Back

নতুন করে মা হওয়ার গল্প

১.
মুবাশ্বিরাহ আমার কোলে আসবে এটা কখনো ভাবনায় ছিল না। কিন্তু যখন জানতে পারলাম আমার তৃতীয় সন্তানের চার বছরের মাথায় আমি আবারও মা হতে যাচ্ছি, সত্যি বলতে অদ্ভূত একটা ভালো লাগা কাজ করে। আর এই ভালো লাগা পুরো প্রেগন্যান্সিতেই ছিল। 

এবার বেশ কিছু জিনিস আগেরবারগুলোর চেয়ে অন্যরকম লাগত। প্রেগন্যান্সি যেমন ধরা পরে তাড়াতাড়ি তেমনি ফার্স্ট ট্রাইমেস্টারের গ্যাস-বমিভাবও আসে দ্রুত।

যে মাসে প্রেগন্যান্সি জানতে পারি সে মাসেই অনেকদিন ধরে করতে চাওয়া একটা এডভান্সড দৌলা ট্রেনিং কোর্সে জয়েন করি। Body Ready Method এর কোর্সটা ছয় মাসের একটা ইন্টেন্সিভ ট্রেনিং। আল্লাহর ইচ্ছায় প্রথম সাড়ে তিন মাসের মতো আম্মুর বাসায় ছিলাম। পড়ার অধিকাংশই গুছিয়ে নিতে পারি। 

মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রথম প্রেগন্যান্সিতে তেমন কিছু না জানলেও, দ্বিতীয় প্রেগন্যান্সিতে “আমানি বার্থ” বই আর নিউজিল্যান্ডের প্রিনেটাল কোর্সের ম্যাটেরিয়াল পড়ে অনেক কিছুই জেনেছিলাম। তৃতীয় প্রেগন্যান্সিতে অন্য মায়েদের শেখানোর জন্য আমানি বার্থ থেকে চাইল্ডবার্থ এডুকেটর ও দৌলা ট্রেনিং কোর্সটা করতে গিয়ে নিজের প্রেগন্যান্সির জন্যও আরো ভালো প্রস্তুতি নিতে পারি। আর এবারও আরেকটা দৌলা ট্রেনিং আর আমার প্রেগন্যান্সি একসাথে শুরু হয়। প্রতিবারের পড়াশোনাই আমি নিজের উপরও প্রয়োগ করার সুযোগ পাই, এর পজিটিভ ফলাফল নিজের উপর দেখতে পাই, আমার কষ্টের মাত্রা প্রতি প্রেগন্যান্সিতে আগেরবারের চেয়ে কমতে থাকে। 

🔷 পেলভিক বোন পেইন

বডি রেডি মেথডের ট্রেনিং থেকে যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি উপকার করেছে তা হলো শরীরের সঠিক এলাইনমেন্ট বজায় রেখে দাঁড়ানো, বসা, শোয়ার পজিশন জানা। আমরা ব্যায়াম করতে পারি দিনের সামান্য কিছু সময়ই, কিন্তু এর বাইরে যে সময়টা তখনও আমাদের শরীর এবং বিশেষ করে পেলভিসকে কিভাবে ব্যবহার করছি তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শরীরের বিভিন্ন পেশী ও হাড়গুলো যদি সঠিক ব্যালেন্সে থাকে তাহলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাথা থেকেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব ইনশাআল্লাহ। যে পেলভিক বোন পেইন আমার আগের প্রেগন্যান্সিগুলোতে প্রথম ট্রাইমেস্টার থেকেই কষ্ট দিয়েছে তা এবার আসি আসি করেও বিদায় নিয়েছে এবং শেষ ট্রাইমেস্টারেও শরীরে উঠতে-বসতে-পাশ ফিরতে পেলভিক বোন পেইন এবং কোমর ব্যাথা এসব আসেনি আলহামদুলিল্লাহ। এই কারণে এখন প্রিনেটাল কোর্সে এই বিষয়ের উপর এক্সট্রা ভিডিও দিচ্ছি, দৌলা কনফারেন্স ২০২৫ এও এই টপিকটা রেখেছি। আমার মনে হয় প্রতিটা মায়ের এ নিয়ে জানা প্রয়োজন। 

