এপিশিওটমি নাকি টিয়ার
- Posted by MNCC Moderator
- Date May 9, 2025
- Categories Blog, Doulas

এপিশিওটমি ও টিয়ার নিয়ে কথাবার্তা শুরু হলে আমরা বেশ অনেকগুলো মতামত দেখতে পাই৷ একদল মনে করেন এপিশিওটমি ভালো নয়, টিয়ার হলে হোক। আরেকদল এসে বলে এভাবে ছিড়ে যাওয়ার চেয়ে অল্প কেটে সুন্দর করে সেলাই করে দেওয়াই ভালো। তৃতীয় আরেক দল এসে কমপ্লেইন করেন তাদের এপিশিওটমি দেওয়ার পর কী কী ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে এবং চতুর্থ দল জানাবেন টিয়ার নিয়ে তাদের কী রকম খারাপ অভিজ্ঞতা আছে। শেষদল আরেক ধাপ এগিয়ে। তারা এপিশিওটমি ও টিয়ারের ভয়ে একেবারে সি সেকশনের ডিসিশন নিয়ে নেন।
এত মতামত কোনটা সঠিক, আসলে কী করতে হবে সেই বিষয়ে কিছুটা পরিষ্কার করে বলতে চাই। প্রথমে জেনে নেওয়া যাক, এপিশিওটমি ও টিয়ার কাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি।
🔷 এপিশিওটমি (Episiotomy) কী?
এপিশিওটমি হলো প্রসবের সময় যোনিপথের মুখ (perineum) প্রশস্ত করতে কেটে দেওয়া, যাতে শিশুর জন্ম সহজ হয় এবং অনিয়ন্ত্রিত টিয়ার/ছেড়া কমানো যায়। এটি সাধারণত প্রসবের দ্বিতীয় ধাপে (baby crowning) করা হয়, যখন শিশুর মাথা বের হতে থাকে।
👉 কেন এপিশিওটমি করা হয়?
– শিশুর জটিলতা এড়াতে: শিশুর হার্টবিট কমে গেলে বা প্রসব দ্রুত করানো দরকার হলে। প্রিম্যাচ্যুর বাচ্চা হলে।
– মায়ের হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপের মতো কোন অসুখ থাকলে যখন লেবারের দ্বিতীয় ধাপ সংক্ষিপ্ত করার প্রয়োজন হয়।
-ভ্যাজাইনাল টিয়ার প্রতিরোধে: অনিয়ন্ত্রিত এবং বড় টিয়ার হওয়ার ঝুঁকি থাকলে।
-ফোর্সেপ বা ভ্যাকুয়াম ডেলিভারির সময়।
-প্রসব দীর্ঘ হয়ে গেলে
-বড় শিশুর জন্মের সময় বা মা যদি প্রথমবার জন্ম দেন এবং পেরিনিয়াম যথেষ্ট নমনীয় না থাকে।
👉 এপিশিওটমির ধরন:
১. মিডলাইন (Midline Episiotomy):
-যোনির নিচের দিকে সোজা কাটা হয়।
-ব্যথা কম হয় ও দ্রুত সেরে যায়।
-ফোর্থ-ডিগ্রি টিয়ারের ঝুঁকি বেশি।
2. মেডিওল্যাটেরাল (Mediolateral Episiotomy):
-যোনি থেকে কিঞ্চিৎ পাশে কাটা হয় (বাঁ বা ডানে)।
-গুরুতর টিয়ারের ঝুঁকি কম কিন্তু ব্যাথা বেশি হয় এবং সেলাই ঠিকভাবে না হলে অস্বস্তি হতে পারে।
🔷 টিয়ার কাকে বলে?
