Back

সঠিক সিধান্ত এবং আত্মবিশ্বাসী মা

আমার মনে হয়, একজন মেয়ের জীবনের মোড় ঘুরানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টা হচ্ছে মেয়ে থেকে মা হয়ে উঠা। গর্ভকালীন সময়ের বিচিত্র সব অভিজ্ঞতাগুলো উঠে আসে আমাদের দৌলা ডায়রির দেয়ালে।
 
আজকে আপনাদের শোনাবো ফারিসা আপুর গল্প। হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল একজন মেয়ে মাশা আল্লাহ। আপুর কাছে এই প্রেগ্ন্যাসি একটা মিরাক্যলের মতই। বায়তুল্লাহ থেকে উমরাহ করে আসার পরে আপু সুসংবাদ পেয়েছিলেন।
 
আপুর ইউরিন ইনফেকশন, গর্ভকালীন ডায়বেটিস সহ কিছু সমস্যা ছিল। এগুলো আপুর একটিভ জীবনে কোন বাঁধার কারন হয় নি। পুরোটা সময় তিনি নিজের পড়াশোনা ও সংসার নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। আপু বাংলাদেশে নরমাল ডেলিভারি করান বলে বিখ্যাত এমন একজন ডাক্তার দেখাচ্ছিলেন। ডাক্তারের কিছু ব্যাপার আমার বেশ ভালো লেগেছিল। যেমন আপুর ইউরিন ইনফেকশন প্রবলেমে উনি বার বার এন্টিবায়োটিক না দিয়ে ক্র্যানবায়োটিক দিয়েছিলেন। সময় দিতেন, বেশ আন্তরিকও ছিলেন।
 
৩৬ সপ্তাহের দিকে আপু আমার সাথে আলোচনা করে ডাক্তারকে ন্যাচরাল ডেলিভারির বিষয়গুলো বলেছিলেন। ডাক্তার এপিসিওটমির ব্যাপারে বলেছিলেন, “আমি তো তোমার শত্রু না যে অকারণে তোমাকে এপিসিওটমি দিয়ে দেব!” প্রয়োজন না হলে উনি এপসিওটমি দেবেন না। তবে পিটোসিনের ব্যাপারে আপোষ করতে রাজী ছিলেন না। উনি লেবার ও ডেলিভারির সময় আপুর হাসবেন্ড কে থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন।
 
আপুর খাওয়া দাওয়া, এক্সারসাইজ রুটিন মত করেছিলেন এবং শেষের দিকে সুগার ও নরমাল লেভেল চলে আসে। আমার অনেক ক্লায়েন্ট আপুর ক্ষেত্রে এটা লক্ষ করেছি, শেষের দিকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
 
ইডিডির আগে আপুর ন্যাচরাল ভাবে পেইন উঠে। পেইন উঠার পর থেকে আমার সাথে কথা হচ্ছিল।ভালোরকম পেইন, অল্প অল্প পানি পড়ছে এমন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। প্রিনেটাল কোর্স থেকে পেইন ম্যানেজ করতে শিখেছিলেন। লেবারের ক্লাস, নোটসগুলো আপু হাসবেন্ডের সাথে শেয়ার করেছিলেন। আপুর হাসবেন্ড ও সেই অনুযায়ী সাপোর্ট দিচ্ছিলেন। লেবার অগ্রগতি হচ্ছিল, পরে পানি টা সবুজ রঙের দেখেছিলেন। ডাক্তারকে জানানোর পর উনি ওয়াটার ব্রেক করে দেখলেন ম্যাকোনিয়াম এর পরিমাণ বেশি। তখন আপু তখন ভয় পেয়েছিলেন এরপর লেবার আগাচ্ছিল না। বেবীর রিস্ক হতে পারে চিন্তা করে সি সেকশনের কথা বলা হয়। আপু নরমাল ডেলিভারির জন্য সবরকম চেস্টা করেছেন। যখন ডাক্তার জানিয়েছেন বেবীর হার্টবিট কমে আসছে তখন জরায়ুমুখ অনেকখানি খুলে যাওয়ার পরও আপুকে ইমার্জেন্সি সি সেকশনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।জন্মের পর বেবীর হার্টবিট কমে আসার কারনে অক্সিজেন সাপোর্ট এবং ইনফেকশন এর জন্য এন্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছিল।
 
