপ্লিকেশন ছিলো না। সেকেন্ড ট্রাইমিস্টার এর শেষ থেকে মোটামুটি ট্রাই করেছি নিউট্রিশন ঠিক রাখার, যেহেতু বেশি খেতে পারতাম না তাই সাথে সাপ্লিমেন্টও নিয়েছি। সেকেন্ড ট্রাইমিস্টার থেকে কোর্সে দেখানো ব্যায়ামগুলো করার ট্রাই করতাম, রেগুলার না করলেও ম্যাক্সিমামই করতাম। রাবেয়া আপুর কথা অনুযায়ী কিছু কিছু ব্যায়াম দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই ঢুকিয়ে নিয়েছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ এটা অনেক কাজে দিয়েছে। প্রথমে করা লাগবে এটা ভেবে করতাম, পরে এমন অভ্যাস হয়েছিল যে একদিন ব্যায়াম না করলে আরাম পেতাম না, করতেই হতো। থার্ড ট্রাইমিস্টার থেকে বিশেষ করে ৩৬+ সপ্তাহ থেকে একেবারে রুটিন মাফিক একটিভ হয়ে যাই। যেটা একদম হস্পিটালে ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত কন্টিনিউ ছিলো। আর শুরু থেকেই চেষ্টা করেছি রেগুলার হাটাহাটি ঠিক রাখার। আর ৩৬+ উইক থেকে রেগুলার খেজুর আর নিয়ত করে জমজমের পানি খেয়েছি। আর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর কাছে প্রচুর দুয়া করেছি। খুব করে চাচ্ছিলাম যাতে ন্যাচারালি পেইন উঠে কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা ছিলো ভিন্ন।
৩৬+ উইক থেকেই রেগুলার ফলস পেইন হতো। খালি দিন গুনতাম কবে আসল পেইন আসবে। আমার ইডিডি ছিলো ফেব্রুয়ারী ১৩ তারিখ, ডক্টর বলেছিলো ইডিডি পর্যন্ত ওয়েট করবে, পেইন না উঠলে ইন্ডাকশন দিবে। ১০ তারিখ মোটামুটি ভালোই পেইন আসছিলো, যা অন্যান্য দিনের থেকে একটু বেশি স্ট্রং ছিলো। সারাদিন দেখার পরে বিকালে হাসবেন্ডকে নিয়ে ডক্টরের কাছে গেলাম, ডক্টর পিভি করে বললো ১ ফিংগার ওপেন, ভর্তি হয়ে যেতে। কিন্তু আমি আমার বাসা কাছে হওয়াতে ভর্তি না হয়ে ডক্টরকে বলে বাসায় চলে আসি। যার কারণে উনি একটু রাগ করেন আমার উপর। বাসায় আসার পরে থেকে পেইন একদম নাই হয়ে গেল, যার কারণে মনটাই খারাপ হয়ে যায়। পরদিন সকালে দেখি অল্প পরিমান মিউকাস প্লাগ বের হয়েছে। আবার খুশি হয়ে যাই হয়তো পেইন আসবে। কিন্তু এভাবে করে ইডিডিও ক্রস হয়ে যায় কিন্তু আমার পেইন আর আসে না। এমনিতেই এটা নিয়ে মন খারাপ তার উপর আশেপাশের সবার মানসিক অত্যাচারে আরও ভেঙে পরি।
তখন আমার দৌলা আপু আমাকে অনেক সাপোর্ট দেয় আলহামদুলিল্লাহ। একবার তো নিজেই চিন্তা করছিলাম ধুর এত ঝামেলার দরকার নাই সিজার করে ফেলি। আমার যেহেতু সব ঠিক ছিলো আলহামদুলিল্লাহ তাই আরও এক সপ্তাহ ওয়েট করার সিদ্ধান্ত নিই। আমার প্রথম বেবিও ইডিডির চারদিন পরে হয়েছে। ভেবেছিলাম এই সপ্তাহে তো পেইন উঠবেই, কিন্তু আরও এক সপ্তাহ চলে যায় তারপরও পেইন উঠে না, এদিকে বেবির ওজন বেড়ে যাওয়ায় আমি স্কারে প্রেশার ফিল করতাম, যার কারণে ভয় লাগতো।