• প্রসবের সময় যোনিপথ ও আশেপাশের টিস্যুতে ফাটল বা ছিঁড়ে যাওয়াকে ভ্যাজাইনাল টিয়ার (Vaginal Tear) বলা হয়। এটি সাধারণত চারটি গ্রেড বা স্তরে ভাগ করা হয়:
১. ফার্স্ট-ডিগ্রি টিয়ার
➤সবচেয়ে হালকা পর্যায়ের ছিঁড়ে যাওয়া।
➤শুধুমাত্র যোনির বাইরের ত্বক ও কিছুটা উপরের স্তর আক্রান্ত হয়।
➤ব্যথা কম হয় এবং সাধারণত নিজে থেকেই সেরে যায় বা কয়েকটি সেলাই লাগতে পারে।
২. সেকেন্ড-ডিগ্রি টিয়ার
➤যোনির বাইরের ত্বক ছাড়াও যোনিপথের মাংসপেশি (perineal muscles) কিছুটা ছিঁড়ে যেতে পারে।
➤সাধারণত সেলাইয়ের প্রয়োজন হয় এবং সেরে উঠতে কয়েক সপ্তাহ লাগে।
৩. থার্ড-ডিগ্রি টিয়ার (Third-Degree Tear)
➤এটি বেশি গুরুতর এবং যোনিপথের মাংসপেশির পাশাপাশি মলদ্বারের পেশি পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।
➤ব্যথা বেশি হয় এবং সঠিকভাবে চিকিৎসা না করালে মলধারণের সমস্যা হতে পারে।
➤অস্ত্রোপচার বা ভালো সেলাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে, এবং সেরে উঠতে কয়েক মাস লাগতে পারে।
৪. ফোর্থ-ডিগ্রি টিয়ার
➤সবচেয়ে গুরুতর পর্যায়। এটি যোনিপথ থেকে শুরু হয়ে মলদ্বারের ভেতরের মিউকোসা পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়।
➤ব্যাথা প্রচণ্ড হতে পারে এবং এটি সঠিকভাবে চিকিৎসা না করলে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
➤সাধারণত অস্ত্রোপচার ও দীর্ঘমেয়াদী পরিচর্যা প্রয়োজন হয়।
প্রথমত যে দল আছেন যাদের মনে হয় এপিশিওটমি ভালো নয়, তারা টিয়ারকে খারাপ কিছু মনে করেন না। তারা হয় ন্যাচরাল চাইল্ড বার্থে আগ্রহী এবং এ বিষয়ে কিছুটা জানেন, বিদেশে যাদের ডেলিভারি হয়েছে বা নিজের বাড়ীতে ডেলিভারির সময় যাদের এপিশিওটমি দেওয়া হয় নি, একদম টিয়ার হয় নি বা অল্প টিয়ার হয়েছে তারা।ব্যাপার হচ্ছে গবেষনা বলে, ৫০% মেয়েদের কোন রকম টিয়ার হবে না। হলেও খুব অল্প হয় যেটা স্টীচ লাগে না। লাগলেও তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যায় মানে ফার্স্ট বা সেকেন্ড ডিগ্রী টিয়ার।
যে এপিশিওটমিকে ভালো বলেন তারা হচ্ছেন ডাক্তার, নার্স, সেসব মায়েরা যাদের হাসপাতালে এপিশিওটমি দিয়ে ডেলিভারি হয়েছে এবং তাদের বোঝানো হয়েছে এটা তাদের জন্য প্রয়োজন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এপিশিওটমি রুটিন মাফিক দেওয়া না হলেও বাংলাদেশের বিভিন্ন গাইড লাইনে এর রুটিন মাফিক প্রয়োগ না করার নির্দেশনা থাকা সত্বেও এটি মোটামুটি সবাইকে দেওয়া হয়।
টিয়ারে আমাদের কোষের ফাঁকা জায়গাগুলো ছিড়ে যায় আর এজন্য তাড়াতাড়ি সেড়ে উঠে। এপিশিওটমিতে কোষগুলো কাটা পরে। এজন্য সেড়ে উঠতে সময় লাগে, ব্যাথা বেশী লাগে, বেশীদিন থাকে।
