Back

দৌলা ডায়েরী ৩১

রহমত ও বরকতের এই রমজান মাসে কিছু সুসংবাদ শেয়ার করতে চাই। কয়েক মাস ধরে লক্ষ করছি, মাতৃত্বের জগতে যেন এক নতুন আলো ছড়িয়ে পড়েছে। সচেতনতার এক নীরব বসন্ত শুরু হয়েছে, যেখানে মায়েরা নিজের ডেলিভারির বিষয়ে আরও সচেতন হচ্ছেন, পরিবারগুলোও আগের চেয়ে বেশি সহযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে।
২ বছর আগে যখন প্রথম দৌলা হিসেবে কাজ শুরু করি, তখন অনেক মা চাইলেও নরমাল ডেলিভারি হত না—সিস্টেমের অসুবিধা, পরিবারের চাপ বা ধৈর্যের অভাবে অনেক সময় সিজারিয়ান ডেলিভারির সিদ্ধান্ত নিতে হতো। কিন্তু এখন যেন পুরো সমাজে পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে।
একসময় জেলা শহরের আপুদের জন্য নরমাল ডেলিভারি প্রায় অসম্ভব মনে হতো। ডাক্তাররা ঝুঁকি নিতে চাইতেন না, অনেক জায়গায় NICU সুবিধা ছিল না, ডাক্তাররাও সবসময় উপস্থিত থাকতেন না। ফলে বেশিরভাগ নরমাল ডেলিভারি হত ঢাকা বা চট্টগ্রামে, হাতে গোনা কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে। কিন্তু এখন মায়েদের সচেতনতা এতটাই বেড়েছে যে, সিস্টেমও যেন পরিবর্তিত হতে বাধ্য হচ্ছে।
আলোর পথে কিছু গল্প…
⭐ ফারিহা জান্নাত আপুর নরমাল ডেলিভারি হয়েছে রাজশাহীর এক হাসপাতালে। ৪০ সপ্তাহে বাবুর ওজন ছিল ৩.৮ কেজি। ডাক্তার পুরোপুরি নরমাল সাপোর্টিভ ছিলেন, একবারও সিজারিয়ানের কথা বলেননি।
⭐ শারমিন আপুর বাসা দিনাজপুরে। ৩৩ ঘণ্টা লেবার সহ্য করার পর ৩.৪ কেজি ওজনের সুস্থ বাবুর জন্ম দেন। লেবারের সময় বাবু পেটে ম্যাকোনিয়াম পাস করেছিল, ফলে টিম সিজারিয়ান করার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু আপুর ডাক্তার হাল ছাড়েননি, আর তার হাসবেন্ডও পাশে ছিলেন। বাবুর জন্মের পর NICU-তে নেওয়া হলেও, সবকিছু ঠিক থাকায় চেকআপ করিয়ে নিয়ে মায়ের কাছে নিয়ে আসা হয়।
⭐ ফাতেমা আপুর বাড়ি কুষ্টিয়ায়। ৪০ সপ্তাহে রাতে প্রসব ব্যথা শুরু হয়, সারারাত ম্যানেজ করে সকালে হাসপাতালে যান। আল্লাহর রহমতে তার নরমাল ডেলিভারি হয়, বাবুর ওজন ছিল ৩ কেজির বেশি। এপিসিওটমি লেগেছিল, তবে মা ও শিশু দুজনেই ভালো আছেন।
⭐ হাফসা আপু রংপুরে থাকেন। আপুর গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ছিল। ইডিডির ৪ দিন আগে হঠাৎ পানি ভেঙে যায়, তবে জরায়ুমুখ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় হাসপাতালে গিয়েও বাড়ি ফিরে আসেন। ৩ দিন পর লেবার শুরু হলে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৩.৫ কেজি ওজনের বাবুর জন্ম হয়, এপিসিওটমি ছাড়াই। তার বোন ও স্বামী পুরো সময় পাশে ছিলেন।
⭐ নুসরাত আপু (ঢাকা) ৩৬ সপ্তাহে হঠাৎ পানি ভেঙে যাওয়ার পর হাসপাতালে যান। ডাক্তার ও নার্সদের এপিসিওটমি না করার অনুরোধ জানানো হয়, এবং ২.৫ কেজি ওজনের বাবুর নরমাল ডেলিভারি হয়।
⭐ আনিকা আপু (ঢাকা) আল্ট্রায় এসেছিল বাবুর গলায় কর্ড প্যাঁচানো। আপু ভয় পাননি। হাল ছাড়েননি, তবুও নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা চালিয়ে যান। ২ দিন ফলস লেবার হয়, এরপর যখন হাসপাতালে যান, তখন জরায়ুমুখ ৫ সেমি খোলা ছিল। আলহামদুলিল্লাহ, তার বাবুও নরমাল ডেলিভারিতে জন্ম নেয়।
পরিবর্তনের পথে একধাপ এগিয়ে…
একটা সাধারণ বিষয় এখন দেখা যাচ্ছে—পরিবারের সহযোগিতা ও মায়েদের দৃঢ়তা। নরমাল ডেলিভারি তখনই সম্ভব হয়, যখন মা আত্মবিশ্বাসী থাকেন এবং তার আশপাশের মানুষ তাকে সহায়তা করেন। চিকিৎসকরাও যখন মায়েদের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেন, তখন অনেক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও নরমাল ডেলিভারি সম্ভব হয়ে ওঠে।
এভাবে ধীরে ধীরে সমাজে পরিবর্তন আসছে। পরিবারগুলো সচেতন হচ্ছে, ডাক্তাররা মায়েদের কথা শুনছেন, এবং মায়েরা নিজেদের শরীরের ওপর বিশ্বাস রাখতে শিখছেন।আমি মনে করি প্রত্যেক মায়ের এই সম্মান প্রাপ্য। এই ধারা অব্যাহত থাকলে, ভবিষ্যতে নরমাল ডেলিভারি আরও সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে, ইনশাআল্লাহ।
 
ফারইয়াব হাসান
নিউট্রিশনিস্ট
দৌলা, রৌদ্রময়ী স্কুল