Back

GENTLE CESAREAN : সিজারিয়ান ডেলিভারিকে আরো ন্যাচারাল করে তোলা

সিজারিয়ান ডেলিভারির নেতিবাচক দিক গুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে – নিজের চোখে সন্তান জন্ম দেয়ার দৃশ্য উপভোগ করা থেকে মায়ের বঞ্চিত হওয়া এবং “গোল্ডেন আওয়ার” বা জন্মের প্রথম মূহুর্তে দু’জন পৃথক থাকার কারণে সন্তানের সাথে বন্ডিং তৈরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া। এখানে মা সক্রিয় প্রসবকারী থেকে নিষ্ক্রিয় রোগীতে পরিণত হয়, যা পরবর্তীতে অনেক মায়ের মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া সিজারিয়ান শিশুরা মাইক্রোবায়োমের উপকারীতা থেকেও বঞ্চিত হয়।

কিন্তু যদি এমন হয়, আজকে আপনি এমন এক ধরনের সিজারিয়ান বার্থ সম্পর্কে জানতে পারেন যেখানে মা তার নিজের চোখে সন্তানের প্রসবের দৃশ্য উপভোগ করতে পারবে, ইমিডিয়েট ব্রেস্টফিডিং ও স্কিন-টু-স্কিন কেয়ারের মাধ্যমে সন্তানের সাথে বন্ডিং তৈরির সুযোগ পাবে, শিশুর মধ্যে মাইক্রোবায়োমের উপস্থিতিও ঘটানো হবে, উপরন্তু নিষ্ক্রিয় রোগীর পরিবর্তে মা সক্রিয় প্রসবকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করবে তাহলে কেমন হয়?

হ্যাঁ, সিজারিয়ান ডেলিভারিতেও উপরে উল্লেখ করা সুবিধাসহ আরো কিছু ন্যাচারাল প্রক্রিয়া উপভোগ করা সম্ভব। মূলত সিজারিয়ান ডেলিভারিকে আরো বেশি অর্গানিক, প্রাকৃতিক এবং পরিবার-বান্ধব করে তোলার একটা প্রচেষ্টা হচ্ছে “জেন্টাল সিজারিয়ান” বা “ন্যাচারাল সিজারিয়ান”।

এটা অনস্বীকার্য যে ট্রাডিশনাল সিজারিয়ানের মতোই এটা একটা বড় সার্জিক্যাল অপারেশন, যেখানে মা ও শিশুর নিরাপত্তার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু এর পাশাপাশি আপনি আরেকটু বেশি যে সুবিধাগুলো পেতে পারেন তা হলো –

🔸মা অপারেশন রুমে পরিচিত বা পরিবারের কাউকে তার সাথে রাখতে পারেন। একজন বাবা চাইলেই স্ত্রীর জীবনের সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে তার পাশে থেকে আবেগিক ও মানসিক সাপোর্ট দিতে পারেন। তার সন্তান জন্মদানের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে পারেন যা পরবর্তীতে সন্তানের সাথে তার বন্ডিং তৈরিতে ব্যাপক কাজে আসে। 

🔸অপারেশন রুমের পরিবেশও অনেকটা ফ্যামিলি-বান্ধব করা হয়। মা তার সুবিধামতো ডিম লাইট বা ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ দাবি করতে পারেন। অপারেশন চলাকালীন সে ব্যাকগ্রাউন্ডে কোরআন বা মিউজিক প্লে করতে পারেন। 

🔸এক্ষেত্রে স্পাইনাল এনেস্থিসিয়া ব্যবহার করা হয়, যা মায়ের শরীরে নিচের অংশকে অবস করে দেয়। ফলে মা সার্জারির কোনো ব্যাথা অনুভব করেন না কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ সচেতন থাকতে পারেন এবং নিজের সন্তানের প্রসব চাক্ষুষ উপভোগ করতে পারেন। 

🔸মা আর তার পেটের মাঝের পর্দায় ছোট জানালার মতো থাকে বা আরেকটা পরিষ্কার ট্রান্সপারেন্ট পর্দা থাকে। যখন বেবিকে পেট থেকে বের করা হয় তখন সেই ছোট জানালা উন্মুক্ত করা হয় বা সলিড পর্দাটা সড়িয়ে ফেলা হয়। ফলে মা ছোট জানালার ভেতর দিয়ে বা ট্রান্সপারেন্ট পর্দার ভেতর দিয়ে নিজের সন্তানের পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। এটা নির্ভর করে মায়ের ইচ্ছার উপর, অনেক মা-ই এমন দৃশ্য দেখতে চান না, সেক্ষেত্রে সে এই অংশটা স্কিপ করতেই পারেন। তবে এখানে এই সুযোগটা আছে। মা তার ইচ্ছা মতো কাস্টমাইজ করতে পারেন। 

