৫০% এরও বেশি সিজার: কারণ ও করনীয়
- Posted by MNCC Moderator
- Date October 21, 2025
- Categories Blog, Doulas

বর্তমানে বাংলাদেশের সিজারিয়ান ডেলিভারির হার ৫০% এরও বেশি। নিঃসন্দেহে এটা বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি। এই যে সিজারিয়ানের হার এত বেশি, এর কারণটা আসলে কি?
১. প্রসব সংক্রান্ত জ্ঞান সম্পর্কে মায়ের অজ্ঞতা
২. মায়ের সাপোর্ট পার্সন এর অভাব
৩. প্রসব ব্যবসায় সিন্ডিকেট বা মেডিকেল টিমের অসহযোগিতা
একটা সময় ছিল যখন মায়েদের প্রসব নিয়ে আলাদা করে জানার প্রয়োজন ছিল না। মা-খালা, নানী-দাদীর মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হাতে-কলমে স্থানান্তরিত হতো এই জ্ঞান। কিন্তু মাঝের এক-দুটো প্রজন্মের হাসপাতাল মুখিতা এবং এই জ্ঞান সংরক্ষণ করার মন মানসিকতার অভাবে আমাদের মায়েদেরকে আজকে ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় সি সেকশনের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে।
আমার আম্মুর দুই দুইটা হোমবার্থ হওয়ার পরও সে নাকি তার গর্ভফুলই চোখে দেখেনি। অথচ আমার নানি নিজের সহ অসংখ্য মায়ের নিজের হাতে ডেলিভারি করিয়েছেন। এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা!
এই কারণেই এখনকার মায়েরা জানেন না –
এই বিষয়গুলো না জানার কারণে তারা আত্মবিশ্বাসের সাথে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। পরিস্থিতি যেদিকে যায় তাদেরকেও সেদিকে যেতে হয়। আর এভাবেই তারা সক্রিয় প্রসবকারী থেকে একজন নিষ্ক্রিয় রোগীতে পরিণত হয়।
প্রসবব্যথা এমন একটা সময় যখন ভালো জানাশোনা মাও ব্যথায় কুপোকাত হয়ে যান। খুব ভালোভাবে প্রস্তুতি নেয়া মা-ও একটা পর্যায়ে এসে হাল ছেড়ে দিতে চাইতে পারেন। বিশেষ করে প্রসবব্যথার রূপান্তর (Transition) ধাপে বেশিরভাগ মা-ই প্যানিকড হয়ে যান এবং মেডিকেল হস্তক্ষেপ চাইতে থাকেন।
এই সময় তার প্রয়োজন ভালোবাসাপূর্ণ ও উৎসাহমূলক শারীরিক ও মানসিক সাপোর্ট। কিন্তু বেশিরভাগ মায়েরাই তাদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। প্যানিকড মাকে শান্ত করা দূরে থাক, কিছু ক্ষেত্রে তো খুব আত্মবিশ্বাসী মায়েদেরকেও তাদের আশেপাশের মানুষেরা বিভ্রান্ত করতে থাকেন। পরিবারের লোক ও মেডিকেল টিমের ক্রমাগত ন্যাগিংয়ের কারণে একসময় মা সি সেকশনে যেতে রাজি হয়ে যান, যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আদতে সি সেকশনের কোনো প্রয়োজন হয়তো ছিল না।
মাঝে মাঝে মায়েদের থেকে শুনি, সব ঠিক থাকার পরও শুধুমাত্র পারিবারিক চাপে কিভাবে তাদের সি সেকশনে যেতে হয়েছিল, এমনকি নরমাল ডেলিভারি ট্রায়াল পর্যন্ত দিতে পারে না অনেকে। তারা খুব আফসোস করে বলে, “ইশশ, ওই সময় যদি একজন মানুষ পেতাম যে আমাকে একটু সাপোর্ট দিতো, একটু সাহস দিতো। বলতো, তুমি পারবে, আরেকটু ধৈর্য ধরো, আল্লাহ ভরসা। তাহলে হয়তো আমাকে এই ছুঁরি কাঁচির নিচে নিজেকে সঁপে দিতে হতো না।”
বাংলাদেশের প্রসব ব্যবসা সিন্ডিকেটের অবস্থা ভয়াবহ রকমের খারাপ। অধিক মুনাফার আশায় মেডিকেল বিল বাড়াতে মায়েদেরকে বিভিন্ন ধরনের ভয়-ভীতি দেখানো হয় এবং অপ্রয়োজনীয় মেডিকেল হস্তক্ষেপ গুলো নিতে এক রকমের বাধ্য করা হয়।
আসলে পরিবেশটাই এমনভাবে তৈরি হয়ে গিয়েছে যে একজন মা যদি প্রসবব্যথার মত লাজুক সময়ে এমন সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়েন তার পক্ষে আর সেটা এড়িয়ে বেরোনো সম্ভব হয়ে উঠে না। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, বুঝে হোক বা না বুঝেই হোক, মা এবং তার পরিবারকে ওই সব মেডিকেল প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হয়।