🔷 পেলভিক ফ্লোর মাসেল স্ট্রেংথ

আরো যে বিষয়ে বিশেষভাবে উপকার পেয়েছি তা হলো পেলভিক ফ্লোর মাসেল স্ট্রেংথ ভালো ছিল। আগে শুধু এর জন্য কেগেল ব্যায়াম করার উপকারীতা নিয়ে জানতাম, কিন্তু এবার জানলাম আরেকটু বিস্তারিতভাবে জানলাম এবং এই পেশীর সংকোচন, প্রসারনে সাহায্য করে এমন ব্যয়ামগুলো (পেলভিক রক, এসিস্টেড স্কোয়াট, কাফ স্ট্রেচিং, হিপ হিঞ্জ, 3D ডিপ ব্রিদিং) করার মাধ্যমে ভালো অনুভব করতাম। 

🔷 কন্সটিপেশন 

প্রতি প্রেগন্যান্সিতেই কন্সটিপেশন আমাকে ভোগায়। এবার উপরে উল্লেখ করা ব্যায়ামগুলো এক্ষেত্রেও উপকারী ছিল যেহেতু টয়লেট স্বাভাবিকভাবে হওয়ার জন্য পেলভিক ফ্লোর পেশীরও ভূমিকা আছে। সেই সাথে হোল গ্রেইন গমের আটা (লাল আটার) রুটি, যেটা আমার হাজব্যান্ড নিজের অর্গানিক ফার্মে ফলান, এবং ঘরে বানানো মিষ্টি ছাড়া দই নিয়মিত খেয়ে উপকার পেয়েছি। দই বানানোর ক্ষেত্রে দেশী গরুর দুধ বা বাণিজ্যিক ফীড খাওয়ানো হয় না এমন গরু/মহিষের দুধ দিয়ে তৈরি করতে পারলে ভালো হয়। আমি লক্ষ্য করলাম, প্রেগন্যান্সিতে খাবারের মান ভালো না হলে শরীর রিয়েক্ট করে, গ্যাস বদহজম বেশি হয়। এমনকি দইটাও যখন আমি যে কোন ফার্মের গরুর দুধ দিয়ে করতাম, তা হজমে অসুবিধা করত। তাই নিজের বাসায় থাকলে আমাদের ফার্মের মহিষের দুধ দিয়ে দই করতাম আর ঢাকায় আম্মুর বাসায় থাকলে “আসল”-এর দেশী গরুর দুধটা নিতাম। 

🔷 হজমে সমস্যা

এছাড়াও গ্যাস না হওয়ার জন্য সরিষার তেলে রান্না করা খাবার খেতাম। এতে ভালো উপকার পাওয়া যায়। আমার শশুড়বাড়ির নিজেদের ক্ষেতের সরিষা থেকে উৎপাদিত তেলটা ব্যবহার করতাম। 

🔷 দুর্বল ইমিউনিটি মোকাবেলা করা

দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে আসে শীতকাল। সেসময় নিজের বাসা শেরপুরে ছিলাম। ঢাকার তুলনায় খোলামেলা সে জায়গার শীতটা অনেক বেশি হলেও এবার আলহামদুলিল্লাহ একবারের জন্যও সর্দি-কাশি হয়নি। এসময় ইমিউনিটি বুস্টিং খাবার নিয়ে একটু ঘাটাঘাটি করি আর সেগুলো মেনে চলতে চেষ্টা করি। তখনই এই নিয়ে একটা লেখা লিখি যা Mother and Child Care BD ওয়েবসাইটে আছে এই লিংকে। 

🔷 ব্যায়াম ও বিশ্রাম

এবার প্রথম ট্রাইমেস্টারে আম্মুর বাসায় থাকার সময় ব্যায়াম করতে শুরু করলেও দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে যখন নিজের সংসারে থাকি তখন রেস্টকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। নিয়মিত আলাদা করে ব্যায়াম করা হতো না, চেষ্টা করতাম দৈনন্দিন মুভমেন্টের মাধ্যমে মাসেল স্ট্রেংথ বজায় রাখতে। যেমন, বসা থেকে ওঠার সময় সবসময় হিপের ওপর ভর দিয়ে ওঠা। মাঝে মাঝে শরীরের পেছন দিকে ম্যাসাজ নিতাম। এই চতুর্থ প্রেগন্যান্সিতে এসে হাজব্যান্ডকে ম্যাসাজ করার বিষয়টা কিছুটা বোঝাতে পেরেছি, তবে এর জন্য আগে একদিন উনাকে ভালো করে ম্যাসাজ করে দিয়েছি। ধৈর্য কম মানুষদের জন্য সহজ কিন্তু অল্পে আরাম হয় এমন একটা ম্যাসাজ করার টেকনিক নিয়ে ভিডিও দেখতে পারেন এই লিংকে। 

