গর্ভফুল: মানবদেহের এক বিস্ময়কর অস্থায়ী অংগ
- Posted by MNCC Moderator
- Date October 21, 2025
- Categories Blog, Doulas

বলেন তো, মানবদেহের কোন অস্থায়ী অঙ্গটি একটা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কাজের জন্য গঠিত হয়, এবং সেই কাজ শেষ হলে খসে পড়ে যায়? এবং এর ওজন কিন্তু প্রায় ১ কেজির মত।
হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। এটা হচ্ছে ‘গর্ভফুল’ বা ‘প্লাসেন্টা’। মানবদেহে থাকা আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টিগুলো একটি এটি। প্লাসেন্টা গর্ভাবস্থায় তৈরি হওয়া একটি অস্থায়ী অঙ্গ, যা মা ও শিশুর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। এটি শুধু একটি অঙ্গই নয়, এর কিছু অসাধারণ ক্ষমতা আছে।
প্লাসেন্টা হলো মানবদেহের একমাত্র অঙ্গ যা শুধুমাত্র গর্ভাবস্থায় তৈরি হয় এবং শিশুর জন্মের পর এর কাজ শেষ হয়ে গেলে শরীর থেকে বেরিয়ে আসে। এটি অনেকটা একটি ছোট, স্বাধীন লাইফ-সাপোর্ট সিস্টেমের মতো।
প্লাসেন্টা কিন্তু শুধু মায়ের শরীর থেকে তৈরি হয় না। এর কিছু অংশ মায়ের জরায়ুর দেয়াল থেকে আসে, আর বাকি অংশ ভ্রূণ থেকে তৈরি হয়। অর্থাৎ, এটি মা এবং শিশু উভয়ের কোষ দিয়ে গঠিত একটি মিউচুয়াল অর্গান।
প্লাসেন্টার সবচেয়ে বিস্ময়কর কাজগুলোর মধ্যে একটি হলো, এটি মা ও শিশুর রক্তকে আলাদা রেখে পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ করে। মায়ের রক্ত প্লাসেন্টার একদিকে প্রবাহিত হয় এবং শিশুর রক্ত অন্য দিকে। এই দুই রক্তের মধ্যে একটি পাতলা পর্দার মাধ্যমে অক্সিজেন, পুষ্টি এবং অ্যান্টিবডি আদান-প্রদান হয়, কিন্তু রক্ত কখনো সরাসরি মিশে যায় না। যার কারণে মা ও শিশুর রক্তের গ্রুপ ভিন্ন হয়।
যদি একই সময়ে দুটি ভ্রূণ বা যমজ শিশুর জন্ম হয়, তাহলে সাধারণত দুটি আলাদা প্লাসেন্টা তৈরি হয় এবং যার কারণে দুই বাচ্চার ভিন্ন ভিন্ন রক্তের গ্রুপ হয়।
এটি মায়ের রক্ত থেকে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন এবং পুষ্টি উপাদান ভ্রূণকে সরবরাহ করে। ঠিক একইভাবে ভ্রূনের দেহে উৎপাদিত কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং বর্জ্যপদার্থ আম্বেলিকাল কর্ড হয়ে এই প্লাসেন্টার মাধ্যমেই মায়ের রক্তে এসে মেশে, যা পরবর্তীতে মায়ের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ও বর্জ্যের মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। এভাবেই গর্ভকালীন পুরো নয় মাস জুড়ে প্লাসেন্টা নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে তার দায়িত্ব পালন করে যায়।
প্লাসেন্টা শুধু পুষ্টি সরবরাহ বা বর্জ্য অপসারণের কাজই করে না, এটি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ হরমোনও তৈরি করে। এসব হরমোন গর্ভাবস্থাকে সচল রাখতে, শিশুর বৃদ্ধিকে উদ্দীপিত করতে এবং মায়ের শরীরকে প্রসবের জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করে। যেমন, হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রপিন (HCG) হরমোন, যা গর্ভাবস্থা পরীক্ষায় ধরা পড়ে।
প্রসবের পর যদি প্লাসেন্টাকে ভালোভাবে পরীক্ষা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে এর একদিকে অনেকটা গাছের শাখার মতো শিরা-উপশিরা বিস্তৃত হয়েছে। এটি দেখতে অনেকটা জীবনের গাছের (Tree of Life) মতো, কারণ এটিই গর্ভাবস্থায় শিশুর জীবনকে টিকিয়ে রাখে।