🔸পেট থেকে বের করেই বাচ্চাকে সরাসরি মায়ের বুকের উপর দেয়া হয়। এর সহায়ক হিসেবে ‘মনিটর এটাচমেন্ট’-গুলো মায়ের পিঠে বা কাঁধের পিছনের দিকটায় লাগানো হয়। যেন বাচ্চার সাথে মায়ের ইমিডিয়েট স্কিন-টু-স্কিন কেয়ার সম্ভব হয়। ব্লাডপ্রেশার কাফ এবং আইভি এক হাতে লাগানো হয়। মায়ের ডোমিনেট হাতটা ঝঞ্জাটমুক্ত রাখা হয়, যেন মা তার বাচ্চাকে বুকের মধ্যে ধরে আদর করতে পারেন। বাচ্চাকে পরিষ্কার করার কাজটা মায়ের বুকে থাকা অবস্থায়ই করা যেতে পারে। 

🔸মা চাইলে ‘ডিলেইড কর্ড ক্ল্যাপিং’ করতে পারেন। ‘ডিলেইড কর্ড ক্ল্যাপিং’ হল বাচ্চার নাড়ী দেরি করে কাটা। অন্তত যতোক্ষণ নাড়ী স্পন্দন করা পুরোপুরি বন্ধ না করে ততোক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করা। বাবা চাইলে নিজের সন্তানের নাড়ী নিজেই কাটতে পারেন। বাবাকে এভাবে প্রসবে অংশগ্রহণ করানোর আইডিয়াটা সত্যিই চমৎকার। 

🔸উপরন্তু মা ডাক্তারের সাথে আগে থেকেই কথা বলে রাখলে, ডেলিভারির সাথে সাথেই মায়ের ভ্যাজাইনা থেকে শ্লেষা নিয়ে ডাক্তার তা শিশুর মুখ, ত্বক ও মায়ের নিপলে লাগিয়ে দিতে পারেন। এতে থাকা মাইক্রোবায়োম শিশুর ইমিউনিটি বুস্ট করতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। ভ্যাজাইনাল ডেলিভারিতে শিশু বার্থ ক্যানেলের মধ্য দিয়ে বের হওয়ার সময় আপনাতেই এই মাইক্রোবায়োম পেয়ে যায় কিন্তু সিজারিয়ানে এটা পাওয়া সম্ভব হয় না বলে আলাদা করে লাগিয়ে দিতে হয়। 

🔸অতি দ্রুত বাচ্চাকে ব্রেস্টফিড করানো হয় এবং মায়ের থেকে তাকে আলাদা করা হয় না। 

ট্রাডিশনাল সিজারিয়ান ডেলিভারিতে আমরা ঠিক কেমন দৃশ্য দেখতে পাই? জন্মের প্রথম মূহুর্তে বাচ্চাকে মায়ের থেকে আলাদা করে পরিষ্কার করা হয়, ওজন দেয়া হয়, চেক-আপ করা হয়, তারপর মায়ের কাছে তাকে দেয়া হয়। ইতেমধ্যেই গোল্ডেন আওয়ার-এর বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। অনেক সময়ই সম্পূর্ণ সার্জারি শেষ হওয়ার আগে মা তার সন্তানকে আদর করতে পারেন না। অপারেশন রুমে ব্রেস্টফিড করাও সম্ভব হয় না। কিন্তু জেন্টেল সিজারিয়ানে এসব বিষয়ে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। এর বেশ কিছু উপকারিতাও আছে। 

জন্মের প্রথম মূহুর্তে বা “গোল্ডেন আওয়ার”-এ বাচ্চা আর মায়ের স্কিন-টু-স্কিন কেয়ারের মাধ্যমে আরো ভালোভাবে সফল ব্রেস্টফিডিং নিশ্চিত করা যায়, শিশুর সাথে মায়ের বন্ডিং দ্রুত গাঢ় হয়, শিশুর টেম্পারেচার, হার্টরেট ও শ্বাসপ্রশ্বাস রেগুলেট করা যায়, সর্বোপরি মা ও শিশু উভয়েরই স্ট্রেস দূর করা সহজ হয়। শিশুকে একটা সিকিউর এবং পরিচিত পরিবেশ দেয়ার মাধ্যমে পৃথিবীতে তার আগমন আরো বেশি স্মুথ করা যায়। 