পায়ের কাফ মাসেলে টান লাগার সমস্যা হতো মাঝে মাঝে, বিশেষ করে যদি কাফ স্ট্রেচিং ব্যায়াম মিস হয়ে যেত তাহলে। তাই খেয়াল রাখতে চেষ্টা করতাম এই ব্যায়ামটা করার জন্য।

এবার যে পেইনটা সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে সেটা ছিল রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন। আগের প্রেগন্যান্সিগুলোতে যা মাঝে মধ্যে হতো তা এবার প্রায়ই দেখা দিত। অনেকসময় নড়তেও পারতাম না এর জন্য। এর কারণ হয়তবা এবার আমার পেট অনেকটা বড় হয়েছিল, অনেকেই দেখে বলত হয় ছেলে বাবু হবে অথবা টুইন বাবু হবে। তবে আমার বাবুর ওজন হয়েছিল মাত্র ২.৫ কেজি…. 

২.
৩৪ সপ্তাহে ঢাকায় আম্মুর বাসায় চলে আসি। ডাক্তার ফাতেমা ইয়াসমিন, যিনি রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্সের ইন্সট্রাক্টরও, শুরু থেকেই উনার পরামর্শে ছিলাম। 

ঢাকায় আসার পর আবারও আরেকটু সময় নিয়ে ব্যায়াম করতে চাইতাম। ৩৫ সপ্তাহে ইনলেট ওপেনিং ব্যায়ামগুলো করার পর অনুভব করলাম যে বাবু ড্রপ করেছে। আমার মনে হতো আমি বেশি ব্যায়াম করলে লেবার শুরু হয়ে যাবে। ৩৬, ৩৭ সপ্তাহে আর তাই ইনলেট ওপেনিং এক্সারসাইজ করিনি। ৩৭ সপ্তাহে তৃতীয় ট্রাইমেস্টারের আল্ট্রা ও অন্যান্য টেস্ট করাই, আলহামদুলিল্লাহ ভালো ছিল। হিমোগ্লোবিন আর ফ্লুইড লেভেল দুইটাই ১১ পয়েন্ট ছিল। 

৩৭ সপ্তাহ ২য় দিনে হালকা পেইন আসে, বেশ কয়েক ঘন্টা থেকে চলে যায়। পরদিন শুক্রবার ভোরে হাজব্যান্ড শেরপুর চলে যান। যাওয়ার আগে আবারও জিজ্ঞেস করেন, যাবেন কি না। যেহেতু আমার পেইন চলে গিয়েছিল, আর আমার আগের তিন বাবু ৪০ সপ্তাহের দিকে হয়েছে তাই বলেছিলাম চলে যেতে। 

দুপুর থেকে আবারও হালকা পেইন অনুভব করতে থাকি। সন্ধ্যায় হাজব্যান্ডকে জানালে চলে আসবে কি না জানতে চায়। আবারও যদি এটা প্র‍্যাকটিস কন্ট্র‍্যাকশন হয় এই ভেবে আমি আরো অপেক্ষা করতে বলি। সত্যি বলতে আমি মেন্টালি রেডি ছিলাম না বাবু এত তাড়াতাড়ি আসার ব্যাপারে যেহেতু আগের তিন বাবু পুরো ৪০ সপ্তাহে এসেছে। আমি চাচ্ছিলাম বাবু আরো কিছুদিন ভেতরে থাকুক। এদিকে আমার নিজের দৌলা সার্ভিসের ক্লায়েন্ট এর ডিউ ডেট আর দুই দিন পর। আমি চাচ্ছিলাম আগে ওর ডেলিভারি হয়ে গেলে ভালো হয়। ক্লায়েন্ট মায়া আপু আমার রিপিট ক্লায়েন্ট আলহামদুলিল্লাহ। আগের বার নরমাল ডেলিভারি হয়েছে এবং এই দম্পতিকে আমি বেশ গোছানো পেয়েছিলাম। তাই উনাকে নিয়ে আমার টেনশন কম হবে বুঝতে পেরে প্রেগন্যান্সির শেষ দিকে হলেও সার্ভিস দিয়েছিলাম। 

রাত ১১ টায়ও যখন পেইন আসছিল তখন হাজব্যান্ডকে বলি রওনা হতে। এরপর বড় তিন বাচ্চার সাথে শুই, ওরা ঘুমানোর পর উঠে পড়ি। শেষ কয়দিন হালকা ঠান্ডা লেগেছিল তাই বাবুর জন্য কেনা কাপড়গুলো ধুতে পারিনি।  সেগুলো ধুয়ে নেড়ে দেই।

