Back

হাতের নাগালে ইমিউনিটি বুস্টিং ৭টি খাবার

গর্ভাবস্থায় মায়েদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এর ফলে অনেকে মা অল্পতেই জ্বর, ঠান্ডা, এলার্জি, চুলকানি, ইনফেকশনের মতো বিভিন্ন অসুখে পরে যান। সঠিক পুষ্টি গ্রহণের রয়েছে এই সমস্যা মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সুষম পুষ্টি গ্রহণ যেমন মাকে অনেক জটিলতা থেকেই সুরক্ষিত রাখবে তেমনই কিছু বিশেষ খাবার নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসে যোগ করে মা নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে চেষ্টা করতে পারেন।
আসুন কিছু ইমিউনিটি বুস্টিং খাবারের সাথে পরিচিত হই, যা আমাদের হাতের নাগালের মাঝেই রয়েছে। গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসে এই খাবারগুলোর উপস্থিতি অত্যন্ত উপকারী হবে।
 
১। রসুন: রসুন যখন কুচি করা হয় বা পেষা হয় তখন এটি এলিসিন (allicin) নামক উপাদান নি:সরন করে যা এন্টিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে। সাধারণ ঠান্ডা-কাশি কমাতে ও ব্যাকটেরিয়াজনিত ইনফেকশন সারাতে রসুন সাহায্য করতে পারে।
🥗যেভাবে খেতে পারেন: শাক/ডালের বাগারে, তরকারি কসানোর সময়। আচার হিসেবে। কাচা রসুন (সামান্য মধুর সাথে) চিবিয়ে খেলে সবচেয়ে ভালো উপকার পাওয়া যায়। পুরোটা চিবিয়ে খাওয়া কষ্টকর হলে কিছুটা দাঁতে পিষে এরপর পানি দিয়ে গলাধঃকরণ করতে পারেন। অসুস্থতার সময় দ্রুত ইমিউনিটি বাড়াতে এই পদ্ধতিতে খাওয়া যেতে পারে।
 
২। আদা: আদায় রয়েছে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় উপাদান যার মাঝে আছে আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন বি-৬ ও সি। এইসব উপাদানের সাথে আদার এন্টিঅক্সিডেন্ট গুণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। আদার জিঞ্জারোল নামক কম্পাউন্ড সাধারণ সর্দি-কাশি থেকে আরাম দিতে সহায়ক। সেই সাথে, আদা বমিভাব (মর্নিং সিকনেস), বদহজম প্রতিরোধে সহায়ক।
🥗যেভাবে খেতে পারেন: গোশতের তরকারি/পাস্তা/নুডলসে মসলা হিসেবে। এছাড়াও, প্রেগন্যান্সিতে অর্ধেক থেকে এক চা চামচ আদা জ্বাল করা পানি দিনে কয়েক বার বা স্বাভাবিক লিকারের চা প্রতিদিন ১ কাপ খাওয়া যেতে পারে।
 
৩। হলুদ: হলুদের মাঝে ফাইবার, ভিটামিন, মিনারেলসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এর মাঝে উপস্থিত এন্টিঅক্সিডেন্ট, এন্টি-ইনফ্লেমেটরি ও এন্টিব্যাকটেরিয়াল কম্পাউন্ড শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, ইনফেকশন প্রতিরোধ করে। হলুদ ডাইজেস্টিভ ট্র্যাক্ট পেশীর কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে হজম সমস্যার অস্বস্তি থেকে আরাম দিতে পারে। এতে উপস্থিত কারকিউমাইন (curcumin) ডোপামিন ও সেরোটোনিনের উৎপাদন বাড়াতে পারে যা মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক।
🥗যেভাবে খেতে পারেন: রান্নায় মসলা হিসেবে। এছাড়াও বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানের সাথে গুড়া হলুদ মেশানো পানীয় খাওয়া যেতে পারে।
 
৪। লেবু: লেবু আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন সি, ফোলেটসহ বিভিন্ন ভিটামিন ও মিনারেলে ভরপুর। এতে উপস্থিত উচ্চ মাত্রার ভিটামিন সি দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও একটি এন্টিঅক্সিডেন্ট, যার ফলে লেবু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ও সাধারণ ঠান্ডা-সর্দিতে জীবাণুর বিরুদ্ধে ইমিউন সিস্টেমকে মজবুত করে। এতে করে ঠান্ডা লাগা থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকতে না পারলেও ঠান্ডা-সর্দিতে ভোগার সময়সীমা কমে আসতে সাহায্য করে। সেই সাথে, আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের সাথে ভিটামিন সি-যুক্ত লেবু খাওয়া শরীরে আয়রনের শোষণ বাড়াতে সাহায্য করে।
🥗যেভাবে খেতে পারেন: লেবু টক/মিষ্টি যে কোন খাবারের সাথেই ভালো কম্বিনেশন। বাংলদেশের মানুষ ডাল-ভাতের সাথে লেবু খেতে ভালোবাসে। গরু/খাসির গোশতের সাথে লেবু চমৎকার লাগে। এতে করে ডাল ও গোশতে থাকা আয়রনের শোষণ ক্ষমতাও বাড়ে। লেবুর শরবত গরমে যেমন আরামদায়ক তেমনি ঠান্ডায় উপকারী। অন্যান্য ইমিউনিটি বুস্টিং খাবারের সাথে মিলিয়ে পানীয় তৈরি করে খেলে সর্দি-কাশিতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত বাড়াতে সহায্য করে। তেমনই সহজ রেসিপি হচ্ছে হাফ চামচ আদা, হাফ চামচ হলুদের গুড়া, লং, দারচিনি জ্বাল করে ১টি লেবুর রস ও ১ চামচ মধু দিয়ে পানীয় পান করলে কয়েকটি ইমিউনিটি বুস্টিং খাবারের উপকারিতা একসাথে পাওয়া যাবে। শুধুমাত্র ১টি বড় সাইজের লেবুর রস কুসুম গরম পানিতে এক চামচ মধুর সাথে মিশিয়ে খেলেও ঠান্ডায় আরাম পাওয়া যায়।
 
