Back

নবজাতকের গোল মাথা

মিতুর বাবু হয়েছে সবেমাত্র এক সপ্তাহ হয়েছে। গ্রামের বাড়িতে এরইমধ্যে পাড়া-প্রতিবেশি, শ্বশুর আর বাবার বাড়ির আত্মীয় স্বজনদের আনাগোনা শুরু হয়ে গিয়েছে। বাড়ির বড় মেয়ে, তারওপর এতোদিন পর বাড়িতে নতুন অতিথি এসেছে, সবাই একটু বেশিই এক্সাইটেড। যে যেভাবে পারছে মিতুকে বিভিন্ন বিষয়ে উপদেশ দিয়ে যাচ্ছে। তবে একটা কথা যেন মিতুকে ঘুরে ফিরেই শুনতে হচ্ছে- বাচ্চার মাথা কেন এখনো গোল হয়নি এবং কিভাবে তা গোল করা যায়। সবার এতোসব কথা শুনে মিতুর মনটাই খারাপ হয়ে গেল। সে ভাবতে লাগল এতোদিনেও যে বাচ্চার মাথা গোল হয়নি সেটা শুধুমাত্র তারই ব্যর্থতা।

ডেলিভারির ঝক্কি এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারে নি মিতু। শরীর এখনো বেশ দূর্বল, সাথে ইমোশনাল আর হরমোনাল আপ-ডাউনের ব্যাপার-স্যাপার তো আছেই। জীবনে প্রথমবার ব্রেস্টফিডিং করাতেও বেশ বেগ পেতে হচ্ছে তাকে। তারওপর বাচ্চার মাথা গোল হওয়া নিয়ে এতো এতো আলোচনা তাকে অস্বস্তিতেই ফেলে দিয়েছে। এখন কেউ এই টপিকে কথা বললে দম বন্ধ লাগে মিতুর, কান্নাও পায় মাঝে মাঝে। তারা শুধু সমস্যা নিয়েই কথা বলে ক্ষান্তি দেয় বিষয়টা এমন না, নানারকম সমাধান নিয়েও হাজির হয়। কেউ বলে সরিষার বালিশে বাবুকে শোয়াতে, তো কেউ বলে বিড়া বানিয়ে শোয়াতে। এভাবে হাতের তালুতে বাচ্চা মাথা রেখে ব্রেস্টফিড করাতে, তো ওভাবে বেশিক্ষণ খাওয়ানো যাবে না।

একে তো এইসময় একটা মায়ের মনের মধ্যে রোলারকোস্টার চলতে থাকে তারওপর সবার এই ছোট ছোট বিষয়ে করা বিশাল বিশাল উদ্বেগ মিতুকে খেই হারিয়ে ফেলার মত অবস্থায় ফেলেছে। ঠিক এই সময়টায় মিতুর বান্ধবী বিথী মিতুর বাবু দেখতে আসল। বিথী এসে যেন ডাঙায় আঁটকে পড়া মাছকে পানিতে নামালো। বিথীর দেড় বছরের একটা মেয়ে আছে, মাশাআল্লাহ। সবার থেকে একটু ফাঁক পেয়েই যেন বিথীর কাছে মনের সব উদ্বেগ উগড়ে দিলো মিতু। বলল, তুই কিভাবে তোর মেয়ের মাথা গোল করলি?

প্রশ্ন শুনেই যেন বিথীর আরকিছু বুঝতে বাকি রইল না। কারণ তার মেয়ের জন্মের পরও তাকে অনেকটা এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, বিথীর প্রিনাটাল কোর্স করা ছিল। সেখানে তাদের ইন্সট্রাক্টর এবিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। তাই এমন পরিস্থিতিতে বিথী আাত্মবিশ্বাসের খুব সহজেই মানিয়ে নিতে পেরেছিল। এতোদিন পর মিতুর প্রশ্ন শুনে সেই পুরনো কথা মনে পড়ে গেলো। বিথী মিতুকে খুব শান্ত এবং দৃঢ় কন্ঠে বললো:
– আচ্ছা মিতু, তুই যখন রাস্তায় বের হোস, নিশ্চয়ই রাস্তায় অনেক মানুষ থাকে। তুই নিজে কয়জনকে খেয়াল করেছিস যে তাদের মাথা গোল না চ্যাপ্টা?

এবার একটু ভড়কে গেল মিতু। নরম ও করুণ স্বরে বললো:
– সবাই যে বিরা, সরিষা বালিশসহ আরো নানান বুদ্ধি দিচ্ছে?

বিথী এমন কথারই অপেক্ষায় ছিল। একটু নড়ে চড়ে বসে লম্বা বক্তৃতার প্রস্তুতি নিয়ে কথা শুরু করলো বিথী:

– এখন গরমের দিন, আর সরিষা জিনিসটা নিজেই অনেক গরম। সরিষার বালিশে শোয়ালে বাবুর মাথার তাপ বালিশে আটকা পড়বে যার ফলে মাথা আরো গরম হবে এবং ঘামতে থাকবে। ঘাম মাথায় আটকে যাওয়ার ফলে বাবুর ঠান্ডা লাগার সম্ভাবনা বাড়বে। তাছাড়া এই সরিষার বালিশে শোয়ালে যে মাথা গোল হয় এই কনসেপ্ট টাই একটা মিথ। এর কোন ভিত্তি নেই। তাহলে তুই কেন বোকার মতন এই কাজটা করতে যাবি?