টিয়ার না কি এপিশিওটমি এই প্রশ্নের উত্তরে সাধারন ভাবে বলা যায়, প্রথম ও দ্বিতীয় ডিগ্রি টিয়ার এপিশিওটমির চেয়ে অবশ্যই ভালো। এদিকে ৩য় ও চতুর্থ ডিগ্রি টিয়ারের চেয়ে এপিশিওটমি ভালো।
তবে এটা কোন উপসংহারে আসা হল না যার উপর ভিত্তি করে কেউ ডিসিশন নিতে পারবেন।
আমাদের দেশের প্রক্ষিতে যদি বলি, এখানে লেবার রুমে এখনও চিৎ হয়ে শুয়ে প্রসব করার প্রচলন। আমাদের দেশের মেয়েরাও সবাই খুব বেশী সচেতন নয়। পেলভিক ফ্লোরের এক্সারসাইজ, লেবার প্রগ্রেস, পুশিং এসব নিয়ে খুব কম মায়েরা জানেন। ডাক্তারকে এখানে পুশিংয়ের সময় বেশ কষ্ট করা লাগে। মায়ের লেবারের সময় বিভিন্ন ভয় ভীতি থাকে, পরবর্তীতে চিৎ হয়ে শুয়ে যখন ডেলিভারি হয় টিয়ারের সম্ভাবনা বেড়ে যায়, অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় বাজে ভাবে টিয়ার হচ্ছে। এজন্য এখানকার ডাক্তাররা এপিশিওটমি দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এর বাইরে কেউ যদি এপিশিওটমি না দেওয়ার কথা বলেন, ডাক্তার সেই ৩য়, ৪র্থ ডিগ্রি টিয়ারের কথা স্মরণ করে কোন প্রকার ঝুঁকি নিতে চান না।
এপিশিওটমি বা ৩য়, ৪র্থ ডিগ্রি টিয়ার হলে যেহেতু সেরে উঠতে সময় লাগে, অনেকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে পারেন না। সেলাইতে ইনফেকশন হয়ে আরও বেশী ভোগান্তি পোহাতে হয়, যেটা সেরে উঠতে অনেক সময় লাগে। যাদের বাড়ীতে ডেলিভারি হয়, ভালো ভাবে স্টীচ দেওয়া হয় না, তাদের ক্ষেত্রে আজীবন ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে। এইসব মায়েদের নরমাল ডেলিভারি হলেও তাদের প্রসব পরবর্তী অভিজ্ঞতা কষ্টদায়ক হয়ে যায়।
এপিশিওটমি দিলে যে টিয়ার হবে না এটার কিন্তু কোন গ্যারান্টি নেই। বিষয়টি ভালো ভাবে বোঝার জন্য কাপড়ের উদাহরণ দেওয়া যায়। একটা কাপড়ে অল্প কাটার পর যদি কাটা অংশে জোরে চাপ পরে তখন আরও বেশ খানিকটা কাপড় ছিড়ে যায়। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে অল্প একটু কেটে জোরে দুইপাশে টান দিয়ে দর্জি এবং কাপড় বিক্রেতাদের কাপড় ভাগ করতে দেখা যায়। এপিশিওটমি দেওয়ার পরও অনেক সময় কিছু পরিস্থিতিতে যেমন বাবুর মাথা বড়, ওজন বেশী হলে, গলায় কর্ড প্যাঁচানো থাকলে অতিরিক্ত চাপে টিয়ার হয়ে যেতে পারে। আমার কয়েকজন দৌলা ক্লায়েন্ট আপুদের এই অভিজ্ঞতা হয়েছিল বলে তারা আমাকে জানিয়েছেন।
মায়েদের বিষয়টা মোটামুটি বোঝা গেল, পরবর্তীতে এ বিষয়ে আরও বলছি। এখন আসি বাচ্চাদের বিষয়ে৷ বাচ্চার জন্য কোনটা ভালো হবে? আমরা যেহেতু বাচ্চার জন্য সহ সব বিষয় বিবেচনা করি, এপিশিওটমি না দেওয়া হলে, যখন যোনীপথে বাচ্চার ডেলিভারি হয় তখন চাপে স্বাভাবিক ভাবে তাদের ফুসফুস থেকে অতিরিক্ত তরল বের হয়ে আসে (fetal Heimlich maneuver) এবং এটা বাচ্চাদের জন্য খুবই উপকারী। এপিশিওটমি দেওয়া হলে এই প্রক্রিয়া সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয় না।