৫। টক দই: টক দই বা plain yogurt-এ রয়েছে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, রিবোফ্লোভিন, ভিটামিন বি-১২ এর মতো বিভিন্ন উপকারী পুষ্টি উপাদান। Full fat দইতে প্রোটিনসহ প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পুষ্টি উপাদান থাকে। এতে আরো রয়েছে জীবন্ত বন্ধুসুলভ প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া যার রয়েছে অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে এই ব্যাকটেরিয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হজমে সহায়তা করে, ডায়রিয়া ও কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে সুরক্ষা দেয়। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্ট ব্যাক্তিদের জন্য দই হজম করতে সহজ হয়, এমনকি এটি ল্যাকটোজ হজম করার ক্ষমতা বাড়াতেও সহায়ক হতে পারে।
🥗যেভাবে খেতে পারেন: সালাদ, রায়তা বানিয়ে। মধু, বাদাম, খেজুর, তাজা ফলের সাথে মিশিয়ে। লাচ্ছি/লবন মিশ্রিত শরবত বানিয়ে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে খাঁটি দুধ থেকে ঘরে বানানো দই সেরা। বাজারের কেনা দই হলেও যে ব্র্যান্ডে টক কম লাগে এমন ব্র্যান্ড বেছে নিতে পারেন।
 
৬। কাঠ বাদাম: কাঠ বাদামে (almond) আছে ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, ভিটামিন ই ও পটাসিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ও মিনারেল। এতে রয়েছে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট যা ভিটামিন ই-এর মতো একটি শক্তিশালী এন্টিঅক্সিডেন্টকে শরীরে ভালোভাবে শোষণ হতে সাহায্য করে, যার ফলে ইমিউন সিস্টেম ভালো থাকে। তবে এটি উপরের বাদামী চামড়াসহ খেতে হবে পুরোপুরি উপকার পাওয়ার জন্য।
🥗যেভাবে খেতে পারেন: রোস্টেড আমন্ড স্ন্যাক্স হিসেবে৷ টক দইয়ের সাথে মিশিয়ে।
 
৭। পালং শাক: পালং শাক বাংলাদেশের জন্য একটি মৌসুমী খাবার। তাই সারা বছর ব্যবস্থা করতে না পারলেও শীতের সময় এ থেকে উপকৃত হওয়ার চেষ্টা করা প্রয়োজন মায়েদের। তবে উন্নত অনেক দেশেই ফ্রোজেন ও প্যাকেটজাত করে এই শাক সারা বছর পাওয়া যায়। এতে রয়েছে গর্ভবতী মায়ের জন্য অপরিহার্য উপাদান আয়রন, ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন ভিটামিন। এতে উপস্থিত ভিটামিন সি একটি এন্টিঅক্সিডেন্ট ও ইমিউন সিস্টেম ভালো রাখতে সাহায্য করে। এর মাঝে থাকা ভিটামিন কে-১ রক্ত জমাট (blood clot) হতে সাহায্য করে যা প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এর মাঝে বিদ্যমান ফোলেট গর্ভবতী ও সন্তান পরিকল্পনা করা মায়েদের জন্য একটি অপরিহার্য উপাদান। পালং শাক ফাইবার সমৃদ্ধ হওয়ায় কোষ্ঠকাঠিন্য রোধেও সহায়তা করতে পারে।
🥗যেভাবে খেতে পারেন: দেশীয় শাক ভাজি হিসেবে, যাতে রসুন দিয়েও বাগার দেয়া হয়। চিংড়ি বা ছোট মাছ দিয়ে ঝোল তরকারি করে।
যে কোন খাবার অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে কিছু সাইড এফেক্ট থাকে। তাই পরিমিত পরিমাণে উপরের খাবারগুলো আপনার নিয়মিত খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন প্রেগন্যান্সিতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য।
 
**তথ্যের জন্য ইন্টারনেট থেকে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য আর্টিকেলের সাহায্য নেয়া হয়েছে। নিউট্রিশনিস্ট দ্বারা রিভিউ করে নেয়া হয়েছে।
 
রাবেয়া রওশীন
প্রিনেটাল ইন্সট্রাক্টর ও দৌলা, রৌদ্রময়ী স্কুল