এখন আসি বিরার প্রসঙ্গে। একটা নবজাতককে বিরার মধ্যে শোয়ানো যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় মায়ের শরীর থাকে প্রচন্ড ক্লান্ত, যার ফলে তার গভীর ঘুমে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। ওদিকে, আল্লাহ না করুক, বিরার বাঁধন খুলে সেই কাপড় বাচ্চার নাকে মুখে লেপটে যায় তাহলে কি হবে তুই ভাবতে পারিস! এমন ঘটনা তো শোনাই যায় যে বিরা খুলে নাকে মুখে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। তাহলে তুই কেন এতো বড় রিস্ক নিবি? আর শোন এটাতেও যে বাচ্চার মাথা গোল হবে এমন কোনো কথা নেই।

অনেকটা এক নিঃশ্বাসেই কথাগুলো শেষ করলো বিথী। মিতু চেহারায় বিশাল একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন ভেসে উঠতে দেখলো বিথী। মনে মনে ভাবছে, তাহলে আমি করবো টা কি? কিন্তু মিতু কিছু বলার আগেই বিথী আবার বলতে শুরু করলো:

এখন আসি আসল কথায়, কিভাবে বাচ্চার মাথা গোল করা যায়? আসলে এই প্রশ্নটাই ভুল। প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘বাচ্চার মাথা কি আসলেও গোল করার প্রয়োজন আছে? নাকি বয়সের সাথে সাথে মাথা আপনা আপনিই গোল হয়ে যাবে?’

ভ্যাজাইনাল ডেলিভারি সময় একটা শিশু প্রচন্ড চাপের মধ্য দিয়ে বেড়িয়ে আসার ফলে শিশুটার মাথা অনেকটা লম্বাটে আকৃতির হয়ে যায়। সিজারিয়ান শিশুর ক্ষেত্রেও মাথা পুরোপুরি গোল থাকে না, কিছুটা লম্বাটেই থাকে। কিন্তু তাই বলে কি জোর জবরদস্তি করে বাচ্চার মাথা গোল করার দায়িত্ব কেউ নিজের কাধে তুলে নিতে পারে! সুবহানাল্লাহ।

একজন নবজাতককে কোনো ধরনের বালিশ বা বিরার মধ্যে শোয়ানোর কোন প্রয়োজন নেই। এমনকি তার মাথার কাছে কোনো প্রকার খেলনা, পুতুল, কাপড়, কাঁথা রাখাও নিরাপদ নয়। এ সময় বাচ্চার মেরুদন্ডের হাড় থাকে নরম, তাই তাকে সমতল বিছানায় শোয়ানোই বেশি উপকারী। নবজাতকের মাথা সময়ের সাথে সাথে বড় হয়ে এমনিতেই গোল হয়ে যায়। তাছাড়া চিত করে শোয়ানো অবস্থায় ওর এদিক সেদিক মাথা ঘুরানোটাও মাথা গোল হতে সাহায্য করবে। তাই দায়িত্ব নিয়ে একে গোল করার কোনো প্রয়োজন নেই। এটা নিয়ে এত প্যানিকড হওয়ারও কিছু নেই। এরপর কেউ কিছু বললে, তাকে বুঝিয়ে বলার মতো পরিস্থিতি থাকলে বুঝিয়ে বলবি, নয়তো চুপ থেকে ইগনোর করবি।

বিথীর কথাগুলো শুনে মিতুর মনে হল যেন বুকে থেকে একটা পাথর নেমে গেল। এখন কেউ তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে বা উপদেশ দিতে আসলে ঠান্ডা মাথায় নিজেকে সামলে নিতে পারবে, ইনশাআল্লাহ।

…………..

গল্পের বিথী এবং মিতু চরিত্র দুটি কাল্পনিক হলেও নবজাতকের মাথা গোল হওয়ার প্রসঙ্গটি যেন কমবেশি প্রত্যেক মায়ের কাছেই পরিচিত। মাথা গোল হওয়া ছাড়াও আরো নানান উদ্ভট উদ্ভট কথা শুনতে হয় একজন নতুন মাকে। নাভিতে তেল দিয়ে তাড়াতাড়ি নাভি ফেলতে হবে, নবজাতকের বুকের দুধ টিপে গালিয়ে দিতে হবে, কানের পিঠে বা হাত-পায়ের আঙ্গুলের ফাঁকে তেল মালিশ করে ফাঁকা করতে হবে, গোসল করার পর বেবিকে ফিড করানো যাবে না – এমন আরো নানান কথা।

কিন্তু আমরা জানি না, শতকরা ৮০ শতাংশ মা ডেলিভারির পরের এক-দুই সপ্তাহ বেবি ব্লু-তে ভোগেন। তারওপর যদি সাপোর্টিভ পরিবেশ না পাওয়া যায়, আর এমন নেগেটিভ কথা ক্রমাগত শুনতে হয় তাহলে ধীরে ধীরে তা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের দিকেও মোড় নিতে পারে। মায়েদেরকে বলবো, এমন পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ়তার। যদিও হাসবেন্ড এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের এখানে বিশাল একটা দায়িত্ব থাকে। কিন্ত সবার আগে আত্মবিশ্বাসের নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। আর আত্মবিশ্বাস আসে ‘জ্ঞান’ থেকে। যার কাছে তথ্য আছে আর সে জানে কোথায় কিভাবে তা কাজে লাগাতে হয় সে অবশ্যই সেই ব্যক্তির থেকে আত্মবিশ্বাসী হবে যে জানে না। তাই আমি বলবো জানুন, যাতে বিভ্রান্ত না হয়ে যান। অন্তত নিজের সন্তানের ওপর অন্যের আইডিয়া এপ্লাই করার আগে জানুন সেটা নিরাপদ কিনা।

Make thyself empowered with knowledge for the most biggest event of your entire life.

রেজওয়ানা রাজ্জাক
দৌলা, রৌদ্রময়ী স্কুল