পরে দৌলা আপুর সাথে কথা বলে আর ইস্তিখারা করে ইন্ডাকশন নেয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তারপর ১৯ তারিখ প্রথম রমাদানে বিকাল ৩:৩০ মিনিটে হস্পিটালে ভর্তি হই এবং ইন্ডাকশন নিই। অল্প ডোজে সেলাইন চলছিলো আর সার্বক্ষণিক মনিটরিং এ ছিলাম। রাতে হাসবেন্ড চলে আসে ঢাকা থেকে। তারপর ওয়েট করতে থাকি কখন পেইন আসে। ওইদিন রাতে আর তেমন কিছু ফিল করি নাই। যখন আমি উঠে হাটাহাটি করি তখন পেইন আসতো কিন্তু নড়াচড়া করার কারণে ক্যানোলা দিয়ে রক্ত উঠে যেত যার কারণে নার্সরা নিষেধ করে নড়তে। পরদিন দুপুর পর্যন্তও যখন পেইন উঠলো না তখন নার্স নিজেই সেলাইন অফ করে দিয়ে বললো হাটাহাটি করতে, এতে পেইন আসবে। তারপর রুমেই হাটাহাটি, এক্সারসাইজ করতে থাকি বিকাল নাগাদ। তারপর আবার সেলাইন নেই একদম রাত ১০:৩০ মিনিট পর্যন্ত। তারপর আবার সেলাইন খুলে হাসবেন্ডকে নিয়ে বাইরে বের হয়ে যাই হাটতে। অনেকক্ষন হাটার পরে এসে আবার সেলাইন নিয়ে শুয়ে পরি। বিকালে এক্সারসাইজ করার পরে থেকে একটু একটু পেইন আসছিলো যেটা রাতে হাটার পরে আরও তীব্র হয়, ঘুমাতেই পারছিলাম না। সকাল পর্যন্ত ভালো পেইন হয়, কিন্তু পিভি করে দেখে এখনো ১ ফিংগার ওপেন একটু লুজ। তারপর পেইন আবার কমে যায়, এরজন্য ১০ টা পর্যন্ত সেলাইন নিয়ে আবার অফ করে বাইরে হাটতে বের হয়ে যাই।
বাসা মোটামুটি কাছে তাই হাটতে হাটতে বাসায় চলে যাই, গিয়ে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে দুপুরে চলে আসি। আসার পরে আবার সেলাইন নিই, এরমধ্যে আমার তিন ভাগের দুই ভাগ সেলাইন শেষ হয়েছিলো তাই এইবার নিয়ত করি একেবারে শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর খুলবো না। ওহ বলে রাখা ভালো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমি দৌলা আপুর সাথে কানেক্টেড ছিলাম, উনার ইন্সট্রাকশন মতো কাজ করছিলাম। দুপুরে হাটার পরে আবারও পেইন আসা শুরু হয় যেটা আস্তে আস্তে আগের থেকে বাড়ে। মাগরিবের পরে পিভি করে দেখে তখনো ১ ফিংগারই। তখন একেবারে মনটাই খারাপ হয়ে যায়, এরমধ্যে আমি ভর্তি থাকা অবস্থাতেও সবার কথা আরও খারাপ লাগছিলো, সবাই বিরক্তই ছিলো আমার উপর শুধু হাসবেন্ড শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাপোর্ট দিয়ে গেছে, ও বলতো তুমি শুধু তোমার দিকে ফোকাস দাও বাকি কে কী বললো তা দেখার জন্য আমি আছি। শুধু ইস্তিগফার আর আল্লাহর কাছে দুয়া করে গেছি।
অতঃপর রাত ৮টার দিকে মনে হলো বাবু পেটে একটা জোরে লাথি মারলো আর ওয়াটার ব্রেক হয়ে গেলো। বেশ ব্যথাই পেলাম লাথিতে। তারপর থেকে হুট করেই পেইন এত বেড়ে গেল যে আমার মাথাই কাজ করছিলো না আমি কী করবো। দৌলা আপু কিছু টেকনিক বললেন কিন্তু আমি কোনো কিছুই এপ্লাই করতে পারছিলাম না। শুধু ডিপ ব্রিদিং করছিলাম আর আল্লাহ আল্লাহ করে পেইনের কাছে নিজেকে ছেড়ে দিয়েছিলাম।
নরমালি আমি চাপা স্বভাবের, সহজে গলা দিয়ে শব্দ বের হয়না কিন্তু তখন গোঙ্গানি মতো শব্দ করলে একটু আরাম লাগছিলো। কিছুক্ষণ পরেই ব্যথা এত বাড়ে যে আমি পা ফেলতে পারছিলাম না, শুধু বেড ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এরমধ্যে এত্ত বাথরুমের চাপ পায় কিন্তু যেতেই পারছিলাম না, পরে কোনোরকম বাথরুম করলে পায়ে শক্তি আসে কিন্তু আমি বাথরুম হওয়ার পরেও ওভাবেই বসে ছিলাম কারণ এতে খুব ভালো লাগছিলো, উঠতেই ইচ্ছা করছিলো না। পরে নার্স এসে উঠতে বলে তারপর পিভি চেক করে বলে প্রায় পুরো ডায়ালেটেড, লেবার রুমে যেতে হবে, সুবহানাল্লাহ আমি কল্পনাও করিনি এত তাড়াতাড়ি এরকম হবে।