চলতি বছরে কিছু হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দেশে এখন সিজারের হার ৭০-৮০% পর্যন্ত পৌঁছেছে। অনেক বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এ হার ৯০% পর্যন্ত উঠে গেছে। আর ঢাকাতে প্রতিটা বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সি সেকশন এর খরচ ৫০ হাজার থেকে ২.৫ লাখ টাকা পর্যন্তও হয়ে থাকে। তাছাড়া, হাই রিস্ক প্রেগন্যান্সি সহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধার উপর ভিত্তি করে এই বিল আরো কম বেশি হতে পারে।
গবেষণা বলছে, সিজারের খরচ স্বাভাবিক প্রসবের তুলনায় প্রায় ৪ গুণ বেশি। ফলে হাসপাতাল ও চিকিৎসকরা আর্থিকভাবে বেশি লাভবান হওয়ার জন্য অপ্রয়োজনীয় সিজার করাতে রোগীদের প্রভাবিত করছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মিফতা মালিহা জানান, “দেশে সিজারিয়ান অপারেশনের হার বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, অনেক সময় চিকিৎসকরা হাসপাতাল মালিকের চাপে পড়ে রোগীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সিজার করান। এর পেছনে মূলত দেশের পুরো সিস্টেমই দায়ী, যেখানে জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার অভাব রয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে জঘন্যতম অপরাধের মধ্যে পড়ে, কারণ সিজারিয়ান অপারেশন এবং এর খরচ ব্যয়বহুল একটি প্রক্রিয়া মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য। কোনো রোগী স্বাভাবিকভাবে সন্তান জন্ম দিতে চাইলে তাকে ভয় দেখিয়ে সিজার করানো কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।”
আল্লাহ প্রসবের আগে একজন মাকে পুরো ৯ মাস সময় দিয়েছেন, এই সময়টা যথাযথ ইউটিলাইজ করতে জানতে হবে একজন মাকে। এটা শুধু তার জন্য নয়, তার সন্তানের জন্য হলেও তাকে এটি করতে হবে। এটা তার জন্য কোনো অপশনাল কাজ নয় বরং এটা তার জন্য অত্যাবশ্যকীয় একটি দায়িত্ব।
অন্যান্য দেশের মতো এখন বাংলাদেশেও সার্টিফাইড Childbirth Educator বা সন্তান প্রসব প্রশিক্ষক রয়েছেন। যারা মায়েদেরকে গর্ভাবস্থা, প্রসবব্যথা ও প্রসব সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করেন। প্রসব সংক্রান্ত জ্ঞানগুলো নিয়ে প্রজন্মের যে একটা গ্যাপ সৃষ্টি হয়ে গিয়েছে তা এখন পেশাদার সন্তান প্রসব প্রশিক্ষকের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। তবে এখনো এ দেশে আরো অনেক বেশি পরিমাণে সন্তান প্রসব প্রশিক্ষকের প্রয়োজন। বর্তমানে এটা কেবল একটি পেশা নয়, এটা এখন প্রজন্মের দাবি।
তাছাড়া ও বাংলাদেশে ‘বার্থ এডুকেশন’ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের ‘অনলাইন প্রিনাটাল কাপল কোর্স’-এ গর্ভাবস্থায়, প্রসবব্যথা, প্রসব, প্রশবোত্তর সময় এবং নবজাতকের যত্ন– সম্পর্কিত যাবতীয় ইনফরমেশন শেয়ার করা হয়। ফলে মায়েদেরকে শিক্ষিত করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে আমাদের দেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান ডেলিভারির যে অপ-সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তার বিরুদ্ধে একটা নিরব বিপ্লব গড়ে উঠছে।
মায়েদের উচিত এসব প্ল্যাটফর্ম এর সদ্ব্যবহার করা ও প্রসবব্যথা শুরু হওয়ার আগেই প্রসব সংক্রান্ত যাবতীয় জ্ঞান অর্জন করা, যেন তিনি একটি এম্পাওয়ারড প্রসব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন।