বাসায় আব্বু অসুস্থ, আম্মু আর বড় আপু উনাকে নিয়ে ব্যস্ত। তাই বাসায় কিছু জানাইনি, বাচ্চাদেরও না। হাজব্যান্ড না আসা পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ নেয়া যাবে না তাই ব্যাথা দমিয়ে রাখার চেষ্টায় আমি দুই পায়ের মাঝে বালিশ রেখে কাত হয়ে শুয়ে বাকি রাতটা পার করি। পেইনের মাত্রা মোটামুটি একইরকম আর সহনীয় ছিল। 

রাত সাড়ে তিনটায় হাজব্যান্ড আসেন। ফজর হয় অল্প সময় পর। সে সময় সালাতের উদ্দেশ্যে উঠে নড়াচড়া করায় আস্তে আস্তে পেইন বাড়তে থাকে।

প্রায় ৭টার দিকে হাজব্যান্ডকে বলি ডাক্তারকে জানাতে। ডাক্তারের বাসা রিক্সা দূরত্বে। অল্প সময় পর উনি আসেন, আমি তখন পুশিং আর্জ অনুভব করছিলাম। শোয়া থেকে উঠে খাটের পাশে হাটু গেড়ে বসি, হাটু সোজা রেখে পায়ের পাতা দুই দিকে ছড়িয়ে দেই পেলভিক আউটলেট এর স্পেস বাড়ার জন্য। ডাক্তার ফেটাল ডপলার দিয়ে বাবুর হার্ট রেট চেক করেন এবং উনি আসার আধ ঘন্টার মাঝে বাবু হয়, আমি আলহামদুলিল্লাহ বলি কয়েকবার।

বাবু ৩৭ সপ্তাহ ৪র্থ দিনে হয়, তবে সে ম্যাচিউর করে গিয়েছিল পুরোই। বের হয়ে কান্না করে, চোখ মেলে তাকায়, সাথে সাথে আঙুল চোষে। আমি খাটে উঠে বসে তাকে বুকে ধরার সাথে সাথে খেতে শুরু করে। 

কর্ডের স্পন্দন থামার পর নাড়ী ক্ল্যাম্প করে কাটা হয়। বাবুকে নিয়ে এক ঘন্টা স্কিন টু স্কিন কন্টাক্ট করি। এর মাঝে আম্মু, আব্বু আর বড় আপু এসে বাবুকে দেখে যায়। ডাক্তার ফাতেমা প্লাসেন্টা ডেলিভারি করান।

এক ঘন্টা পর উঠে গোসল সেরে নাশতা করে ওজিএসবি মিরপুর ১ এ ডাক্তার আয়েশা সিদ্দিকা ম্যামের কাছে চেক আপে যাই। ম্যাম রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল কোর্স নিয়ে জানেন, রৌদ্রময়ী অনলাইন ক্লিনিকে গাইনী ডাক্তার হিসেবে আছেন। উনি চেক করে জানান সেকেন্ড ডিগ্রি টিয়ার হয়েছে, স্টিচ দিয়ে নিলে ভালো হবে। এরপর অন্য ডিউটি ডাক্তারের কাছে রেফার করেন। তিনি সেলাই দেয়ার আগে পেটে চাপ দিয়ে অনেক ব্লাড ক্লট বের করেন। বের করার সময় ব্যাথা পেলেও পরে জরায়ুর ভেতরের ব্যাথা অনেক কমে যায় ক্লটগুলো বের করায়। 

অন্যদিকে বাবুকেও পেডিয়াট্রিশিয়ান দেখানো হয়। 

পোস্ট ডেলিভারি সময়ে এবার শরীর অনেক ঝরঝরে লাগছিল আগে থেকে ব্যায়ামের প্র‍্যাকটিস থাকায়, মনে পড়ছিল সেই প্রথমবার বাবু হওয়ার পরের দিনগুলোতে কী ভীষণ আড়ষ্টতা কাজ করত সারা শরীরে! পোস্ট ডেলিভারিতেও প্রথম দিন থেকেই প্রেগন্যান্সির সহজ ব্যায়ামগুলো করা যায়, যেমন ডিপ ব্রিদিং, কাফ স্ট্রেচিং,  হিপ হিঞ্জ, নেক স্ট্রেচিং, আপার বডির সহজ কিছু স্ট্রেচিং ইত্যাদি। আমি প্রথমদিন বিশ্রাম ও ব্যস্ততায় না পারলেও পরদিন থেকে ব্যায়ামগুলো শুরু করি। 