প্রসবের পরও প্লাসেন্টা শিশুকে রক্ত এবং অক্সিজেন সাপ্লাই দেয়। এটি জরায়ুর দেয়াল থেকে খসে বেরিয়ে আসার পরও বেশ কিছু সময় শিশুকে রক্ত এবং অক্সিজেন সরবরাহ করতে থাকে। তাই প্রসবের সাথে সাথে কর্ড বা নাড়ি কাটা উচিত নয়। এতে শিশু তার প্রাপ্য হক থেকে বঞ্চিত হয়। এই একটু দেরি করে কর্ড কাটাকে বলা হয় “ডিলেইড কর্ড ক্ল্যাম্পিং”। এর উপকারিতা ব্যাপক, যা নিয়ে আমরা অন্য কোনদিন কথা বলবো, ইনশাআল্লাহ।
সবথেকে অবাক করা তথ্য হচ্ছে, বিউটি এবং ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ড্রাসটিতে এই প্লাসেন্টার চাহিদা ব্যাপক। প্লাসেন্টার স্টেম সেল, গ্রোথ ফ্যাক্টর এবং অন্যান্য জৈব উপাদানগুলো ত্বক এবং ওষুধ শিল্পে মূল্যবান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর বাজার প্রায় বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
প্লাসেন্টাতে আছে বিভিন্ন ধরনের বৃদ্ধির উপাদান (Growth factors), ভিটামিন, অ্যামিনো অ্যাসিড এবং হরমোন, যা ত্বককে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং কোলাজেন উৎপাদনে সাহায্য করে। তাছাড়া এগুলো ত্বকের বলিরেখা, সূক্ষ্ম রেখা এবং বয়সের ছাপ কমাতেও সাহায্য করে থাকে।
তাই এর নির্যাস এন্টি এজিং প্রসাধনী সহ বিভিন্ন ধরনের সিরাম, ফেস ক্রিম, মশ্চারাইজার, ফেস মাস্ক, হেয়ার কেয়ার এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির প্রসাধনীতে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে এশিয়ার কিছু দেশে (যেমন: চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া) এর ব্যবহার বেশ প্রচলিত।
ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ড্রাসটিতে ক্ষত নিরাময়ের ঔষধ এবং inflammatory (প্রদাহজনিত) রোগের চিকিৎসায় এর নির্যাস, সেল ব্যবহৃত হয়।
সিজারিয়ান ডেলিভারির প্লাসেন্টার মূল্য তুলনামূলক একটু বেশি হয়ে থাকে, কারণ সিজারিয়ান ডেলিভারির প্লাসেন্টা তুলনামূলক কম চাপের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসার কারণে প্রায় পুরোপুরি অক্ষত থাকে এবং দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করা যায়।
রেজওয়ানা রাজ্জাক
দৌলা, রৌদ্রময়ী স্কুল
Other post
Tag:দৌলা, প্রেগ্ন্যান্সি
You may also like
মায়ের নিঃশব্দ কান্না, আমরা কি শুনি?
September 3, 2026
‘খুব কাঁদত, রাতে ঘুম হত না! যমজ সন্তানকে ফাঁস দিয়ে মারল মা। সন্তানদের কান্না থামানোর জন্য একটি লেপ দিয়ে মুখ ঢেকে দেয়। তাতে আরও জোরে চিৎকার শুরু করলে ওড়না দিয়ে তাদের শ্বাসরোধ করে মারে মা।’ কিছুদিন পরপরই এমন ঘটনা ঘটে …
দৌলা ডায়েরী সিরিজ — পর্ব ৩৯
August 15, 2026
সাদিয়া আপু আমাকে দৌলা সার্ভিস এর জন্য নক করেন উনার ২য় প্রেগন্যান্সির ৩৬ সপ্তাহে। আপুর ফর্ম থেকে জানতে পারি উনার প্রায় ৩ বছরের একটি বাবু আছে এবং ১ম প্রেগন্যান্সিতে উনার লেবার ট্রায়াল দেয়ার সময় ৭সেমি ডায়লেশনের (জরায়ু মুখ খোলার) পর …
আমার ব্রেস্ট ফিডিং জার্নি
August 15, 2026
আমার বাবু হওয়ার পর প্রথম দুই দিন আমার মিল্ক ফ্লো আসেনি। ফ্যামিলি থেকে ফর্মুলা ফিডিং করাবো কিনা জিজ্ঞেস করা হচ্ছিল। আমি কনফিডেন্টলি বলেছিলাম ‘ফ্লো আসবে, ফর্মুলা দেবো না’।আমার বাবু হওয়ার পর প্রথম দুই দিন আমার মিল্ক ফ্লো আসেনি। ফ্যামিলি থেকে …