তারপর লেবার রুমে যাই, আমাকে আধা শোয়া অবস্থায় পুশ করতে বলে, যদিও আমার মনে হচ্ছিল ডিপ স্কোয়াট পজিশনে আমি আরাম পাবো, ডক্টরকে বলেছিলাম উনি না করেছিলেন, বললেন যে তোমার সার্ভিক্স একদম পাতলা হয়ে গেছে অল্প সময় লাগবে বেবি হতে তুমি এভাবেই পুশ করো। পরে আমি আর এটা নিয়ে তর্ক করিনি, ওভাবেই চেষ্টা করছিলাম কিন্তু এতে আমার কোমরে খুব চাপ লাগছিলো। যাই হোক মোটামুটি দশ/বারো মিনিট পুশ করার পরই আমার বাবু বেরিয়ে আসে আলহামদুলিল্লাহ। রিং অফ ফায়ার এত যন্ত্রণার লাগছিলো যে পুশ করতেই ভয় লাগছিলো। বাবু বের হওয়ার অল্প সময় পরেই প্লাসেন্টা বেরিয়ে আসে।
আলহামদুলিল্লাহ এপিশিওটমি লাগেনি অল্প একটু টিয়ার হয়েছে যেটা ডক্টর সুন্দর মতো সেলাই করে দিয়েছেন। আর বাবুর ওজন হয়েছিলো ৩৫০০ গ্রাম। আলহামদুলিল্লাহ আমরা দুজনেই সুস্থ আছি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একমাত্র আমার হাসবেন্ড আমাকে সাহস দিয়েছে এবং সাপোর্ট করে গেছে, আমার হাসবেন্ড না থাকলে আমার একার পক্ষে কখনোই সম্ভব ছিলো না এতদূর আসার। আল্লাহ তায়ালা তাকে উত্তম জাযা দান করুন। সবাই আমার এবং আমার পরিবারের জন্য বারাকাহর দুয়া করে দিবেন ইনশাআল্লাহ।
উম্মু আয়িশাহ
রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স পার্টিসিপ্যান্ট,
ব্যাচ ২১
ক্লায়েন্ট, রৌদ্রময়ী দৌলা সার্ভিস
Other post
Tag:বার্থ স্টোরি, ভিব্যাক
You may also like
লেবারের লক্ষণ নেই ভাবছিলেন যে মা, তার ন্যাচারাল ভিব্যাক হয়েছে — দৌলা ডায়েরী সিরিজ (পর্ব ৪১)
ভিব্যাক তা-ও ন্যাচারাল! আলহামদুলিল্লাহ!! অথচ এই মা ৩৮ সপ্তাহেও ভাবছিলেন, উনার লেবারের কোন লক্ষ্মণ নেই কেন! আসলে, নরমাল ডেলিভারি এমনই। সবাই পূর্ব লক্ষ্মণ দেখে না। তবে বডি রেডি থাকলে ফুল টার্মের কাছাকাছি গিয়ে হঠাৎই পেইন শুরু হয়ে যেতে পারে। এই …
আমি পেরেছি আপু! — মারুফা আপুর বার্থ স্টোরি (দৌলা ডায়েরী সিরিজ: পর্ব ৪০)
মারুফা আপু ৩৭ সপ্তাহ থেকে আমার দৌলা সার্ভিস নিচ্ছিলেন। প্রেগন্যান্সিতে আপু খাবার ও এক্সারসাইজ মোটামুটি মেইনটেইন করেছেন। শেষের দিকে হাঁটতে গেলে পায়ে কোথাও যেন কিছু একটা বাধে, এমন অনুভূতির কথা বলেছিলেন। বাবুর পজিশন নিয়ে আমার একটু সন্দেহ হয়। কিছু প্রশ্ন …
ইডিডি পার হয়ে নরমাল ডেলিভারি — দৌলা ডায়েরী সিরিজ (পর্ব ৪২)
আপু খুবই শান্ত মানুষ। এতই শান্ত যে হ্যালো হ্যালো বলে বুঝতে হতো লাইনে আছেন কিনা। এই শান্ত সভাবই হয়তো আপুর স্টোরির স্পটলাইট। ৩৬ সপ্তাহ থেকে দৌলা সার্ভিস নেন। আলহামদুলিল্লাহ উনার পুরো প্রেগন্যান্সি একদম স্মুথ ছিল। নিউট্রিশন ও এক্সারসাইজও ভালোভাবে মেইনটেইন …