স্টিচের জন্য টানা দশ দিন হিপ বাথ নেই। আমাকে ভিক্রিল সুতা দিয়ে সেলাই দেয়া হয়, এই সুতায় প্রথমদিন থেকেই হিপ বাথ নেয়া যায়। তৃতীয় দিন ঘরে কিছু গেস্ট আসায় একটু বেশি নড়াচড়ায় ব্যাথা বাড়ে। তৃতীয় দিনের পর থেকে আমার ব্লিডিং এর পরিমাণ অনেকখানি কমে আসে, তাই বেশিরভাগ সময় ন্যাপকিন ফ্রি ছিলাম। দুই দিন সুযোগ পাই হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে সেলাইয়ের জায়গাটায় গরম বাতাস দেয়ার, এতে অনেক আরাম হয়। নিয়মিত ভিটামিন সি এর জন্য লেবুর রস খেতাম, সিজনাল ফল পেয়ারা, আম খাওয়া হতো। এসবের ফলে আলহামদুলিল্লাহ দশ দিন পর থেকে সেলাইতে আর ব্যাথা লাগেনি। এরপর মাঝে মাঝে কেগেল করছি। আর ডেলিভারির দিন থেকেই পোস্ট ডেলিভারি সুস্থতার জন্য ক্যালসিয়াম, আয়রন সাপ্লিমেন্ট যা প্রেগন্যান্সিতে খেতাম তা খাওয়া কন্টিনিউ করেছি। 

আমার বাবু হওয়ার দুই দিন পর আমার ক্লায়েন্টের মেম্ব্রেন সুইপ করা থেকে পেইন উঠে নরমাল ডেলিভারি হয়। মায়া আপুর প্রথম ডেলিভারিতে পুশিং স্টেজ অনেক লং ছিল, উনি এটা নিয়ে এবারও চিন্তিত ছিলেন। উনাকে পেলভিসের সব স্টেশনের ব্যায়াম প্র‍্যাকটিস করতে বলেছিলাম। ডেলিভারির পর আপু জানান এবার পুশিং অনেক সহজ হয়েছে, আপু পাশ ফিরে শুয়ে পুশ করেছেন এবং সময়ও কম লেগেছে। আলহামদুলিল্লাহ আমি খুবই স্বস্তি পাই এটা জেনে। 

বাসায় ডেলিভারির বিকল্প কি প্ল্যান আমার ছিল?

ওজিএসবি হাসপাতালের মেইন ব্রাঞ্চ আমার বাসার খুব কাছে এবং ডাক্তার ফাতেমা ইয়াসমিনও এখানে রেজিস্টার্ড ডাক্তার হিসেবে পেশেন্ট নিয়ে গিয়ে ডেলিভারি করাতে পারতেন। প্রয়োজনে সেখানে যাওয়া যেত। ডাক্তার ফাতেমা ইয়াসমিন হোম ডেলিভারি এটেন্ড করেন না, তবে সেই মাসে উনি ছুটিতে থাকায় আমাকে সময় দিতে পারেন। আমার তৃতীয় সন্তানও জার্মানিতে হোম ডেলিভারি হয় এবং সেখান থেকে আমার হাজব্যান্ডেরও এই ব্যাপারে অভিজ্ঞতা ছিল। এতগুলো পজিটিভ দিক থাকায় আমরা এই বাবুর সময়ও হোম ডেলিভারি প্ল্যান করতে পেরেছি। 

শেষ কিছু কথা..

প্রিয় মা, প্রথম প্রেগন্যান্সিতে সবাই আপনার যতটা যত্ন নিবে, খোঁজ খবর করবে, পরবর্তী প্রেগন্যান্সিগুলোতে আর তেমন হবে না সাধারণত। কিন্তু তখনও আপনার পুষ্টি, বিশ্রামের প্রয়োজন আগের মতোই থাকবে। তাই নিজের দেখাশোনায় কার্পণ্য করবেন না। কেউ খোঁজ নিক বা না নিক, নিজের যত্নের প্রতি খেয়াল রাখবেন। প্রেগন্যান্সিতে যেমন, পোস্ট প্রেগন্যান্সিতেও তেমনই। 

উম্মে আমাতুল্লাহ
রৌদ্রময়ী প্রিনেটাল টিম মেম্বার

 

উম্মে আমাতুল্লাহর ২য় ও ৩য় বার্থ স্টোরি পড়ুন নিচের ২টি লিংক থেকে:

২য় বার্থ স্টোরি –

প্রথমবার ফোরসেপ, দ্বিতীয়বার প্রাকৃতিক প্রসবের গল্প

৩য় বার্থ স্টোরি –

তৃতীয় সন্তান: পরিকল্পিত হোম বার্থের গল্প