যদিও জেন্টেল সিজারিয়ানে নরমাল সিজারিয়ানের থেকে সময় একটু বেশি লাগে, তারপরও এটা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং মা খুব দ্রুত সেড়ে ওঠে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। 

উপরের প্রতিটা প্রক্রিয়াই মা এবং তার পরিবারের পছন্দ অপছন্দের উপর নির্ভর করে। তারা যদি কোনো একটা ধাপ স্কিপ বা কাস্টমাইজ করতে চায় তাহলে তার ডাক্তারের সাথে কথা বলে তা করতেই পারে।

একজন জেন্টেল সিজারিয়ান সাপোর্টিভ ডাক্তার বা হাসপাতাল মা-বাবাকেই খুঁজে বের করতে হবে। সেক্ষেত্রে তারা ডাক্তারকে কিছু প্রশ্ন করতে পারেন এটা বোঝার জন্য যে ডাক্তার এমন ডেলিভারি সম্পর্কে কেমন ধারণা পোষণ করেন। আপনার দাবিকৃত প্রতিটা প্রক্রিয়া নিয়ে ডাক্তারের সাথে বিস্তারিত কথা বলে একটা বার্থ প্ল্যান তৈরি করে ফেলতে পারেন যা সম্পর্কে সবাই ওয়াকিবহাল থাকবে এবং প্রত্যেকে সেই বার্থ প্ল্যান-কে সম্মান প্রদর্শন করবে। 

কিন্তু সবসময় মাথায় রাখবেন, আমরা যা-ই পরিকল্পনা করি না কেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা-ই হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী। যদি এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যায় যে আপনার ডাক্তারকে বার্থ প্ল্যানের বাইরে কিছু করতে হয়, তাহলে প্ল্যান ‘বি’ রাখাই বেশি বুদ্ধিমানের কাজ। যেমন, কোনো কারণে আপনার সাথে স্কিন-টু-স্কিন কেয়ার করানো সম্ভব হচ্ছে না, সেক্ষেত্রে এটা যেন আপনার হাসবেন্ডের সাথে করানো হয় এমনটা বার্থ প্ল্যানে উল্লেখ রাখা। মোদ্দাকথা বার্থ প্ল্যানকে নমনীয় রাখা যেন ডাক্তার তার কম্ফোর্ট জোনে থেকে আপনার সকল চাওয়া পূরণ করতে পারেন।

একটা কথা কোনোভাবেই হেলা করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশে জেন্টেল সিজারিয়ান এর সুবিধা খুবই সীমিত। হাতেগোনা কয়েকজন ডাক্তার এটার প্রাক্টিস করে থাকতে পারেন। তবে উন্নত বিশ্বের ন্যায় এদেশেও দিন দিন এমন সিজারিয়ান ডেলিভারি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আপনি এমন সুবিধা পান বা না পান অন্তত আপনার ডাক্তারের সাথে এ বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করুন, যেন ডাক্তাররা জানতে পারেন দিন দিন মানুষ এমন ডেলিভারি সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠছে। হয়তো একটা সময় পর মানুষের চাহিদার কথা বিবেচনা করে এদেশেও এমন সিজারিয়ান ডেলিভারি অনেক বেশি প্রচলিত এবং সহজলভ্য হয়ে উঠবে। 

যদিও জেন্টেল বা ন্যাচারাল সিজারিয়ান ন্যাচারাল বার্থের বিকল্প নয়, তবে ইলেকটিভ সিজারের পরিবর্তে এমন সিজারিয়ান অনেক বেশি রিকমন্ডেড। আমরা চাই একজন মায়ের জীবনে শুধু তার সার্জারিটাই স্মরণীয় হওয়ার পরিবর্তে তার প্রসবটাও স্মরণীয় হয়ে থাকুক।

রেজওয়ানা রাজ্জাক 
দৌলা ট্রেইনী, আমানি বার্থ 
প্রিনেটাল এসোসিয়েট, রৌদ্রময়ী স্কুল