আমরা এখন বুঝতে পারছি যে মায়েদের এমন ভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে, যাতে এপিশিওটমি দেওয়া না হয় এবং টিয়ারও যাতে বেশি না হয় এর জন্য আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। পেলভিক ফ্লোর মজবুত এবং নমনীয় হলে, মা নিজের সুবিধামতো পুশিং পজিশন নিতে পারলে, টিয়ার হওয়ার সম্ভবনা কমে যায়। এপিশিওটমি দেওয়া হলেও তখন আরও বেশী টিয়ার হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায় এবং মা তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়। এপিশিওটমি বা টীয়ারের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আপনার পেলভিক ফ্লোর।
আর যারা এপিশিওটমির ভয়ে সি সেকশনের দিকে যেতে চান তারা বোকার রাজ্যে আছেন বলা যেতে পারে। পেটের কাটাটা কত খানি বড় ও গভীর সেটা ভয় না পেয়ে নিচের দিকে ছোট্ট একটা কাটাকে কেন ভয় করেন? সি সেকশন তলপেটের একটি মেজর অপারেশন, এনেস্থিসিয়া ওসুধসহ কত সতর্কতা ও বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়, যেখানে এপিশিওটমি শুধুমাত্র লোকাল এনেস্থিসিয়া দিয়েই দেওয়া হয় এবং হাই ডোজের ব্যাথানাশক ওষুধ ছাড়া তাড়াতাড়ি সুস্থ হওয়া যায়। তবে হ্যাঁ, এপিশিওটমি যেহেতু ছোট হলেও একটি সার্জিক্যাল কাটা, তাই এর কাটা ও সেলাই দক্ষ হাতে হওয়া প্রয়োজন।
এজন্য বলতে চাই গর্ভকালীন বিষয়গুলো পড়ুন, জানুন এবং কোনটা আপনার জন্য উত্তম সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিন, সবসময় আল্লাহর উপর তাওয়াককুল করুন।
ফারইয়াব হাসান
নিউট্রিশনিস্ট
প্রিনেটাল ইন্সট্রাক্টর ও দৌলা, রৌদ্রময়ী স্কুল
Other post
You may also like
মায়ের নিঃশব্দ কান্না, আমরা কি শুনি?
‘খুব কাঁদত, রাতে ঘুম হত না! যমজ সন্তানকে ফাঁস দিয়ে মারল মা। সন্তানদের কান্না থামানোর জন্য একটি লেপ দিয়ে মুখ ঢেকে দেয়। তাতে আরও জোরে চিৎকার শুরু করলে ওড়না দিয়ে তাদের শ্বাসরোধ করে মারে মা।’ কিছুদিন পরপরই এমন ঘটনা ঘটে …
দৌলা ডায়েরী সিরিজ — পর্ব ৩৯
সাদিয়া আপু আমাকে দৌলা সার্ভিস এর জন্য নক করেন উনার ২য় প্রেগন্যান্সির ৩৬ সপ্তাহে। আপুর ফর্ম থেকে জানতে পারি উনার প্রায় ৩ বছরের একটি বাবু আছে এবং ১ম প্রেগন্যান্সিতে উনার লেবার ট্রায়াল দেয়ার সময় ৭সেমি ডায়লেশনের (জরায়ু মুখ খোলার) পর …
আমার ব্রেস্ট ফিডিং জার্নি
আমার বাবু হওয়ার পর প্রথম দুই দিন আমার মিল্ক ফ্লো আসেনি। ফ্যামিলি থেকে ফর্মুলা ফিডিং করাবো কিনা জিজ্ঞেস করা হচ্ছিল। আমি কনফিডেন্টলি বলেছিলাম ‘ফ্লো আসবে, ফর্মুলা দেবো না’।আমার বাবু হওয়ার পর প্রথম দুই দিন আমার মিল্ক ফ্লো আসেনি। ফ্যামিলি থেকে …