শেষ দিন যখন আপুর সাথে কথা হয়েছিল কিছুটা ডিপ্রেশনে ছিলেন। বাবুর সব ব্যাপারে খুব চিন্তিত হয়ে পড়ছিলেন। আপুকে শেষ কিছু পরামর্শ দিয়ে সার্ভিস শেষ করলাম। কিছুদিনের মধ্যে আপু ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠেছিলেন।
 
বেশ কয়েকমাস পর আপু নিজে থেকে নক দিলেন। অনেক দিন পর আপুর কথা শুনলাম। আপু জানালেন বাবুর একটা সমস্যা হয়েছে সে দিনে অসংখ্যবার বমি করে। এটা সামলাতে আপুর বেশ কস্ট হচ্ছে। সব রিপোর্ট নরমাল কোন বড় সমস্যা নাই কিন্তু বমি কোনভাবেই কমছে না। এর কোন সমাধান ডাক্তার দিতে পারেন নাই। বলেছেন বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে৷ পরে আপু নিজেই এই বিষয়ে অনেক পড়াশোনা করে বিস্তারিত জেনেছেন এবং সে ভাবে ম্যানেজ করার চেস্টা করে যাচ্ছেন। পরিবারের মা হাসবেন্ড সাপোর্টিভ দেখে মানসিক ভাবে আপু ষ্ট্রং আছেন৷
 
এই দৌলা ডায়রি শেয়ার করার পিছনে একটা বড় কারন হচ্ছে বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো সবাইকে জানানো।
 
আপু টা নরমাল ডেলিভারির জন্য এতটা চেস্টা করেছেন, নরমাল করায় এমন ডাক্তার দেখিয়েছেন, প্রিনেটাল কোর্স, দৌলা সার্ভিস ও নিয়েছিলেন। তার জন্য সবচেয়ে কস্টের ব্যাপার হচ্ছে পেইন উঠে ডায়ালেশন হওয়ার পরও বেবীর কথা চিন্তা করে উনাকে সি সেকশন করাতে হয়েছে। মন ভাঙার সাথে শারীরিক কস্ট তো হয়েছেই, তারপরও বেবীর দিকে তাকিয়ে কস্ট ভুলতে চেস্টা করেছেন। আপু মনে করেন লেবারের সময় বাবু অনেকক্ষন বার্থ ক্যানেলে ছিল। মায়ের শরীরের ভালো ব্যাকটেরিয়া গুলো সে পেয়েছে। এটা তার ইমিউনিটর জন্য কাজ করবে। আরও দেরী করলে হয়ত বাবুর আরও অসুবিধা হতে পারত, আল্লাহর অশেষ রহমত ও প্রিনেটালের ব্যাপারে জানতেন বলেই সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন। আল্লাহর পরিকল্পনা কে উত্তম মনে করেছেন। প্রিনাটাল কোর্স, দৌলা সার্ভিস একমাত্র উদ্দেশ্যই যে নরমাল ডেলিভারিই ব্যাপারটা আসলে এমন না। প্রিনেটালের জ্ঞান থাকলে আপনি সি সেকশন আসলে প্রয়োজন কিনা সেটা বুঝে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। সবার অবস্থা একরকম হয় না৷ অবস্থা অনুযায়ী তথ্য ও পরামর্শের পাশাপাশি মানসিকভাবে মাকে সহায়তার জন্য দৌলা সার্ভিস। জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডিসিশন টা যখন মা নিজে নেন তখন তার মধ্যে অন্যরকম কনফিডেন্স চলে আসে। যা মা হওয়ার পর অনেকরকম চ্যালেন্জের মুখোমুখি হলে তাকে মানসিক ভাবে শক্তি দেয়।
 
আল্লাহ প্রত্যেক মাকে তাদের এই কস্টের বিনিময়ে দুনিয়া ও আখেরাতে পুরস্কৃত করুক।
 
ফারইয়াব হাসান
সার্টিফাইড চাইল্ড বার্থ এডুকেটর ও ট্রেইন্ড দৌলা, আমানি বার্থ
দৌলা, রৌদ্রময়ী স্কুল