তিনি প্রসবের সময় একজন মায়ের মানসিক চাপ কমাতে এবং তাকে শান্ত থাকতে সহায়তা করেন। প্রসবের ব্যথা কমাতে বিভিন্ন কৌশল, যেমন- মাসাজ, পজিশন পরিবর্তন এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান করে থাকেন। প্রসবের বিভিন্ন পর্যায় বা ধাপ সম্পর্কে তথ্য প্রদান করেন এবং মাকে তার প্রসবের বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেন। তাছাড়া, বিভিন্ন মেডিকেল টার্ম বিশ্লেষণ এর মাধ্যমে মেডিকেল টিমের সাথে মায়ের যোগাযোগ আরো সহজতর করতেও সাহায্য করেন।
গবেষণা এসেছে সার্বক্ষণিক দৌলার উপস্থিতি সিজারিয়ান ডেলিভারি হার ২৯% পর্যন্ত কমাতে সাহায্য করে। তাছাড়া দৌলার উপস্থিতিতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা মানসিকভাবে স্বস্তি অনুভব করেন, যার কারণে তারা মাকে অহেতুক মেডিকেল হস্তক্ষেপ নিতে মানসিক চাপ দেন না।
একজন দৌলা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও আশ্বস্ত করেন, ফলে সবাই মিলে একটা টিম হিসেবে মাকে সাপোর্ট করতে পারেন।
প্রসবের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার মধ্যে কিন্তু এটাও পড়ে যে, কোন জায়গাটা একজন মা প্রসবের জন্য নির্বাচন করবেন। একজন মায়ের উচিত জেনেশুনে খোঁজ খবর নিয়ে প্রসবের জন্য জায়গা নির্বাচন করা।
যেসব হাসপাতাল বা ক্লিনিক গুলোতে প্রসবকে একটা ব্যবসায়ে পরিণত করা হয়েছে, সেখানে জেনেশুনে যাওয়ার কোন মানে হয় না। বরং একজন বাবা মায়ের উচিত তার এলাকায় খোঁজখবর নিয়ে এমন হাসপাতাল বা বার্থ সেন্টার নির্বাচন করা যেখানে নরমাল ডেলিভারি ফ্রেন্ডলি পরিবেশ রয়েছে।
বিভিন্ন মায়েদের থেকে সংগ্রহকৃত তথ্যের উপর ভিত্তি করে একটি ডাটাবেজ রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় নরমাল ডেলিভারি সাপোর্টিভ ডাক্তার এবং মিডওয়াইফ দের তালিকা রয়েছে।
এসব জায়গায় গেলে কিছুটা হলেও আপনি নরমাল ডেলিভারির জন্য সাপোর্ট পাবেন বলে আশা করা যায়।
——————————————-
মনে রাখবেন, এখানে মোটাদাগে মাত্র ৩ টা দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, এর বাইরেও আরো অনেক কারণ এবং সমাধান রয়েছে।
আপনার কি মনে হয়, কেন আমাদের দেশে সিজারিয়ান ডেলিভারির হার এতো বেশি এবং এর সম্ভাব্য সমাধান কি কি হতে পারে?
সার্টিফাইড চাইল্ডবার্থ এডুকেটর এন্ড বার্থ দৌলা
Other post
Tag:দৌলা
You may also like
মায়ের নিঃশব্দ কান্না, আমরা কি শুনি?
September 3, 2026
‘খুব কাঁদত, রাতে ঘুম হত না! যমজ সন্তানকে ফাঁস দিয়ে মারল মা। সন্তানদের কান্না থামানোর জন্য একটি লেপ দিয়ে মুখ ঢেকে দেয়। তাতে আরও জোরে চিৎকার শুরু করলে ওড়না দিয়ে তাদের শ্বাসরোধ করে মারে মা।’ কিছুদিন পরপরই এমন ঘটনা ঘটে …
দৌলা ডায়েরী সিরিজ — পর্ব ৩৯
August 15, 2026
সাদিয়া আপু আমাকে দৌলা সার্ভিস এর জন্য নক করেন উনার ২য় প্রেগন্যান্সির ৩৬ সপ্তাহে। আপুর ফর্ম থেকে জানতে পারি উনার প্রায় ৩ বছরের একটি বাবু আছে এবং ১ম প্রেগন্যান্সিতে উনার লেবার ট্রায়াল দেয়ার সময় ৭সেমি ডায়লেশনের (জরায়ু মুখ খোলার) পর …
আমার ব্রেস্ট ফিডিং জার্নি
August 15, 2026
আমার বাবু হওয়ার পর প্রথম দুই দিন আমার মিল্ক ফ্লো আসেনি। ফ্যামিলি থেকে ফর্মুলা ফিডিং করাবো কিনা জিজ্ঞেস করা হচ্ছিল। আমি কনফিডেন্টলি বলেছিলাম ‘ফ্লো আসবে, ফর্মুলা দেবো না’।আমার বাবু হওয়ার পর প্রথম দুই দিন আমার মিল্ক ফ্লো আসেনি। ফ্যামিলি থেকে …
